মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর পতন সাধারণত পাহাড়ের চূড়া থেকে এক লাফে হয় না; এই পতন হয় ধাপে ধাপে, অতি সন্তর্পণে, খুবই নিঃশব্দে। এই পতন বাইরের কেউ দেখতে পায় না, এটি ঘটে মানুষের নিজের ভেতরে, নিজের বিবেকের সাথে তালি দিতে দিতে।
শয়তানের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো, সে মানুষকে হঠাৎ করে স্রষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয় না। বরং, প্রথমে মানুষ দ্বীনকে জানতে শুরু করে, তারপর দ্বীনের ভাষা আয়ত্ত করে, দ্বীনের ভারি ভারি শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করতে শেখে। আর ঠিক এই পর্যায়ে এসে, একসময় সে অবচেতনভাবেই ভাবতে শুরু করে—সে যেন দ্বীনের মালিক বা একচ্ছত্র আধিপত্যকারী হয়ে গেছে। তখন আর আল্লাহর বিধান তার কাছে আমানত বা ভারি দায়িত্ব মনে হয় না, বরং নিজের মনগড়া ব্যাখ্যাই তার কাছে সবচেয়ে হালকা, সহজ ও চূড়ান্ত বলে মনে হতে থাকে।
জ্ঞানের এই ধাপটিই হলো পতনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। কারণ, ইসলামি জ্ঞান যদি অন্তরে বিনয় নিয়ে আসতে না পারে, তবে তা হেদায়েতের আলোর বদলে অহংকারের বিধ্বংসী আগুনে পরিণত হয়। আর অহংকার যখন দ্বীনদারির শুভ্র পোশাক পরে মানুষের সামনে আসে, তখন তা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক আগুনে পরিণত হয়। ইবলিসের পতন কিন্তু জ্ঞানের অভাবে হয়নি, তার পতন হয়েছিল এই অহংকারের কারণেই। সে ভেবেছিল, সে জেনে গেছে, সে শ্রেষ্ঠ হয়ে গেছে।
আজকের সময়ের সবচেয়ে বিষাক্ত ও সংক্রামক রোগগুলোর একটি হলো—মানুষ দ্বীন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানে, কিন্তু তার বাস্তব প্রতিফলন জীবনে নেই। সূরা আস-সফে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন,
“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ ● كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ”
“হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা নিজেরা করো না? আল্লাহর কাছে এটা অত্যন্ত ঘৃণ্য বিষয় যে, তোমরা যা করো না তা বলবে”। (সূরা আস-সফ, আয়াত: ২-৩)
অথচ আজ একটু জানলেই আমরা ভাবতে শুরু করি, এখন আমরা সব বুঝে গেছি। আমাদের চেয়ে বেশি আর কে বোঝে! সত্য হলো, একজন মুমিনের জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় বাড়ার কথা, নিজের অক্ষমতা ও দুর্বলতার বোধ প্রকট হওয়ার কথা। আল্লাহর বিশালত্বের সামনে নিজেকে ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র মনে হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী করছি?
কুরআন-হাদিসের টুকটাক পরিভাষা জেনে আমরা থেমে যাচ্ছি এবং বিচারকের আসনে বসে পড়ছি। নিজের চোখের সামনে যখন গীবত, রিয়া, তাকাব্বুর, হাসাদ, ব্যাখ্যার বাড়াবাড়ি এবং ফতোয়ার দাপট—সবকিছু একসাথে চলতে থাকে, তখনও আমরা মনে মনে নিজেদেরকে বুদ্ধিমান ও সঠিক পথের পথিক ভাবতে থাকি। এই আত্মপ্রসাদের চেয়ে বিপজ্জনক আর কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাধি নেই।
কুরআনের ভাষা যেমন পরম মমতাময়ী, তেমনি প্রয়োজনে তা অত্যন্ত কঠোর ও ন্যায়সঙ্গত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইহুদি পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য করে একটি চিরন্তন কথা বলেছেন, যা আজকের যুগে আমাদের প্রতিটি দ্বীনদারের বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হওয়া উচিত:
“أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ”
“তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন করো। তোমরা কি বোঝো না”? (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৪৪)
এই আয়াতটি কেবল অতীতের কোনো সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের আয়না। কারণ, মানবচরিত্র এমন এক আশ্চর্য প্রহেলিকা, যে অন্যকে নসিহত করার সময় বা অন্যের ভুল ধরার সময় খুবই দৃঢ় ও আপসহীন, কিন্তু নিজের নফসকে দমন করার সময় খুবই দুর্বল ও আপসকামী।
অন্যের ছোট একটি গুনাহ দেখলে সে জ্বলন্ত আগুন হয়ে ওঠে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে; কিন্তু নিজের পাহাড়সম গুনাহ দেখলে তাতে সংস্কারের বদলে হাজারটা মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি খুঁজে নেয়। নিজের দোষকে সে সুন্দর করে নাম দেয় “পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি” বা “মানবিক দুর্বলতা”, আর অন্যের দোষকে আখ্যা দেয় “চরিত্রহীনতা” বা “মুনাফিকি” বলে। অথচ, হাশরের মাঠে আল্লাহর কাছে উভয়ের হিসাবই কড়ায়-গণ্ডায় নেওয়া হবে। সেখানে কোনো শব্দের চাতুর্য কাজে আসবে না।
গীবতের ক্ষেত্রেই আমাদের দৈনন্দিন আচরণটি একবার লক্ষ্য করুন। মুখে মুখে আমরা সবাই অত্যন্ত সুন্দর করে বলি—গীবত হারাম, গীবত জাহান্নামের রাস্তা, গীবত নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজ। কিন্তু তারপর? হঠাৎ করেই যখন আমরা কোনো চায়ের মজলিসে বসি, ফোনে বন্ধুদের সাথে কথা বলি, বা নিজের লেখায় অত্যন্ত সুকৌশলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম না নিয়ে এমনভাবে ইঙ্গিত করি যা সবাই বুঝতে পারে—তখন আমাদের মনে হয় এইটুকু করা সব মাফ!
মানুষ চিরকালই নিজের পাপকে নতুন নাম দিয়ে বৈধতা দিতে ভালোবাসে। স্পষ্ট হারাম কাজকে সে “প্রসঙ্গ”, “বিশ্লেষণ”, “সমালোচনা”, “সোচ্চারতা”, “উম্মাহর স্বার্থে দায়বদ্ধতা” বা “সতর্কীকরণ”—এইসব ভারী ভারী শব্দের মোড়কে ঢেকে দেয়। কিন্তু শব্দের মোড়ক যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, গুনাহের বাস্তবতা আল্লাহর কাছে একটুও বদলায় না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) গীবতের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। সাহাবীগণ যখন তাঁকে গীবত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি বললেন:
“ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ”
“তোমার ভাই যা অপছন্দ করে, (তার অনুপস্থিতিতে) সে বিষয়ে আলোচনা করাই হলো গীবত।”
সাহাবীগণ পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যই বিদ্যমান থাকে?”
রাসূল (সা.) উত্তরে বললেন:
“إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ”
“তুমি যা বলছো তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তাকে অপবাদ দিলে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯৩৪)
ঠিক এই জায়গাতেই শয়তান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। সে বর্তমান যুগের দ্বীনদার মানুষকে সরাসরি বলে না, “যাও, তুমি হারাম কাজ করো বা মদ খাও।” বরং সে ডান দিক থেকে এসে ধোঁকা দেয়। সে বলে, “তুমি তো খারাপ কিছু করছ না, তুমি তো হকের পক্ষে কথা বলছ।” “তুমি তো নাম ধরে বলোনি, তুমি তো শুধু ইঙ্গিত করেছ।” “তুমি তো উম্মাহকে সতর্ক করার জন্য নসিহত করছ।”
শয়তানের এই সামান্য শব্দগত ও মনস্তাত্ত্বিক ছলনা মানুষের বিবেককে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে সে নিজের দোষগুলো আরেকজনের দোষের বিশালত্ব দিয়ে ঢাকতে শেখে। আর এভাবেই পবিত্র ধর্ম এমন এক নির্মম বিচারালয়ে পরিণত হয়, যেখানে সবাই কেবল বিচারক, কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর মতো কোনো অভিযুক্ত নেই!
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, আজ এই মারাত্মক রোগগুলো কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দ্বীনি পরিবেশেও তা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আজ কেউ হয়তো আলেমের সন্তান, কেউ নামকরা আলেমা, কেউ জনপ্রিয় দায়ী, কেউ বেস্টসেলার লেখক, কেউ বা সোশ্যাল মিডিয়ার তুখোড় বক্তা—কিন্তু দিনের শেষে নিজের অন্তরের গভীর অন্ধকারে টর্চলাইট ফেলে তাকানোর মতো সময় বা অভ্যাস কারও নেই।
আজ আমরা নিজের ইলম বা জ্ঞানকে ‘আমানত’ না ভেবে ‘পরিচয়’ বা ‘ব্র্যান্ড’ ভাবছি। নিজের সামান্য পড়াশোনাকে অন্যদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর ‘মর্যাদার সনদ’ বানিয়ে নিচ্ছি। আরবি বা ইসলামি ফিকহের কিছু জটিল শব্দ আয়ত্ত করলেই একজন তরুণ মনে করছে, সে এখন উম্মাহর কাণ্ডারি হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—দ্বীন ‘বোঝা’ আর দ্বীন ‘বহন করা’ এক কথা নয়। মস্তিষ্ক দিয়ে বোঝা খুব সহজ, কিন্তু হৃদয় ও কাঁধ দিয়ে তা বহন করা পাহাড়সম কঠিন। মুখস্থ করা সহজ, কিন্তু নিজের অহংকারী নফসকে চূর্ণবিচূর্ণ করা কঠিন। সাবলীল ভাষায় কথা বলা আয়ত্ত করা সহজ, কিন্তু সেই কথার মানদণ্ডে নিজের জীবনকে বিচার করে মানার দায়িত্ব বহন করা অত্যন্ত কঠিন।
এখানে একজন মানুষ খুব সহজেই আত্মপ্রবঞ্চনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। সে প্রতিনিয়ত ভাবে, “আমি তো কুরআন-হাদিস বলছি, আমি তো হকের পথে আছি।” কিন্তু কুরআন-হাদিস ‘বলা’ আর কুরআন-হাদিসে ‘চলা’ সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন জগৎ।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) অত্যন্ত চমৎকার একটি কথা বলেছেন, “প্রকৃত জ্ঞান তা-ই যা (আমলের মাধ্যমে) উপকার দেয়, কেবল যা মুখস্থ করা হয় তা প্রকৃত জ্ঞান নয়। আর যে জ্ঞান অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে না, তা শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
কারণ, আল্লাহর ভয় ছাড়া অর্জিত জ্ঞান কেবল অহংকারের খাদ্য জোগায়। আর জ্ঞানী সেজে থাকা মানুষ একজন মূর্খের চেয়েও সমাজের জন্য বেশি ভয়ংকর, কারণ সে নিজের অন্তরের অন্ধত্বকে সুন্দর বিদ্যার শুভ্র পোশাকে ঢেকে রাখে, যা সাধারণ মানুষ ধরতে পারে না।
সাহাবায়ে কেরামের জীবন আর আমাদের বর্তমান জীবনের মধ্যে যদি আমরা তুলনা করি, তবে সেখানে আকাশ-পাতাল এক বিশাল শূন্যতা দেখতে পাব। তাঁরা জানতেন, তাই তাঁরা আল্লাহর ভয়ে কাঁপতেন। আর আমরা জানি, তাই আমরা মানুষের সামনে জাহির করি।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হকের সামনে এতটা নত ছিলেন যে, পুরো উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার পরও তিনি নিজেকে বড় ভাবার অবকাশ পাননি। নিজের জিহ্বা ধরে তিনি কাঁদতেন আর বলতেন, “এই জিহ্বাই আমাকে ধ্বংস করবে।”
উমর (রা.)-এর মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খলিফা, যাঁর ভয়ে শয়তান রাস্তা পরিবর্তন করত, তিনিও নিজের হিসাব নিজের কাছে এত কঠিন করতেন যে, রাতের অন্ধকারে হুজাইফা (রা.)-এর কাছে গিয়ে কাঁদতেন আর জিজ্ঞেস করতেন, “রাসূল (সা.) কি মুনাফিকদের তালিকায় আমার নাম বলেছেন?”
আমাদের মতো চারজনের প্রশংসা শুনে তাঁরা অহংকারে ফুলে উঠতেন না।
উসমান (রা.)-এর লজ্জা ও হায়া এমন পর্যায়ের ছিল যে, স্বয়ং ফেরেশতারা পর্যন্ত তাঁকে দেখে লজ্জাবোধ করত।
এটি শুধু কোনো ঐতিহাসিক গালগল্প বা বর্ণনা নয়, এটি হলো ঈমানি চরিত্রের চূড়ান্ত উচ্চতা।
আলী (রা.) ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল সমুদ্র, কিন্তু তাঁর সেই অথৈ জ্ঞান তাঁকে ‘জ্ঞান-গর্বী’ করেনি; বরং তাঁকে করেছে আরও বেশি বিনম্র, মাটির কাছাকাছি।
এটাই ছিল সাহাবা-মানসিকতা। তাঁরা দ্বীনকে নিজের দক্ষতা দেখানোর, ক্যারিয়ার গড়ার বা মানুষের বাহবা কুড়ানোর মঞ্চ বানাননি। তাঁরা দ্বীনের বিশালত্বের সামনে নিজেদেরকে সবসময় ধূলিকণার মতো ছোট রেখেছেন। আর আজ আমরা কী করছি?
আমরা অত্যন্ত সুকৌশলে দ্বীনকে নিজের অবস্থান, পরিচিতি ও ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলছি। কেউ বক্তৃতার মঞ্চে অন্যকে হারিয়ে জিতে যেতে চায়, কেউ কমেন্ট বক্সের বিতর্কে, কেউ ইউটিউবের ভিউয়ে, কেউ বেস্টসেলার বইয়ের তালিকায়, কেউবা আকর্ষণীয় পোস্টে বা পত্রিকার শিরোনামে। কিন্তু আমরা ভুলে গেছি, আল্লাহর কাছে জেতার মানদণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে জেতা মানে অন্যকে হারানো নয়; সেখানে জেতা মানে নিজের ভেতরের পশুত্ব ও অহংকারের পরাজয় ঘটানো। সেখানে জেতা মানে মানুষ নয়, কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক রোগগুলোর আরেকটি হলো—স্পষ্ট হারামের ক্ষেত্রে ছোট ছোট ছাড় দেওয়া এবং তাকে স্বাভাবিকীকরণ করা। এই পতন হঠাৎ হয় না। শুরুতে বলা হয়, “আরে, এখন তো সবাই এমনটা করছে।” কিছুদিন পর বলা হয়, “এতে আসলে এত বেশি সমস্যা নেই, নিয়ত তো ভালো।” এরপর বলা হয়, “সময় বদলেছে, যুগ পাল্টেছে, ধর্মের ব্যাখ্যাও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে করতে হবে।” তারপর বলা হয়, “সবার জন্য তো আর একই কঠোরতা চলে না, দ্বীন অনেক সহজ।” এভাবেই ছাড় দিতে দিতে একসময় সমাজে হারাম আর হারাম থাকে না, সেটি কেবল ব্যক্তিগত রুচি বা পছন্দের বিষয়ে পরিণত হয়।
ঠিক এই বিন্দুতেই মানুষের আধ্যাত্মিক ধ্বংস নেমে আসে। কারণ, যখন অন্তর থেকে হারামের প্রতি ঘৃণা ও ভয় চিরতরে চলে যায়, তখন ঈমানের নীরব রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মানুষ আর গুনাহের পর কাঁপে না, তার আর অনুশোচনায় বুক ফাটে না, সে আর সিজদায় গিয়ে কাঁদে না। সে নিজের ভেতরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—নৈতিক অনুভূতিটাকেই নিজের হাতে গুম করে ফেলে।
ভয়ের বিষয় হলো, এই অবস্থা আজ শুধু সাধারণ বা পশ্চিমা প্রভাবিত মানুষের নয়; বরং তা দ্বীনি পরিমণ্ডলেও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদ্রাসা, মাহফিল, অনলাইন ইসলামি কনটেন্ট, আধুনিক দাওয়াহ প্ল্যাটফর্ম—সবকিছুর ভেতরেই আজ ইখলাসের চেয়ে ‘স্টাইল’ ও ‘প্যাকেজিং’ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথার ভঙ্গি অত্যন্ত চমৎকার, প্রেজেন্টেশন নিখুঁত, কিন্তু পূর্বসূরিদের সেই আদব ও রুহানিয়াতের জৌলুস আজ বিলীন।
বাইরে থেকে তাকালে মনে হয় সমাজে কত দ্বীনের চর্চা হচ্ছে, কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেতরের দিকে তাকালে দেখা যায়—সেখানে ব্যক্তিপূজা, উগ্র অন্ধানুকরণ, চরম হিংসা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ব্র্যান্ডিং, পরিচিতি-লালসা এবং যেকোনো মূল্যে “ফেমাস” হওয়ার এক গোপন ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। একজন মানুষ নিজের অজান্তেই শয়তানের যে মায়াজালে আটকা পড়ে, তা হলো: সে বুঝতেই পারে না যে, সে এখন আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করছে না; বরং সে অত্যন্ত সুকৌশলে সমাজে নিজের একটি ‘ইমেজ’ বা ‘মূর্তি’ নির্মাণ করছে। বাইরের একটি নিখুঁত সাদাকালো পোস্টারের মতো তার বাইরের রূপটি পরিপাটি, কিন্তু ভেতরের ক্যানভাসে ইখলাসের কোনো রং নেই।
এই প্রবণতা একজন প্রবীণ আলেমেরও হতে পারে, আধুনিক আলেমারও হতে পারে, কিংবা সাধারণ কোনো দ্বীনদার তরুণেরও হতে পারে। কেউ হয়তো উস্তাদ বা উস্তাযার বিশাল ছায়ায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দম্ভের সাথে এমনভাবে কথা বলে, যেন জান্নাতের চাবি এবং সত্যের শেষ সনদ কেবল তারই হাতে। কেউ ছাত্রদের সামনে এমন অহংকারী ভঙ্গি করে, যেন তার জ্ঞান অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত। কেউ ফিকহের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে চরম কঠোরতা প্রদর্শন করে, অথচ নিজের ব্যক্তিগত আচরণে সে অত্যন্ত রূঢ় ও শিষ্টাচারবর্জিত।
আবার কেউ নিজের নফসের ধোঁকায় পড়ে দ্বীনের নতুন নতুন ছাড়কে “দরকারি ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি” বা “মাকাসিদুশ শরিয়াহ” বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু অমোঘ সত্য হলো, যদি কোনো মানুষ তার নিজের অন্তরের অসুখগুলো দেখতে না পায়, তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত যতই আধুনিক বা জটিল হোক না কেন, তা সমাজে হেদায়াতের আলো আনার বদলে কেবল বিভ্রান্তির অন্ধকারই ডেকে আনবে।
কুরআন মাজিদ আমাদের বারবার সাবধান করেছে এই আত্মপ্রসাদ ও নিজেকে পবিত্র মনে করার ব্যাধি থেকে। সূরা আন-নাজমে আল্লাহ বলেন,
“فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ”
“সুতরাং তোমরা নিজেদেরকে পবিত্র বলে দাবি করো না; কে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান, তা আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।” (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩২)
এই আয়াতের গভীরতা অসীম। মানুষ যখন নিজেকে খুব ভালো, নেককার ও সঠিক ভাবতে শুরু করে, ঠিক তখন থেকেই তার পতনের মূল দরজাটি খুলে যায়। সে আর নিজের কোনো ভুল দেখতে পায় না, কারণ সে নিজের অবচেতন মনে নিজেকে ইতিমধ্যেই “বুঝদার”, “পরিপক্ব”, ও “সঠিক পন্থার একমাত্র ধারক” বলে ধরে নিয়েছে। কিন্তু ক্রমাগত আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো মানুষের দ্বীনদারি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। যে ব্যক্তি রাতের বেলা একাকী বসে নিজের নফসকে প্রতিদিন প্রশ্ন করে না, সে খুব দ্রুত নিজের মনগড়া ও আরোপিত পবিত্রতার মরীচিকায় ডুবে ধ্বংস হয়ে যায়।
গীবত, রিয়া, তাকাব্বুর, হিংসা—এই আত্মিক পাপগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এগুলো সাধারণত ঢোল পিটিয়ে বা সরাসরি ঘোষিতভাবে আসে না। এগুলো খুব নীরবে চায়ের মজলিসে বসে, ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে, দাওয়াহর আলোচনার ভেতরে, হিতাকাঙ্ক্ষী সাজার পরামর্শের ছলে, “উদাহরণ” দেওয়ার পর্দায়, কিংবা “সৎ সমালোচনা”র মুখোশ পরে আমাদের হৃদয়ে ঢুকে পড়ে।
এভাবে একজন মানুষ নিজের অজান্তেই প্রতিদিন বহুবার কবিরা গুনাহ করে ফেলে। সে ভাবে, সে তো দ্বীনের স্বার্থেই কথা বলছে; অথচ বাস্তবে সে দ্বীনের নূন্যতম আদব রক্ষা করছে না। সে ভাবে, সে তো উম্মাহকে সংশোধন করছে; অথচ তার ভাষার গভীরে লুকিয়ে আছে অন্যকে ছোট করার হীনমন্যতা, নিজের জ্ঞান জাহির করার প্রতিযোগিতা, বা ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ।
এই জায়গায় সাহাবায়ে কেরামের একটি সাধারণ ঘটনাও আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তাঁরা যখন বুঝতে পারতেন যে তাঁদের কোনো কাজে বা কথায় ভুল হয়েছে, তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে বিনয়াবনত হয়ে ফিরে যেতেন। তাঁরা তর্কে জড়াতেন না। কিন্তু আমরা? আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পারার পরও তা স্বীকার না করে হাজারটা দার্শনিক ব্যাখ্যা খুঁজি।
সাহাবারা আল্লাহর সামনে নিজেদের সর্বদা অপরাধী ও মুখাপেক্ষী ভাবতেন; আর আমরা আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে দ্বীনের পাহারাদার ও ব্যাখ্যাকারী ভাবতে শুরু করেছি। সাহাবারা নিজেদের পাহাড়সম আমলকেও কাল কিয়ামতের জন্য অল্প ও তুচ্ছ ভাবতেন; আর আমরা আমাদের যৎসামান্য আমল, দুই-চারটে স্ট্যাটাস বা দান-সদকাকে অনেক বড় কিছু ভেবে বসে আছি।
এটাই আমাদের এবং তাদের মাঝের আসমান-জমিন ব্যবধান। এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। যে উম্মাহর একমাত্র কাজ ছিল নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর দিকে ডাকা, সেই উম্মাহ আজ নিজের ইমেজ, দল বা প্রতিষ্ঠানকে আল্লাহর পথের মাঝখানে দাঁড় করাতে ব্যস্ত।
আমাদের যুগের আরেকটি বড় আধ্যাত্মিক সংকট হলো, আমরা ইসলামি জ্ঞানকে আমলের মাধ্যম বানানোর বদলে সস্তা “কনটেন্ট” বানিয়ে ফেলেছি। মানুষ এখন দ্বীন পড়ার আগে বুঝতে চায়—কোন কথা বললে মানুষ বেশি হাততালি দেবে, কোন ব্যাখ্যাটি নেটে বেশি ভাইরাল হবে, কোন মতামতটি মঞ্চের জন্য বেশি উপযোগী। সত্যের নীরব অনুসন্ধান কমে গেছে, আর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার হিসাব-নিকাশ বেড়ে গেছে।
এভাবে জ্ঞানকে হয়তো কাগজের পাতায়, ক্যামেরার লেন্সে, চমৎকার গ্রাফিক্সের ডিজাইনে বা ছোট ছোট আকর্ষণীয় উদ্ধৃতিতে সীমাবদ্ধ করা যায়; কিন্তু তা দিয়ে কখনো হৃদয়কে আলোকিত করা যায় না। অথচ, দ্বীন যদি মস্তিষ্কের গণ্ডি পেরিয়ে হৃদয়ে না নামে, তবে তা কেবল কিছু ‘তথ্য’ হয়েই থেকে যায়, তা কখনো ‘নূর’ হতে পারে না।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর যুগে যখন কুরআনের দশটি আয়াত অবতীর্ণ হতো, সাহাবারা কেবল সেগুলো তোতাপাখির মতো তিলাওয়াত করতেন না; তাঁরা সেই দশ আয়াত শিখতেন, বুঝতেন এবং নিজেদের বাস্তব জীবনে তা পুরোপুরি আমলে পরিণত করতেন। এর আগে তাঁরা পরবর্তী আয়াতে যেতেন না। এটিই ছিল তাঁদের জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি। আর আমাদের পদ্ধতি? গুগল থেকে দশটা সুন্দর কোটেশন কপি করে রাখা, চমৎকার ডিজাইন দিয়ে তিনটা পোস্ট বানানো, কমেন্ট বক্সে দুটো ঝগড়া করা, আর মনে করা—আমরা ইসলামের বিশাল সমুদ্র পার হয়ে গেছি!
কিন্তু না, ইসলাম বোঝা এত সস্তা নয়। কুরআন বুঝতে চাইলে সবার আগে নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে, নিজের নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। হাদিসের গভীরে যেতে চাইলে নফসের খোলস ভাঙতে হয়। তাফসির পড়তে চাইলে আগে নিজের ভেতরের আত্মপ্রবঞ্চনাগুলোকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে শনাক্ত করতে হয়।
আজ মাদ্রাসা, খানকা, দাওয়াহর মঞ্চ, দ্বীনি আড্ডা—সবখানেই যদি পশ্চিমা ভোগবাদের অদৃশ্য ছায়া ঢুকে পড়ে; যদি ফ্রিলোড সংস্কৃতি, ফ্রি মিক্সিং, সেলফি-সেলিব্রেশন, ফেম-সিকিং, আর যেকোনো মূল্যে নিজের বা নিজের দলের ব্র্যান্ড গড়ার নেশা ঢুকে পড়ে, তাহলে দ্বীনের নূর চিরতরে ম্লান হয়ে যায়। আর যখন নূর ম্লান হয়, তখন মানুষের আর ভুল চোখে পড়ে না। মানুষের মনে হয়, “পরিবেশ তো কত সুন্দর, কত দ্বীনি আড্ডা হচ্ছে, সব তো ঠিকই আছে।”
কিন্তু কেবল বাইরের পরিবেশ ঠিক থাকলেই তো হয় না, ভেতরকার হৃদয় ঠিক থাকতে হয়। মসজিদের দেয়াল বা মিনার যতই সুন্দর ও পবিত্র হোক না কেন, নামাজির অন্তর যদি দুনিয়ার মোহ আর অহংকারে নোংরা থাকে, তাহলে কোন দিক থেকে আল্লাহর সাহায্য আর নাজাত আসবে?
সুতরাং, এই ফেতনার যুগে আমাদের প্রধান এবং একমাত্র চিকিৎসা হলো—আবার সেই পুরোনো পথে ফিরে যাওয়া। আমাদের বিনয় শিখতে হবে, প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে নীরবে আমল করা শিখতে হবে। কথা বলা কমাতে হবে এবং নিজের কাজের হিসাববেশি বেশি নিতে হবে। সবার আগে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাটুকু নত মস্তকে মেনে নিতে হবে। অন্য একজন মানুষকে ছোট বা অপমান করে কখনো দ্বীনকে বড় করা যায় না; বরং আল্লাহর সামনে নিজের নফসকে ছোট করতে পারলেই দ্বীন বড় হয়।
মানুষের ভুল ধরতে ধরতে এবং মানুষকে বিচার করতে করতে আমরা আজ অনেক সময় আল্লাহর সামনে নিজেরই বিচারক হয়ে বসে আছি। অথচ, আমাদের মূল কাজ ছিল নিজেকে সংশোধন করা, অন্যদের নয়। কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে, সেই ফয়সালার দায়িত্ব আল্লাহ আমাদের দেননি।
ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি বা যে ব্যক্তি নিজের সংশোধনের বদলে সর্বদা অন্যের সমালোচনা আর ছিদ্রান্বেষণে সময় কাটায়, সে ধীরে ধীরে আল্লাহর নূর থেকে বঞ্চিত হয়। আর যে ব্যক্তি নিজের আমলের খবর রাখে, নিজের ভুল নিয়ে কাঁদে, সে দুনিয়ার চোখে যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, আল্লাহর কাছে সে অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী। কারণ, কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ দেখবেন না কাকে কত বেশি তথ্য বা জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল; আল্লাহ দেখবেন, সে সেই জ্ঞান দিয়ে কী করেছে।
প্রশ্ন এটি নয় যে, তুমি কতগুলো বই পড়েছ বা কতগুলো হাদিস মুখস্থ করেছ। মূল প্রশ্ন হলো—সেই জ্ঞান কি তোমাকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে? তুমি কি আগের চেয়ে নরম ও বিনয়ী হয়েছ? তুমি কি মানুষের দোষ দেখা থেকে নিজের চোখকে থামাতে শিখেছ? তুমি কি অন্যের গীবত শোনা থেকে কানকে ফিরিয়ে নিয়েছ? তুমি কি রিয়া বা লোক-দেখানো ইবাদত ছেড়ে ইখলাস অর্জন করেছ? তুমি কি আল্লাহর বিধানের সামনে বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের মাথা নত করতে পেরেছ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে আমাদের অর্জিত জ্ঞান আমাদের জন্য নাজাতের অসিলা নয়; বরং তা আমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে এক ভয়ংকর প্রমাণ এবং বিশাল দায়িত্বের বোঝা। আর দায়িত্ব মানেই হলো তার কঠিন হিসাব আছে।
তাই আমাদের ভয় করা উচিত। নিজেকে নেককার বা বড় ভাবা থেকে ভয় করা উচিত। নিজের দ্বীনি পরিচয়ের মোহ বা ফ্যানবেস দেখে মুগ্ধ হওয়া থেকে ভয় করা উচিত। দুনিয়ার মানুষের চোখে সম্মানিত হতে গিয়ে, লাইক-কমেন্ট পেতে গিয়ে, আসমানের মালিকের কাছে হালকা ও মূল্যহীন হয়ে যাওয়া থেকে প্রচণ্ড ভয় করা উচিত। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সফলতা কেবল তারই, যে আল্লাহর সামনে নিজের শূন্যতা ও কাঙালপনা বুঝতে পেরেছে এবং সেই শূন্যতা পূরণের জন্য সিজদায় পড়ে কাঁদতে পেরেছে।
“হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এমন জ্ঞান দান করুন, যা সবার আগে আমাদেরকে বিনয় শেখায়, তারপর ইখলাসের সাথে আমল শেখায়, এবং সর্বশেষে নিজের ভুলের জন্য তওবা করতে শেখায়। আপনি আমাদেরকে এমন একটি জীবন্ত হৃদয় দিন, যা নিজের সামান্যতম ভুল দেখলেও আল্লাহর ভয়ে কেঁপে ওঠে। আমাদেরকে এমন জিহ্বা দিন, যা মানুষের গীবত, সমালোচনা আর অহেতুক তর্ক থেকে চিরকাল বিরত থাকে। আমাদেরকে এমন অন্তর দিন, যা লোক দেখানো ইবাদত বা রিয়া থেকে মুক্ত থাকে। আর আমাদেরকে এমন দৃষ্টি দিন, যা হারাম থেকে তো বাঁচেই, অন্যের দোষ খোঁজা থেকেও নিজেকে গুটিয়ে রাখে।”
কারণ, যে ব্যক্তি নিজেকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করতে জানে, সেই-ই হলো সত্যিকারের দ্বীনি মানুষ। আর যে মানুষ নিজের ভেতরের এই ভয়াবহ রোগগুলো দেখতে পায় না, তার বাইরের দ্বীনদারি যতই মোহনীয়, নিখুঁত বা আকর্ষণীয় হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত অহংকার আর রিয়া’র মরিচার নিচে চিরতরে চাপা পড়ে যায়।
এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের রুঢ় বাস্তবতা। এটাই চরম ও কঠোর সত্য। আর একমাত্র এই সত্যের উপলব্ধি এবং আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণই আমাদের এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।
[দ্য শ্যাডো অব সেলফ-রাইটনেস]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর পতন সাধারণত পাহাড়ের চূড়া থেকে এক লাফে হয় না; এই পতন হয় ধাপে ধাপে, অতি সন্তর্পণে, খুবই নিঃশব্দে। এই পতন বাইরের কেউ দেখতে পায় না, এটি ঘটে মানুষের নিজের ভেতরে, নিজের বিবেকের সাথে তালি দিতে দিতে।
শয়তানের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো, সে মানুষকে হঠাৎ করে স্রষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয় না। বরং, প্রথমে মানুষ দ্বীনকে জানতে শুরু করে, তারপর দ্বীনের ভাষা আয়ত্ত করে, দ্বীনের ভারি ভারি শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করতে শেখে। আর ঠিক এই পর্যায়ে এসে, একসময় সে অবচেতনভাবেই ভাবতে শুরু করে—সে যেন দ্বীনের মালিক বা একচ্ছত্র আধিপত্যকারী হয়ে গেছে। তখন আর আল্লাহর বিধান তার কাছে আমানত বা ভারি দায়িত্ব মনে হয় না, বরং নিজের মনগড়া ব্যাখ্যাই তার কাছে সবচেয়ে হালকা, সহজ ও চূড়ান্ত বলে মনে হতে থাকে।
জ্ঞানের এই ধাপটিই হলো পতনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। কারণ, ইসলামি জ্ঞান যদি অন্তরে বিনয় নিয়ে আসতে না পারে, তবে তা হেদায়েতের আলোর বদলে অহংকারের বিধ্বংসী আগুনে পরিণত হয়। আর অহংকার যখন দ্বীনদারির শুভ্র পোশাক পরে মানুষের সামনে আসে, তখন তা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক আগুনে পরিণত হয়। ইবলিসের পতন কিন্তু জ্ঞানের অভাবে হয়নি, তার পতন হয়েছিল এই অহংকারের কারণেই। সে ভেবেছিল, সে জেনে গেছে, সে শ্রেষ্ঠ হয়ে গেছে।
আজকের সময়ের সবচেয়ে বিষাক্ত ও সংক্রামক রোগগুলোর একটি হলো—মানুষ দ্বীন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানে, কিন্তু তার বাস্তব প্রতিফলন জীবনে নেই। সূরা আস-সফে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন,
“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ ● كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ”
“হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা নিজেরা করো না? আল্লাহর কাছে এটা অত্যন্ত ঘৃণ্য বিষয় যে, তোমরা যা করো না তা বলবে”। (সূরা আস-সফ, আয়াত: ২-৩)
অথচ আজ একটু জানলেই আমরা ভাবতে শুরু করি, এখন আমরা সব বুঝে গেছি। আমাদের চেয়ে বেশি আর কে বোঝে! সত্য হলো, একজন মুমিনের জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় বাড়ার কথা, নিজের অক্ষমতা ও দুর্বলতার বোধ প্রকট হওয়ার কথা। আল্লাহর বিশালত্বের সামনে নিজেকে ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র মনে হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী করছি?
কুরআন-হাদিসের টুকটাক পরিভাষা জেনে আমরা থেমে যাচ্ছি এবং বিচারকের আসনে বসে পড়ছি। নিজের চোখের সামনে যখন গীবত, রিয়া, তাকাব্বুর, হাসাদ, ব্যাখ্যার বাড়াবাড়ি এবং ফতোয়ার দাপট—সবকিছু একসাথে চলতে থাকে, তখনও আমরা মনে মনে নিজেদেরকে বুদ্ধিমান ও সঠিক পথের পথিক ভাবতে থাকি। এই আত্মপ্রসাদের চেয়ে বিপজ্জনক আর কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাধি নেই।
কুরআনের ভাষা যেমন পরম মমতাময়ী, তেমনি প্রয়োজনে তা অত্যন্ত কঠোর ও ন্যায়সঙ্গত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইহুদি পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য করে একটি চিরন্তন কথা বলেছেন, যা আজকের যুগে আমাদের প্রতিটি দ্বীনদারের বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হওয়া উচিত:
“أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ”
“তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন করো। তোমরা কি বোঝো না”? (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৪৪)
এই আয়াতটি কেবল অতীতের কোনো সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের আয়না। কারণ, মানবচরিত্র এমন এক আশ্চর্য প্রহেলিকা, যে অন্যকে নসিহত করার সময় বা অন্যের ভুল ধরার সময় খুবই দৃঢ় ও আপসহীন, কিন্তু নিজের নফসকে দমন করার সময় খুবই দুর্বল ও আপসকামী।
অন্যের ছোট একটি গুনাহ দেখলে সে জ্বলন্ত আগুন হয়ে ওঠে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে; কিন্তু নিজের পাহাড়সম গুনাহ দেখলে তাতে সংস্কারের বদলে হাজারটা মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি খুঁজে নেয়। নিজের দোষকে সে সুন্দর করে নাম দেয় “পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি” বা “মানবিক দুর্বলতা”, আর অন্যের দোষকে আখ্যা দেয় “চরিত্রহীনতা” বা “মুনাফিকি” বলে। অথচ, হাশরের মাঠে আল্লাহর কাছে উভয়ের হিসাবই কড়ায়-গণ্ডায় নেওয়া হবে। সেখানে কোনো শব্দের চাতুর্য কাজে আসবে না।
গীবতের ক্ষেত্রেই আমাদের দৈনন্দিন আচরণটি একবার লক্ষ্য করুন। মুখে মুখে আমরা সবাই অত্যন্ত সুন্দর করে বলি—গীবত হারাম, গীবত জাহান্নামের রাস্তা, গীবত নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজ। কিন্তু তারপর? হঠাৎ করেই যখন আমরা কোনো চায়ের মজলিসে বসি, ফোনে বন্ধুদের সাথে কথা বলি, বা নিজের লেখায় অত্যন্ত সুকৌশলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম না নিয়ে এমনভাবে ইঙ্গিত করি যা সবাই বুঝতে পারে—তখন আমাদের মনে হয় এইটুকু করা সব মাফ!
মানুষ চিরকালই নিজের পাপকে নতুন নাম দিয়ে বৈধতা দিতে ভালোবাসে। স্পষ্ট হারাম কাজকে সে “প্রসঙ্গ”, “বিশ্লেষণ”, “সমালোচনা”, “সোচ্চারতা”, “উম্মাহর স্বার্থে দায়বদ্ধতা” বা “সতর্কীকরণ”—এইসব ভারী ভারী শব্দের মোড়কে ঢেকে দেয়। কিন্তু শব্দের মোড়ক যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, গুনাহের বাস্তবতা আল্লাহর কাছে একটুও বদলায় না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) গীবতের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। সাহাবীগণ যখন তাঁকে গীবত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি বললেন:
“ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ”
“তোমার ভাই যা অপছন্দ করে, (তার অনুপস্থিতিতে) সে বিষয়ে আলোচনা করাই হলো গীবত।”
সাহাবীগণ পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যই বিদ্যমান থাকে?”
রাসূল (সা.) উত্তরে বললেন:
“إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ”
“তুমি যা বলছো তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তাকে অপবাদ দিলে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯৩৪)
ঠিক এই জায়গাতেই শয়তান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। সে বর্তমান যুগের দ্বীনদার মানুষকে সরাসরি বলে না, “যাও, তুমি হারাম কাজ করো বা মদ খাও।” বরং সে ডান দিক থেকে এসে ধোঁকা দেয়। সে বলে, “তুমি তো খারাপ কিছু করছ না, তুমি তো হকের পক্ষে কথা বলছ।” “তুমি তো নাম ধরে বলোনি, তুমি তো শুধু ইঙ্গিত করেছ।” “তুমি তো উম্মাহকে সতর্ক করার জন্য নসিহত করছ।”
শয়তানের এই সামান্য শব্দগত ও মনস্তাত্ত্বিক ছলনা মানুষের বিবেককে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে সে নিজের দোষগুলো আরেকজনের দোষের বিশালত্ব দিয়ে ঢাকতে শেখে। আর এভাবেই পবিত্র ধর্ম এমন এক নির্মম বিচারালয়ে পরিণত হয়, যেখানে সবাই কেবল বিচারক, কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর মতো কোনো অভিযুক্ত নেই!
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, আজ এই মারাত্মক রোগগুলো কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দ্বীনি পরিবেশেও তা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আজ কেউ হয়তো আলেমের সন্তান, কেউ নামকরা আলেমা, কেউ জনপ্রিয় দায়ী, কেউ বেস্টসেলার লেখক, কেউ বা সোশ্যাল মিডিয়ার তুখোড় বক্তা—কিন্তু দিনের শেষে নিজের অন্তরের গভীর অন্ধকারে টর্চলাইট ফেলে তাকানোর মতো সময় বা অভ্যাস কারও নেই।
আজ আমরা নিজের ইলম বা জ্ঞানকে ‘আমানত’ না ভেবে ‘পরিচয়’ বা ‘ব্র্যান্ড’ ভাবছি। নিজের সামান্য পড়াশোনাকে অন্যদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর ‘মর্যাদার সনদ’ বানিয়ে নিচ্ছি। আরবি বা ইসলামি ফিকহের কিছু জটিল শব্দ আয়ত্ত করলেই একজন তরুণ মনে করছে, সে এখন উম্মাহর কাণ্ডারি হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—দ্বীন ‘বোঝা’ আর দ্বীন ‘বহন করা’ এক কথা নয়। মস্তিষ্ক দিয়ে বোঝা খুব সহজ, কিন্তু হৃদয় ও কাঁধ দিয়ে তা বহন করা পাহাড়সম কঠিন। মুখস্থ করা সহজ, কিন্তু নিজের অহংকারী নফসকে চূর্ণবিচূর্ণ করা কঠিন। সাবলীল ভাষায় কথা বলা আয়ত্ত করা সহজ, কিন্তু সেই কথার মানদণ্ডে নিজের জীবনকে বিচার করে মানার দায়িত্ব বহন করা অত্যন্ত কঠিন।
এখানে একজন মানুষ খুব সহজেই আত্মপ্রবঞ্চনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। সে প্রতিনিয়ত ভাবে, “আমি তো কুরআন-হাদিস বলছি, আমি তো হকের পথে আছি।” কিন্তু কুরআন-হাদিস ‘বলা’ আর কুরআন-হাদিসে ‘চলা’ সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন জগৎ।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) অত্যন্ত চমৎকার একটি কথা বলেছেন, “প্রকৃত জ্ঞান তা-ই যা (আমলের মাধ্যমে) উপকার দেয়, কেবল যা মুখস্থ করা হয় তা প্রকৃত জ্ঞান নয়। আর যে জ্ঞান অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে না, তা শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
কারণ, আল্লাহর ভয় ছাড়া অর্জিত জ্ঞান কেবল অহংকারের খাদ্য জোগায়। আর জ্ঞানী সেজে থাকা মানুষ একজন মূর্খের চেয়েও সমাজের জন্য বেশি ভয়ংকর, কারণ সে নিজের অন্তরের অন্ধত্বকে সুন্দর বিদ্যার শুভ্র পোশাকে ঢেকে রাখে, যা সাধারণ মানুষ ধরতে পারে না।
সাহাবায়ে কেরামের জীবন আর আমাদের বর্তমান জীবনের মধ্যে যদি আমরা তুলনা করি, তবে সেখানে আকাশ-পাতাল এক বিশাল শূন্যতা দেখতে পাব। তাঁরা জানতেন, তাই তাঁরা আল্লাহর ভয়ে কাঁপতেন। আর আমরা জানি, তাই আমরা মানুষের সামনে জাহির করি।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হকের সামনে এতটা নত ছিলেন যে, পুরো উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার পরও তিনি নিজেকে বড় ভাবার অবকাশ পাননি। নিজের জিহ্বা ধরে তিনি কাঁদতেন আর বলতেন, “এই জিহ্বাই আমাকে ধ্বংস করবে।”
উমর (রা.)-এর মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খলিফা, যাঁর ভয়ে শয়তান রাস্তা পরিবর্তন করত, তিনিও নিজের হিসাব নিজের কাছে এত কঠিন করতেন যে, রাতের অন্ধকারে হুজাইফা (রা.)-এর কাছে গিয়ে কাঁদতেন আর জিজ্ঞেস করতেন, “রাসূল (সা.) কি মুনাফিকদের তালিকায় আমার নাম বলেছেন?”
আমাদের মতো চারজনের প্রশংসা শুনে তাঁরা অহংকারে ফুলে উঠতেন না।
উসমান (রা.)-এর লজ্জা ও হায়া এমন পর্যায়ের ছিল যে, স্বয়ং ফেরেশতারা পর্যন্ত তাঁকে দেখে লজ্জাবোধ করত।
এটি শুধু কোনো ঐতিহাসিক গালগল্প বা বর্ণনা নয়, এটি হলো ঈমানি চরিত্রের চূড়ান্ত উচ্চতা।
আলী (রা.) ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল সমুদ্র, কিন্তু তাঁর সেই অথৈ জ্ঞান তাঁকে ‘জ্ঞান-গর্বী’ করেনি; বরং তাঁকে করেছে আরও বেশি বিনম্র, মাটির কাছাকাছি।
এটাই ছিল সাহাবা-মানসিকতা। তাঁরা দ্বীনকে নিজের দক্ষতা দেখানোর, ক্যারিয়ার গড়ার বা মানুষের বাহবা কুড়ানোর মঞ্চ বানাননি। তাঁরা দ্বীনের বিশালত্বের সামনে নিজেদেরকে সবসময় ধূলিকণার মতো ছোট রেখেছেন। আর আজ আমরা কী করছি?
আমরা অত্যন্ত সুকৌশলে দ্বীনকে নিজের অবস্থান, পরিচিতি ও ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলছি। কেউ বক্তৃতার মঞ্চে অন্যকে হারিয়ে জিতে যেতে চায়, কেউ কমেন্ট বক্সের বিতর্কে, কেউ ইউটিউবের ভিউয়ে, কেউ বেস্টসেলার বইয়ের তালিকায়, কেউবা আকর্ষণীয় পোস্টে বা পত্রিকার শিরোনামে। কিন্তু আমরা ভুলে গেছি, আল্লাহর কাছে জেতার মানদণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে জেতা মানে অন্যকে হারানো নয়; সেখানে জেতা মানে নিজের ভেতরের পশুত্ব ও অহংকারের পরাজয় ঘটানো। সেখানে জেতা মানে মানুষ নয়, কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক রোগগুলোর আরেকটি হলো—স্পষ্ট হারামের ক্ষেত্রে ছোট ছোট ছাড় দেওয়া এবং তাকে স্বাভাবিকীকরণ করা। এই পতন হঠাৎ হয় না। শুরুতে বলা হয়, “আরে, এখন তো সবাই এমনটা করছে।” কিছুদিন পর বলা হয়, “এতে আসলে এত বেশি সমস্যা নেই, নিয়ত তো ভালো।” এরপর বলা হয়, “সময় বদলেছে, যুগ পাল্টেছে, ধর্মের ব্যাখ্যাও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে করতে হবে।” তারপর বলা হয়, “সবার জন্য তো আর একই কঠোরতা চলে না, দ্বীন অনেক সহজ।” এভাবেই ছাড় দিতে দিতে একসময় সমাজে হারাম আর হারাম থাকে না, সেটি কেবল ব্যক্তিগত রুচি বা পছন্দের বিষয়ে পরিণত হয়।
ঠিক এই বিন্দুতেই মানুষের আধ্যাত্মিক ধ্বংস নেমে আসে। কারণ, যখন অন্তর থেকে হারামের প্রতি ঘৃণা ও ভয় চিরতরে চলে যায়, তখন ঈমানের নীরব রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মানুষ আর গুনাহের পর কাঁপে না, তার আর অনুশোচনায় বুক ফাটে না, সে আর সিজদায় গিয়ে কাঁদে না। সে নিজের ভেতরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—নৈতিক অনুভূতিটাকেই নিজের হাতে গুম করে ফেলে।
ভয়ের বিষয় হলো, এই অবস্থা আজ শুধু সাধারণ বা পশ্চিমা প্রভাবিত মানুষের নয়; বরং তা দ্বীনি পরিমণ্ডলেও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদ্রাসা, মাহফিল, অনলাইন ইসলামি কনটেন্ট, আধুনিক দাওয়াহ প্ল্যাটফর্ম—সবকিছুর ভেতরেই আজ ইখলাসের চেয়ে ‘স্টাইল’ ও ‘প্যাকেজিং’ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথার ভঙ্গি অত্যন্ত চমৎকার, প্রেজেন্টেশন নিখুঁত, কিন্তু পূর্বসূরিদের সেই আদব ও রুহানিয়াতের জৌলুস আজ বিলীন।
বাইরে থেকে তাকালে মনে হয় সমাজে কত দ্বীনের চর্চা হচ্ছে, কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেতরের দিকে তাকালে দেখা যায়—সেখানে ব্যক্তিপূজা, উগ্র অন্ধানুকরণ, চরম হিংসা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ব্র্যান্ডিং, পরিচিতি-লালসা এবং যেকোনো মূল্যে “ফেমাস” হওয়ার এক গোপন ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। একজন মানুষ নিজের অজান্তেই শয়তানের যে মায়াজালে আটকা পড়ে, তা হলো: সে বুঝতেই পারে না যে, সে এখন আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করছে না; বরং সে অত্যন্ত সুকৌশলে সমাজে নিজের একটি ‘ইমেজ’ বা ‘মূর্তি’ নির্মাণ করছে। বাইরের একটি নিখুঁত সাদাকালো পোস্টারের মতো তার বাইরের রূপটি পরিপাটি, কিন্তু ভেতরের ক্যানভাসে ইখলাসের কোনো রং নেই।
এই প্রবণতা একজন প্রবীণ আলেমেরও হতে পারে, আধুনিক আলেমারও হতে পারে, কিংবা সাধারণ কোনো দ্বীনদার তরুণেরও হতে পারে। কেউ হয়তো উস্তাদ বা উস্তাযার বিশাল ছায়ায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দম্ভের সাথে এমনভাবে কথা বলে, যেন জান্নাতের চাবি এবং সত্যের শেষ সনদ কেবল তারই হাতে। কেউ ছাত্রদের সামনে এমন অহংকারী ভঙ্গি করে, যেন তার জ্ঞান অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত। কেউ ফিকহের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে চরম কঠোরতা প্রদর্শন করে, অথচ নিজের ব্যক্তিগত আচরণে সে অত্যন্ত রূঢ় ও শিষ্টাচারবর্জিত।
আবার কেউ নিজের নফসের ধোঁকায় পড়ে দ্বীনের নতুন নতুন ছাড়কে “দরকারি ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি” বা “মাকাসিদুশ শরিয়াহ” বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু অমোঘ সত্য হলো, যদি কোনো মানুষ তার নিজের অন্তরের অসুখগুলো দেখতে না পায়, তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত যতই আধুনিক বা জটিল হোক না কেন, তা সমাজে হেদায়াতের আলো আনার বদলে কেবল বিভ্রান্তির অন্ধকারই ডেকে আনবে।
কুরআন মাজিদ আমাদের বারবার সাবধান করেছে এই আত্মপ্রসাদ ও নিজেকে পবিত্র মনে করার ব্যাধি থেকে। সূরা আন-নাজমে আল্লাহ বলেন,
“فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ”
“সুতরাং তোমরা নিজেদেরকে পবিত্র বলে দাবি করো না; কে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান, তা আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।” (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩২)
এই আয়াতের গভীরতা অসীম। মানুষ যখন নিজেকে খুব ভালো, নেককার ও সঠিক ভাবতে শুরু করে, ঠিক তখন থেকেই তার পতনের মূল দরজাটি খুলে যায়। সে আর নিজের কোনো ভুল দেখতে পায় না, কারণ সে নিজের অবচেতন মনে নিজেকে ইতিমধ্যেই “বুঝদার”, “পরিপক্ব”, ও “সঠিক পন্থার একমাত্র ধারক” বলে ধরে নিয়েছে। কিন্তু ক্রমাগত আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো মানুষের দ্বীনদারি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। যে ব্যক্তি রাতের বেলা একাকী বসে নিজের নফসকে প্রতিদিন প্রশ্ন করে না, সে খুব দ্রুত নিজের মনগড়া ও আরোপিত পবিত্রতার মরীচিকায় ডুবে ধ্বংস হয়ে যায়।
গীবত, রিয়া, তাকাব্বুর, হিংসা—এই আত্মিক পাপগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এগুলো সাধারণত ঢোল পিটিয়ে বা সরাসরি ঘোষিতভাবে আসে না। এগুলো খুব নীরবে চায়ের মজলিসে বসে, ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে, দাওয়াহর আলোচনার ভেতরে, হিতাকাঙ্ক্ষী সাজার পরামর্শের ছলে, “উদাহরণ” দেওয়ার পর্দায়, কিংবা “সৎ সমালোচনা”র মুখোশ পরে আমাদের হৃদয়ে ঢুকে পড়ে।
এভাবে একজন মানুষ নিজের অজান্তেই প্রতিদিন বহুবার কবিরা গুনাহ করে ফেলে। সে ভাবে, সে তো দ্বীনের স্বার্থেই কথা বলছে; অথচ বাস্তবে সে দ্বীনের নূন্যতম আদব রক্ষা করছে না। সে ভাবে, সে তো উম্মাহকে সংশোধন করছে; অথচ তার ভাষার গভীরে লুকিয়ে আছে অন্যকে ছোট করার হীনমন্যতা, নিজের জ্ঞান জাহির করার প্রতিযোগিতা, বা ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ।
এই জায়গায় সাহাবায়ে কেরামের একটি সাধারণ ঘটনাও আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তাঁরা যখন বুঝতে পারতেন যে তাঁদের কোনো কাজে বা কথায় ভুল হয়েছে, তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে বিনয়াবনত হয়ে ফিরে যেতেন। তাঁরা তর্কে জড়াতেন না। কিন্তু আমরা? আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পারার পরও তা স্বীকার না করে হাজারটা দার্শনিক ব্যাখ্যা খুঁজি।
সাহাবারা আল্লাহর সামনে নিজেদের সর্বদা অপরাধী ও মুখাপেক্ষী ভাবতেন; আর আমরা আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে দ্বীনের পাহারাদার ও ব্যাখ্যাকারী ভাবতে শুরু করেছি। সাহাবারা নিজেদের পাহাড়সম আমলকেও কাল কিয়ামতের জন্য অল্প ও তুচ্ছ ভাবতেন; আর আমরা আমাদের যৎসামান্য আমল, দুই-চারটে স্ট্যাটাস বা দান-সদকাকে অনেক বড় কিছু ভেবে বসে আছি।
এটাই আমাদের এবং তাদের মাঝের আসমান-জমিন ব্যবধান। এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। যে উম্মাহর একমাত্র কাজ ছিল নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর দিকে ডাকা, সেই উম্মাহ আজ নিজের ইমেজ, দল বা প্রতিষ্ঠানকে আল্লাহর পথের মাঝখানে দাঁড় করাতে ব্যস্ত।
আমাদের যুগের আরেকটি বড় আধ্যাত্মিক সংকট হলো, আমরা ইসলামি জ্ঞানকে আমলের মাধ্যম বানানোর বদলে সস্তা “কনটেন্ট” বানিয়ে ফেলেছি। মানুষ এখন দ্বীন পড়ার আগে বুঝতে চায়—কোন কথা বললে মানুষ বেশি হাততালি দেবে, কোন ব্যাখ্যাটি নেটে বেশি ভাইরাল হবে, কোন মতামতটি মঞ্চের জন্য বেশি উপযোগী। সত্যের নীরব অনুসন্ধান কমে গেছে, আর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার হিসাব-নিকাশ বেড়ে গেছে।
এভাবে জ্ঞানকে হয়তো কাগজের পাতায়, ক্যামেরার লেন্সে, চমৎকার গ্রাফিক্সের ডিজাইনে বা ছোট ছোট আকর্ষণীয় উদ্ধৃতিতে সীমাবদ্ধ করা যায়; কিন্তু তা দিয়ে কখনো হৃদয়কে আলোকিত করা যায় না। অথচ, দ্বীন যদি মস্তিষ্কের গণ্ডি পেরিয়ে হৃদয়ে না নামে, তবে তা কেবল কিছু ‘তথ্য’ হয়েই থেকে যায়, তা কখনো ‘নূর’ হতে পারে না।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর যুগে যখন কুরআনের দশটি আয়াত অবতীর্ণ হতো, সাহাবারা কেবল সেগুলো তোতাপাখির মতো তিলাওয়াত করতেন না; তাঁরা সেই দশ আয়াত শিখতেন, বুঝতেন এবং নিজেদের বাস্তব জীবনে তা পুরোপুরি আমলে পরিণত করতেন। এর আগে তাঁরা পরবর্তী আয়াতে যেতেন না। এটিই ছিল তাঁদের জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি। আর আমাদের পদ্ধতি? গুগল থেকে দশটা সুন্দর কোটেশন কপি করে রাখা, চমৎকার ডিজাইন দিয়ে তিনটা পোস্ট বানানো, কমেন্ট বক্সে দুটো ঝগড়া করা, আর মনে করা—আমরা ইসলামের বিশাল সমুদ্র পার হয়ে গেছি!
কিন্তু না, ইসলাম বোঝা এত সস্তা নয়। কুরআন বুঝতে চাইলে সবার আগে নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে, নিজের নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। হাদিসের গভীরে যেতে চাইলে নফসের খোলস ভাঙতে হয়। তাফসির পড়তে চাইলে আগে নিজের ভেতরের আত্মপ্রবঞ্চনাগুলোকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে শনাক্ত করতে হয়।
আজ মাদ্রাসা, খানকা, দাওয়াহর মঞ্চ, দ্বীনি আড্ডা—সবখানেই যদি পশ্চিমা ভোগবাদের অদৃশ্য ছায়া ঢুকে পড়ে; যদি ফ্রিলোড সংস্কৃতি, ফ্রি মিক্সিং, সেলফি-সেলিব্রেশন, ফেম-সিকিং, আর যেকোনো মূল্যে নিজের বা নিজের দলের ব্র্যান্ড গড়ার নেশা ঢুকে পড়ে, তাহলে দ্বীনের নূর চিরতরে ম্লান হয়ে যায়। আর যখন নূর ম্লান হয়, তখন মানুষের আর ভুল চোখে পড়ে না। মানুষের মনে হয়, “পরিবেশ তো কত সুন্দর, কত দ্বীনি আড্ডা হচ্ছে, সব তো ঠিকই আছে।”
কিন্তু কেবল বাইরের পরিবেশ ঠিক থাকলেই তো হয় না, ভেতরকার হৃদয় ঠিক থাকতে হয়। মসজিদের দেয়াল বা মিনার যতই সুন্দর ও পবিত্র হোক না কেন, নামাজির অন্তর যদি দুনিয়ার মোহ আর অহংকারে নোংরা থাকে, তাহলে কোন দিক থেকে আল্লাহর সাহায্য আর নাজাত আসবে?
সুতরাং, এই ফেতনার যুগে আমাদের প্রধান এবং একমাত্র চিকিৎসা হলো—আবার সেই পুরোনো পথে ফিরে যাওয়া। আমাদের বিনয় শিখতে হবে, প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে নীরবে আমল করা শিখতে হবে। কথা বলা কমাতে হবে এবং নিজের কাজের হিসাববেশি বেশি নিতে হবে। সবার আগে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাটুকু নত মস্তকে মেনে নিতে হবে। অন্য একজন মানুষকে ছোট বা অপমান করে কখনো দ্বীনকে বড় করা যায় না; বরং আল্লাহর সামনে নিজের নফসকে ছোট করতে পারলেই দ্বীন বড় হয়।
মানুষের ভুল ধরতে ধরতে এবং মানুষকে বিচার করতে করতে আমরা আজ অনেক সময় আল্লাহর সামনে নিজেরই বিচারক হয়ে বসে আছি। অথচ, আমাদের মূল কাজ ছিল নিজেকে সংশোধন করা, অন্যদের নয়। কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে, সেই ফয়সালার দায়িত্ব আল্লাহ আমাদের দেননি।
ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি বা যে ব্যক্তি নিজের সংশোধনের বদলে সর্বদা অন্যের সমালোচনা আর ছিদ্রান্বেষণে সময় কাটায়, সে ধীরে ধীরে আল্লাহর নূর থেকে বঞ্চিত হয়। আর যে ব্যক্তি নিজের আমলের খবর রাখে, নিজের ভুল নিয়ে কাঁদে, সে দুনিয়ার চোখে যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, আল্লাহর কাছে সে অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী। কারণ, কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ দেখবেন না কাকে কত বেশি তথ্য বা জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল; আল্লাহ দেখবেন, সে সেই জ্ঞান দিয়ে কী করেছে।
প্রশ্ন এটি নয় যে, তুমি কতগুলো বই পড়েছ বা কতগুলো হাদিস মুখস্থ করেছ। মূল প্রশ্ন হলো—সেই জ্ঞান কি তোমাকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে? তুমি কি আগের চেয়ে নরম ও বিনয়ী হয়েছ? তুমি কি মানুষের দোষ দেখা থেকে নিজের চোখকে থামাতে শিখেছ? তুমি কি অন্যের গীবত শোনা থেকে কানকে ফিরিয়ে নিয়েছ? তুমি কি রিয়া বা লোক-দেখানো ইবাদত ছেড়ে ইখলাস অর্জন করেছ? তুমি কি আল্লাহর বিধানের সামনে বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের মাথা নত করতে পেরেছ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে আমাদের অর্জিত জ্ঞান আমাদের জন্য নাজাতের অসিলা নয়; বরং তা আমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে এক ভয়ংকর প্রমাণ এবং বিশাল দায়িত্বের বোঝা। আর দায়িত্ব মানেই হলো তার কঠিন হিসাব আছে।
তাই আমাদের ভয় করা উচিত। নিজেকে নেককার বা বড় ভাবা থেকে ভয় করা উচিত। নিজের দ্বীনি পরিচয়ের মোহ বা ফ্যানবেস দেখে মুগ্ধ হওয়া থেকে ভয় করা উচিত। দুনিয়ার মানুষের চোখে সম্মানিত হতে গিয়ে, লাইক-কমেন্ট পেতে গিয়ে, আসমানের মালিকের কাছে হালকা ও মূল্যহীন হয়ে যাওয়া থেকে প্রচণ্ড ভয় করা উচিত। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সফলতা কেবল তারই, যে আল্লাহর সামনে নিজের শূন্যতা ও কাঙালপনা বুঝতে পেরেছে এবং সেই শূন্যতা পূরণের জন্য সিজদায় পড়ে কাঁদতে পেরেছে।
“হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এমন জ্ঞান দান করুন, যা সবার আগে আমাদেরকে বিনয় শেখায়, তারপর ইখলাসের সাথে আমল শেখায়, এবং সর্বশেষে নিজের ভুলের জন্য তওবা করতে শেখায়। আপনি আমাদেরকে এমন একটি জীবন্ত হৃদয় দিন, যা নিজের সামান্যতম ভুল দেখলেও আল্লাহর ভয়ে কেঁপে ওঠে। আমাদেরকে এমন জিহ্বা দিন, যা মানুষের গীবত, সমালোচনা আর অহেতুক তর্ক থেকে চিরকাল বিরত থাকে। আমাদেরকে এমন অন্তর দিন, যা লোক দেখানো ইবাদত বা রিয়া থেকে মুক্ত থাকে। আর আমাদেরকে এমন দৃষ্টি দিন, যা হারাম থেকে তো বাঁচেই, অন্যের দোষ খোঁজা থেকেও নিজেকে গুটিয়ে রাখে।”
কারণ, যে ব্যক্তি নিজেকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করতে জানে, সেই-ই হলো সত্যিকারের দ্বীনি মানুষ। আর যে মানুষ নিজের ভেতরের এই ভয়াবহ রোগগুলো দেখতে পায় না, তার বাইরের দ্বীনদারি যতই মোহনীয়, নিখুঁত বা আকর্ষণীয় হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত অহংকার আর রিয়া’র মরিচার নিচে চিরতরে চাপা পড়ে যায়।
এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের রুঢ় বাস্তবতা। এটাই চরম ও কঠোর সত্য। আর একমাত্র এই সত্যের উপলব্ধি এবং আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণই আমাদের এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।
[দ্য শ্যাডো অব সেলফ-রাইটনেস]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group




