UMMA TOKEN INVESTOR

About me

"I am my own self — a journey full of flaws and imperfections. Yet I strive to let every shadow of my being be colored by the light of the Prophet (ﷺ)." — Saeed.

Followings
0
No followings
Translation is not possible.
আমরা যে সময়ে বসবাস করছি, তাকে এক কথায় ‘যৌনতার মহামারীকাল’ বললে খুব একটা ভুল হবে না। মানুষের পকেটে পকেটে এখন পৃথিবী, আর সেই কৃত্রিম পৃথিবীর নীল বিষে আসক্ত হয়ে আছে আমাদের তরুণ থেকে শুরু করে মাঝবয়সী পুরুষদের একটি বিশাল অংশ। যে চোখের কাজ ছিল সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে খোঁজা, সেই চোখ এখন ব্যস্ত নিষিদ্ধ পল্লীর ডিজিটাল সংস্করণ গিলতে। এই বিষাক্ত আসক্তি যখন একজন পুরুষের মগজে বাসা বাঁধে, তখন তার কাছে ‘স্ত্রী’ আর রক্ত-মাংসের মানুষ থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন কেবল নিজের বিকৃত কামলিপ্সা চরিতার্থ করার একটি যন্ত্রমাত্র।
 
অথচ ইসলামি জীবনব্যবস্থায় দাম্পত্য ছিল প্রশান্তির নীড়, কুরআনের ভাষায় যা ‘লিবাছ’ বা একে অপরের পরিচ্ছদ। কিন্তু যখন পর্দার আড়ালে পর্নোগ্রাফির করাল গ্রাস প্রবেশ করে, তখন সেই প্রশান্তির নীড়টি পরিণত হয় নির্যাতনের কারাগারে।
 
একজন স্বামী যখন বাইরের জগত থেকে, ইন্টারনেট থেকে নোংরা সব দৃশ্য দেখে এসে নিজের স্ত্রীর ওপর সেই ফ্যান্টাসি প্রয়োগ করতে চান, তখন তিনি মূলত তিনটি অপরাধ একসাথে করেন।
 
প্রথমত, তিনি চোখের জিনাহ করছেন এবং নিজের ফিতরাত বা স্বভাবজাত পবিত্রতা নষ্ট করছেন;
 
দ্বিতীয়ত, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছেন;
 
এবং তৃতীয়ত, তিনি তার স্ত্রীর ওপর এমন এক মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালাচ্ছেন যা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট জুলুম।
 
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে। এটি কেবল রাস্তার বেগানা নারীর জন্য নয়, বরং ইন্টারনেটের কৃত্রিম নারীদেহের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
 
যে স্বামী এই নির্দেশ অমান্য করে নীল ছবির সাগরে ডুব দেয়, তার রুচি এবং মননশীলতা এতটাই বিকৃত হয়ে যায় যে, স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক তাকে আর তৃপ্তি দেয় না। সে তখন পশুর মতো আচরণ শুরু করে, আর ইসলামে পশুর আচরণের কোনো স্থান নেই।
 
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীর ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে না পড়ে (পশুর মতো মিলিত না হয়)। বরং তাদের উভয়ের মাঝে যেন একজন ‘দূত’ থাকে।” জিজ্ঞাসা করা হলো, “হে আল্লাহর রাসূল! সেই দূতটি কী?” তিনি বললেন, “চুম্বন এবং (প্রেমময়) কথোপকথন।’
 
যেই ধর্মে মিলনের আগে ভালোবাসার দূত প্রেরণের কথা বলা হয়েছে, সেই ধর্মে পর্নোগ্রাফির অনুকরণে স্ত্রীর ওপর জবরদস্তি বা বিকৃত যৌনাচার চালানো কীভাবে বৈধ হতে পারে?
 
আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা দ্বীনের আংশিক পালন করি এবং সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করাই। অনেক পুরুষ মনে করেন, বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর ওপর তার নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই মালিকানার দম্ভ থেকেই তারা স্ত্রীর অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা বা মানসিক অবস্থাকে তোয়াক্কা করেন না। অথচ ইসলামে বিয়ে কোনো মালিকানা স্বত্ব নয়, বরং এটি একটি পবিত্র চুক্তিনামা যার ভিত্তি হলো ভালোবাসা ও করুণা।
 
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে দাম্পত্যের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো।’
 
এখন প্রশ্ন হলো, একজন অসুস্থ স্ত্রীকে জোরপূর্বক বিছানায় টেনে নেওয়া, জ্বরে বা ব্যথায় কাতরাতে থাকা শরীরটার ওপর নিজের পাশবিক জেদ চাপিয়ে দেওয়া—এটা কি প্রশান্তি? নাকি এটি সেই স্ত্রীর জন্য আজাব?
 
যিনি অসুস্থ, তিনি তো শরিয়তের দৃষ্টিতেই ‘মাজুর’ বা অক্ষম। আল্লাহ যেখানে অসুস্থ ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, সেখানে একজন স্বামী কোন যুক্তিতে অসুস্থ স্ত্রীর ওপর নিজের কামনার বোঝা চাপিয়ে দিতে পারেন? এটি কি আল্লাহর দেওয়া বিধানের চেয়েও নিজের নফসকে বড় মনে করা নয়?
 
অনেকেই হয়তো তর্কের খাতিরে বলবেন, হাদিসে তো স্বামীকে খুশি রাখার ব্যাপারে অনেক তাকিদ দেওয়া হয়েছে। ফেরেশতারা লানত দেন বলে যে হাদিসটি প্রচলিত, সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অনেক জালিম স্বামী নিজের অপকর্মকে জায়েজ করতে চান।
 
কিন্তু তারা হাদিসটির প্রেক্ষাপট এবং ইসলামের ‘লা দারা ওয়ালা দিরা’ (ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্যও করা যাবে না) নীতিটি বেমালুম ভুলে যান। ইসলামে কোনো ইবাদত বা আনুগত্যই নিজের জীবন বা শরীরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে করার বিধান নেই।
 
স্ত্রীর অসুস্থতার সময় তাকে জোর করা, তার অনিচ্ছায় এমন কোনো কাজ করা যা তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়—এটি স্পষ্টতই বান্দার হক নষ্ট করা। আর বান্দার হক নষ্ট করার অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না সেই বান্দা ক্ষমা করে।
 
তাই যারা মনে করেন স্ত্রীর অসুস্থতায় জোরজবরদস্তি করলে কোনো গুনাহ নেই, তারা মূলত বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এই জুলুমের বিচার শুধু হাশরের ময়দানেই হবে না, বরং ইহকালেও এর প্রতিবিধান থাকা আবশ্যক।
 
এখানেই আসে সেই মোক্ষম প্রশ্নটি—‘অসুস্থ অবস্থায় বা অনিচ্ছায় জোরপূর্বক মিলনের শাস্তি কি ইসলামে নেই?
 
উত্তর হলো—অবশ্যই আছে এবং তা অত্যন্ত কঠোর। ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রে ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাপ্রসূত শাস্তির একটি বিশাল অধ্যায় রয়েছে। যেই অপরাধের জন্য কুরআনে নির্দিষ্ট কোনো হুদুদ (যেমন চুরির জন্য হাত কাটা) নেই, কিন্তু যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর বা অন্যের ওপর জুলুম, তার জন্য শাসক বা বিচারক কঠোর শাস্তির বিধান করতে পারেন। একজন স্বামী যদি তার স্ত্রীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বা তাকে জিম্মি করে এমন আচরণ করেন যা তার শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের হানি ঘটায়, তবে ইসলামি আইনে সেই স্বামী অপরাধী।
 
স্ত্রী যদি কাজীর (বিচারক) কাছে অভিযোগ করেন যে তার স্বামী তাকে অসুস্থ অবস্থায় জোরপূর্বক ব্যবহার করেছেন বা বিকৃত যৌনাচারে বাধ্য করেছেন, তবে বিচারক সেই স্বামীকে দৈহিক শাস্তি, কারাদণ্ড, এমনকি জনসমক্ষে লজ্জিত করার মতো দণ্ডও দিতে পারেন। ইসলাম কখনোই নারীর ওপর এই পাশবিকতাকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যায় না।
 
বিশেষ করে, বিকৃত যৌনাচার, যেমন মলদ্বারে সঙ্গম, ইসলামে হারাম এবং জঘন্য অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নারীর মলদ্বারে সঙ্গম করে, সে অভিশপ্ত।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।
 
এখন চিন্তা করুন, যেই কাজের জন্য স্বয়ং আল্লাহর রাসূল লানত দিয়েছেন এবং আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলেছেন, সেই কাজটিকে রাষ্ট্র বা সমাজ কীভাবে লঘু করে দেখতে পারে? এটি কেবল পরকালীন বিষয় নয়।
 
ইসলামি রাষ্ট্রে এমন বিকৃত রুচির মানুষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ওয়াজিব। কারণ, এই ধরনের আচরণ কেবল একটি নারীর মর্যাদা হানি করে না, বরং পুরো প্রজন্মের রুচি ও ফিতরাতকে ধ্বংস করে দেয়।
 
পর্নোগ্রাফি দেখে যারা এই ধরনের কাজ করে, তারা মূলত লুত (আ.)-এর কওমের স্বভাব নিজেদের মধ্যে ধারণ করছে। তাদের এই বিকৃতি প্রতিরোধের জন্য ইহকালীন শাস্তির ব্যবস্থা থাকাটা ইসলামের ‘সাদদুজ যারাই’ (মন্দের পথ রুদ্ধ করা) নীতির অন্তর্ভুক্ত।
 
আমাদের বুঝতে হবে, ইসলাম নারীকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে সৃষ্টি করেনি। ইসলাম নারীকে দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান। তার শরীরের ওপর তার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অসুস্থতা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই সময়ে স্বামীর দায়িত্ব ছিল সেবা করা, কপালে জলপট্টি দেওয়া, রাত জেগে পাশে বসে থাকা। অথচ সেই সময়ে যে স্বামী তাকে ভোগ করতে চায়, সে মানুষ নামের কলঙ্ক। তার এই আচরণের বিচার চাওয়ার অধিকার স্ত্রীর আছে।
 
আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় হয়তো নারীরা লজ্জায় মুখ খোলেন না, অথবা তথাকথিত পারিবারিক সম্মানের ভয়ে চুপ থাকেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ইসলাম তাদের চুপ থাকতে বলেছে।
 
হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে আমরা দেখেছি, পারিবারিক অসঙ্গতি নিয়েও নারীরা সরাসরি খলিফার দরবারে অভিযোগ করেছেন এবং তিনি তার সমাধান দিয়েছেন। আজকের দিনেও যদি কোনো নারী তার স্বামীর এই পৈশাচিক আচরণের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি কোনো অন্যায় করবেন না। বরং এই জুলুম প্রতিরোধ করাটাই ঈমানের দাবি।
 
যুক্তি এবং আবেগের মিশেলে যদি আরেকটু গভীরে যাই, তবে দেখব—একজন অসুস্থ মানুষের ওপর জবরদস্তি করাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও ‘ট্রমা’ বা মানসিক আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসলাম মানুষের ‘আকল’ বা বুদ্ধিমত্তা এবং ‘নফস’ বা প্রাণের সুরক্ষাকে শরিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়ত) হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এখন কোনো স্বামীর আচরণ যদি স্ত্রীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে বা তার অসুস্থতাকে বাড়িয়ে প্রাণনাশের কারণ হয়, তবে সেই স্বামী কি শরিয়তের দৃষ্টিতে অপরাধী নন? অবশ্যই অপরাধী। এবং এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে সংশোধনাগারে পাঠানো, বেত্রাঘাত করা বা স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া—সবই ইসলামি বিচারব্যবস্থার এখতিয়ারভুক্ত। সুতরাং যারা বলেন, ‘স্বামীর শরীরের ওপর অধিকার আছে, তাই তিনি যা খুশি করতে পারেন’—তারা মূলত ইসলামের অপব্যাখ্যা করছেন এবং নিজেদের প্রবৃত্তির পূজা করছেন।
 
আমাদের যুবকদের মগজ ধোলাই করে দিয়েছে পশ্চিমা পর্ন ইন্ডাস্ট্রি। তারা শেখাচ্ছে যে, যৌনতা মানেই ভায়োলেন্স, চিৎকার আর আধিপত্য। অথচ আমাদের রাসুল (সা.)-এর সিরাত দেখুন। তিনি আয়েশা (রা.)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করছেন, একই পাত্র থেকে পানি পান করছেন, স্ত্রীর উরুতে মাথা রেখে শুয়ে থাকছেন। এই যে কোমলতা, এই যে মায়া—এটাই হলো ইসলামের রোমান্স। যেই রোমান্সে সম্মান নেই, যেই রোমান্সে অপরের কষ্টের অনুভূতি নেই, তা ইসলাম নয়, তা হলো পৈশাচিকতা। অসুস্থ স্ত্রীর সাথে জবরদস্তি করা সেই পৈশাচিকতারই চূড়ান্ত রূপ।
 
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকার কারণে হয়তো আজ আমরা হাতেনাতে এর শাস্তি দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু এর মানে এই নয় যে ইসলামে এর বিধান নেই। একটি আদর্শ ইসলামি সমাজে এমন স্বামীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং আইনের আওতায় আনা জরুরি। কারণ, ঘরের ভেতর যে পুরুষটি অত্যাচারী, সে সমাজের জন্যও নিরাপদ নয়। যে তার অর্ধাঙ্গিনীর অসুস্থতা বোঝে না, সে মানবতার কোনো কল্যাণ করতে পারে না।
 
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সমাজ কেন চুপ? সমাজ চুপ কারণ আমরা লজ্জা আর দ্বীনদারিতার সংজ্ঞাকে গুলিয়ে ফেলেছি। আমরা মনে করি, ঘরের কথা বাইরে বলাটা বেহায়াপনা। কিন্তু জুলুম সহ্য করা দ্বীনদারি নয়। ইসলামে আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। একজন নারী যখন তার স্বামীর বিকৃত যৌনাচারের শিকার হন, তখন তিনি কেবল শারীরিকভাবেই লাঞ্ছিত হন না, তার আত্মবিশ্বাস, তার ঈমানি শক্তি এবং তার মানসিক প্রশান্তি—সবই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই অবস্থায় তাকে বলা যে ‘তোমাকে হাশর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে’—এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীর জন্য ক্ষতিকর হন (তা শারীরিক বা মানসিক যেভাবেই হোক), তবে স্ত্রী ‘খুলা’ তালাক বা কাজীর মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন। এবং এই ক্ষতির কারণে তিনি ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন। এটিই তো ইহকালীন বিচারের একটি অংশ।
 
আরও গভীরে ভাবুন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুমিন পুরুষদের চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, কেবল তাদের স্ত্রী ও দাসী ছাড়া। এই ‘হেফাজত’ মানে কেবল জিনা থেকে বিরত থাকা নয়, বরং এর ব্যবহারকে শরিয়তসম্মত রাখা। পর্নোগ্রাফির অনুকরণে স্ত্রীকে ব্যবহার করা লজ্জাস্থানের হেফাজত নয়, বরং এটি তার অপব্যবহার। যারা এই যুক্তি দেন যে, ‘বাইরে জিনা করার চেয়ে স্ত্রীর সাথে যা খুশি করা ভালো’—তারা শয়তানের ধোঁকায় আছেন। হারাম কখনো হারামের বিকল্প হতে পারে না। মলদ্বারে সঙ্গম বা পিরিয়ড চলাকালীন সঙ্গম—এগুলো স্পষ্ট হারাম। স্ত্রীকে এই হারামে বাধ্য করা মানে তাকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেওয়া। আর যে স্বামী তার স্ত্রীকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়, সে ‘কাওয়াম’ বা অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা হারায়। রাষ্ট্র তাকে অভিভাবকত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
 
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে, নারীদের সুরক্ষা আইন বা পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনগুলো যদি ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে সেগুলো মেনে চলা এবং প্রয়োগ করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। অসুস্থ অবস্থায় জোরপূর্বক মিলনকে যদি আমরা ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করি, তবে ইসলাম এর পূর্ণ সমর্থন দেবে। কারণ ইসলাম এসেছে সহিংসতা দূর করতে, বাড়াতে নয়।
 
যেই স্বামী তার স্ত্রীর চোখের পানিকে উপেক্ষা করে নিজের কামনার আগুন নেভাতে ব্যস্ত, সে মূলত আবু লাহাব বা আবু জাহেলের উত্তরসূরি, মোহাম্মদী আদর্শের অনুসারী নয়। তাকে থামানো, তার হাত ধরে প্রতিহত করা সমাজের এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে।’ ঘরের ভেতরের এই অন্যায় প্রতিরোধ করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
 
পরিশেষে বলব, এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ একটাই—কুরআনের আলোয় ফিরে আসা এবং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। স্বামীদের বুঝতে হবে, স্ত্রী কোনো বাজারের পণ্য নয় যে তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে হবে। তিনি আমানত। আর আমানতের খেয়ানতকারীকে আল্লাহ মুনাফিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
 
অসুস্থতা, অপারগতা এবং মানবিক সীমাবদ্ধতাকে সম্মান জানানোই প্রকৃত পৌরুষ। পর্নোগ্রাফি আসক্ত বিকৃত মস্তিষ্কের পুরুষদের চিকিৎসার প্রয়োজন এবং প্রয়োজন কঠোর শাসন। ইসলামি অনুশাসনে এই বিকৃতির কোনো স্থান নেই, থাকার প্রশ্নই আসে না। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে এই পৈশাচিকতাকে জায়েজ করতে চায়, তারা ইসলামের শত্রু। তাদের মুখোশ উন্মোচন করা এবং ইহকালেই তাদের বিচারের মুখোমুখি করা সময়ের দাবি। হাশরের বিচার তো আছেই, কিন্তু দুনিয়াতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করাও আল্লাহর নির্দেশ। নারীর সম্মান, সুরক্ষা এবং তার ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়া সেই ইনসাফেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
 
আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিকে সংযত করি, আমাদের বিবেককে জাগ্রত করি। আমাদের ঘরগুলো হোক জান্নাতের টুকরো, জাহান্নামের গহ্বর নয়। অসুস্থ স্ত্রী যখন স্বামীর দিকে তাকাবেন, তার চোখে যেন ভয়ের বদলে ভরসা দেখতে পান—এটাই ইসলামের শিক্ষা, এটাই মানবতার দাবি।
 
[অসুস্থ স্ত্রীর অধিকার ও জালিম স্বামী]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যখনই কোনো জনপদ থেকে ইনসাফ উঠে গেছে, যখনই বিচারকের হাত অপরাধীর পরিচয় খুঁজতে গিয়ে কেঁপে উঠেছে, তখনই সেই জনপদে নেমে এসেছে আল্লাহর গজব। আজকের এই লেখাটি কোনো সাধারণ কলাম নয়, এটি আমাদের মৃতপ্রায় বিবেকের জানাজার নামাজ। ঢাকার ধামরাইয়ে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি দম্পতি বা একজন নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের ঘুণে ধরা নৈতিকতা আর পক্ষপাতদুষ্ট সুশীলতার নগ্ন দলিল।
 
ভাবতে পারেন? বিশ্বাস আর বন্ধুত্বের খাতিরে একজন মুসলিম দম্পতি বেড়াতে গিয়েছিলেন তাদের হিন্দু সহকর্মী কৃষ্ণচন্দ্র মনিদাসের বাড়িতে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বা সহকর্মীর প্রতি ন্যূনতম মানবিক আমানতদারিতা থাকবে—এটাই তো ছিল আবহমান বাংলার সংস্কৃতি। কিন্তু রাত বারোটার সেই কাললগ্নে মনিদাসের বোনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে যা ঘটল, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। সাতজন নরপশু। সারা রাত ধরে একটি নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন। সেই গৃহবধূর আর্তনাদ কি ধামরাইয়ের আকাশ ভেদ করে আরশে আজিমের মালিকের কাছে পৌঁছায়নি? তাদের লোলুপ দৃষ্টি কেবল সেই নারীর শরীরের ওপরই পড়েনি, তাদের লোভ ছিল স্বর্ণালংকারের প্রতিও। কানের দুল, গলার চেইন, হাতের বালা—সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নিয়ে তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং যখন নির্যাতিত দম্পতি বিচার চাইতে গেল, তখন সজিব চন্দ্রমনি দাসসহ অন্যরা উল্টো তাদেরকে পিটিয়ে গ্রাম ছাড়া করল। কী অদ্ভুত আমাদের সমাজ! কী বিচিত্র আমাদের বিচারিক বোধ!
 
এখানেই থামুন। একটু গভীর দম নিন। মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে একটু নাড়া দিন। আপনার চোখের সামনে যদি ভেসে উঠত উল্টো কোনো চিত্র? ধরুন, ভিক্টিম যদি কোনো হিন্দু দম্পতি হতো আর অপরাধী হতো কোনো মুসলিম নামধারী ব্যক্তি? তাহলে এতক্ষণে এই দেশের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, আর মানবাধিকারের ঝাণ্ডাবাহী এনজিওগুলোর অবস্থা কী হতো? এতক্ষণে টকশোতে চায়ের কাপে ঝড় উঠত, পত্রিকার পাতা কালো হয়ে যেত "সংখ্যালঘু নির্যাতন" আর "অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিনাশ" শিরোনামে। বুদ্ধিজীবীরা তাদের কলম শানিয়ে ফেলতেন, আর তথাকথিত প্রগতিশীলরা মোমবাতি হাতে শাহবাগে দাঁড়িয়ে যেতেন। কিন্তু আজ? আজ কেন সব চুপ? আজ কেন সেই সুশীলদের চোখে পানি নেই? কারণ ভিক্টিম এখানে মুসলিম। অপরাধী এখানে ভিন্ন ধর্মের। ধামরাইয়ের এই ঘটনায় তাদের মুখে কুলুপ আঁটা। এই যে দ্বিচারিতা, এই যে অন্যায়ের বাছ-বিচার, এটা কি প্রমাণ করে না যে তাদের কাছে মানবতা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো তাদের এজেন্ডা?
 
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড কত উঁচুতে স্থাপন করেছেন, তা কি আমরা ভুলে গেছি?
 
সূরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছেন:
 
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্যদানকারী হও, তাতে তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের যদি ক্ষতিও হয় তবুও। কেউ যদি ধনী হয় বা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের উভয়েরই হিতাকাঙ্ক্ষী। অতএব, তোমরা দুনিয়ার কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে ফিরে যেও না।"
 
লক্ষ করুন, আল্লাহ এখানে অপরাধী বা ভিক্টিমের ধর্ম পরিচয় দেখতে বলেননি। তিনি ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। ইনসাফ হতে হবে অন্ধ। অপরাধী যেই হোক—সে মুসলিম হোক, হিন্দু হোক, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হোক—তার একমাত্র পরিচয় সে 'অপরাধী'। আর মজলুম যেই হোক, তার একমাত্র পরিচয় সে 'মজলুম'। কিন্তু আজকের সেক্যুলার আইনের মারপ্যাঁচে আর মিডিয়ার ভণ্ডামিতে আমরা বিচারকে ধর্মের চশমা দিয়ে দেখতে শিখেছি। আমাদের প্রশাসন আজ ঘুমাচ্ছে। একটি নারীর ইজ্জত চলে গেল, তাকে গ্রাম ছাড়া করা হলো, অথচ প্রশাসন নীরব। এই নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ নয়?
 
এই যে একের পর এক ধর্ষণ, এই যে নৈতিক অবক্ষয়—এর মূল কারণ কী? এর মূল কারণ হলো আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ইমানি চেতনার বিলুপ্তি। আমরা এমন এক আইন ব্যবস্থা তৈরি করেছি যা অপরাধীকে ভয় দেখাতে ব্যর্থ। যে আইন মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে আইনের বই কেবল আদালতের তাকে সাজানো থাকে কিন্তু মজলুমের চোখের পানি মুছতে পারে না, সেই আইন দিয়ে আমরা কী করব? আজকে যদি ঐ সাতজন ধর্ষককে জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হতো, যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হতো, তবে কাল কোনো নরপশু কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না।
 
আধুনিকতা আর প্রগতির নামে আমরা জাহেলিয়াতের যুগে ফিরে গেছি। জাহেলিয়াতের যুগেও নারীদের পণ্য মনে করা হতো, আর আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতেও নারীরা নিরাপদ নয়। পার্থক্য শুধু এটুকুই—তখন তারা কবর দিত জীবন্ত কন্যাকে, আর আজ আমরা কবর দিচ্ছি জীবন্ত নারীর স্বপ্ন আর সম্ভ্রমকে। ধর্ষণ কেন থামছে না? কারণ, ধর্ষকের মনে কোনো ভয় নেই। সে জানে, টাকা থাকলে, পলিটিক্যাল পাওয়ার থাকলে, অথবা 'সংখ্যালঘু' বা 'সংখ্যাগুরু' কার্ড খেলতে পারলে সে পার পেয়ে যাবে।
 
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সমস্যার গোড়ায় হাত দিচ্ছি না। আমরা ডালপালা ছাঁটছি। ইসলাম বলে, অপরাধের বিচার হতে হবে দ্রুত এবং দৃশ্যমান। যখন কোনো সমাজে অপরাধের শাস্তি বিলম্বিত হয়, তখন সেই সমাজে অপরাধ মহামারী আকার ধারণ করে।
 
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা ধ্বংস হয়েছে কারণ, যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তখন তারা তার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।"
 
এই হলো ইসলামের ইনসাফ। এখানে সজিব চন্দ্রমনি দাস বা কোনো আব্দুল্লাহর মধ্যে পার্থক্য নেই। যে ধর্ষণ করেছে, সে ফাসাদ সৃষ্টিকারী। তার শাস্তি হতে হবে সর্বোচ্চ এবং কঠোরতম। কিন্তু আমাদের প্রশাসন কি সেই সাহস রাখে? নাকি তারা রাজনৈতিক সমীকরণের হিসাব কষতে ব্যস্ত? প্রশ্ন জাগে, আর কত হাজার বোন ধর্ষিত হলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? আর কত সম্ভ্রম লুন্ঠিত হলে আমরা ন্যায়বিচার দেখতে পাব?
 
যারা আজ সম্প্রীতির সবক দিতে আসেন, তাদের জিজ্ঞেস করতে চাই—সম্প্রীতি মানে কি কেবল একপক্ষের নীরবতা? সম্প্রীতি মানে কি অন্যায়ের সাথে আপস? ধামরাইয়ের ঘটনায় স্পষ্ট বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ। যারা পরিকল্পিতভাবে একজন মুসলিম নারীকে ফাঁদে ফেলে এই পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তারা কেবল কামুক নয়, তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকেও এটি করতে পারে। আর যদি তাই হয়, তবে এর বিচার হওয়া উচিত আরও কঠোরভাবে। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ আজ অন্ধ। তাদের চশমার গ্লাসটি এমনভাবে তৈরি যে, তাতে কেবল নির্দিষ্ট কিছু রং ধরা পড়ে। মুসলিম নারীর কান্না তাদের কানে পৌঁছায় না, কারণ এতে তাদের এনজিওর ফান্ড বাড়ে না, এতে তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুদের কাছে রিপোর্ট পাঠানোর মতো মশলা থাকে না।
 
লজ্জা! ভীষণ লজ্জা হয় এই সমাজ নিয়ে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন সত্য বলাটা আগুনের গোলক হাতে রাখার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই। “যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না, সে বোবা শয়তান।” এই হাদিসটি কি আমাদের অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করে না? আমরা কি চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এমন এক সমাজে বেড়ে উঠুক যেখানে নারীর সম্ভ্রমের কোনো মূল্য নেই? যেখানে বিচার চেয়ে উল্টো মার খেতে হয়?
 
আমাদের বুঝতে হবে, এই সমস্যার সমাধান কেবল মোমবাতি জ্বালিয়ে বা মানববন্ধন করে হবে না। এর সমাধান নিহিত আছে আমাদের ফিরে আসার মাঝে—সেই শাশ্বত সত্যের দিকে, সেই ঐশী বিধানের দিকে। কুরআনের আইন যেদিন প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন বিচারকের আসনে বসে বিচারক আল্লাহর ভয়ে কম্পমান থাকবেন, সেদিনই কেবল এই ধর্ষণ আর অনাচার বন্ধ হবে। মানুষের তৈরি আইন ফাঁকফোকরে ভরা। উকিলের যুক্তিতে সেখানে সত্য মিথ্যা হয়, আর মিথ্যা সত্য হয়। কিন্তু আল্লাহর আইনে কোনো ফাঁক নেই।
 
আজকে যারা বুদ্ধিজীবী সেজে বসে আছেন, যারা সমালোচনা করেন, তারা কি পারেন না নিজেদের কলম দিয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে? নাকি তাদের কলম কেবল ইসলামের বিষদগার করার জন্যই প্রস্তুত থাকে? মনে রাখবেন, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজকের এই নীরবতা আগামীকালের ইতিহাসের পাতায় আপনাদেরকে মীরজাফরের চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করবে।
 
ধামরাইয়ের সেই বোনটির কথা ভাবুন। তার স্বামীটির কথা ভাবুন। তাদের কি অপরাধ ছিল? বিশ্বাস করা? সহকর্মীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া? এই সরলতার সুযোগ নিয়ে যারা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারা কি মানুষ? না, তারা মানুষ নামের কলঙ্ক। আর যারা এদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, যারা বিচার না করে উল্টো ভিক্টিমকে গ্রাম ছাড়া করছে, তারা এই অপরাধের সমান অংশীদার।
 
“আঁধার রাতে ওৎ পেতে রয় হিংস্র দানব দল,
বিচার চেয়ে ফিরল তারা, চোখে শুধুই জল।
সবক দেয় সুশীল যারা, মানবতা আজ কই?
বোনটি আমার কাঁদছে একা, আমি কি বধির রই?”
 
আমাদের তরুণ সমাজকে জাগতে হবে। আপনাদের রক্ত কি গরম হয় না? আপনাদের কি মনে হয় না যে, এই সমাজটাকে বদলানো দরকার? জাকের নায়েক যখন যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, তখন অনেকে অস্বস্তিবোধ করেন। কেন? কারণ সত্য সব সময় তিতা হয়। আরিফ আজাদ যখন কলমের খোঁচায় আপনাদের ভণ্ডামি ধরিয়ে দেন, তখন আপনারা তাকে মৌলবাদী বলেন। কিন্তু ধামরাইয়ের এই ঘটনার পর কে আসল মৌলবাদী আর কে আসল ভণ্ড, তা কি পরিষ্কার নয়?
 
প্রশাসনের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ নয়, বরং কঠোর দাবি—এই ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেককে, সে যেই হোক, যে ধর্মেরই হোক, অবিলম্বে গ্রেফতার করুন। তাদের এমন শাস্তি দিন যেন তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। সজিব চন্দ্রমনি দাসদের মতো যারা অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তারাও সমান অপরাধী। তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা আর কোনো আশ্বাস চাই না, আমরা দৃশ্যমান বিচার চাই।
 
মনে রাখবেন, জুলুমের রাজত্ব কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফেরাউনের পতন হয়েছিল, নমরুদের পতন হয়েছিল। আজকের এই আধুনিক নমরুদদেরও পতন হবে। আল্লাহর গজব যখন আসবে, তখন কেউ রেহাই পাবে না—না ধর্ষক, না প্রশ্রয়দাতা, আর না এই নীরব দর্শক। আমরা চাই না আমাদের দেশটা আল্লাহর গজবের শিকার হোক। তাই সময় থাকতে আমাদের তওবা করতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়াতে হবে।
 
পরিশেষে বলি, হে আমার ভাই ও বোনেরা! আপনারা হতাশ হবেন না। রাত যত গভীর হয়, ভোর তত নিকটে আসে। এই অন্ধকার কেটে যাবেই। ইনশাআল্লাহ, একদিন এই জমিনে ইনসাফ কায়েম হবে। সেদিন কোনো মনিদাস বা কোনো আব্দুল্লাহ অন্যায় করে পার পাবে না। সেদিন বিচার হবে কেবল আমলনামা দেখে, ধর্ম বা বংশ পরিচয় দেখে নয়। আসুন, আমরা সেই দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি এবং আজ থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত করি।
 
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
মধ্যরাতের হাসপাতালের করিডোরটা বড্ড নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে শুধু দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়া নার্সদের জুতো আর ট্রলি চাকার ঘসঘসে শব্দ। জানালার ওপাশে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। কাঁচের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে—ঠিক যেন মানুষের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অসহায় কান্না।
 
আহিয়ান করিডরের স্টিলের বেঞ্চটাতে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার এলোমেলো চুল, বিধ্বস্ত চেহারা। চোখের চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে বারবার মুছছে, কিন্তু ঝাপসা ভাবটা কাটছে না। তার ঠিক পাশেই বসে আছে সাফওয়ান। তার হাতে একটা তসবিহ থাকার কথা ছিল, কিন্তু তার হাতে এখন আহিয়ানের কাঁধ। শান্ত, ধীরস্থির স্পর্শ। আইসিইউর ভেতরে তাদের ভার্সিটি জীবনের বন্ধু রাফি লড়ছে মৃত্যুর সাথে। বাইক এক্সিডেন্ট। মাথার খুলি ফেটে মগজের কিছুটা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছে।
 
আহিয়ান হঠাৎ মাথা তুলল। তার চোখে সেই চিরচেনা সংশয়বাদী ক্ষোভ, যা ক্যাম্পাসের আড্ডায় বহুবার দেখা গেছে। কিন্তু আজকের ক্ষোভের সাথে মিশে আছে প্রচণ্ড হাহাকার। সে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু গলার স্বর বের হলো ফিসফিসানি হয়ে, যেন কোনো এক পরাজিত সেনাপতির শেষ আর্তনাদ।
 
“সাফওয়ান, তোরা তো বলিস গাছের পাতাও নাকি আল্লাহর হুকুম ছাড়া নড়ে না। রাফির এই এক্সিডেন্ট, এই মৃত্যু—সবই তো লওহে মাহফুজে লেখা ছিল, তাই না? ও তো চাইলেও আজ বাইক না নিয়ে বের হতে পারত না, কারণ চিত্রনাট্য তো আগেই লেখা। তাহলে এই যন্ত্রণার দায় কার? যে স্ক্রিপ্ট লিখেছে তার, নাকি যে পুতুলের মতো পারফর্ম করছে তার? একজন খুনি যখন খুন করে, একজন নাস্তিক যখন অবিশ্বাস করে—সেটাও তো আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। তিনি চাইলে তো রাফিকে আজ বাঁচাতে পারতেন, আমাকে বা তোকে আস্তিক বা নাস্তিক বানাতে পারতেন। তাহলে দিনশেষে জাহান্নামের আগুন কেন আমাদের জন্য? পুতুল নাচের সুতো যার হাতে, দোষ তো তার হওয়া উচিত, পুতুলের কেন?”
 
সাফওয়ান জানত, এই প্রশ্নটা আহিয়ানের একার নয়। এটি এই যান্ত্রিক সভ্যতার লাখো তরুণের বুকের ভেতর জমে থাকা এক দগদগে ঘা। সে আহিয়ানের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। বাইরে তখনো বজ্রপাত হচ্ছে। সেই বিদ্যুতের আলোয় সাফওয়ানের শান্ত মুখটা ক্ষণিকের জন্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
 
“আহিয়ান, তুই জানালার দিকে তাকা,” সাফওয়ান ধীর গলায় বলল। “বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। তুই কি জানিস কখন বৃষ্টি থামবে? জানিস না। কিন্তু আবহাওয়াবিদরা মেঘের গতিবেগ দেখে বলে দিতে পারে কখন ঝড় আসবে। এখন বল তো, আবহাওয়াবিদ ‘জানে’ বলেই কি ঝড়টা আসছে? নাকি ঝড়টা আসবে, তাই সে জেনেছে? তার জ্ঞান কি ঝড়টাকে বাধ্য করেছে ধ্বংসলীলা চালাতে?”
 
আহিয়ান চুপ করে তাকিয়ে রইল। সাফওয়ান বলতে থাকল, “তোর লজিকের গোড়ায় একটা বিশাল গলদ আছে দোস্ত। তুই আল্লাহর ‘ইলম’ আর আল্লাহর বাধ্যবাধকতাকে গুলিয়ে ফেলেছিস। আল্লাহ ‘আলিমুল গায়িব’, তিনি মহাকালের শুরু আর শেষটা একই ফ্রেমে দেখতে পান। তিনি সময়ের ফ্রেমে বন্দী নন, তিনি সময়ের স্রষ্টা। আমাদের কাছে যা ‘আগামীকাল’, আল্লাহর কাছে তা উন্মুক্ত কিতাব। তিনি জানেন তুই এখন এই প্রশ্নটা করবি, তাই তিনি লিখে রেখেছেন। তিনি লিখে রেখেছেন বলে তুই প্রশ্ন করছিস—বিষয়টা এমন নয়। কারণ, তুই তো জানতিস না যে তুই আজ এই প্রশ্নটা করবি। তোর কাছে অপশন ছিল চুপ থাকার, অথবা কাঁদার। তুই বেছে নিয়েছিস প্রশ্ন করাটা। এই ‘বেছে নেওয়া’ বা ‘ইখতিয়ার’-এর জায়গাটুকুতেই তোর পরীক্ষা।”
 
আহিয়ান পাল্টা যুক্তি দিল, “কিন্তু তিনি তো সর্বশক্তিমান। তিনি চাইলে কি আমি নাস্তিক হতে পারতাম? তিনি চাইলে কি রাফি বাইক নিয়ে বের হতে পারত? তাঁর ইচ্ছার বাইরে তো কিছু হয় না। তাহলে তাঁর ইচ্ছাতেই তো আমি অবিশ্বাস করছি।”
 
সাফওয়ান একটু নড়েচড়ে বসল। হাসপাতালের সাদা আলোয় তার চোখ দুটো গভীর দেখাল। সে বলল, “তোর এই পয়েন্টটা বুঝতে হলে তোকে একটু গভীরে নামতে হবে। দর্শন আর ওহির জ্ঞানের মিলন ঘটাতে হবে এখানে। শোন, আল্লাহর ‘ইচ্ছা’ বা ‘ইরাদা’ দুই ধরণের। খুব মনোযোগ দিয়ে বুঝবি। একটা হলো ‘ইরাদা কাউনিয়া’—যা সৃষ্টিগত ইচ্ছা। আর অন্যটা ‘ইরাদা শারঈয়া’—যা বিধানগত বা পছন্দনীয় ইচ্ছা।
 
আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে ইবলিসকে হায়াত দিয়েছেন, ফেরাউনকে ক্ষমতা দিয়েছেন, এমনকি হিটলারকে গ্যাস চেম্বার বানানোর শক্তি দিয়েছেন। এটা তাঁর ‘ইরাদা কাউনিয়া’। কেন দিয়েছেন? কারণ এই দুনিয়াটা ‘দারুল ইমতিহান’ বা পরীক্ষার হল। পরীক্ষার হলে একজন ছাত্র ভুল উত্তর লেখার স্বাধীনতা পায়। শিক্ষক তার হাত চেপে ধরেন না। যদি শিক্ষক জোর করে ছাত্রের হাত দিয়ে সঠিক উত্তর লিখিয়ে নেন, তবে সেই পরীক্ষার কোনো মূল্য থাকে কি? আল্লাহ মানুষকে ফেরেশতা বানাননি, আবার পশুও বানাননি। তিনি মানুষকে দিয়েছেন ‘ফ্রি উইল’ বা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। আল্লাহ চান, মানুষ পাপ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাপ থেকে ফিরে আসুক। এটাই তাঁর ‘ইরাদা শারঈয়া’। তিনি চান না তুই কুফরি কর, তিনি চান না রাফি বেপরোয়া গতিতে বাইক চালাক। তিনি মদ হারাম করেছেন, কিন্তু মদের বোতল ধরার শক্তি তোর হাত থেকে কেড়ে নেননি। তিনি জিনা হারাম করেছেন, কিন্তু সেই পরিস্থিতির কাছে যাওয়ার ক্ষমতা তোকে দিয়েছেন। কেন? যাতে তুই তোর নফসকে দমন করে বলিস—‘আমি আমার রবের ভয়ে এটা করছি না’। এই যে ইচ্ছাশক্তির লড়াই, এটাই তোকে আশরাফুল মাখলুকাত বানায়। এখন তুই যদি তোর স্বাধীনতার অপব্যবহার করে গর্তে পড়িস এবং গর্তে পড়ে বলিস—‘আল্লাহ কেন গর্তটা রাখলেন?’, তবে সেটা হবে নিজের বোকামির দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো।”
 
করিডরের শেষ মাথায় আইসিইউর লাল বাতিটা জ্বলছে আর নিভছে। মৃত্যুর এক অদ্ভুত সংকেত। আহিয়ান মাথা নিচু করে বলল, “কিন্তু পরিবেশ? একজন মানুষ যদি হিন্দু বা খ্রিস্টান পরিবারে জন্মায়, তার তো কোনো দোষ নেই। তার মগজ তো ছোটবেলা থেকেই ওভাবে ওয়াশ করা হয়েছে। সে কেন জাহান্নামে যাবে?”
 
সাফওয়ান আলতো করে আহিয়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। যেন কোনো এক অবুঝ শিশুকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। “দোস্ত, আল্লাহ কি তোর চেয়ে কম ইনসাফকারী? নাউজুবিল্লাহ। তিনি তো ‘আহকামুল হাকিমিন’। যার কাছে সত্যের দাওয়াত পৌঁছায়নি, যার বোঝার মতো মানসিক পরিপক্কতা বা সুযোগ ছিল না, আল্লাহ তাকে হুট করে জাহান্নামে ফেলে দেবেন না। আখেরাতে তাদের জন্য আলাদা পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে—এটাই বিশুদ্ধ মত। কিন্তু সমস্যা তো তাদের নিয়ে নয়, সমস্যা তোকে নিয়ে। সমস্যা আমাদের নিয়ে।
 
আমাদের কাছে সত্য এসেছে। কোরআন ধুলো পড়া অবস্থায় আমাদের বুকশেলফে আছে। আজান হলে আমরা শুনি। ইউটিউবে ডিবেট দেখি। এরপরও যখন আমরা বলি—‘তকদিরে ছিল তাই আমি মানিনি’, তখন আমরা আসলে মুনাফেকি করি। তুই লক্ষ্য করেছিস আহিয়ান? দুনিয়ার কোনো ব্যাপারে আমরা তকদিরের দোহাই দিই না। তুই যখন পরীক্ষার খাতায় লিখিস, তখন কি কলম রেখে বসে থাকিস এই ভেবে যে—‘পাস করার হলে এমনিই করব’? তুই যখন রাস্তা পার হস, তখন কি দুপাশে না দেখে চোখ বন্ধ করে দৌড় দিস—‘মরার হলে মরবই’ ভেবে? না। সেখানে তুই তোর শতভাগ চেষ্টা করিস, সাবধানতা অবলম্বন করিস। ব্যাংকে টাকা জমানোর সময় তুই তকদিরের ভরসায় থাকিস না। অথচ, যখনই রবের হুকুম মানার প্রসঙ্গ আসে, নামাজের সময় আসে, পর্দা করার কথা আসে—তখনই তোরা খুব দার্শনিক হয়ে যাস। তোরা বলিস—‘আল্লাহর ইচ্ছা হলে হেদায়েত পাব’। এই দ্বিমুখী আচরণ কেন? দুনিয়ার জন্য ‘ফ্রি উইল’ আর আখেরাতের জন্য ‘জবরদস্তি’? এটা কি তোর বিবেকের সাথে প্রতারণা নয়?”
 
আহিয়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কথাটা তো সত্য। সে তো ক্যারিয়ারের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে। সেখানে তো সে ভাগ্যের দোহাই দেয় না। তবে ধর্মের বেলায় কেন সে নিজেকে অসহায় পুতুল ভাবে?
 
সাফওয়ান তার স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে আবার বলতে শুরু করল, “তকদির হলো একটা মহাসমুদ্র। এর গভীরে ডুব দিতে নেই, ডুবলে হারিয়ে যাবি। সাহাবারা তকদির নিয়ে বিতর্ক করতেন না, তাঁরা তকদিরকে বিশ্বাস করে আমল করতেন। হযরত আলী (রা.)-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল তকদির আর ইচ্ছাশক্তি নিয়ে। আলী (রা.) তাকে বললেন, ‘তোমার এক পা তোলো।’ লোকটি পা তুলল। এরপর তিনি বললেন, ‘এবার দ্বিতীয় পা-টিও তোলো।’ লোকটি বলল, ‘তা তো অসম্ভব, পড়ে যাব।’ আলী (রা.) হাসলেন। বললেন, ‘প্রথম পা তোলার যতটুকু ক্ষমতা তোমাকে দেওয়া হয়েছে, ওটাই তোমার স্বাধীন ইচ্ছা। আর দ্বিতীয় পা তুলতে না পারাটাই তকদির বা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ।’
 
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা ওই দ্বিতীয় পা তোলার চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হয়ে প্রথম পা-টাও নড়াতে চাই না। আল্লাহ তোকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন, তার হিসাব নেবেন। তুই বাংলাদেশে জন্মেছিস না আমেরিকায়, সেটা তোর হাত নেই। কিন্তু বাংলাদেশে জন্মে তুই সত্য খুঁজেছিস কি না, বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়েছিস কি না—এটার হিসাব তোকে দিতে হবে। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘আমি মানুষকে পথ দেখিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ।’ স্টিয়ারিং তোর হাতে। ম্যাপ তোর সামনে। এখন তুই যদি গাড়ি খাদে ফেলিস, তবে গাড়ির ম্যানুফ্যাকচারারকে দোষ দিতে পারিস না।”
 
বাইরের ঝড়টা কিছুটা কমেছে। কিন্তু আহিয়ানের ভেতরের ঝড়টা তখনো চলছে। সে বলল, “কিন্তু আল্লাহ তো কোরআনে বলেছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দেন, যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। তাহলে?”
 
“আবারও কন্টেক্সট ছাড়া আয়াত বুঝছিস,” সাফওয়ানের কণ্ঠে এবার কিছুটা দৃঢ়তা। “আল্লাহ কি লটারি করে হেদায়েত দেন? না। আল্লাহ তাদেরকেই পথভ্রষ্ট করেন, যারা নিজেদের অন্তরকে বক্র করে ফেলেছে। সুরা বাকারায় আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন, ‘তিনি ফাসিক (অবাধ্য) ছাড়া কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না।’ যখন কেউ সত্য শোনার পরও অহংকার করে, নিজেকে বড় ভাবে, যুক্তির আড়ালে নিজের প্রবৃত্তির পূজা করতে চায়—তখন আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন। এটা আল্লাহর জুলুম নয়, এটা বান্দার কর্মফল। ডাক্তার যখন দেখেন রোগী বারবার ওষুধ ফেলে দিচ্ছে, তখন ডাক্তারও হাল ছেড়ে দেন।
 
আবু জাহেল জানত মুহাম্মদ (সা.) সত্যবাদী। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ করেনি শুধু অহংকারের কারণে। সে ভেবেছিল, বনু হাশেমের কাছে বনু মাখজুম মাথা নত করবে না। এখানে তকদির তাকে আটকায়নি, আটকেছে তার ইগো। আজকের যুগেও নাস্তিকতার মূলে বেশিরভাগ সময় বিজ্ঞান থাকে না, থাকে ইগো এবং ভোগবাদী মানসিকতা। মানুষ চায় না তার জীবনে কোনো ‘হারাম’ বা নিষেধ থাকুক। সে চায় আনলিমিটেড ফ্রিডম—যা খুশি করব, যা খুশি খাব। এই স্বেচ্ছাচারী জীবনের লাইসেন্স পেতেই সে স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। আর সেটাকে জাস্টিফাই করার জন্য তকদিরের এমন খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করায়।”
 
সাফওয়ান থামল। তার চোখ ভিজে উঠেছে। আইসিইউর দরজার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “রাফি হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু রাফির মৃত্যু কি কেবলই একটা দুর্ঘটনা? নাকি এটা আমাদের জন্য একটা সিগন্যাল? আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, শ্বাস নিচ্ছি, আমাদের ‘সময়’ কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। স্ক্রিপ্ট রাইটার আমাদের কলম এখনো কেড়ে নেননি। খাতা এখনো খোলা। আমরা চাইলে এখনি তওবা করে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারি। এই ক্ষমতা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।
 
সালাফদের জীবনী পড়েছিস? তাঁরা কীভাবে জীবনকে দেখতেন? তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ঈমান হলো আশা আর ভয়ের মাঝখানের অবস্থা। তাঁরা তকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকতেন, যাকে বলা হয় ‘রিদা বিল ক্বাদা’। জীবনে যত ঝড়ই আসুক, তাঁরা জানতেন—আমার রব আমার জন্য যা ভালো মনে করেছেন, তাই হয়েছে। কিন্তু নিজের পাপের জন্য তাঁরা কখনো তকদিরকে দোষ দিতেন না। তাঁরা রাতের অন্ধকারে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতেন। বলতেন, ‘রাব্বানা জলামনা আনফুসানা’—হে রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আদম (আ.) ভুল করার পর বলেছিলেন, ‘আমি জুলুম করেছি’। আর ইবলিস ভুল করার পর বলেছিল, ‘আপনি আমাকে বিপথগামী করেছেন’। যে নিজের দোষ স্বীকার করে, সে আদমের সন্তান। আর যে দোষ আল্লাহর ওপর চাপায়, সে ইবলিসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তুই কার দলে থাকবি আহিয়ান? আদমের, নাকি ইবলিসের?”
 
আহিয়ান অনুভব করল তার গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। এতদিনের জমানো পাথরটা যেন সরে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল একটা লেখার কথা—যেখানে বলা হয়েছিল, বিশ্বাস হলো অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া নয়, বরং ভোরের আলোর অপেক্ষায় থাকা। সে এতদিন অন্ধকারের গর্তে বসে আলোর সমালোচনা করেছে, কিন্তু আলোতে আসার চেষ্টা করেনি।
 
সাফওয়ান পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে আহিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল। “দোস্ত, ইসলাম কোনো জটিল ফিলোসফি নয়। এটা হলো আত্মসমর্পণের প্রশান্তি। তুই যখন যুক্তি দিয়ে সব বুঝতে যাবি, তখন মস্তিষ্ক তোকে ধোঁকা দেবে। কারণ আমাদের মস্তিষ্কের প্রসেসর খুবই সীমিত। একটা পিঁপড়া যেমন ইন্টারনেটের মেকানিজম বুঝতে পারে না, তেমনি আমরাও অসীম রবের সব হিকমত বুঝতে পারব না। কিন্তু আমরা তাঁর রহমত অনুভব করতে পারি। তুই যখন মায়ের কোলে মাথা রাখিস, তখন কি মায়ের ডিএনএ টেস্ট করিস? না। তখন শুধু বিশ্বাস আর ভালোবাসা কাজ করে। রবের সাথে সম্পর্কটা ঠিক তেমনই। স্বামীর কাছে স্ত্রীর সব আবদার যেমন যুক্তিহীন মনে হলেও আদতে তা ভালোবাসারই প্রকাশ, তেমনি রবের সব বিধানেই বান্দার জন্য কল্যাণ লুকিয়ে আছে।
 
এই যে তুই হিন্দু, খ্রিস্টান বা নাস্তিকদের কথা বললি—সবার ভেতরেই আল্লাহ একটা ‘ফিতরাত’ বা ডিফল্ট প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছেন। বিপদে পড়লে, বিমান যখন মাঝ আকাশে কাঁপতে থাকে, তখন কট্টর নাস্তিকও অবচেতন মনে ‘ওহ গড’ বলে চিৎকার করে ওঠে। ওই ডাকটা কে দেয়? ওটা তার রুহ বা আত্মা দেয়। আত্মা জানে তার মালিক কে। কিন্তু দুনিয়ার চাকচিক্য আর শয়তানের ওয়াসওয়াসায় সেই ডাকটা চাপা পড়ে যায়। যারা সেই ডাক শুনতে পায় এবং সাড়া দেয়, তারাই সফল। আর যারা কানে আঙুল দিয়ে রাখে, তারাই ব্যর্থ।”
 
হঠাৎ আইসিইউর দরজা খুলে গেল। ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। তার মুখাবয়ব গম্ভীর। তিনি মাথা নাড়লেন। রাফি আর নেই।
 
করিডরে একটা স্তব্ধতা নেমে এল। আহিয়ান উঠে দাঁড়াল। তার পা কাঁপছে। কিছুক্ষণ আগেও সে তকদির নিয়ে তর্ক করছিল, আর এখন তার সামনে তকদিরের সবচেয়ে বড় সত্য—মৃত্যু—উপস্থিত। সে কাঁচের দেওয়াল দিয়ে রাফির নিথর দেহটার দিকে তাকাল। মেশিনের শব্দগুলো থেমে গেছে। মনিটরের আঁকাবাঁকা রেখাটা এখন সোজা হয়ে আছে। এক সরলরেখা। জীবনের সব জটিল সমীকরণ আজ এক সরলরেখায় মিশে গেছে।
 
আহিয়ানের মনে হলো, এই যে রাফি চলে গেল, সে কি এখন আল্লাহর কাছে গিয়ে বলতে পারবে—‘আমার তকদিরে মৃত্যু ছিল তাই আমি কিছু করিনি’? নাকি তার আমলনামা এখন তার গলার হাড় হয়ে ঝুলছে?
সাফওয়ান আহিয়ানের কাঁধে হাত রাখল। “চল আহিয়ান। রাফির জন্য এখন আর তর্কের প্রয়োজন নেই, দোয়ার প্রয়োজন। আর তোর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্তের। জীবনটা কোনো রিহার্সাল নয় বন্ধু, এটাই ফাইনাল শট। তুই কি এখনো দর্শকের গ্যালারিতে বসে সমালোচকের মতো হাততালি দিবি, নাকি মাঠে নেমে খেলবি? জান্নাতের পথটা খুব মসৃণ নয়, কাঁটা বিছানো। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছালে যে প্রশান্তি পাবি, তার কোনো তুলনা হয় না।”
 
আহিয়ান চশমাটা চোখে পরল। ঝাপসা কাঁচের ওপাশে পৃথিবীটা এখন অনেক স্পষ্ট মনে হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, এতক্ষণ সে ভুল দরজায় কড়া নাড়ছিল। সে যুক্তির দরজায় লাথি মারছিল, অথচ হৃদয়ের দরজাটা খোলাই ছিল।
“সাফওয়ান,” আহিয়ানের গলাটা ধরে এল। “আমাকে অজুর জায়গাটা দেখিয়ে দিবি? অনেকদিন রবের সামনে দাঁড়াই না। খুব ইচ্ছে করছে কপালটা মাটিতে ছোঁয়াই। শুনেছি, সেজদাতেই নাকি বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে।”
 
সাফওয়ানের মুখে এক টুকরো জান্নাতি হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “চল। মসজিদ হাসপাতালের নিচতলায়। আজ আমরা দুজন মিলে রাফির মাগফিরাতের দোয়া করব, আর তোর হেদায়েতের শুকরিয়া আদায় করব।”
 
তারা দুজন লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। মেঘের আড়াল থেকে ভোরের আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে। এই আলোটা নতুন দিনের, নতুন উপলব্ধির।
 
আহিয়ান মনে মনে ভাবল, সবকিছু হয়তো আল্লাহর ইচ্ছায় হয়, কিন্তু আমার ইচ্ছাটাকে তাঁর ইচ্ছার কাছে সঁপে দেওয়ার নামই তো ইসলাম। আমি আর প্রশ্ন করব না কেন আমাকে সৃষ্টি করা হলো, আমি বরং উত্তর খুঁজব—কীভাবে আমাকে আমার স্রষ্টার কাছে প্রিয় করা যায়।
 
“তকদিরে যা লেখা ছিল, ভেবেছ কি তাই শেষ কথা?
তোমার কর্মেই লুকিয়ে আছে, জান্নাত কিংবা ব্যথা।
নৌকা ভাসালে সাগরে, ঝড় তো আসবেই ভাই,
বৈঠা ছাড়লে চলবে না, হাল ধরতে হবে তাই।
আলোর পথে হাঁটলে তুমি, ছায়া যাবে পিছে,
রবের দয়া সত্য জেনো, বাকি সব তো মিছে।”
 
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু আহিয়ানের হৃদয়ের দরজা আজ খুলে গেছে। এক অনন্ত প্রশান্তির পথে তার যাত্রা শুরু হলো। এমন এক যাত্রা, যেখানে যুক্তি এসে আবেগের কাছে হার মানে, যেখানে মস্তিষ্কের অহংকার ধুয়ে যায় চোখের নোনা জলে।
 
এটাই জীবন। এটাই পরীক্ষা। আর এর উত্তরপত্রের নাম—ঈমান।
 
[তাকদিরের স্ক্রিপ্ট ও হৃদয়ের স্টিয়ারিং]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
মহাকাশের অসীম নিস্তব্ধতা চিরে যখন একটি আওয়াজ ধ্বনিত হয়, তখন কেবল বাতাসের কণাগুলোই কাঁপে না, কেঁপে ওঠে মিথ্যার ওপর নির্মিত সমস্ত প্রাসাদ। সেই আওয়াজটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়, এটি মহাবিশ্বের অস্তিত্বের এক পরম সত্যের ঘোষণা—‘আল্লাহু আকবার’। কিন্তু ইদানীং আমাদের আশেপাশে অদ্ভুত এক দৃশ্যপট রচিত হচ্ছে। যে ধ্বনি শুনে একসময় জালিমের তখত তাউস উল্টে যেত, আজ সেই ধ্বনি শুনলে কিছু মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, হৃদয়ে আতঙ্কের চোরাস্রোত বয়ে যায়। তারা একে উগ্রবাদ, মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে বন্দী করতে চায়।
 
অথচ তারা জানে না, এই আপত্তি কেবল একটি স্লোগানের বিরুদ্ধে নয়, এই আপত্তি খোদ মহাবিশ্বের রবের শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে এক নগ্ন বিদ্রোহ। কেন এই আপত্তি? কিসের এই ভয়? এটি কি আধুনিকতার কোনো রূপ, নাকি সেই পুরোনো আইয়ামে জাহিলিয়াতেরই এক নতুন সংস্করণ, যা কোট-টাই আর সেক্যুলারিজমের মুখোশ পরে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে?
 
আসুন, আবেগের ফানুস না উড়িয়ে, কুরআনের আয়াত, হাদিসের সনদ এবং ধারালো যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করি এই আপত্তির ব্যবচ্ছেদ।
 
শুরুতেই মস্তিষ্কের নিউরনে একটি মৌলিক প্রশ্ন গেঁথে নিন। ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থ কী? আভিধানিক অর্থে আমরা বলি—‘আল্লাহ মহান’। কিন্তু আরবি ব্যাকরণ বা লুগাতের গভীরতা যারা বোঝেন, তারা জানেন এই তরজমাটি অসম্পূর্ণ।
 
‘আকবার’ শব্দটি ‘ইসমে তাফজিল’ বা সুপারলেটিভ ডিগ্রিরও ঊর্ধ্বে। এর অর্থ—আল্লাহ ‘সবচেয়ে’ বড়, আল্লাহ ‘সবকিছুর’ চেয়ে মহান। কার চেয়ে বড়? আপনার ক্ষমতার চেয়ে, আপনার দম্ভের চেয়ে, আপনার পারমাণবিক বোমার চেয়ে, আপনার পার্লামেন্টের চেয়ে, আপনার নালিশ আর সালিশের চেয়ে।
 
যখনই কোনো মুমিন চিৎকার করে বলে ওঠে ‘আল্লাহু আকবার’, তখন সে মূলত একটি ঘোষণা দেয়—এই পৃথিবীতে আমি আল্লাহ ছাড়া আর কারোর গোলামি করি না, আর কারোর শ্রেষ্ঠত্ব মানি না। ঠিক এখানেই সমস্যাটা তৈরি হয়। সমস্যাটা আল্লাহর নাম নেওয়াতে নয়, সমস্যাটা ‘সবচেয়ে বড়’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াতে।
 
মক্কার কুরাইশরা আল্লাহকে বিশ্বাস করত। কুরআনের সূরা যুখরুফের ৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো কে তাদের সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে—আল্লাহ।” তবুও আবু জাহেলের আপত্তি ছিল। কেন?
 
কারণ, আল্লাহকে স্রষ্টা মানতে তাদের আপত্তি ছিল না, কিন্তু আল্লাহকে একমাত্র ‘বিধানদাতা’ ও ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ মানতে তাদের ইগোতে লাগত। আজকের আধুনিক জাহিলিয়াত সেই আবু জাহেলেরই প্রেতাত্মা। তারা মসজিদে আল্লাহকে ‘বড়’ মানতে রাজি, কিন্তু রাজনীতির মাঠে, সংস্কৃতির মঞ্চে বা স্লোগানে আল্লাহকে ‘সবচেয়ে বড়’ মানতে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা আহত হয়। এই যে বিভাজন, এটাই হলো শিরক, আর এই মানসিকতাই হলো নব্য জাহিলিয়াত।
 
একটু গভীরভাবে দিয়ে চিন্তা করুন ভাই। একজন মানুষ যখন ‘জয় বাংলা’ বা কিংবা ‘লং লিভ রেভোলিউশন’ বলে, তখন তা যদি বাকস্বাধীনতা হয়, তবে মহাবিশ্বের মালিকের নাম নেওয়া কেন অপরাধ হবে?
 
যুক্তি বলে, স্রষ্টা যদি সৃষ্টির চেয়ে মহান হন, তবে তাঁর নাম নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় সত্য। বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে, এই পৃথিবী মহাবিশ্বের তুলনায় ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। আর সেই ধূলিকণার বুকে দাঁড়িয়ে কোনো ক্ষুদ্র এক প্রাণী যদি তার স্রষ্টার নাম নিতে কুণ্ঠাবোধ করে বা অন্য কেউ নিলে আপত্তি জানায়, তবে বুঝতে হবে তার মানসিক বৈকল্য চরম পর্যায়ে।
 
সূরা আল-মুদ্দাসসিরের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (সা.) প্রথমেই নির্দেশ দিয়েছেন— “ওয়া রব্বাকা ফাকাব্বির”—অর্থাৎ, “তোমার রবের বড়ত্ব ঘোষণা করো।”
 
এটি কোনো অপশনাল বিষয় নয়, এটি ঈমানের শ্বাস-প্রশ্বাস। সালাফ আস-সালেহীন বা আমাদের পূর্বসূরিরা যখন এই আয়াত শুনেছিলেন, তারা তাদের জীবনকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যেখানে আল্লাহর হুকুমের সামনে দুনিয়ার সব পরাশক্তি তুচ্ছ হয়ে যেত।
 
সাহাবাদের জীবনপদ্ধতি কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়; এটি হলো সেই জীবনব্যবস্থা যেখানে ‘আল্লাহু আকবার’ কেবল মুখের বুলি ছিল না, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নাম ছিল।
 
একজন মুমিন যখন তাকবীর দেয়, সে মূলত তার নফসের কাছে, শয়তানের কাছে এবং তাগুতের কাছে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
 
আজ যারা এই স্লোগান নিয়ে চুলকানি অনুভব করছেন, তাদের মনস্তত্ত্বটা একটু গভীরে গিয়ে দেখুন। তাদের ভয়টা মূলত ‘আল্লাহ’ শব্দে নয়, তাদের ভয় ‘ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণে’। তারা চায় ইসলাম থাকুক কেবল জায়নামাজে আর তসবিহ দানায়। কিন্তু ইসলাম তো বৈরাগ্যবাদ শেখায়নি। ইসলাম শিখিয়েছে বীরত্ব।
 
বদরের প্রান্তরে ৩১৩ জন সাহাবী যখন ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে ১০০০ সুসজ্জিত মুশরিক বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন সেই ধ্বনি ছিল তাদের ঈমানি শক্তির উৎস।
 
খন্দকের যুদ্ধে পেটে পাথর বেঁধে, অনাহারে থেকেও সাহাবীরা যখন সমস্বরে তাকবীর দিতেন, তখন মদীনার মাটি কেঁপে উঠত, আর মুনাফিকদের হৃদকম্পন বেড়ে যেত।
 
আজকের দিনের মুনাফিকদের হৃদকম্পনও বেড়ে যায়। কারণ, তাকবীর হলো সেই চাবুক, যা ঘুমন্ত মুসলিম উম্মাহকে জাগিয়ে তোলে।
 
ওমর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন কাবার চত্বরে দাঁড়িয়ে তিনি ফিসফিস করে কথা বলেননি। হামজা (রা.) এবং ওমর (রা.)-এর নেতৃত্বে দুটি সারি করে মুসলমানরা যখন তাকবীর দিতে দিতে কাবায় প্রবেশ করলেন, তখন কুরাইশরা বুঝে গিয়েছিল—মুহাম্মদ (সা.) আর একা নন।
 
তাকবীরের এই ঐতিহাসিক ইমপ্যাক্ট আছে বলেই ইসলামের শত্রুরা এই আওয়াজকে স্তব্ধ করতে চায়।
 
বিষয়টি আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। আমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে আজানের সময়, ইকামতের সময়, সালাতের শুরুতে এবং প্রতি রাকাতে ওঠাবসায় কতবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলি? গুনে দেখেছেন কি? শতবার। সালাতের শুরুতে ‘তাকবীরে তাহরিমা’ বলা হয়। ‘তাহরিমা’ মানে কী? হারাম করে দেওয়া।
 
অর্থাৎ, যখনই আপনি হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন, তখন দুনিয়ার সব কাজ, সব চিন্তা, সব আনুগত্য আপনার জন্য হারাম হয়ে গেল। এখন আপনি কেবল আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান। যে ব্যক্তি দিনে শতবার মসজিদে এই ঘোষণা দেয়, সে কীভাবে মসজিদের বাইরে এসে এই স্লোগান নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতে পারে?
 
যদি করে, তবে বুঝতে হবে তার সালাত ছিল কেবল শারীরিক কসরত, রুহ সেখানে অনুপস্থিত। এটি সেই দ্বিমুখী নীতি, যা আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে।
 
সূরা মুনাফিকুনে আল্লাহ এদের চিত্রই তুলে ধরেছেন। তারা মুখে যা বলে, অন্তরে তা ধারণ করে না। আজকের যুগে যারা ‘আল্লাহু আকবার’ শুনে জঙ্গিবাদের গন্ধ পায়, তারা মূলত নিজেদের অজান্তেই আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা চায় এমন এক ইসলাম, যা তাদের দুর্নীতি, অশ্লীলতা আর অন্যায়ের পথে বাধা হবে না। কিন্তু তাকবীরের স্লোগান যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠ, তা তারা সহ্য করবে কী করে?
 
আপনি কি কখনো ঝড়ের রাতে সমুদ্রের গর্জন শুনেছেন? কিংবা মেঘের গর্জনে আকাশের বুক চিরে যাওয়া দেখেছেন? প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপের মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষ কতটা অসহায়! তখন মানুষের মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে আসে স্রষ্টার নাম। অথচ রোদের দিনে, এসির বাতাসে বসে সেই মানুষই স্রষ্টার নাম নিতে লজ্জা পায়।
 
"সিংহের গর্জনে যদি কম্পিত হয় বন,
তবে রবের নামে কেন কাঁপে না তোমার মন?
যে ধ্বনিতে সূর্য ওঠে, তারারা দেয় পাড়ি,
সেই নামেই জ্বলে উঠুক ঈমানের বাতি।"
 
এই স্লোগান কোনো রাজনৈতিক দলের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটি আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী (সা.) পর্যন্ত সকল নবীর স্লোগান। এটি আসমানের স্লোগান, এটি জমিনের স্লোগান। যখন একজন মুমূর্ষু রোগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তখনও তার কানে এই তাওহীদের বাণীই শোনানো হয়। তাহলে জীবন থাকতে কেন এই আপত্তি?
 
এখন আসুন, একটু সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এবং বিশুদ্ধ ইসলামি জীবনবোধের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
 
তথাকথিত মডারেট মুসলিমরা প্রায়ই বলে—‘ধর্ম পালন হবে মনে মনে, স্লোগানে কেন?’ এটি একটি শয়তানি ধোঁকা। ইসলাম কোনো প্রাইভেট রিলিজিয়ন বা ব্যক্তিগত গোপন ধর্ম নয়। ইসলাম একটি কমপ্লিট কোড অব লাইফ। একজন মুসলিমের (অর্থাৎ যারা সাহাবাদের বুঝ অনুযায়ী দ্বীন পালন করেন) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। সে যখন ব্যবসা করে, তখন সুদের অফার ফিরিয়ে দিয়ে কাজের মাধ্যমে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ টাকার চেয়ে আল্লাহর হুকুম বড়। সে যখন চোখের সামনে অশ্লীলতা দেখে এবং দৃষ্টি অবনত করে, তখন সে নীরবে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ আমার কামনার চেয়ে আল্লাহর ভয় বড়। আর যখন সমাজে জুলুম হয়, তখন সে উচ্চস্বরে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ জালিমের চেয়ে আমার রব শক্তিশালী।
 
সুতরাং, তাকবীর কেবল মুখের আওয়াজ নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল। যারা এই লাইফস্টাইল বা জীবনপদ্ধতিকে ভয় পায়, তারাই এই স্লোগানের বিরোধিতা করে। তারা চায় মুসলিমরা এমন এক জাতিতে পরিণত হোক, যাদের মেরুদণ্ড নেই, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, তাকবীরের সংস্কৃতি যে জাতির মধ্যে জীবিত থাকে, সেই জাতিকে কেউ গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে না।
 
কুরআন মাজীদের সূরা আল-আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।”
 
আজ উম্মাহর এই করুণ দশা কেন? কারণ আমরা আল্লাহর বড়ত্ব ভুলে গিয়েছি। আমরা এখন দল, মত, আর নেতার বড়ত্ব নিয়ে ব্যস্ত। আমরা মানুষকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহকে নারাজ করছি।
 
যখনই কোনো মুসলিম ‘আল্লাহু আকবার’ বলে স্লোগান দেয়, তখন সে মূলত এই উম্মাহকে এক হওয়ার আহ্বান জানায়। সে মনে করিয়ে দেয়—আমাদের রব এক, আমাদের লক্ষ্য এক। এই ঐক্যই কুফরের চোখের বালি। তারা জানে, যদি এই উম্মাহ আবার তাকবীরের পতাকাতলে এক হয়, তবে তাদের শোষণ আর শাসনের দিন শেষ হয়ে যাবে।
 
তাই তারা মিডিয়া দিয়ে, বুদ্ধিজীবী দিয়ে মগজধোলাই করার চেষ্টা করছে। তারা বোঝাতে চায়—তাকবীর দেওয়া মানেই উগ্রতা। অথচ তাকবীর মানেই হলো শান্তি। কারণ, যে সমাজে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে চুরি হয় না, ধর্ষণ হয় না, দুর্নীতি হয় না। আল্লাহর বড়ত্ব মেনে নেওয়া মানেই সৃষ্টির ওপর থেকে সৃষ্টির প্রভুত্ব খতম করা।
 
মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, এটা থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র। এই বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। মানুষ একটা ভাইরাস সামলাতে পারে না, সামান্য ভূমিকম্পে অসহায় হয়ে পড়ে। সেই মানুষের মুখে আল্লাহর বড়ত্ব নিয়ে আপত্তি কি মানায়? এটি কি হাস্যকর নয়? এটি সেই জাহিলিয়াত, যেখানে মানুষ নিজের সৃষ্টি করা মাটির পুতুলকে রব বানাত।
 
আজ মানুষ নিজের তৈরি করা মতবাদকে রব বানিয়েছে। পার্থক্য কেবল উপাদানে—আগে ছিল মাটি, এখন মতবাদ। কিন্তু সারকথা একই—আল্লাহকে অস্বীকার করা বা আল্লাহর সমকক্ষ কাউকে দাঁড় করানো। তাকবীরের স্লোগান এই সমস্ত মিথ্যা ইলাহ বা উপাস্যদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।
 
যারা বলে, ‘তাকবীর দিলে অন্য ধর্মের মানুষ ভয় পায়’—এটি একটি ডাহা মিথ্যা অজুহাত। ইসলামের ইতিহাসে যখনই মুসলিমরা কোনো জনপদ বিজয় করেছে, তারা তাকবীর ধ্বনি দিয়েই প্রবেশ করেছে। কিন্তু তারা কি সেখানকার গির্জা বা মন্দির ভেঙেছে? তারা কি সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে?
 
না। বরং তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। ওমর (রা.)-এর জেরুজালেম বিজয়ের কথা স্মরণ করুন। তাকবীরের ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়েছিল, কিন্তু খ্রিস্টানরা পেয়েছিল পূর্ণ নিরাপত্তা। সুতরাং, তাকবীর ভয়ের কারণ নয়, তাকবীর হলো ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি। ভয় পায় কেবল তারা, যারা অপরাধী। পুলিশ দেখলে চোর যেমন ভয় পায়, তাকবীর শুনলে জালেমরা তেমনি ভয় পায়। সাধারণ মানুষের ভয়ের কিছু নেই। বরং এই ধ্বনি শুনে তাদের আশ্বস্ত হওয়া উচিত যে, এখন আর মানুষের মনগড়া আইনে বিচার হবে না, এখন ইনসাফ কায়েম হবে।
 
আত্মার গভীরে একবার প্রশ্ন করুন—আমরা কি আসলেই মুসলিম? যদি হই, তবে আল্লাহর নাম শুনে আমাদের রক্ত গরম হবে, শরীর শিউরে উঠবে, চোখে পানি আসবে।
 
সূরা আল-আনফালের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, “মুমিন তো তারাই, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়।”
 
আপনার হৃদয়ে যদি কম্পন না হয়, উল্টো বিরক্তি আসে, তবে আপনার ঈমানের ইসিজি রিপোর্ট চেক করা দরকার। হয়তো সেখানে ‘নিফাক’ নামক কোনো ব্লক ধরা পড়বে। আমাদের যুবসমাজকে আজ এই হীনম্মন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভার্সিটির ক্যান্টিনে, বন্ধুদের আড্ডায়, সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে—সর্বত্র সত্যকে সত্য বলতে হবে।
 
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবী আমাদের আসল ঠিকানা নয়। কবরের সেই অন্ধকার ঘরে যখন মুনকার ও নকির ফেরেশতা আসবে, তখন কোনো স্লোগান কাজে আসবে না, যদি না হৃদয়ে আল্লাহর বড়ত্ব থাকে। সেদিন আপনার নেতা, আপনার পার্টি, আপনার সেক্যুলার বন্ধুরা কেউ পাশে থাকবে না। সালাফি জীবনধারায় যারা বিশ্বাসী, তারা এই মৃত্যুচিন্তাকে সবসময় মাথায় রাখে। তারা জানে, দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জিন্দেগীতে মানুষের মন জুগিয়ে চলার কোনো মানে নেই।
 
আকিদাহর কিতাবগুলো পড়লে দেখবেন, সেখানে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি নিয়ে কত সূক্ষ্ম আলোচনা করা হয়েছে। সব আলোচনার সারমর্ম একটাই—আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, আমরা মুখাপেক্ষী। যে মুখাপেক্ষী, সে কীভাবে অমুখাপেক্ষী সত্তার নামোচ্চারণে বাধা দেয়? এ যেন সূর্যের আলোকে অস্বীকার করে প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করার চেষ্টা।
 
শেষের দিকে এসে একটা কথা বলি, যা হয়তো আপনার বিবেককে নাড়া দেবে। আপনি যখন মারা যাবেন, আপনার জানাজার খাটিয়া যখন কাঁধে তোলা হবে, তখন মানুষেরা কী বলবে? তারা সমস্বরে বলবে—‘আল্লাহু আকবার’। চার তাকবীরে আপনার জানাজা পড়া হবে।
 
ভাবুন তো, যেই তাকবীর নিয়ে আপনার এতো এলার্জি ছিল, সেই তাকবীর দিয়েই আপনাকে বিদায় জানানো হচ্ছে। কি অদ্ভুত না? আপনি সারাজীবন যেই ধ্বনিকে ‘মৌলবাদ’ বা ‘বাড়াবাড়ি’ বলেছেন, মৃত্যুর পর সেই ধ্বনিই আপনার মাগফিরাতের একমাত্র মাধ্যম হবে।
 
তাই সময় থাকতে জাগুন। জাহিলিয়াতের চশমা খুলে ফেলুন। মডার্ন হওয়ার নামে ঈমান বিক্রি করবেন না। আল্লাহু আকবার কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি অস্তিত্বের স্লোগান, এটি মুক্তির স্লোগান, এটি বিজয়ের স্লোগান। যেদিন এই উম্মাহর প্রতিটি যুবকের হৃদয়ে, প্রতিটি নারীর হিজাবে, প্রতিটি পুরুষের দাঁড়িতে এবং কর্মে ‘আল্লাহু আকবার’-এর প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে, সেদিন পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।
 
আসুন, আমরা আমাদের কণ্ঠে সেই হারানো তেজ ফিরিয়ে আনি। লজ্জিত না হয়ে, কুণ্ঠিত না হয়ে, সগৌরবে ঘোষণা করি মহাকাশের সেই পরম সত্য। আকাশ সাক্ষী থাকুক, বাতাস সাক্ষী থাকুক, আর সাক্ষী থাকুক এই জমিন—আমরা সেই দল, যারা আল্লাহ ছাড়া কাউকে বড় বলে মানি না।
 
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
 
[তাকবীর]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
জীবনের এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন আপনার মনে হয় পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। চারদিকের দেয়ালগুলো যেন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে, আর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক অতল গহ্বরের কিনারায়। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে, যখন মনে হয় সব রাস্তা বন্ধ, সব আলো নিভে গেছে, তখনই আসলে আপনার গল্পের মূল মোড়টা শুরু হয়।
 
এই সেই সন্ধিক্ষণ, যেখানে আপনার হাতে কেবল দুটি অপশন অবশিষ্ট থাকে।
 
প্রথমটি হলো—
হাল ছেড়ে দেওয়া, স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে নিজেকে ধ্বংসের হাতে সঁপে দেওয়া।
 
আর দ্বিতীয়টি হলো—দাঁতে দাঁত চেপে ঘুরে দাঁড়ানো, ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে জেগে ওঠা।
 
পৃথিবীর ইতিহাসে যারাই ইতিহাস গড়েছেন, যারাই নিজেদের চিনিয়েছেন ‘মানুষ’ হিসেবে, তাদের প্রত্যেকের জীবনেই এই ‘দুটি অপশন’ ওয়ালা অধ্যায়টি এসেছিল। কেউ সেখানে ভেঙে চুরমার হয়ে হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে, আর কেউ সেই ভাঙা টুকরোগুলো দিয়েই গড়ে তুলেছে এক ইস্পাতকঠিন ইমারত। প্রতিটা শক্ত মানুষের পেছনে এই না-বলা গল্পটা থাকে, যা হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার চকচকে হাসির আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।
 
আমরা প্রায়ই ভাবি, ইসলাম মানেই বুঝি শান্তশিষ্ট একটা জীবন, যেখানে কোনো ঝড় নেই, কোনো জলোচ্ছ্বাস নেই। কিন্তু কুরআনের পাতা উল্টালে আমরা দেখি ভিন্ন চিত্র। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-আনকাবুতের শুরুতেই এক প্রলয়ংকরী প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন,
 
“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’—এ কথা বলেই তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ২)
 
এই আয়াতটি নিছক কোনো বাক্য নয়; এটি মুমিনের জীবনের ব্লু-প্রিন্ট। আপনি যখনই নিজেকে সত্যের পথে পরিচালিত করবেন, যখনই আপনি নিজেকে আল্লাহর প্রিয়ভাজন ভাবতে শুরু করবেন, ঠিক তখনই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আপনার সামনে হাজির হবে। কেন? কারণ, খাদ ছাড়া সোনা চেনা যায় না, আর চাপ ছাড়া কয়লা হীরায় পরিণত হয় না। যে লোহা আগুনে পোড়ে না, সে লোহা দিয়ে কখনো ধারালো তলোয়ার বানানো সম্ভব নয়। আপনার জীবনের ওই কঠিন সময়টা, যখন আপনার অপশন ছিল মাত্র দুটি, সেটি আসলে আল্লাহ কর্তৃক আপনাকে ‘প্রসেসিং’ করার সময়।
 
আধুনিক যুগে আমরা ‘ডিপ্রেশন’ শব্দটাকে খুব সস্তায় ব্যবহার করি। সামান্য আঘাতেই আমরা মুষড়ে পড়ি। অথচ আমাদের পূর্বসূরিরা, সেই সালাফ আস-সালেহিন, তাদের জীবনে ঝড় আসত পাহাড়সম। কিন্তু তারা ভাঙতেন না। কেন জানেন? কারণ তাদের ‘মাইন্ডসেট’ ছিল ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা জানতেন, দুনিয়াটা কোনো আরামের বিছানা নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষার হল। পরীক্ষার হলে এসি কাজ না করলে, বেঞ্চ শক্ত হলে যেমন ছাত্র পরীক্ষা ছেড়ে বেরিয়ে যায় না, বরং মনোযোগ দিয়ে খাতাটা শেষ করে, ঠিক তেমনি মুমিন ব্যক্তি জীবনের কঠিন মুহূর্তেও তার ‘ফোকাস’ নড়াতে দেয় না।
 
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের দিকে তাকান। তায়েফের ময়দানে যখন তাঁকে পাথর মারা হচ্ছিল, শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পায়ের জুতোর সাথে জমাট বেঁধে যাচ্ছিল, তখন তাঁর সামনেও দুটি অপশন ছিল।
 
এক—
বদদোয়া করে পুরো তায়েফবাসীকে পিষে ফেলা এবং হতাশ হয়ে দাওয়াতি কাজ ছেড়ে দেওয়া।
 
দুই—
এই চরম অপমানেও ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং আরও শক্তভাবে নিজের মিশন আঁকড়ে ধরা।
 
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দ্বিতীয়টি বেছে নিয়েছিলেন। আর তাই আজ দেড় হাজার বছর পর আপনি আর আমি কালেমা পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। সেই রক্তঝরা দিনটি যদি তিনি ‘হাল ছেড়ে দেওয়ার’ অপশন বেছে নিতেন, তবে ইসলামের ইতিহাস ওখানেই শেষ হয়ে যেত।
 
শক্ত মানুষ এমনি এমনি তৈরি হয় না। শক্ত মানুষ তৈরি হয় রাতের অন্ধকারে, জায়নামাজে চোখের পানি ফেলার মাধ্যমে। যখন দুনিয়ার সবাই ঘুমিয়ে থাকে, আর আপনি আপনার রবের সাথে একান্তে কথা বলেন, নিজের দুর্বলতাগুলো তাঁর সামনে উজাড় করে দেন, ঠিক তখনই আপনার ভেতরে এক অলৌকিক শক্তির সঞ্চার হয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন,
 
“আমি আমার বান্দার প্রতি তেমনই আচরণ করি, যেমন সে আমার প্রতি ধারণা পোষণ করে।”
 
আপনি যদি ভাবেন, “আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করার জন্য এই বিপদ দিয়েছেন”, তবে আপনি ধ্বংসই হবেন। আর যদি ভাবেন, “আমার রব আমাকে শক্তিশালী করার জন্য, আমাকে কোনো বড় মাকামে পৌঁছানোর জন্য এই সিঁড়িটি দিয়েছেন”, তবে আপনি অবশ্যই বিজয়ী হবেন। মুমিনের ডিকশনারিতে ‘ব্যর্থতা’ বলে কোনো শব্দ নেই; আছে কেবল ‘অভিজ্ঞতা’ এবং ‘পরীক্ষা’।
 
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সমসাময়িক ভোগবাদী সমাজের চশমা দিয়ে জীবনকে দেখি। আমাদের শেখানো হয়েছে, জীবন মানেই সাকসেস, জীবন মানেই সুখ। তাই যখনই একটু দুঃখ আসে, আমরা ভড়কে যাই। অথচ আল্লাহ বলছেন,
 
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের কিছুটা ক্ষতি দিয়ে; আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
 
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ ‘অবশ্যই’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, এই অপশনটি আসবেই। আপনার চাকরি চলে যেতে পারে, প্রিয়জন আপনাকে ছেড়ে যেতে পারে, দুরারোগ্য ব্যাধি আপনার শরীরে বাসা বাঁধতে পারে, অথবা মিথ্যে অপবাদে আপনার সামাজিক মর্যাদা ধুলিস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে শয়তান আপনার কানে ফিসফিস করে বলবে, “শেষ! সব শেষ! তোমার আর বাঁচার কোনো মানে নেই।”
 
এটিই সেই প্রথম অপশন—শয়তানের টোপ। কিন্তু কুরআনিক লজিক বলে, “যেখানে শেষ, সেখান থেকেই মূলত নতুনের শুরু।” রাত যখন সবচেয়ে গভীর হয়, ভোর তখন সবচেয়ে নিকটে থাকে।
 
একজন সালাফি অনুসারী প্রকৃত মুসলিমের জীবন দর্শন হলো—তাকদিরে বিশ্বাস। উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের (রহ.)-এর ঘটনাটি আমাদের জন্য এক জীবন্ত পাঠ। তিনি সফরের সময় তার একটি পা পচন ধরার কারণে কেটে ফেলতে বাধ্য হলেন। ঠিক একই সফরে তার প্রিয় পুত্র ঘোড়ার লাথিতে মারা গেল। এক দিনে দুটি বিশাল ট্রাজেডি! পা হারালেন, সন্তান হারালেন। মানুষ ভাবল তিনি ভেঙে পড়বেন।
 
কিন্তু তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! আমার চারটি হাত-পায়ের মধ্যে আপনি একটি নিয়েছেন, তিনটি তো রেখেছেন। আমার চার ছেলের মধ্যে একটি নিয়েছেন, তিনটি তো রেখেছেন। আপনি যা দিয়েছেন তার জন্যও প্রশংসা, যা নিয়েছেন তার জন্যও প্রশংসা।”
 
এই যে মানসিক দৃঢ়তা, এটা কোনো মোটিভেশনাল স্পিকারের ভিডিও দেখে আসেনি। এটা এসেছে কুরআনের গভীর বুঝ থেকে। তিনি জানতেন, তার সামনে দুটি অপশন ছিল:
 
এক— হা-হুতাশ করে আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা এবং নিজের ঈমান হারানো।
 
দুই— সবর করে জান্নাতের বিনিময় হিসেবে এই কষ্টকে কবুল করে নেওয়া। তিনি শক্ত হওয়াটাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
 
আজকের দিনে আমাদের যুবসমাজ সামান্য রিলেশনশিপ ব্রেকআপ বা ক্যারিয়ারের ছোটখাটো ধস নামলেই আত্মহত্যার কথা ভাবে। কারণ, তাদের আত্মার খোরাক নেই। তাদের আত্মা দুর্বল। তারা মনে করে, এই দুনিয়ার প্রাপ্তিই সব। অথচ মুমিন জানে, দুনিয়াটা একটা মুসাফিরখানা। এখানে কেউ থাকতে আসেনি। আসল গন্তব্য তো সামনে। যে মানুষটা জানে তার আসল বাড়ি জান্নাতে, রাস্তার ধারের কোনো সরাইখানায় বেডশিট ময়লা হলে সে কি খুব বেশি বিচলিত হবে?
 
না। সে বলবে, “রাত পোহালেই তো চলে যাব।” এই চিন্তাটাই মানুষকে ‘শক্ত’ করে। যখন আপনি জানবেন যে, আপনার সাথে যা ঘটছে তা মহাবিশ্বের মহাপরিচালক আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ, তখন আপনার দুশ্চিন্তা বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে।
 
ভাবুন, আল্লাহ কি আপনাকে ভালোবাসেন না? অবশ্যই বাসেন। মায়ের চেয়েও সত্তর গুণ বেশি বাসেন। তাহলে সেই দয়ালু রব কেন আপনাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেললেন যেখানে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসছে? কারণ, তিনি চান আপনি নিজের পায়ের ওপর দাঁড়ান। তিনি চান আপনি দুনিয়ার ওপর নির্ভরতা ছেড়ে একমাত্র তাঁর ওপর নির্ভর করুন।
 
একটা বাচ্চার কথা ভাবুন। মা যখন বাচ্চাটাকে হাত ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শেখায়, বাচ্চাটা ভয় পায়, টলমল করে, পড়ে যায়, হয়তো কান্নাও করে। কিন্তু মা কি নিষ্ঠুর? না। মা জানেন, আজ যদি তিনি হাতটা না ছাড়েন, তবে সন্তান কোনোদিন নিজের পায়ে হাঁটতে শিখবে না।
 
আল্লাহও মাঝে মাঝে আমাদের হাত ছেড়ে দেন, যাতে আমরা শিখতে পারি কীভাবে ঝড়ের মাঝেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়। এটাই সেই প্রসেস—শক্ত হওয়ার প্রসেস।
 
শক্ত মানুষরা কাঁদে না—এ কথা ভুল। শক্ত মানুষরাই সবচেয়ে বেশি কাঁদে, তবে সেটা মানুষের সামনে নয়, জায়নামাজে। তাদের কান্না হয় নীরব, তাদের অভিযোগ হয় কেবল রবের দরবারে। তারা যখন চোখ মুছে মানুষের সামনে আসে, তখন তাদের চেহারায় থাকে প্রশান্তির ছাপ। কারণ তারা তাদের বোঝাটা আল্লাহর জিম্মায় দিয়ে এসেছে। আপনি যখন আপনার দুর্বলতাগুলো আল্লাহর কাছে প্রকাশ করবেন, আল্লাহ তখন আপনাকে এমন শক্তি দেবেন যা দিয়ে আপনি পাহাড়ও টলাতে পারবেন।
 
সাহাবায়ে কেরাম বদরের মাঠে সংখ্যায় কম ছিলেন, অস্ত্রে কম ছিলেন, কিন্তু তাদের ‘ঈমানি শক্তি’ এত প্রখর ছিল যে, ফেরেশতারাও তাদের সাহায্যে নেমে এসেছিলেন। আপনার জীবনের বদর প্রান্তরেও আপনি একা নন। যদি আপনি ‘শক্ত হওয়ার’ অপশনটি বেছে নেন, তবে আসমানি সাহায্য আপনার জন্যও অপেক্ষা করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
 
“শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।”
 
এখানে শক্তি বলতে কেবল সিক্স প্যাক বডি বা মাসল বোঝানো হয়নি। এখানে বোঝানো হয়েছে মানসিক ও আত্মিক শক্তি। যে শক্তি দিয়ে মানুষ পাপের হাতছানিকে ‘না’ বলতে পারে। যে শক্তি দিয়ে মানুষ হাজারো কষ্টের মাঝেও বলতে পারে “আলহামদুলিল্লাহ”।
 
আজকের এই ভোগবাদী সমাজে, যেখানে অশ্লীলতা আর হারাম উপার্জনের স্রোত বইছে, সেখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলাটাই সবচেয়ে বড় শক্তি। সবাই যখন অন্যায়ের সাথে আপস করে নিচ্ছে, তখন আপনি যখন একলা দাঁড়িয়ে সত্যের পতাকা ধরেন—সেটাই আপনার শক্ত হওয়ার গল্প।
 
আপনার জীবনের ওই কঠিন অধ্যায়টা, যেটা কাউকে বলতে পারেন না, সেটাই আপনার ‘মেকিং জোন’। ওটাই আপনাকে তৈরি করছে ভবিষ্যতের কোনো বড় দায়িত্বের জন্য। হযরত ইউসুফ (আ.)-কে দেখুন। কূয়ায় নিক্ষিপ্ত হলেন, দাস হিসেবে বিক্রি হলেন, মিথ্যা অপবাদে জেলে গেলেন। প্রতিটি ধাপে তার সামনে অপশন ছিল—হতাশ হওয়া অথবা আল্লাহর ওপর ভরসা করে শক্ত থাকা। তিনি শক্ত থাকলেন। আর ফলাফল? জেলখানা থেকে সোজা মিশরের রাজসিংহাসন।
 
যদি তিনি কূয়ায় পড়ে হতাশ হয়ে যেতেন, তবে কি আমরা আজকের ইউসুফকে পেতাম? পেতাম না। তাই, আপনার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যৎ বিচার করবেন না। বীজের ভেতর বিশাল মহীরুহ সুপ্ত থাকে, কিন্তু তাকে মাটির নিচে অন্ধকার সহ্য করতে হয়, বুক চিরে অংকুর বের করতে হয়। আপনার বর্তমান কষ্টগুলো সেই অংকুরোদগমের বেদনা মাত্র।
 
আমাদের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, যারা জীবনে অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছে, তারাই পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল ও প্রজ্ঞাবান মানুষে পরিণত হয়। কারণ তারা যন্ত্রণার ভাষা বোঝে। তারা জানে, কীভাবে পড়ে গিয়ে আবার উঠতে হয়। আল্লাহ হয়তো আপনাকে ভেঙেছেন, যাতে আপনি অন্যদের জোড়া লাগাতে পারেন। আপনার ক্ষতগুলো একসময় অন্যদের জন্য আরোগ্যের কারণ হবে। কিন্তু শর্ত হলো—আপনাকে সেই কঠিন সময়ে ‘হাল ছাড়া’ যাবে না। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, “ইন্না মাআল উসরি ইউসরা”—নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।
 
আল্লাহ একই আয়াতে দুবার বলেছেন এ কথা। কষ্টের পরে নয়, কষ্টের ‘সাথেই’ স্বস্তি আছে। প্যাকেজ ডিল। আপনি কষ্টটা নিচ্ছেন, স্বস্তিটা কেন রিজেক্ট করবেন?
 
তাই আজ যারা নিজেদের ব্যর্থ ভাবছেন, যারা ভাবছেন জীবনটা বুঝি এখানেই থেমে গেল, তাদের বলছি—আপনার গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। কলম এখনো আল্লাহর হাতে। আপনি শুধু পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছেন, কিন্তু লেখক তো তিনি। তিনি কি তাঁর প্রিয় বান্দার গল্পটা ট্রাজেডি দিয়ে শেষ করবেন? অসম্ভব। মুমিনের গল্পের শেষটা সবসময় সুন্দর হয়, ইহকালে না হলেও পরকালে। আপনার কাজ হলো সেই ‘হ্যাপি এন্ডিং’ পর্যন্ত টিকে থাকা। ধৈর্য মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; ধৈর্য মানে হলো ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা যে, এই ঝড় থামবেই।
 
নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি সেই কয়লা হবেন যা চাপে গুঁড়ো হয়ে যায়? নাকি সেই হীরা হবেন যা চাপে দ্যুতি ছড়ায়? পছন্দ আপনার। অপশন দুইটা।
 
এক— হয় আপনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিজেকে শেষ করে দেবেন—মদ, ড্রাগস, হারাম রিলেশন বা আত্মহননের মাধ্যমে।
 
দুই — আপনি ওজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে বলবেন, “ইয়া রব! আমি দুর্বল, কিন্তু তুমি সবল। আমি পারছি না, কিন্তু তুমি তো পারো। আমাকে শক্তি দাও।”
 
বিশ্বাস করুন, এই একটি সিদ্ধান্ত আপনার জীবনকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেবে। তখন আপনি আর পরিস্থিতির দাস থাকবেন না, আপনি হবেন পরিস্থিতির নেতা। আপনার গল্পটা যেন এমন হয়, যা শুনে অন্য কেউ সাহস পায়। যেন কেউ আপনার দিকে তাকিয়ে বলতে পারে, “সে যদি পারে, আমিও পারব।”
 
সালাফরা বলতেন, “যার ঈমান যত মজবুত, তার পরীক্ষাও তত কঠিন।” তাই বিপদ দেখলে ভয় পাবেন না। মনে করবেন, আপনার ঈমানের লেভেল বাড়ছে বলেই পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হচ্ছে। আল্লাহ আপনাকে প্রমোশন দিতে চান। আর প্রমোশন পেতে হলে কঠিন ইন্টারভিউ ফেস করতেই হয়।
 
পরিশেষে বলি, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকান। এই চোখ অনেক কেঁদেছে, এই মন অনেক ভেঙেছে। কিন্তু আপনি এখনো বেঁচে আছেন। এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। তার মানে আল্লাহ আপনার ওপর আশা ছাড়েননি। তিনি এখনো আপনাকে নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। অতীতে যা হারিয়েছেন, তার জন্য শোক করবেন না। যা আছে, তা নিয়ে নতুন করে শুরু করুন। মনে রাখবেন, ভাঙা হাড় যখন জোড়া লাগে, তখন জোড়া লাগার স্থানটা আগের চেয়েও মজবুত হয়। আপনার ভাঙা হৃদয়টা যখন আল্লাহর ভালোবাসায় জোড়া লাগবে, তখন তা হবে আগের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি পবিত্র।
 
সুতরাং, শেষ হয়ে যাওয়া নয়, শক্ত হওয়াকেই বেছে নিন। কারণ, ভীরুরা মরে যায় বারবার, কিন্তু সাহসীরা মৃত্যুঞ্জয়ী হয় আল্লাহর রহমতে। আপনার গল্পটা যেন হয় বিজয়ের, পরাজয়ের নয়। সেই গল্প, যেখানে নায়ক রক্তমাখা শরীরেও হাসিমুখে বলে, “আমার রব আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।”
 
[গন্তব্যের বাঁকে দুই অপশন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group