UMMA TOKEN INVESTOR

About me

"I am my own self — a journey full of flaws and imperfections. Yet I strive to let every shadow of my being be colored by the light of the Prophet (ﷺ)." — Saeed.

Followings
0
No followings
Translation is not possible.
মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর পতন সাধারণত পাহাড়ের চূড়া থেকে এক লাফে হয় না; এই পতন হয় ধাপে ধাপে, অতি সন্তর্পণে, খুবই নিঃশব্দে। এই পতন বাইরের কেউ দেখতে পায় না, এটি ঘটে মানুষের নিজের ভেতরে, নিজের বিবেকের সাথে তালি দিতে দিতে।
শয়তানের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো, সে মানুষকে হঠাৎ করে স্রষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয় না। বরং, প্রথমে মানুষ দ্বীনকে জানতে শুরু করে, তারপর দ্বীনের ভাষা আয়ত্ত করে, দ্বীনের ভারি ভারি শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করতে শেখে। আর ঠিক এই পর্যায়ে এসে, একসময় সে অবচেতনভাবেই ভাবতে শুরু করে—সে যেন দ্বীনের মালিক বা একচ্ছত্র আধিপত্যকারী হয়ে গেছে। তখন আর আল্লাহর বিধান তার কাছে আমানত বা ভারি দায়িত্ব মনে হয় না, বরং নিজের মনগড়া ব্যাখ্যাই তার কাছে সবচেয়ে হালকা, সহজ ও চূড়ান্ত বলে মনে হতে থাকে।
জ্ঞানের এই ধাপটিই হলো পতনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। কারণ, ইসলামি জ্ঞান যদি অন্তরে বিনয় নিয়ে আসতে না পারে, তবে তা হেদায়েতের আলোর বদলে অহংকারের বিধ্বংসী আগুনে পরিণত হয়। আর অহংকার যখন দ্বীনদারির শুভ্র পোশাক পরে মানুষের সামনে আসে, তখন তা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক আগুনে পরিণত হয়। ইবলিসের পতন কিন্তু জ্ঞানের অভাবে হয়নি, তার পতন হয়েছিল এই অহংকারের কারণেই। সে ভেবেছিল, সে জেনে গেছে, সে শ্রেষ্ঠ হয়ে গেছে।
আজকের সময়ের সবচেয়ে বিষাক্ত ও সংক্রামক রোগগুলোর একটি হলো—মানুষ দ্বীন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানে, কিন্তু তার বাস্তব প্রতিফলন জীবনে নেই। সূরা আস-সফে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন,
​​​“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ ● كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ”
“হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা নিজেরা করো না? আল্লাহর কাছে এটা অত্যন্ত ঘৃণ্য বিষয় যে, তোমরা যা করো না তা বলবে”। (সূরা আস-সফ, আয়াত: ২-৩)
অথচ আজ একটু জানলেই আমরা ভাবতে শুরু করি, এখন আমরা সব বুঝে গেছি। আমাদের চেয়ে বেশি আর কে বোঝে! সত্য হলো, একজন মুমিনের জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় বাড়ার কথা, নিজের অক্ষমতা ও দুর্বলতার বোধ প্রকট হওয়ার কথা। আল্লাহর বিশালত্বের সামনে নিজেকে ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র মনে হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী করছি?
কুরআন-হাদিসের টুকটাক পরিভাষা জেনে আমরা থেমে যাচ্ছি এবং বিচারকের আসনে বসে পড়ছি। নিজের চোখের সামনে যখন গীবত, রিয়া, তাকাব্বুর, হাসাদ, ব্যাখ্যার বাড়াবাড়ি এবং ফতোয়ার দাপট—সবকিছু একসাথে চলতে থাকে, তখনও আমরা মনে মনে নিজেদেরকে বুদ্ধিমান ও সঠিক পথের পথিক ভাবতে থাকি। এই আত্মপ্রসাদের চেয়ে বিপজ্জনক আর কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাধি নেই।
কুরআনের ভাষা যেমন পরম মমতাময়ী, তেমনি প্রয়োজনে তা অত্যন্ত কঠোর ও ন্যায়সঙ্গত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইহুদি পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য করে একটি চিরন্তন কথা বলেছেন, যা আজকের যুগে আমাদের প্রতিটি দ্বীনদারের বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হওয়া উচিত:
​“أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ”
“তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন করো। তোমরা কি বোঝো না”? (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৪৪)
এই আয়াতটি কেবল অতীতের কোনো সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের আয়না। কারণ, মানবচরিত্র এমন এক আশ্চর্য প্রহেলিকা, যে অন্যকে নসিহত করার সময় বা অন্যের ভুল ধরার সময় খুবই দৃঢ় ও আপসহীন, কিন্তু নিজের নফসকে দমন করার সময় খুবই দুর্বল ও আপসকামী।
অন্যের ছোট একটি গুনাহ দেখলে সে জ্বলন্ত আগুন হয়ে ওঠে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে; কিন্তু নিজের পাহাড়সম গুনাহ দেখলে তাতে সংস্কারের বদলে হাজারটা মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি খুঁজে নেয়। নিজের দোষকে সে সুন্দর করে নাম দেয় “পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি” বা “মানবিক দুর্বলতা”, আর অন্যের দোষকে আখ্যা দেয় “চরিত্রহীনতা” বা “মুনাফিকি” বলে। অথচ, হাশরের মাঠে আল্লাহর কাছে উভয়ের হিসাবই কড়ায়-গণ্ডায় নেওয়া হবে। সেখানে কোনো শব্দের চাতুর্য কাজে আসবে না।
গীবতের ক্ষেত্রেই আমাদের দৈনন্দিন আচরণটি একবার লক্ষ্য করুন। মুখে মুখে আমরা সবাই অত্যন্ত সুন্দর করে বলি—গীবত হারাম, গীবত জাহান্নামের রাস্তা, গীবত নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজ। কিন্তু তারপর? হঠাৎ করেই যখন আমরা কোনো চায়ের মজলিসে বসি, ফোনে বন্ধুদের সাথে কথা বলি, বা নিজের লেখায় অত্যন্ত সুকৌশলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম না নিয়ে এমনভাবে ইঙ্গিত করি যা সবাই বুঝতে পারে—তখন আমাদের মনে হয় এইটুকু করা সব মাফ!
মানুষ চিরকালই নিজের পাপকে নতুন নাম দিয়ে বৈধতা দিতে ভালোবাসে। স্পষ্ট হারাম কাজকে সে “প্রসঙ্গ”, “বিশ্লেষণ”, “সমালোচনা”, “সোচ্চারতা”, “উম্মাহর স্বার্থে দায়বদ্ধতা” বা “সতর্কীকরণ”—এইসব ভারী ভারী শব্দের মোড়কে ঢেকে দেয়। কিন্তু শব্দের মোড়ক যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, গুনাহের বাস্তবতা আল্লাহর কাছে একটুও বদলায় না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) গীবতের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। সাহাবীগণ যখন তাঁকে গীবত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি বললেন:
“ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ”
“তোমার ভাই যা অপছন্দ করে, (তার অনুপস্থিতিতে) সে বিষয়ে আলোচনা করাই হলো গীবত।”
সাহাবীগণ পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যই বিদ্যমান থাকে?”
রাসূল (সা.) উত্তরে বললেন:
“إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ”
“তুমি যা বলছো তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তাকে অপবাদ দিলে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯৩৪)
ঠিক এই জায়গাতেই শয়তান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। সে বর্তমান যুগের দ্বীনদার মানুষকে সরাসরি বলে না, “যাও, তুমি হারাম কাজ করো বা মদ খাও।” বরং সে ডান দিক থেকে এসে ধোঁকা দেয়। সে বলে, “তুমি তো খারাপ কিছু করছ না, তুমি তো হকের পক্ষে কথা বলছ।” “তুমি তো নাম ধরে বলোনি, তুমি তো শুধু ইঙ্গিত করেছ।” “তুমি তো উম্মাহকে সতর্ক করার জন্য নসিহত করছ।”
শয়তানের এই সামান্য শব্দগত ও মনস্তাত্ত্বিক ছলনা মানুষের বিবেককে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে সে নিজের দোষগুলো আরেকজনের দোষের বিশালত্ব দিয়ে ঢাকতে শেখে। আর এভাবেই পবিত্র ধর্ম এমন এক নির্মম বিচারালয়ে পরিণত হয়, যেখানে সবাই কেবল বিচারক, কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর মতো কোনো অভিযুক্ত নেই!
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, আজ এই মারাত্মক রোগগুলো কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দ্বীনি পরিবেশেও তা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আজ কেউ হয়তো আলেমের সন্তান, কেউ নামকরা আলেমা, কেউ জনপ্রিয় দায়ী, কেউ বেস্টসেলার লেখক, কেউ বা সোশ্যাল মিডিয়ার তুখোড় বক্তা—কিন্তু দিনের শেষে নিজের অন্তরের গভীর অন্ধকারে টর্চলাইট ফেলে তাকানোর মতো সময় বা অভ্যাস কারও নেই।
আজ আমরা নিজের ইলম বা জ্ঞানকে ‘আমানত’ না ভেবে ‘পরিচয়’ বা ‘ব্র্যান্ড’ ভাবছি। নিজের সামান্য পড়াশোনাকে অন্যদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর ‘মর্যাদার সনদ’ বানিয়ে নিচ্ছি। আরবি বা ইসলামি ফিকহের কিছু জটিল শব্দ আয়ত্ত করলেই একজন তরুণ মনে করছে, সে এখন উম্মাহর কাণ্ডারি হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—দ্বীন ‘বোঝা’ আর দ্বীন ‘বহন করা’ এক কথা নয়। মস্তিষ্ক দিয়ে বোঝা খুব সহজ, কিন্তু হৃদয় ও কাঁধ দিয়ে তা বহন করা পাহাড়সম কঠিন। মুখস্থ করা সহজ, কিন্তু নিজের অহংকারী নফসকে চূর্ণবিচূর্ণ করা কঠিন। সাবলীল ভাষায় কথা বলা আয়ত্ত করা সহজ, কিন্তু সেই কথার মানদণ্ডে নিজের জীবনকে বিচার করে মানার দায়িত্ব বহন করা অত্যন্ত কঠিন।
এখানে একজন মানুষ খুব সহজেই আত্মপ্রবঞ্চনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। সে প্রতিনিয়ত ভাবে, “আমি তো কুরআন-হাদিস বলছি, আমি তো হকের পথে আছি।” কিন্তু কুরআন-হাদিস ‘বলা’ আর কুরআন-হাদিসে ‘চলা’ সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন জগৎ।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) অত্যন্ত চমৎকার একটি কথা বলেছেন, ​“প্রকৃত জ্ঞান তা-ই যা (আমলের মাধ্যমে) উপকার দেয়, কেবল যা মুখস্থ করা হয় তা প্রকৃত জ্ঞান নয়। আর যে জ্ঞান অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে না, তা শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
কারণ, আল্লাহর ভয় ছাড়া অর্জিত জ্ঞান কেবল অহংকারের খাদ্য জোগায়। আর জ্ঞানী সেজে থাকা মানুষ একজন মূর্খের চেয়েও সমাজের জন্য বেশি ভয়ংকর, কারণ সে নিজের অন্তরের অন্ধত্বকে সুন্দর বিদ্যার শুভ্র পোশাকে ঢেকে রাখে, যা সাধারণ মানুষ ধরতে পারে না।
সাহাবায়ে কেরামের জীবন আর আমাদের বর্তমান জীবনের মধ্যে যদি আমরা তুলনা করি, তবে সেখানে আকাশ-পাতাল এক বিশাল শূন্যতা দেখতে পাব। তাঁরা জানতেন, তাই তাঁরা আল্লাহর ভয়ে কাঁপতেন। আর আমরা জানি, তাই আমরা মানুষের সামনে জাহির করি।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হকের সামনে এতটা নত ছিলেন যে, পুরো উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার পরও তিনি নিজেকে বড় ভাবার অবকাশ পাননি। নিজের জিহ্বা ধরে তিনি কাঁদতেন আর বলতেন, “এই জিহ্বাই আমাকে ধ্বংস করবে।”
উমর (রা.)-এর মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খলিফা, যাঁর ভয়ে শয়তান রাস্তা পরিবর্তন করত, তিনিও নিজের হিসাব নিজের কাছে এত কঠিন করতেন যে, রাতের অন্ধকারে হুজাইফা (রা.)-এর কাছে গিয়ে কাঁদতেন আর জিজ্ঞেস করতেন, “রাসূল (সা.) কি মুনাফিকদের তালিকায় আমার নাম বলেছেন?”
আমাদের মতো চারজনের প্রশংসা শুনে তাঁরা অহংকারে ফুলে উঠতেন না।
উসমান (রা.)-এর লজ্জা ও হায়া এমন পর্যায়ের ছিল যে, স্বয়ং ফেরেশতারা পর্যন্ত তাঁকে দেখে লজ্জাবোধ করত।
এটি শুধু কোনো ঐতিহাসিক গালগল্প বা বর্ণনা নয়, এটি হলো ঈমানি চরিত্রের চূড়ান্ত উচ্চতা।
আলী (রা.) ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল সমুদ্র, কিন্তু তাঁর সেই অথৈ জ্ঞান তাঁকে ‘জ্ঞান-গর্বী’ করেনি; বরং তাঁকে করেছে আরও বেশি বিনম্র, মাটির কাছাকাছি।
এটাই ছিল সাহাবা-মানসিকতা। তাঁরা দ্বীনকে নিজের দক্ষতা দেখানোর, ক্যারিয়ার গড়ার বা মানুষের বাহবা কুড়ানোর মঞ্চ বানাননি। তাঁরা দ্বীনের বিশালত্বের সামনে নিজেদেরকে সবসময় ধূলিকণার মতো ছোট রেখেছেন। আর আজ আমরা কী করছি?
আমরা অত্যন্ত সুকৌশলে দ্বীনকে নিজের অবস্থান, পরিচিতি ও ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলছি। কেউ বক্তৃতার মঞ্চে অন্যকে হারিয়ে জিতে যেতে চায়, কেউ কমেন্ট বক্সের বিতর্কে, কেউ ইউটিউবের ভিউয়ে, কেউ বেস্টসেলার বইয়ের তালিকায়, কেউবা আকর্ষণীয় পোস্টে বা পত্রিকার শিরোনামে। কিন্তু আমরা ভুলে গেছি, আল্লাহর কাছে জেতার মানদণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে জেতা মানে অন্যকে হারানো নয়; সেখানে জেতা মানে নিজের ভেতরের পশুত্ব ও অহংকারের পরাজয় ঘটানো। সেখানে জেতা মানে মানুষ নয়, কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক রোগগুলোর আরেকটি হলো—স্পষ্ট হারামের ক্ষেত্রে ছোট ছোট ছাড় দেওয়া এবং তাকে স্বাভাবিকীকরণ করা। এই পতন হঠাৎ হয় না। শুরুতে বলা হয়, “আরে, এখন তো সবাই এমনটা করছে।” কিছুদিন পর বলা হয়, “এতে আসলে এত বেশি সমস্যা নেই, নিয়ত তো ভালো।” এরপর বলা হয়, “সময় বদলেছে, যুগ পাল্টেছে, ধর্মের ব্যাখ্যাও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে করতে হবে।” তারপর বলা হয়, “সবার জন্য তো আর একই কঠোরতা চলে না, দ্বীন অনেক সহজ।” এভাবেই ছাড় দিতে দিতে একসময় সমাজে হারাম আর হারাম থাকে না, সেটি কেবল ব্যক্তিগত রুচি বা পছন্দের বিষয়ে পরিণত হয়।
ঠিক এই বিন্দুতেই মানুষের আধ্যাত্মিক ধ্বংস নেমে আসে। কারণ, যখন অন্তর থেকে হারামের প্রতি ঘৃণা ও ভয় চিরতরে চলে যায়, তখন ঈমানের নীরব রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মানুষ আর গুনাহের পর কাঁপে না, তার আর অনুশোচনায় বুক ফাটে না, সে আর সিজদায় গিয়ে কাঁদে না। সে নিজের ভেতরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—নৈতিক অনুভূতিটাকেই নিজের হাতে গুম করে ফেলে।
ভয়ের বিষয় হলো, এই অবস্থা আজ শুধু সাধারণ বা পশ্চিমা প্রভাবিত মানুষের নয়; বরং তা দ্বীনি পরিমণ্ডলেও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদ্রাসা, মাহফিল, অনলাইন ইসলামি কনটেন্ট, আধুনিক দাওয়াহ প্ল্যাটফর্ম—সবকিছুর ভেতরেই আজ ইখলাসের চেয়ে ‘স্টাইল’ ও ‘প্যাকেজিং’ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথার ভঙ্গি অত্যন্ত চমৎকার, প্রেজেন্টেশন নিখুঁত, কিন্তু পূর্বসূরিদের সেই আদব ও রুহানিয়াতের জৌলুস আজ বিলীন।
বাইরে থেকে তাকালে মনে হয় সমাজে কত দ্বীনের চর্চা হচ্ছে, কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেতরের দিকে তাকালে দেখা যায়—সেখানে ব্যক্তিপূজা, উগ্র অন্ধানুকরণ, চরম হিংসা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ব্র্যান্ডিং, পরিচিতি-লালসা এবং যেকোনো মূল্যে “ফেমাস” হওয়ার এক গোপন ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। একজন মানুষ নিজের অজান্তেই শয়তানের যে মায়াজালে আটকা পড়ে, তা হলো: সে বুঝতেই পারে না যে, সে এখন আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করছে না; বরং সে অত্যন্ত সুকৌশলে সমাজে নিজের একটি ‘ইমেজ’ বা ‘মূর্তি’ নির্মাণ করছে। বাইরের একটি নিখুঁত সাদাকালো পোস্টারের মতো তার বাইরের রূপটি পরিপাটি, কিন্তু ভেতরের ক্যানভাসে ইখলাসের কোনো রং নেই।
এই প্রবণতা একজন প্রবীণ আলেমেরও হতে পারে, আধুনিক আলেমারও হতে পারে, কিংবা সাধারণ কোনো দ্বীনদার তরুণেরও হতে পারে। কেউ হয়তো উস্তাদ বা উস্তাযার বিশাল ছায়ায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দম্ভের সাথে এমনভাবে কথা বলে, যেন জান্নাতের চাবি এবং সত্যের শেষ সনদ কেবল তারই হাতে। কেউ ছাত্রদের সামনে এমন অহংকারী ভঙ্গি করে, যেন তার জ্ঞান অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত। কেউ ফিকহের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে চরম কঠোরতা প্রদর্শন করে, অথচ নিজের ব্যক্তিগত আচরণে সে অত্যন্ত রূঢ় ও শিষ্টাচারবর্জিত।
আবার কেউ নিজের নফসের ধোঁকায় পড়ে দ্বীনের নতুন নতুন ছাড়কে “দরকারি ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি” বা “মাকাসিদুশ শরিয়াহ” বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু অমোঘ সত্য হলো, যদি কোনো মানুষ তার নিজের অন্তরের অসুখগুলো দেখতে না পায়, তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত যতই আধুনিক বা জটিল হোক না কেন, তা সমাজে হেদায়াতের আলো আনার বদলে কেবল বিভ্রান্তির অন্ধকারই ডেকে আনবে।
কুরআন মাজিদ আমাদের বারবার সাবধান করেছে এই আত্মপ্রসাদ ও নিজেকে পবিত্র মনে করার ব্যাধি থেকে। সূরা আন-নাজমে আল্লাহ বলেন,
“فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ”
​“সুতরাং তোমরা নিজেদেরকে পবিত্র বলে দাবি করো না; কে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান, তা আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।” (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩২)
এই আয়াতের গভীরতা অসীম। মানুষ যখন নিজেকে খুব ভালো, নেককার ও সঠিক ভাবতে শুরু করে, ঠিক তখন থেকেই তার পতনের মূল দরজাটি খুলে যায়। সে আর নিজের কোনো ভুল দেখতে পায় না, কারণ সে নিজের অবচেতন মনে নিজেকে ইতিমধ্যেই “বুঝদার”, “পরিপক্ব”, ও “সঠিক পন্থার একমাত্র ধারক” বলে ধরে নিয়েছে। কিন্তু ক্রমাগত আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো মানুষের দ্বীনদারি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। যে ব্যক্তি রাতের বেলা একাকী বসে নিজের নফসকে প্রতিদিন প্রশ্ন করে না, সে খুব দ্রুত নিজের মনগড়া ও আরোপিত পবিত্রতার মরীচিকায় ডুবে ধ্বংস হয়ে যায়।
গীবত, রিয়া, তাকাব্বুর, হিংসা—এই আত্মিক পাপগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এগুলো সাধারণত ঢোল পিটিয়ে বা সরাসরি ঘোষিতভাবে আসে না। এগুলো খুব নীরবে চায়ের মজলিসে বসে, ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে, দাওয়াহর আলোচনার ভেতরে, হিতাকাঙ্ক্ষী সাজার পরামর্শের ছলে, “উদাহরণ” দেওয়ার পর্দায়, কিংবা “সৎ সমালোচনা”র মুখোশ পরে আমাদের হৃদয়ে ঢুকে পড়ে।
এভাবে একজন মানুষ নিজের অজান্তেই প্রতিদিন বহুবার কবিরা গুনাহ করে ফেলে। সে ভাবে, সে তো দ্বীনের স্বার্থেই কথা বলছে; অথচ বাস্তবে সে দ্বীনের নূন্যতম আদব রক্ষা করছে না। সে ভাবে, সে তো উম্মাহকে সংশোধন করছে; অথচ তার ভাষার গভীরে লুকিয়ে আছে অন্যকে ছোট করার হীনমন্যতা, নিজের জ্ঞান জাহির করার প্রতিযোগিতা, বা ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ।
এই জায়গায় সাহাবায়ে কেরামের একটি সাধারণ ঘটনাও আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তাঁরা যখন বুঝতে পারতেন যে তাঁদের কোনো কাজে বা কথায় ভুল হয়েছে, তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে বিনয়াবনত হয়ে ফিরে যেতেন। তাঁরা তর্কে জড়াতেন না। কিন্তু আমরা? আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পারার পরও তা স্বীকার না করে হাজারটা দার্শনিক ব্যাখ্যা খুঁজি।
সাহাবারা আল্লাহর সামনে নিজেদের সর্বদা অপরাধী ও মুখাপেক্ষী ভাবতেন; আর আমরা আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে দ্বীনের পাহারাদার ও ব্যাখ্যাকারী ভাবতে শুরু করেছি। সাহাবারা নিজেদের পাহাড়সম আমলকেও কাল কিয়ামতের জন্য অল্প ও তুচ্ছ ভাবতেন; আর আমরা আমাদের যৎসামান্য আমল, দুই-চারটে স্ট্যাটাস বা দান-সদকাকে অনেক বড় কিছু ভেবে বসে আছি।
এটাই আমাদের এবং তাদের মাঝের আসমান-জমিন ব্যবধান। এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। যে উম্মাহর একমাত্র কাজ ছিল নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর দিকে ডাকা, সেই উম্মাহ আজ নিজের ইমেজ, দল বা প্রতিষ্ঠানকে আল্লাহর পথের মাঝখানে দাঁড় করাতে ব্যস্ত।
আমাদের যুগের আরেকটি বড় আধ্যাত্মিক সংকট হলো, আমরা ইসলামি জ্ঞানকে আমলের মাধ্যম বানানোর বদলে সস্তা “কনটেন্ট” বানিয়ে ফেলেছি। মানুষ এখন দ্বীন পড়ার আগে বুঝতে চায়—কোন কথা বললে মানুষ বেশি হাততালি দেবে, কোন ব্যাখ্যাটি নেটে বেশি ভাইরাল হবে, কোন মতামতটি মঞ্চের জন্য বেশি উপযোগী। সত্যের নীরব অনুসন্ধান কমে গেছে, আর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার হিসাব-নিকাশ বেড়ে গেছে।
এভাবে জ্ঞানকে হয়তো কাগজের পাতায়, ক্যামেরার লেন্সে, চমৎকার গ্রাফিক্সের ডিজাইনে বা ছোট ছোট আকর্ষণীয় উদ্ধৃতিতে সীমাবদ্ধ করা যায়; কিন্তু তা দিয়ে কখনো হৃদয়কে আলোকিত করা যায় না। অথচ, দ্বীন যদি মস্তিষ্কের গণ্ডি পেরিয়ে হৃদয়ে না নামে, তবে তা কেবল কিছু ‘তথ্য’ হয়েই থেকে যায়, তা কখনো ‘নূর’ হতে পারে না।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর যুগে যখন কুরআনের দশটি আয়াত অবতীর্ণ হতো, সাহাবারা কেবল সেগুলো তোতাপাখির মতো তিলাওয়াত করতেন না; তাঁরা সেই দশ আয়াত শিখতেন, বুঝতেন এবং নিজেদের বাস্তব জীবনে তা পুরোপুরি আমলে পরিণত করতেন। এর আগে তাঁরা পরবর্তী আয়াতে যেতেন না। এটিই ছিল তাঁদের জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি। আর আমাদের পদ্ধতি? গুগল থেকে দশটা সুন্দর কোটেশন কপি করে রাখা, চমৎকার ডিজাইন দিয়ে তিনটা পোস্ট বানানো, কমেন্ট বক্সে দুটো ঝগড়া করা, আর মনে করা—আমরা ইসলামের বিশাল সমুদ্র পার হয়ে গেছি!
কিন্তু না, ইসলাম বোঝা এত সস্তা নয়। কুরআন বুঝতে চাইলে সবার আগে নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে, নিজের নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। হাদিসের গভীরে যেতে চাইলে নফসের খোলস ভাঙতে হয়। তাফসির পড়তে চাইলে আগে নিজের ভেতরের আত্মপ্রবঞ্চনাগুলোকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে শনাক্ত করতে হয়।
আজ মাদ্রাসা, খানকা, দাওয়াহর মঞ্চ, দ্বীনি আড্ডা—সবখানেই যদি পশ্চিমা ভোগবাদের অদৃশ্য ছায়া ঢুকে পড়ে; যদি ফ্রিলোড সংস্কৃতি, ফ্রি মিক্সিং, সেলফি-সেলিব্রেশন, ফেম-সিকিং, আর যেকোনো মূল্যে নিজের বা নিজের দলের ব্র্যান্ড গড়ার নেশা ঢুকে পড়ে, তাহলে দ্বীনের নূর চিরতরে ম্লান হয়ে যায়। আর যখন নূর ম্লান হয়, তখন মানুষের আর ভুল চোখে পড়ে না। মানুষের মনে হয়, “পরিবেশ তো কত সুন্দর, কত দ্বীনি আড্ডা হচ্ছে, সব তো ঠিকই আছে।”
কিন্তু কেবল বাইরের পরিবেশ ঠিক থাকলেই তো হয় না, ভেতরকার হৃদয় ঠিক থাকতে হয়। মসজিদের দেয়াল বা মিনার যতই সুন্দর ও পবিত্র হোক না কেন, নামাজির অন্তর যদি দুনিয়ার মোহ আর অহংকারে নোংরা থাকে, তাহলে কোন দিক থেকে আল্লাহর সাহায্য আর নাজাত আসবে?
সুতরাং, এই ফেতনার যুগে আমাদের প্রধান এবং একমাত্র চিকিৎসা হলো—আবার সেই পুরোনো পথে ফিরে যাওয়া। আমাদের বিনয় শিখতে হবে, প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে নীরবে আমল করা শিখতে হবে। কথা বলা কমাতে হবে এবং নিজের কাজের হিসাববেশি বেশি নিতে হবে। সবার আগে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাটুকু নত মস্তকে মেনে নিতে হবে। অন্য একজন মানুষকে ছোট বা অপমান করে কখনো দ্বীনকে বড় করা যায় না; বরং আল্লাহর সামনে নিজের নফসকে ছোট করতে পারলেই দ্বীন বড় হয়।
মানুষের ভুল ধরতে ধরতে এবং মানুষকে বিচার করতে করতে আমরা আজ অনেক সময় আল্লাহর সামনে নিজেরই বিচারক হয়ে বসে আছি। অথচ, আমাদের মূল কাজ ছিল নিজেকে সংশোধন করা, অন্যদের নয়। কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে, সেই ফয়সালার দায়িত্ব আল্লাহ আমাদের দেননি।
ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি বা যে ব্যক্তি নিজের সংশোধনের বদলে সর্বদা অন্যের সমালোচনা আর ছিদ্রান্বেষণে সময় কাটায়, সে ধীরে ধীরে আল্লাহর নূর থেকে বঞ্চিত হয়। আর যে ব্যক্তি নিজের আমলের খবর রাখে, নিজের ভুল নিয়ে কাঁদে, সে দুনিয়ার চোখে যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, আল্লাহর কাছে সে অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী। কারণ, কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ দেখবেন না কাকে কত বেশি তথ্য বা জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল; আল্লাহ দেখবেন, সে সেই জ্ঞান দিয়ে কী করেছে।
প্রশ্ন এটি নয় যে, তুমি কতগুলো বই পড়েছ বা কতগুলো হাদিস মুখস্থ করেছ। মূল প্রশ্ন হলো—সেই জ্ঞান কি তোমাকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে? তুমি কি আগের চেয়ে নরম ও বিনয়ী হয়েছ? তুমি কি মানুষের দোষ দেখা থেকে নিজের চোখকে থামাতে শিখেছ? তুমি কি অন্যের গীবত শোনা থেকে কানকে ফিরিয়ে নিয়েছ? তুমি কি রিয়া বা লোক-দেখানো ইবাদত ছেড়ে ইখলাস অর্জন করেছ? তুমি কি আল্লাহর বিধানের সামনে বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের মাথা নত করতে পেরেছ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে আমাদের অর্জিত জ্ঞান আমাদের জন্য নাজাতের অসিলা নয়; বরং তা আমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে এক ভয়ংকর প্রমাণ এবং বিশাল দায়িত্বের বোঝা। আর দায়িত্ব মানেই হলো তার কঠিন হিসাব আছে।
তাই আমাদের ভয় করা উচিত। নিজেকে নেককার বা বড় ভাবা থেকে ভয় করা উচিত। নিজের দ্বীনি পরিচয়ের মোহ বা ফ্যানবেস দেখে মুগ্ধ হওয়া থেকে ভয় করা উচিত। দুনিয়ার মানুষের চোখে সম্মানিত হতে গিয়ে, লাইক-কমেন্ট পেতে গিয়ে, আসমানের মালিকের কাছে হালকা ও মূল্যহীন হয়ে যাওয়া থেকে প্রচণ্ড ভয় করা উচিত। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সফলতা কেবল তারই, যে আল্লাহর সামনে নিজের শূন্যতা ও কাঙালপনা বুঝতে পেরেছে এবং সেই শূন্যতা পূরণের জন্য সিজদায় পড়ে কাঁদতে পেরেছে।
“হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এমন জ্ঞান দান করুন, যা সবার আগে আমাদেরকে বিনয় শেখায়, তারপর ইখলাসের সাথে আমল শেখায়, এবং সর্বশেষে নিজের ভুলের জন্য তওবা করতে শেখায়। আপনি আমাদেরকে এমন একটি জীবন্ত হৃদয় দিন, যা নিজের সামান্যতম ভুল দেখলেও আল্লাহর ভয়ে কেঁপে ওঠে। আমাদেরকে এমন জিহ্বা দিন, যা মানুষের গীবত, সমালোচনা আর অহেতুক তর্ক থেকে চিরকাল বিরত থাকে। আমাদেরকে এমন অন্তর দিন, যা লোক দেখানো ইবাদত বা রিয়া থেকে মুক্ত থাকে। আর আমাদেরকে এমন দৃষ্টি দিন, যা হারাম থেকে তো বাঁচেই, অন্যের দোষ খোঁজা থেকেও নিজেকে গুটিয়ে রাখে।”
কারণ, যে ব্যক্তি নিজেকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করতে জানে, সেই-ই হলো সত্যিকারের দ্বীনি মানুষ। আর যে মানুষ নিজের ভেতরের এই ভয়াবহ রোগগুলো দেখতে পায় না, তার বাইরের দ্বীনদারি যতই মোহনীয়, নিখুঁত বা আকর্ষণীয় হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত অহংকার আর রিয়া’র মরিচার নিচে চিরতরে চাপা পড়ে যায়।
এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের রুঢ় বাস্তবতা। এটাই চরম ও কঠোর সত্য। আর একমাত্র এই সত্যের উপলব্ধি এবং আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণই আমাদের এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।
[দ্য শ্যাডো অব সেলফ-রাইটনেস]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
একটা সময় আসবে, যখন মানুষ হারামকে আর হারাম বলে মনে করবে না। তারা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এবং বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য পাপের নতুন নতুন গালভরা নাম আবিষ্কার করবে। হারাম সম্পর্ক, পর্দার লঙ্ঘন কিংবা দৃষ্টির অবাধ স্বাধীনতাকে তারা আধুনিকতার ‘প্রসেস’, ‘ট্রেন্ড’ কিংবা বয়সের একটি স্বাভাবিক ‘ফেজ’ বা ধাপ বলে চালিয়ে দেবে। তওবা বা অনুশোচনার মতো ঐশী ও জীবনমুখী বিষয়গুলোকে তারা আর জরুরি মনে করবে না। কারণ, শয়তান তাদের মনের গভীরে এই আত্মঘাতী বিশ্বাসটি অত্যন্ত সুকৌশলে বদ্ধমূল করে দেবে যে, জীবনের কোনো এক মোড়ে গিয়ে—বিশেষ করে বয়স বাড়লে বা বিয়ে করলে—সবকিছু জাদুর মতো এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।
এই চিন্তাটাই হলো আজকের প্রজন্মের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ভয়াবহ আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষ যখন পাপ করতে করতে পাপের অনুভূতিটাই হারিয়ে ফেলে, তখন তার হৃদয় এমন এক অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ সে আর সহজে খুঁজে পায় না। পাপকে মনস্তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রাখার এই প্রবণতা মানুষের ভেতরের ঐশী বিবেক বা ‘ফিতরাত’কে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়।
আজকের দিনে একজন যুবক বা যুবতী যখন নিজের দৃষ্টিকে অবাধে ছেড়ে দেয়, যখন তার চোখে পর্দাহীনতা, নগ্নতা বা অশ্লীলতা একদম স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়, যখন তার হাত সীমালঙ্ঘনের দুঃসাহস পায় এবং যখন তার লজ্জাস্থান আল্লাহর নির্ধারিত পবিত্র সীমার বাইরে গিয়ে হারাম উপায়ে তৃপ্তি খুঁজতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে—আর তারপর সে নিজের নফসকে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, “বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে”—তখন সে কেবল একটি মারাত্মক ভুল ধারণাই পোষণ করছে না, বরং সে পবিত্র কুরআনের মৌলিক নির্দেশনা ও মানবচরিত্রের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বকেই এক প্রকার অস্বীকার করছে।
এই ধারণাটি একটি মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। শয়তানের অন্যতম বড় একটি ধোঁকা হলো, সে মানুষকে ভবিষ্যতের কোনো একটি হালাল কাজের আশা দেখিয়ে বর্তমানের হারাম কাজকে চালিয়ে যাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দেয়। সে বোঝায়, “এখন তো যৌবন, একটু উপভোগ করে নাও, বিয়ের পর তো তুমি সৎ হয়েই যাবে।” অথচ বাস্তবতা হলো, যে ব্যক্তি দিনের পর দিন হারামে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, হালাল তার কাছে একটা সময় অত্যন্ত পানসে ও আকর্ষণহীন মনে হতে শুরু করে। এর ফলে তার দাম্পত্য জীবনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়, যা সে বিয়ের আগে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি।
কুরআনুল কারীমের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
​"قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ"
“মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে; এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।”
এই আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে দৃষ্টি অবনত রাখা বা সংযত রাখার (গাদদুল বাসার) অর্থ শুধু সাময়িকভাবে চোখ নামিয়ে নেওয়া নয়; বরং এটি হলো এমন সব কিছু থেকে নিজের দৃষ্টি ও মনকে সরিয়ে নেওয়া, যা নফসকে বা প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করে এবং যা মানুষকে হারামের দিকে প্রবলভাবে টেনে নেয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা লজ্জাস্থান হেফাজতের নির্দেশের আগে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ দৃষ্টি হলো প্রবেশদ্বার, আর লজ্জাস্থান হলো তার চূড়ান্ত পরিণতি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বিয়ের কোনো শর্ত দেননি। তিনি এমন কথা বলেননি যে, যারা অবিবাহিত কেবল তারাই চোখ সংযত রাখবে। বরং তিনি এটিকে মুমিনের ‘ঈমানের’ একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, দৃষ্টি সংযত রাখা একজন মুমিনের স্থায়ী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত। বিবাহিত হলেই যে দৃষ্টির হেফাজত করা থেকে কেউ চিরতরে অব্যাহতি পেয়ে যায়, এমন ভাবার কোনো অবকাশ ইসলামে নেই। বরং যে ব্যক্তি অবিবাহিত অবস্থায় নিজের দৃষ্টির লাগাম টেনে ধরতে শেখেনি, বিবাহিত জীবনেও তার চোখ বাইরের হারাম সৌন্দর্যের মোহে পড়ে যাওয়ার এবং ঘরোয়া শান্তিতে অতৃপ্ত থাকার তীব্র ঝুঁকিতে থাকে।
ইসলামের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক চিকিৎসক ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোতে দৃষ্টির ভয়াবহতা নিয়ে অসাধারণ সব মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, দৃষ্টি হচ্ছে হৃদয়ের প্রবেশদ্বার এবং মনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বার্তাবাহক। এই দরজা দিয়ে যা কিছু ভেতরে ঢোকে, তা-ই অন্তরের গভীরে গিয়ে শক্তভাবে বাসা বাঁধে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “চোখ যিনা করে, আর তার যিনা হলো হারাম দৃষ্টি।” (সহিহ মুসলিম, ২৬৫৭)
ফিকহ বা ইসলামি আইনের পরিভাষায় এখানে 'যিনা' শব্দটি রূপক বা 'মাজাজি' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি 'হাকিকি' বা আইনি যিনা নয়, যার কারণে পৃথিবীতে ইসলামি দণ্ডবিধি বা 'হদ' (যেমন বেত্রাঘাত বা রজম) কার্যকর হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) এখানে একে 'যিনা' বলে আখ্যায়িত করেছেন মূলত এর ভয়াবহতা ও জঘন্যতা বোঝাতে। এটি হলো প্রকৃত ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক ধাপ বা 'Prelude'। এটি 'হাকিকি' যিনা না হলেও 'মাজাজি' বা আধ্যাত্মিক যিনা হিসেবে অত্যন্ত গুরুতর, যা মানুষের আত্মিক পবিত্রতাকে ধ্বংস করে দেয়।
আধ্যাত্মিক পতন একদিনে ঘটে না। প্রথমে একটি অবৈধ দৃষ্টি মানুষের মস্তিষ্কে হানা দেয় (খাওয়াতের)। সেই দৃষ্টি মস্তিষ্কে তৈরি করে একটি নিরন্তর ফ্যান্টাসি বা কল্পনা (আফকার)। সেই কল্পনা হৃদয়ের গভীরে জন্ম দেয় তীব্র কু-বাসনা বা শাহওয়াহ (ইরাদা)। এরপর সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হয় পাপ করার দৃঢ় সংকল্প (আযিমাহ)। এবং পরিশেষে সেই সংকল্প মানুষকে ঠেলে দেয় বাস্তব পাপে বা দৈহিক ব্যভিচারে (ফি'ল)। সুতরাং, যে ব্যক্তি প্রথম ধাপেই নিজের দৃষ্টির আগল টেনে ধরতে পারল না, সে শেষ ধাপে গিয়ে নিজেকে জাদুকরীভাবে আটকে রাখতে পারবে—এমনটা ভাবা চরম বোকামি। প্রতিটি হারাম দৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে একটি অন্ধকারের কালো ছোপ ফেলে দেয়।
হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে নিজের দৃষ্টি সংযত রাখে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরকে ঈমানের নূর বা আলো দিয়ে আলোকিত করে দেন এবং তার অন্তর্দৃষ্টি (বসিরাহ) প্রখর করে দেন। আর যে তার দৃষ্টিকে অবাধ করে দেয়, তার অন্তর ধীরে ধীরে অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যায়।
পাপের পুনরাবৃত্তি কীভাবে মানুষের হৃদয়কে ধ্বংস করে দেয়, তা আল্লাহ তাআলা কুরআনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। সূরা আল-মুতাফফিফিনে আল্লাহ বলেছেন:
​"كَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ"
“কখনোই নয়, বরং তাদের অপকর্মের কারণেই তাদের অন্তরে মরিচা পড়ে গেছে।” (আল-মুতাফফিফীন, ১৪)
এই মরিচা বা ‘রান’ সম্পর্কে মুফাসসিরগণ এবং হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। সে যদি দ্রুত তওবা করে ফিরে আসে, তবে অন্তর আবার আগের মতো পরিষ্কার ও স্ফটিকস্বচ্ছ হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি গুনাহ চালিয়ে যেতেই থাকে এবং তওবার প্রয়োজন মনে না করে, তবে কালো দাগ বাড়তে বাড়তে একসময় পুরো হৃদয়কে লোহার মরিচার মতো আবৃত করে ফেলে। তখন সেই হৃদয় আর সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে বর্জন করতে পারে না।
এখন একজন যুবক বা যুবতী নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারে—যে হৃদয় আজ পাপে আবৃত, যে চোখ আজ পর্নোগ্রাফি বা পর্দার বাইরের অশ্লীলতায় মারাত্মকভাবে আসক্ত, যে নফস আজ হারাম উত্তেজনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে—সে কি আগামীকাল শুধুমাত্র একটি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা (কবুল বলা এবং সাইন করা) শেষ করার মাধ্যমে হঠাৎ করে জাদুকরীভাবে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে? বাস্তবতা হলো, তওবা এবং আত্মশুদ্ধির দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছাড়া এটি অসম্ভব।
আজকের সমাজের একটি বড় এবং নীরব ট্র্যাজেডি হলো, আমরা বিয়েকে মানসিক বা চারিত্রিক রোগের কোনো চিকিৎসালয় বা রিহ্যাব সেন্টার বলে মনে করি। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছেলে বখে গেছে, ড্রাগস বা নারীতে আসক্ত, কিংবা মেয়ে অবাধ্য হয়ে গেছে—বিয়ে করিয়ে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। অনেক যুবক নিজে নিজেই ভাবে, আমার এখন যে সব বাজে অভ্যাস বা পর্নোগ্রাফির আসক্তি আছে, বিয়ে করলে সেগুলো এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে।
কিন্তু বিয়ে কোনো জাদুর কাঠি নয়; এটি একটি অত্যন্ত গুরুদায়িত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং একটি মহান ইবাদত। এর জন্য শারীরিক ও আর্থিক প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিরও প্রবল প্রয়োজন। আর এই প্রস্তুতির মূল ভিত্তিটাই হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
​"وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا"
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে বা তাকওয়া অবলম্বন করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।” (আত-তালাক: ২-এর শেষ অংশ)
যে যুবক বা যুবতী তাকওয়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণের কঠিন প্রশিক্ষণ না নিয়েই বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে প্রবেশ করে, সে আসলে চোরাবালির ওপর একটি বিশাল অট্টালিকা তৈরি করার চেষ্টা করছে। বাইরে থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়তো অনেক জাঁকজমকপূর্ণ দেখাতে পারে, কিন্তু ভেতরে সেই সম্পর্কটি থাকে চরম নড়বড়ে ও অস্থির। একবার নিজের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর কথা গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত। সে হয়তো নিজের সতীত্ব, চরিত্র ও দৃষ্টি রক্ষা করে আপনার জন্য সযতনে অপেক্ষা করছে, আর আপনি তাকে উপহার দিতে যাচ্ছেন একটি পাপে ক্লিষ্ট, আসক্ত ও অন্ধকার হৃদয়! এটি কি আপনার সেই পবিত্র সঙ্গীর প্রতি চরম অবিচার ও প্রতারণা নয়?
সূরা আন-নূরের ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শাশ্বত মূলনীতি উল্লেখ করেছেন:
​"الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ"
“দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য; আর পবিত্রা নারীরা পবিত্র পুরুষদের জন্য এবং পবিত্র পুরুষরা পবিত্রা নারীদের জন্য।”
মুফাসসিরগণ স্পষ্ট করেছেন যে, এটি একটি আদর্শিক সামঞ্জস্য বা চারিত্রিক মূলনীতি, যা সাধারণত মানবসমাজে প্রতিফলিত হয়। তবে একে কোনো অনিবার্য জাগতিক বা গাণিতিক নিয়ম হিসেবে দেখা যাবে না যার কোনো ব্যতিক্রম নেই। কারণ, মহান আল্লাহর অসীম হিকমতে ইতিহাসে আমরা এর ব্যতিক্রমও দেখেছি। যেমন—নবী লুত (আ.) ও নূহ (আ.)-এর স্ত্রীরা তাদের মতো পবিত্র চরিত্রের ছিলেন না। আবার উল্টোদিকে, ফেরাউনের মতো ইতিহাসের সবচেয়ে পাপিষ্ঠ ও জালিম ব্যক্তির ঘরে আছিয়া (আ.)-এর মতো পরম নেককার ও জান্নাতি নারী ছিলেন।
সুতরাং, এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো—সাধারণত আল্লাহ তাআলা পবিত্রদের সাথে পবিত্রদের মিল করিয়ে দেন এবং অপবিত্রদের কপালে অপবিত্ররাই জোটে। অর্থাৎ, নিজেকে পবিত্র করার মাধ্যমে একজন মুমিনের জন্য পবিত্র ও নেককার জীবনসঙ্গী পাওয়ার একটি জোরালো, যৌক্তিক ও শক্তিশালী সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই কেউ যদি একজন পবিত্র সঙ্গীর আশা করে, তবে যুক্তি, ন্যায় ও ইনসাফের খাতিরেই তাকে প্রথমে নিজেকে পবিত্র করার চেষ্টা করতে হবে। হারামের পথে হাঁটা অবস্থায় একজন পুত-পবিত্র, সতী-সাধ্বী সঙ্গীর স্বপ্ন দেখা অনেকটা মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রবল বৃষ্টির প্রত্যাশা করার মতো, যা অসম্ভব না হলেও প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের পরিপন্থী।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদের মনস্তত্ত্ব, বয়সের উন্মাদনা এবং তাদের শারীরিক চাহিদা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালোভাবে জানতেন। তাই তিনি অত্যন্ত দরদভরা কণ্ঠে যুবকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন: “হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।” (সহিহ মুসলিম, ১৪০০)
এই হাদিসটির শিক্ষা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বিয়ের সামর্থ্য না আসা পর্যন্ত নিজেকে কোনোভাবেই হারামে জড়িয়ে ফেলা যাবে না, বরং আত্মসংযমের বা নিজের প্রবৃত্তিকে অবদমিত রাখার ঐশী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। রোজা এখানে কেবল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকার নাম নয়; বরং এটি হলো নিজের অবাধ্য নফসকে শৃঙ্খলিত করার একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।
ইমাম কুরতুবী (রহ.) এই প্রসঙ্গে বলেছেন, এই হাদিস অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, বিয়ের আগে আত্মসংযম শেখা কতটা জরুরি। কারণ যে ব্যক্তি অবিবাহিত অবস্থায় নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে বিয়ের পর বৈধ সম্পর্কের সীমাবদ্ধতাগুলোও মানতে পারবে না। দাম্পত্য জীবনে যখনই কোনো দূরত্ব, রাগ-অভিমান বা সাময়িক শারীরিক সমস্যা আসবে, সে তখন অত্যন্ত সহজেই তার পুরনো হারামের নেশায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিয়ের আগে সংযমের কঠিন পাঠ গ্রহণ করেনি, সে বিয়ের পরেও পরকীয়া বা অন্যান্য পাপে লিপ্ত হয়ে নিজের সাজানো সোনার সংসার ছারখার করে দিতে পারে।
আধুনিক বিজ্ঞান আজ ইসলামের সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন করে প্রমাণ করছে। হারামের দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস হালালের স্বাভাবিক স্বাদকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দেয়।
যে চোখ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বা রাস্তায় প্রতিদিন কৃত্রিম, ফিল্টারযুক্ত ও অশ্লীল সৌন্দর্য দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তার মস্তিষ্ক ‘ডোপামিন’ নামক রিওয়ার্ড হরমোনের অস্বাভাবিক ক্ষরণে এক প্রকার আসক্ত হয়ে পড়ে। পর্নোগ্রাফি বা অবাধ দৃষ্টি মস্তিষ্কের নিউরাল পাথওয়েকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সে যখন বাস্তবে একটি বৈধ সম্পর্কের শান্ত, স্নিগ্ধ ও মার্জিত জগতে প্রবেশ করে, তখন তার স্ত্রীর স্বাভাবিক, মানবিক ও পবিত্র সৌন্দর্য তাকে আর আগের মতো তৃপ্তি দিতে পারে না। তার অবচেতন মন সর্বদা সেই নিষিদ্ধ, উগ্র এবং কৃত্রিম কল্পনার জগতেই বিচরণ করতে চায়।
সে বাস্তব সম্পর্কের গভীরতা, আবেগ, স্পর্শ ও মানসিক প্রশান্তি উপলব্ধি করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে বিয়ে তার জন্য শান্তির নীড় বা ‘সাকিনাহ’ হওয়ার বদলে এক নতুন মানসিক অস্থিরতা ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অদৃশ্য এক মনস্তাত্ত্বিক দেওয়াল তৈরি হয়, যার ফলে সম্পর্কে তিক্ততা, দূরত্ব এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বিচ্ছেদ নেমে আসে।
আমাদের পূর্বসূরি নেককারদের বা সালাফ আস-সালেহীনের জীবন এই জায়গায় আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তারা শুধু যে প্রকাশ্য হারাম থেকে দূরে থাকতেন তা নয়; বরং সন্দেহজনক বিষয় এবং অনর্থক দৃষ্টি থেকেও নিজেদের সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতেন। তাদের কাছে পবিত্রতা ছিল আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের এক অনন্য ভিত্তি।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) একবার তাঁর শিক্ষক ইমাম ওয়াকীর কাছে নিজের স্মরণশক্তি সামান্য কমে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। তখন শিক্ষক তাঁকে সমস্ত পাপকাজ (এমনকি অনিচ্ছাকৃত হারাম দৃষ্টি) ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “ইলম হলো আল্লাহর নূর, যা কোনো পাপী ব্যক্তিকে দান করা হয় না।” আরেকজন সালাফ বলেছিলেন, “আমি দুনিয়াতে একটি হারাম দৃষ্টিকে শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে সংযত করেছি, আর তার বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে অন্তরে এমন ঈমানের মিষ্টতা দান করেছেন, যা আমি আগে কখনো পাইনি।” যখন কোনো বান্দা কেবল আল্লাহর ভয়ে নিজের নফসের প্রবল ইচ্ছার লাগাম টেনে ধরে, আল্লাহ তার অন্তরকে এমন এক প্রশান্তি দান করেন যা পৃথিবীর কোনো সম্পদের বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয়। বিয়ের আগে এই আত্মিক পবিত্রতা অর্জন করা তাই একজন তরুণ বা তরুণীর জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।
যে ব্যক্তি বলে, “এখন যা করছি করি, পরে একসময় ঠিক হয়ে যাব”, সে আসলে নিজের চরিত্র ও ভবিষ্যৎকে নিজ হাতে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ আজকের অবাধ দৃষ্টি হলো আগামী দিনের দাম্পত্য অস্থিরতার বীজ। আজকের হারাম স্পর্শ বা অবৈধ চ্যাটিং হলো আগামী দিনের মানসিক শূন্যতার কারণ। আজকের পর্নোগ্রাফি আসক্তি হলো আগামী দিনের বৈবাহিক জীবনে অতৃপ্তির মূল নিয়ামক।
ইসলাম বৈরাগ্যবাদে বিশ্বাসী নয়, এটি মানুষের জৈবিক কামনাকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে। কিন্তু ইসলাম সেই কামনাকে একটি পবিত্র কাঠামোর (বিবাহ) ভেতরে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। কারণ নিয়ন্ত্রিত কামনা ইবাদতে পরিণত হয় (যেমন স্ত্রী সহবাসকেও ইসলামে সদাকাহ বলা হয়েছে), আর অনিয়ন্ত্রিত কামনা পশুবৃত্তিতে পরিণত হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে। তাই আত্মশুদ্ধি ছাড়া বিয়ে কখনোই হারামের জগৎ থেকে মুক্তির সহজ পথ হতে পারে না।
তবে কি যারা ভুল পথে হেঁটেছে তাদের ফেরার কোনো উপায় নেই? অবশ্যই আছে। ইসলামের সৌন্দর্যই হলো এর ক্ষমা ও ক্ষমার বিস্তৃতি। আল্লাহ তাআলা গাফুরুর রাহীম। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, আন্তরিক তওবা বা 'তওবাতুন নাসুহা'র মাধ্যমে মানুষ যদি ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তার অন্তরকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দেন যে, সে যেন কোনোদিন পাপই করেনি। তওবাতুন নাসুহার শর্ত হলো—পাপের জন্য তীব্র অনুশোচনা করা, সাথে সাথে পাপ ছেড়ে দেওয়া, ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প করা এবং বান্দার হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া। এই তওবা ছাড়া কেবল সময়ের ওপর বা বিয়ের ওপর ভরসা করা হলো আত্মপ্রবঞ্চনা।
নিজের জীবনের সমীকরণটি আজই মেলাতে চেষ্টা করুন। আপনি কি বিয়েকে ব্যবহার করতে চান আপনার বিগত জীবনের পাপ ঢাকার একটি পর্দা হিসেবে? নাকি আপনি নিজেকে তওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নতুনভাবে প্রস্তুত করছেন একটি পবিত্র ও দায়িত্বশীল সম্পর্কের জন্য?
দুনিয়ার মানুষের চোখে আপনি নিজেকে খুব ভালো, ভদ্র ও ধার্মিক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সবকিছুই জানেন। আপনার গোপন দৃষ্টির লক্ষ্য কী, আপনার নিঃশব্দ চিন্তাগুলো কতটা দূষিত, একাকীত্বের অন্ধকারে আপনার হাতের স্ক্রিনে কী ভাসছে—সবই তাঁর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
​"يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ"
“চোখের খেয়ানত এবং অন্তর যা গোপন রাখে, সে সম্পর্কে তিনি সবিশেষ অবগত।” (সূরা গাফির: ১৯)
তাই, বিয়ের স্বপ্ন দেখার আগে নিজের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি পবিত্র? নিজের চোখকে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি সংযত? নিজের নফসকে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি নিয়ন্ত্রিত? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই; আজই তওবা করুন। আল্লাহর রহমত বিশাল। আন্তরিক তওবা করলে আল্লাহ কেবল পাপ মাফই করেন না, বরং পাপের ফলে অন্তরে যে অন্ধকার ও মরিচা তৈরি হয়েছিল তাও ধুয়ে মুছে সাফ করে দেন।
চোখকে অনুশোচনায় কাঁদিয়ে হৃদয়কে পরিষ্কার করুন। কারণ একটি পবিত্র ও শান্তিময় সংসার শুরু হয় একটি পবিত্র ও প্রশান্ত আত্মা থেকেই। যে নিজে শুদ্ধ হতে জানে, সেই কেবল অন্য কারো জীবনে শান্তির ছায়া হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটাই ধ্রুব বাস্তবতা, এটাই চিরন্তন সত্য এবং এটাই সেই একমাত্র পথ, যা মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে প্রকৃত সফলতা ও প্রশান্তি এনে দেয়।
নিজেকে শুদ্ধ করার এই প্রক্রিয়াই একজন মুমিনের জীবনের সার্থকতা। আসুন, প্রবঞ্চনার মরীচিকা ছেড়ে আমরা হাকিকত বা বাস্তবের আলোতে ফিরি। তওবার মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে সাজাই, যাতে আমাদের আগামী দিনের সম্পর্কগুলো কেবল শরীরী মিলন না হয়ে, বরং দুটি পবিত্র আত্মার এক জান্নাতি মহামিলন হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের দৃষ্টি, আমাদের মন এবং আমাদের চরিত্রকে যাবতীয় ফিতনা থেকে হেফাজত করেন এবং আমাদের একটি পবিত্র, স্নিগ্ধ ও তাকওয়াপূর্ণ জীবন উপহার দেন। আমীন। ইয়া রাব্বাল আলামীন।
[মরীচিকার মোহে আত্মহনন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
“আপনার স্বামীর সঙ্গে যদি পরের জন্মে আবার বিয়ে করার সুযোগ হয়, তাহলে কি করবেন?”
হয়তো কোনো পেজ বা গ্রুপ থেকে নিছক বিনোদন বা এঙ্গেজমেন্ট বাড়ানোর জন্যই পোস্টটি করা হয়েছিল। কিন্তু এর মন্তব্যের ঘরে চোখ রাখলে শিউরে উঠতে হয়। হাজার হাজার নারী সেখানে দ্বিধাহীনভাবে, নির্দ্বিধায় একটিই উত্তর দিচ্ছেন— "না!"
এই অসংখ্য "না"-এর নিচে চাপা পড়ে আছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অভিমান, মানসিক ক্লান্তি এবং বহু ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ। মানুষ যখন এমন একটি প্রশ্নে এতটা সরাসরি “না” লেখে, তখন সেটি কেবল একটি সম্পর্কের মূল্যায়ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এক নীরব, করুণ বিদ্রোহ।
কিন্তু এই বিদ্রোহ যখন নিজের অজান্তেই ইসলামি আকিদা বা বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করতে শুরু করে, তখন বিষয়টি আর কেবল সমাজবিজ্ঞানের ফ্রেমে আটকে থাকে না। এটি রূপ নেয় বিশ্বাস ও আবেগের এক ভয়ংকর সংঘাতে। আর ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের মুসলিম পরিচয়ের এক সূক্ষ্ম, অথচ ভয়াবহ ক্ষয় শুরু হয়েছে।
হাজারো নারীর এই “না” বলার নেপথ্যে যে নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তারা এই উত্তর দিচ্ছেন কারণ তাদের কাছে দাম্পত্য জীবন কোনো শান্তির নীড় নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে এক অন্তহীন ক্লান্তির কারাগার।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারীকে বিয়ের পর যে পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই অমানবিক। স্বামীর দিনের পর দিন অবহেলা, কথায় কথায় রূঢ়তা, দায়িত্বহীনতা, অর্থনৈতিক চাপ, শ্বশুরবাড়ির একতরফা দায়ভার কাঁধে নেওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন—এসব কিছু মিলিয়ে তাদের হৃদয়ে জমেছে কালচে এক ক্ষত। তারা সারাদিন পরিশ্রম করেন, কিন্তু বিনিময়ে একটুখানি প্রশংসা বা ভালোবাসার অভাব তাদের ভেতরটাকে কুরে কুরে খায়। সেই অবদমিত ক্ষতের গভীর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসছে এই “না”। এটি অত্যন্ত মানবিক একটি প্রতিক্রিয়া।
পবিত্র কুরআন মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজন ও দুর্বলতাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধারণ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে সাকিনা (প্রশান্তি) লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে মাওয়াদ্দাহ (গভীর ভালোবাসা) ও রাহমাহ (দয়া-মায়া) সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে সেই সীম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তাভাবনা করে।” (সূরা রুম, ৩০:২১)
এই আয়াতের তাফসীরে ইসলামি স্কলারগণ স্পষ্ট করেছেন যে, বিবাহের মূল উদ্দেশ্য কেবল জৈবিক চাহিদা মেটানো বা বংশবৃদ্ধি নয়; বরং এর আত্মিক ভিত্তি হলো— সাকিনা, মাওয়াদ্দাহ এবং রাহমাহ।
একটি সংসারে যখন এই তিনটি গুণের লেশমাত্র থাকে না, স্বামী যখন স্ত্রীর অনুভূতির মূল্য দেন না, তখন সেই সম্পর্ক নারীর জন্য এক জীবন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়। তখন নারী “না” লিখে তার যন্ত্রণার ভার কিছুটা হলেও লাঘব করতে চায়। আমাদের এই যন্ত্রণাকে শুনতে হবে, তাদের আর্তনাদকে সম্মান জানাতে হবে। সমাজ হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা তাদের এই কষ্টকে ধারণ করতে পারিনি। কিন্তু এই যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ যেন আমাদের ঈমানের শেকড় কেটে না দেয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য।
এই ভাইরাল ট্রেন্ডটির সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটি লুকিয়ে আছে এর প্রশ্নকাঠামোতে— "পরের জন্ম"।
ইসলামি আকিদায় 'পুনর্জন্ম' বা জন্মান্তরবাদের কোনো স্থান নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধর্মীয় বিশ্বাস (বিশেষত সনাতন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের), যেখানে মনে করা হয় আত্মা বারবার পৃথিবীতে নতুন রূপ নিয়ে ফিরে আসে। কর্মফল অনুযায়ী কেউ মানুষ, কেউ প্রাণী হয়ে বারবার জন্ম নেয়। একজন মুসলিমের জীবনদর্শন এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদের সবাইকে আমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।” (সূরা আনকাবুত, ২৯:৫৭)
দুনিয়ার জীবন একবারই। মৃত্যু একবার, কবরের জীবন (বারযাখ) একবার, পুনরুত্থান (হাশর) একবার এবং চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশও একবারই হবে। নতুন করে একই পরিচয়ে, বা ভিন্ন কোনো পরিচয়ে এই পৃথিবীতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ বা বাস্তবতা নেই।
কুরআনে আল্লাহ আরও বলেন: “অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, সে বলে, 'হে আমার রব! আমাকে পুনরায় (দুনিয়ায়) পাঠিয়ে দিন, যাতে আমি যে সৎকর্ম করিনি, তা করতে পারি।' কখনোই নয়! এটি তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে বারযাখ (পর্দা) রয়েছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।” (সূরা মুমিনুন, ২৩:৯৯-১০০)
তাই, এই প্রশ্ন যখন কোনো মুসলিমের মুখে উচ্চারিত হয় বা কোনো মুসলিম নারী যখন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে "পরের জন্মে এই স্বামী চাই না" বলেন, তখন সেটি নিছক ক্ষোভের প্রকাশ থাকে না; এটি পরিণত হয় আকিদার সীমালঙ্ঘনে। মিডিয়া, নাটক-সিনেমা এবং সাহিত্যের প্রভাবে "সাত জনম", "পরের জন্ম" শব্দগুলো আমাদের রোজকার ভাষায় এমনভাবে মিশে গেছে যে, আমরা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারি না।
যে সমাজে মুসলিমরা হাসি-ঠাট্টা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে "পরের জন্ম" ধারণাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করবে, সেই সমাজে কিয়ামত, হাশর, মিজান এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার ভয় ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাবে। তাওহীদের এই স্খলন একটি সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত। কারণ, যখন কেউ মনে করে সে আবার ফিরে আসবে, তখন পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামের ধারণা তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে যে নারী এই দুনিয়ায় এক অত্যাচারী, অবহেলাকারী স্বামীর সাথে জীবন কাটালেন, তার এই কষ্টের কি কোনো প্রতিদান নেই? আখিরাতে কি তাকে আবার সেই একই স্বামীর সাথেই থাকতে হবে? জান্নাতে কি নারীদের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতার মূল্য থাকবে না?
ইসলাম এর অত্যন্ত যৌক্তিক, হৃদয়গ্রাহী এবং ইনসাফপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। দুনিয়ার জীবনে যারা মজলুম, আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে অকল্পনীয় ক্ষতিপূরণ। যদি কোনো নারী দুনিয়ায় স্বামীর জুলুমের শিকার হন এবং ধৈর্য ধারণ করে ঈমানের ওপর অটল থাকেন, তবে জান্নাতে আল্লাহ তার সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেবেন।
জান্নাতবাসীদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
“আর আমি তাদের অন্তর থেকে সব ধরনের ক্ষোভ ও মালিন্য বের করে দেব...” (সূরা হিজর, ১৫:৪৭)
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জান্নাতে যদি কোনো নারী তার দুনিয়ার স্বামীকেই জান্নাতি হিসেবে পান এবং তারা উভয়েই সেখানে একসাথে থাকতে চান, তবে আল্লাহ তাদের সেই পবিত্র বন্ধনকে জান্নাতেও অটুট রাখবেন। তারা সেখানে অনন্তকাল আনন্দময় জীবন কাটাবেন। কিন্তু যদি কেউ দুনিয়ার তিক্ত স্মৃতির কারণে, বা স্বামীর কোনো খারাপ আচরণের ট্রমা থেকে জান্নাতে তাকে আর জীবনসঙ্গী হিসেবে না চান, তবে জান্নাতে কোনো জোর-জবরদস্তি থাকবে না।
জান্নাত হলো এমন এক স্থান, যেখানে আল্লাহ বান্দাকে চূড়ান্তভাবে সন্তুষ্ট করবেন। আল্লাহ বলেছেন, "সেখানে তোমাদের মন যা চাইবে, তা-ই তোমাদের জন্য রয়েছে এবং তোমরা যা দাবি করবে, তা-ই দেওয়া হবে।" (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩১)।
দুনিয়ার যে স্বামী স্ত্রীর হক আদায় করেনি, জুলুম করেছে, সে যদি তওবা না করে মারা যায়, তবে আখিরাতে তাকে এর জন্য কঠিন হিসাব দিতে হবে। আর স্ত্রী যদি তার নেক আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেন, তবে জান্নাতে তাকে কোনো অপছন্দের ব্যক্তির সাথে জোর করে রাখা হবে না। দুনিয়ার ট্রমা বা ক্ষতের কারণে কেউ যদি অন্য কাউকে বা নতুন কোনো শুরু চান, আল্লাহ তাকে তা-ই দেবেন যাতে সে চূড়ান্তভাবে সন্তুষ্ট হয়। জান্নাত কোনো আপস করার জায়গা নয়; এটি পরম প্রাপ্তির ও অবারিত স্বাধীনতার জায়গা।
এর সবচেয়ে বড় ও জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আসিয়া (আলাইহাস সালাম)। ফেরাউন ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারী এবং নিকৃষ্টতম স্বামী। কিন্তু আসিয়া (আ.) এই জুলুমের মাঝেও আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলেন। তিনি "পরের জন্মে"র কাল্পনিক হিসাব করেননি বা আক্ষেপ করে বসে থাকেননি, বরং তিনি সরাসরি আল্লাহর কাছে জান্নাতের চিরস্থায়ী ঠিকানা ও নতুন জীবনের দোয়া করেছিলেন: “হে আমার রব! আপনার সান্নিধ্যে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন...”** (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:১১)
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কষ্টগুলোকে ভাইরাল করতে শেখায়, কিন্তু নিরাময়ের পথ দেখায় না। একটি পোস্টে হাজারো নারী যখন “না” লিখে তাদের বেদনাকে একত্রিত করেন, তখন পুরো সমাজের সামনে একটি নেতিবাচক আবহ তৈরি হয়। এর ফলে নারী-পুরুষের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ও বিভেদ তৈরি হচ্ছে। পুরুষের চোখে নারী হয়ে উঠছে অসহনশীল, আর নারীর চোখে পুরুষ হয়ে উঠছে জালিম।
অথচ ইসলাম এই ভারসাম্যহীনতাকে প্রশ্রয় দেয় না। ইসলামে যেমন স্বামীর অধিকার রয়েছে, তেমনি স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে পূর্ণমাত্রায়। যখন কোনো দাম্পত্য জীবনে অশান্তি চরমে পৌঁছায়, কুরআন তখন বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়। কুরআন বলেছে— প্রথমে বোঝাও (নসিহত), এরপরও কাজ না হলে নিজেদের বিছানা আলাদা করো, তাতেও সমাধান না হলে দুই পরিবার থেকে সালিশ বা প্রতিনিধি পাঠাও। (সূরা নিসা, ৪:৩৪-৩৫)
আর যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, স্বামীর জুলুমের কারণে স্ত্রীর দ্বীন, সম্মান বা জীবন হুমকির মুখে, তবে ইসলাম নারীকে সেখানে আজীবন পড়ে থেকে নীরবে কাঁদতে বলেনি। ইসলাম নারীকে শরিয়তের সীমার ভেতরে থেকে 'খুলা' (স্ত্রী কর্তৃক বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার) বা তালাকের অধিকার দিয়েছে। যদি স্বামী চরম মাত্রায় অবহেলাকারী, চরিত্রহীন বা জালিম হয়, তবে একজন মুসলিম নারী বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে পারেন। এই এক জীবনেই তাকে তার সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করার আইনি ও ধর্মীয় পথ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থায় "তালাকপ্রাপ্তা" নারীকে এমনভাবে দেখা হয় যেন সে বড় কোনো অপরাধী। সমাজ নারীকে তালাক নিতে নিরুৎসাহিত করে। "লোকলজ্জা", "বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ" বা "মেয়েরা একটু সহ্য করেই নেয়"—এমন হাজারো খোঁড়া যুক্তিতে সমাজ নারীকে আজীবন জুলুম সইতে বাধ্য করে। যখন শরিয়ত প্রদত্ত অধিকার সমাজ কেড়ে নেয়, তখন সেই অসহায়, বাধ্য নারীটি সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে "পরের জন্মে এই স্বামী চাই না" লিখে আক্ষেপ করে। সমাজ শরিয়ত মানে না বলেই আজ নারীদের আকিদা নষ্টকারী মরীচিকার পেছনে ছুটতে হচ্ছে।
আমাদের বর্তমান সমাজের এই হাহাকারের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনের চিত্র মেলালে আমরা বুঝতে পারি, আমরা আদর্শ থেকে কতটা দূরে সরে এসেছি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামীর চূড়ান্ত উদাহরণ। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিযি)।
তিনি দশ হাজার সাহাবীর সামনে বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট করে গেছেন, "নারীদের বিষয়ে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।" তিনি নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন এবং স্ত্রীদের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন।
হযরত খাদিজা (রা.) রাসূল (সা.)-কে সেই কঠিন সময়ে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, যখন পুরো মক্কা তার শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। তাদের সম্পর্ক ছিল গভীর আমানত ও ভালোবাসার। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথেও মাঝে মাঝে মান-অভিমান হতো, কিন্তু সেখানে বিন্দুমাত্র অসম্মান ছিল না; ছিল তাকওয়া। হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.) সংসারের কাজ ভাগ করে নিতেন।
হযরত উমর (রা.)-এর মতো বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী খলিফাও নিজ স্ত্রীর বকাঝকা চুপচাপ শুনে নিতেন এই ভেবে যে, "সে আমার সন্তানের মা, আমার ঘরের রক্ষক। সে আমার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, আমি কি তার একটু কড়া কথা সহ্য করতে পারব না?"
সাহাবীরা জানতেন, স্ত্রী বা স্বামীকে কষ্ট দেওয়া কেবল একটি ভুল নয়, এটি একটি কবিরা গুনাহ। বান্দার হক নষ্ট করার অপরাধে হাশরের ময়দানে নিজের নেকি দিয়ে দিতে হবে। আমাদের আবেগ যেখানে “আমি আর সইতে পারছি না” বলে থেমে যায়, সাহাবীদের আবেগ সেখানে “আল্লাহর সন্তুষ্টি কিসে” সেই দিকে ধাবিত হতো। আমরা কষ্টে ভেঙে পড়ে কল্পিত জন্মে শান্তি খুঁজি, আর তারা এই জীবনের কষ্টকে আখিরাতের পুঁজি বানাতেন।
আবেগকে খাটো করার কোনো সুযোগ নেই, তবে একে আসমানি কাঠামোর (কুরআন-সুন্নাহর) মধ্যে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনো নারী কষ্ট পেয়ে এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে “না” বলেন, তবে তাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করতে হবে— “আপনার এই ক্ষতের মূল কারণ কী?”
হয়তো কারণগুলো হলো— সম্মান না পাওয়া, অর্থনৈতিক অবহেলা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, কিংবা শ্বশুরবাড়ির অন্যায় চাপ। এই গভীর ক্ষতগুলোর নিরাময় সোশ্যাল মিডিয়ার এক লাইনের কমেন্টে বা কল্পিত জন্মে হবে না। এর নিরাময় হবে তখন, যখন সমাজে 'আল্লাহভীতি' বা তাকওয়ার সংস্কৃতি ফিরে আসবে।
একজন মুসলিম স্বামী যেদিন সত্যিকার অর্থে বুঝতে শিখবেন যে, তার স্ত্রী কোনো দাসী বা কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় 'আমানত', এবং এই আমানতের খেয়ানত করলে রোজ হাশরে তাকে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে— সেদিন এই অবহেলার অবসান ঘটবে। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বিবাহকে "মীসাকান গালিযা" বা 'দৃঢ় অঙ্গীকার' বলেছেন। এটি কেবল দুটি মানুষের চুক্তি নয়, এর সাক্ষী স্বয়ং আল্লাহ।
একইভাবে একজন স্ত্রীকেও বুঝতে হবে যে, তার স্বামী কোনো ফেরেশতা নন, তারও ভুল-ত্রুটি হতে পারে, অর্থনৈতিক সংকট থাকতে পারে। এই পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, সম্মান প্রদর্শন এবং জবাবদিহির বোধই পারে একটি মৃতপ্রায় দাম্পত্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে।
এই ভাইরাল ট্রেন্ডটি আসলে আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের ঘরগুলোতে কতটা অন্ধকার জমেছে। কিন্তু এই অন্ধকারের সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমরা যেন অন্ধকারেরই অন্য এক গলিতে—আকিদা নষ্টকারী, শিরক ও কুফর মিশ্রিত ধারণায়—হারিয়ে না যাই।
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের উত্তর খুব স্পষ্ট হওয়া উচিত: আমাদের কোনো 'পরের জন্ম' নেই। যা করার, এই এক জীবনেই করতে হবে। অন্যায় থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, অধিকার বঞ্চিত হলে তা আদায় করতে হবে, আর জুলুম সীমার বাইরে গেলে আল্লাহর দেওয়া নিয়মে বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই কল্পিত জন্মে বিচার চাওয়া যাবে না বা আক্ষেপ করা যাবে না। কারণ কল্পিত জন্মে আল্লাহ নেই, হাশর নেই, ইনসাফ নেই, হিসাব-নিকাশ নেই। সেটি কেবলই একটি মিথ্যে মরীচিকা।
আসুন, আমরা আবেগের লাগাম টেনে ধরি। সম্পর্কগুলোকে সিনেমা বা উপন্যাসের বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে না দেখে, আল্লাহর দেওয়া আলোয় দেখতে শিখি। একে অপরের কষ্টকে শুনি, সম্মান করি, কিন্তু সেই কষ্টকে কখনোই শরিয়ত ও আকিদার ওপরে স্থান না দিই। তাহলেই আমাদের এই এক জীবনেই দাম্পত্যে রহমতের বারিধারা নেমে আসবে, জান্নাতে পরম প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে এবং আমাদের ঈমান থাকবে পাহাড়ের মতো অটুট।
[ছদ্মবেশী পরের জন্ম]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
[1]
একটি প্রশ্ন কখনও কখনও ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ে। সেই প্রশ্নটি তলোয়ারের মতো নয়—যা শব্দ করে আঘাত করে। বরং মরুভূমির বাতাসের মতো—নীরবে আসে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের গভীর বালুকণাগুলোকে নড়িয়ে দেয়।
রিয়াদের একটি পুরোনো লাইব্রেরিতে বসে ছিল যুবকটি। বাইরে রাত নেমেছে। যুবকটির হাতে একটি পুরোনো কিতাব, কিন্তু তার চোখ বইয়ের অক্ষরে স্থির ছিল না। তার মাথার ভেতর ঘুরছিল কিছু প্রশ্ন। একসময় সে অস্ফুট স্বরে নিজেকেই বলল,
“যদি সময় বদলে যায়, তবে নিয়ম কেন বদলায় না?”
তার সামনেই বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ শিক্ষক। তিনি ধীরে কিতাবটি বন্ধ করলেন।
“তুমি কি জানো,” তিনি বললেন, “প্রশ্ন মানুষের শত্রু নয়। প্রশ্ন হচ্ছে জ্ঞানের প্রবেশদ্বার। কিন্তু দরজায় কড়া নাড়ার আগে জানতে হয়—সেই দরজার ওপারে কী আছে।”
যুবকটি একটু নড়েচড়ে বসল।
“আমার প্রশ্নগুলো খুব সরল,” সে বলল। “চৌদ্দশো বছর আগে আরব ছিল ভিন্ন। তখন ঘরে ঘরে শৌচাগার ছিল না, আজকের মতো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। পর্দার বিধান কি কেবল সেই যুগের প্রতিকূলতা থেকে বাঁচার জন্য একটি সাময়িক কৌশল ছিল না? আজ তো পৃথিবী আধুনিক হয়েছে, নিরাপত্তা বেড়েছে।”
বৃদ্ধ শিক্ষক মৃদু হাসলেন।
“পৃথিবী বদলেছে—এটা সত্য। কিন্তু মানুষের ভেতরের জগত কি বদলেছে?”
যুবকটি চুপ করে রইল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “একটি প্রশ্ন আমি তোমাকে করি। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি কি চৌদ্দশো বছর আগের চেয়ে উন্নত?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে যৌন অপরাধ, শোষণ, আর পৈশাচিক লালসা—এসব কি কমেছে? বরং পরিসংখ্যান বলছে, আধুনিকতা যত বেড়েছে, নৈতিক অবক্ষয় তত জটিল রূপ নিয়েছে।”
যুবকটি উত্তর দিতে পারল না। বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন,
“ইসলাম যখন কোনো নৈতিক আইন দেয়, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ভূখণ্ডের জন্য দেয় না। তা দেয় মানুষের চিরন্তন প্রকৃতির (ফিতরাত) জন্য। প্রযুক্তি বদলালেও মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তি আর রিপুগুলো বদলায়নি। আর শৌচাগার বা অন্ধকারের যে যুক্তিটি তুমি দিলে, সেটি পর্দার বিধানের একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল না। কুরআনের সুরা আহজাবে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে যেন নারীদের চেনা যায় (তাদের অনন্য মর্যাদা ও স্বতন্ত্র পরিচয় বোঝা যায়) এবং তাদের উত্যক্ত করা না হয়। অর্থাৎ এটি ছিল নারীর সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তার একটি স্থায়ী বর্ম।”
তারপর তিনি ধীরে একটি আয়াত পাঠ করলেন— “মুমিন পুরুষদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে...” (সুরা নূর: ৩০)
তিনি থামলেন।
“দেখলে? এখানে প্রথম নির্দেশটি নারীকে নয়, বরং পুরুষকে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম সমস্যার সমাধান কেবল কাপড়ের আবরণে খুঁজেনি, বরং সমস্যার মূলে—মানুষের মনস্তাত্ত্বিক কামনার উৎসে (চোখে) প্রথম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ইসলাম নৈতিকতাকে কেবল পোশাকে সীমাবদ্ধ করেনি, সে হাত দিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। পর্দা আসলে কোনো দেয়াল নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। বৃদ্ধের চোখে গভীর প্রজ্ঞা।
“তুমি কি জানো রোমান বা পারস্য সভ্যতা কেন ধ্বংস হয়েছিল? কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, বরং চরম নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে। নবীজি (সা.) জানতেন, মানুষের সমাজে দুটি জিনিস সবসময় থাকবে—দৃষ্টি এবং প্রবৃত্তি। আর যখন এই দুটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে উন্নত সভ্যতাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।”
যুবকটি এবার ধীরে বলল, “কিন্তু আজকের পৃথিবীতে তো মানুষ ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’র কথা বলে। পর্দা কি সেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়?”
বৃদ্ধের মুখে ম্লান হাসি। “স্বাধীনতা।” তিনি শব্দটি এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যেন সেটিকে ওজন করছেন। “একটি পাখি যখন দিগন্ত বিস্তৃত আকাশে উড়ে, তখন সে স্বাধীন। কিন্তু সে যদি ঝড়ের মরণনেশায় ঢুকে পড়ে, তবে কি সে সত্যিই স্বাধীন থাকে? স্বাধীনতার সাথে প্রজ্ঞার প্রয়োজন। ইসলাম যখন পর্দার কথা বলে, তখন সে কেবল কাপড়ের কথা বলে না। সে একটি সামাজিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরি করতে চায়—যেখানে মানুষ মানুষকে নিছক দেহের মোড়কে নয়, বরং মানুষ হিসেবে সম্মান করবে।”
লাইব্রেরির বাইরে বাতাস বইছিল। বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তুমি কি জানো সালাফদের (পূর্বসূরী) সমাজে একটি অদ্ভুত বিষয় ছিল? তারা আইনকে প্রশ্ন করার আগে নিজেদের আত্মাকে প্রশ্ন করত। এক যুবককে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক আলেম বললেন—রাস্তারও কিছু অধিকার আছে। যুবকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—রাস্তার অধিকার কী? আলেম উত্তর দিলেন—দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া এবং সালামের উত্তর দেওয়া।”
যুবকটি হঠাৎ এক গভীর সত্যের মুখোমুখি হলো। এই পুরো আলোচনা আসলে কেবল কাপড় নিয়ে নয়। এটি চোখ নিয়ে। এটি হৃদয় নিয়ে। এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষা নিয়ে। লাইব্রেরির আলো তখন ম্লান হয়ে এসেছে। বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“মানুষ যখন নিজের চোখকে পাহারা দেয় না, তখন তাকে আইন দিয়ে পাহারা দিতে হয়। আর যখন মানুষের হৃদয় জেগে ওঠে, তখন আইন আর বোঝা মনে হয় না; তখন তা হয়ে ওঠে সম্মানের এক অভেদ্য ঢাল।”
রাত আরও গভীর হলো। যুবকটির মনে শেষ একটি প্রশ্ন জন্ম নিল—
“যদি কেউ দাবি করে—একজন নারীকে উদ্দেশ্যহীনভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল বা তার ব্যক্তিগত সীমানা লঙ্ঘন করা হয়েছে—তবে কি সেটি আধুনিক ভাষায় ‘স্টকিং’ নয়? ইসলাম কি একে অপরাধ গণ্য করে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে তার দিকে তাকালেন।
“ইসলামি শরিয়তে একে বলা হয় মানুষের ‘হুরমাহ’ বা অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার লঙ্ঘন। কারও ব্যক্তিগত পথে বাধা হওয়া, তাকে অস্বস্তিতে ফেলা বা তার অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, এটি আখিরাতের আমলনামাতেও একটি কালো দাগ। ইসলামে মানুষের সম্মান রক্ষা করা প্রাণের চেয়েও মূল্যবান।”
বৃদ্ধের কন্ঠস্বর আরও গম্ভীর হলো—
“চলো দেখি, নবীজি (সা.) কীভাবে মদিনার রাস্তায় নারী-পুরুষের এই সামাজিক আচরণের সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল পর্দার আদেশ দেননি, তিনি পুরুষদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা নিচু করে হাঁটতে হয় এবং নারীদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্বকে সুরক্ষিত রেখে সমাজে ভূমিকা রাখতে হয়। সেই সমাজটি ছিল লজ্জা এবং সম্মানের সমন্বয়ে গড়া এক অনন্য দুর্গ।”
লাইব্রেরির বাইরের রাস্তা প্রায় নিঃশব্দ। দূরের মিনার থেকে ইশার নামাজের পরের নীরবতা যেন রিয়াদের আধুনিক স্থাপত্য আর মরুভূমির ধূলিকণার ওপর একটি কোমল চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। যুবকটি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল—প্রশ্নগুলো যেন ধীরে ধীরে অন্য রূপ নিচ্ছে।
বৃদ্ধ শিক্ষক জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের রাস্তায় জ্বলজ্বল করা সিসিটিভি ক্যামেরা আর আধুনিক নিরাপত্তা বাতিগুলোর দিকে ইশারা করে তিনি ধীরে বললেন, “তুমি একটু আগে যে প্রশ্নটি করলে—কেউ যদি কোনো নারীকে অনুসরণ করে, তবে কি সেটি আধুনিক ভাষায় ‘স্টকিং’ নয়? ইসলাম কি একে অপরাধ গণ্য করে?”
তিনি ঘুরে তাকালেন। “প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাসকে ভুলভাবে পড়লে মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।”
বৃদ্ধ টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো কিতাব খুললেন। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, যেন সময়ের ধুলো জমে আছে তার ওপর। “মদিনার সেই সমাজটি কল্পনা করো,” তিনি বললেন। “একটি শহর যেখানে নবী (সা.) মানুষকে নতুন করে সভ্যতা শিখাচ্ছেন। সেখানে তিনি কেবল আত্মিক শুদ্ধিই শেখাননি, বরং ‘হুরমাহ’ বা মানুষের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার এক কঠিন সামাজিক প্রাচীর গড়ে দিয়েছিলেন।”
যুবকটি ধীরে বলল, “কিন্তু কিছু মানুষ তো দাবি করে সাহাবীদের যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে কেউ কাউকে অনুসরণ করেছে বা দূর থেকে দেখেছে...”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “বাস্তবতা হলো, ইসলামে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ‘প্রাইভেসি’ লঙ্ঘন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নবী (সা.)-এর একটি ঘোষণা শোনো—কেউ যদি অন্যের ঘরের ভেতরে অনুমতি ছাড়া উঁকি দেয়, তবে তার চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গৃহকর্তার ওপর কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার দায় নেই। এই একটি ঘোষণা থেকেই বোঝা যায়, ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষায় ইসলাম কতটা কঠোর।”
যুবকটি বিস্মিত হয়ে তাকাল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “দেখো, আধুনিক রাষ্ট্র আজ রাস্তায় হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলো অবশ্যই প্রয়োজন এবং এগুলো আমাদের সহায়ক। কিন্তু একটি প্রশ্ন করো নিজেকে—যদি মানুষের হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়, তবে কি কেবল ক্যামেরা তাকে থামাতে পারবে? আজ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির দেশেও কি অপরাধ থেমে আছে?”
যুবকটি চুপ করে রইল। বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন, “প্রযুক্তি অপরাধী ধরতে পারে, কিন্তু অপরাধ করার মানসিকতা মুছে দিতে পারে না। ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধী নয়, কিন্তু ইসলাম মনে করে প্রযুক্তি হলো বাইরের প্রহরী। আর প্রকৃত নিরাপত্তা আসে তখন, যখন মানুষের ভেতরে একটি অদৃশ্য ‘ভেতরের প্রহরী’ বা তাকওয়া জেগে ওঠে। ইসলাম মানুষের সেই বিবেককে পাহারা দিতে শেখায়।”
লাইব্রেরির বাতাসে কাগজের পাতার শব্দ হলো। যুবকটি ধীরে বলল, “তাহলে কেন অনেক মানুষ মনে করে—পর্দা নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “কারণ তারা স্বাধীনতাকে দেখে ‘ইন্দ্রীয়র দাসত্ব’ হিসেবে। কিন্তু ইসলামের চোখে পর্দা কোনো বাধা নয়—এটি একটি পরিচয়। কুরআনের ভাষায়—‘এটি তাদেরকে চেনার জন্য এবং যাতে তারা উত্যক্ত না হয়’। অর্থাৎ পর্দা নারীকে সমাজ থেকে আলাদা করে না, বরং তাকে একটি সম্মানিত আসনে বসিয়ে নিরাপত্তা দেয়।”
বৃদ্ধ এবার যুবকের কাছে এসে দাঁড়ালেন। “তুমি রাস্তার হকের কথা শুনেছিলে? নবী (সা.) যখন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করার এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি মূলত একটি ‘পাবলিক স্পেস এথিক্স’ বা জনসমাগমস্থলে আচরণের নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। সেখানে নারীর কাপড় যেমন একটি ঢাল, পুরুষের লজ্জাশীল চোখও তেমনি একটি দেয়াল।”
বৃদ্ধের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত গভীরতা। “একটি সভ্যতা তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তার আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানুষের নৈতিক শক্তি—দুটোই একসাথে কাজ করে। যখন আইন কেবল বাইরে নয়, মানুষের হৃদয়েও রাজত্ব করে।”
যুবকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হচ্ছিল—তার প্রশ্নগুলোর কঠোরতা ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক তখনই আরেকটি নতুন প্রশ্ন উঁকি দিল। সে ধীরে বলল, “কিন্তু যদি কেউ বলে—পোশাক তো একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ। কেন একটি ধর্মের নিয়ম আজকের গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে সবার ওপর প্রয়োগ হবে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন। তার চোখে তখন মরুভূমির রাতের মতো এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি বললেন, “তাহলে আমাদের তৃতীয় আলোচনায় যেতে হবে। সেখানে আমরা দেখব—ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সামাজিক নৈতিকতার ভারসাম্য কোথায়।”
লাইব্রেরির ভেতরে এখন কেবল দুটি আলো জ্বলছে—একটি টেবিল ল্যাম্প, আরেকটি জানালার বাইরে শহরের আলো। দূরে কোনো গাড়ি চলে গেলে তার শব্দ কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকে, তারপর আবার নীরবতা। যুবকটি এবার আগের চেয়ে শান্ত। কিন্তু তার ভেতরে নতুন একটি প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।
সে ধীরে বলল, “কিন্তু যদি কেউ বলে—পোশাক তো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। একজন মানুষ কী পরবে, সেটি কি তার নিজের অধিকার নয়?”
বৃদ্ধ শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। যেন প্রশ্নটিকে তিনি তাড়াহুড়া করে উত্তর দিতে চান না। তিনি ধীরে টেবিলে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন, “স্বাধীনতা শব্দটি মানুষ খুব ভালোবাসে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে—স্বাধীনতার সীমা কোথায় শেষ হয়।”
যুবকটি তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধ বললেন, “একটি উদাহরণ দিই।” তিনি জানালার দিকে ইশারা করলেন। “ওই রাস্তাটি দেখছো? ধরো, কেউ বলল—আমি স্বাধীন। তাই আমি গাড়ি চালাব, কিন্তু কোনো নিয়ম মানব না। লাল বাতি মানব না, গতির সীমা মানব না। তাহলে কী হবে?”
যুবকটি বলল, “দুর্ঘটনা।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক তাই। তাই সভ্য সমাজে স্বাধীনতার সাথে দায়িত্বও থাকে। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারকে অস্বীকার করে না। বরং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনেক মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে—নারীর সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার, এমনকি বিবাহে সম্মতির অধিকার। কিন্তু একই সাথে ইসলাম একটি প্রশ্ন করে—ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা কি সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলে না?”
যুবকটি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “অবশ্যই ফেলে।”
বৃদ্ধ বললেন, “এটাই সামাজিক নৈতিকতার মূল প্রশ্ন। ইসলাম মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না। বরং সে জানে—মানুষের ভেতরে আকর্ষণ আছে, কামনা আছে। তাই সে সমাজকে এমনভাবে সাজাতে চায় যাতে সেই প্রবৃত্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে। আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই একটি ভুল করি—আমরা মনে করি নৈতিকতা কেবল একটি ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু বাস্তবে নৈতিকতা সবসময়ই সামাজিক। কারণ একজনের অনৈতিকতা অন্যজনের নিরাপত্তার অভাব তৈরি করে।”
তারপর তিনি একটি ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টানলেন। “একসময় আন্দালুস (স্পেন) ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত সভ্যতা। সেখানে বিজ্ঞান ছিল, জ্ঞান ছিল। কিন্তু যখন সেই সমাজ তার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে কেবল বিলাসিতা আর ইন্দ্রিয়পরায়ণতায় ডুবে গেল, তখন তার জ্ঞানও তাকে পতন থেকে রক্ষা করতে পারল না।”
যুবকটি গভীরভাবে শুনছিল। বৃদ্ধ বললেন, “তাই ইসলাম যখন শালীনতার কথা বলে, তখন সে কেবল কোনো বিশেষ লিঙ্গের পোশাক নিয়ে কথা বলে না। সে একটি শুদ্ধ সংস্কৃতি তৈরি করতে চায়। যেখানে পুরুষ তার চোখকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নারী তার মর্যাদাকে সুরক্ষিত রাখবে। সমাজ এমন হবে যেখানে মানুষকে নিছক ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে সম্মান করা হবে।”
যুবকটি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কি পর্দার কারণে নারীরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না?”
বৃদ্ধ হাসলেন। “নবী (সা.)-এর যুগের দিকে তাকাও। সেখানে নারীরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তারা মসজিদে আসতেন, ব্যবসা করতেন, এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে পরামর্শে অংশ নিতেন। পর্দার বিধান তাদের পথ রুদ্ধ করেনি, বরং তাদের জন্য একটি নিরাপদ বলয় তৈরি করেছিল—যাতে তারা তাদের মেধা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারেন, দেহ দিয়ে নয়।”
লাইব্রেরির বাতাসে যেন একটি গভীর শান্তি নেমে এসেছে। বৃদ্ধ আবার বললেন, “একটি কথা মনে রেখো। মানুষ যখন নিজের মর্যাদাকে সস্তা করে, তখন সমাজ তাকে সস্তা দৃষ্টিতেই দেখতে শুরু করে। আর যখন সমাজ নারীকে কেবল তার বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে বিচার করতে শুরু করে, তখন তার প্রকৃত মেধা ও আত্মা অবহেলিত থেকে যায়।”
যুবকটি দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার ভেতরে এখনও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে। সে ধীরে বলল, “কিন্তু অনেকেই বলে—এই নিয়মগুলো হয়তো অতীতের কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এসেছিল।”
বৃদ্ধ শিক্ষক এবার গভীরভাবে তাকালেন। তিনি টেবিলের উপর রাখা কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ‘ওহি’র দর্শন। কারণ মানুষের তৈরি আইন সময়ের সাথে তামাদি হয়ে যায়, কিন্তু স্রষ্টার আইন কেন সর্বজনীন?”
তিনি ধীরে বসে বললেন, “চলো, আমরা সেই ইতিহাসের দিকে তাকাই—যেখানে মানুষ বুঝেছিল, প্রকৃত আইন মানুষের ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয় না। বরং তা আসে পরম করুণাময়ের কাছ থেকে, যিনি মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।”
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। সময় যেন থেমে নেই, কিন্তু খুব ধীরে হাঁটছে। জানালার বাইরে রিয়াদের আকাশে শহরের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত সোনালি কুয়াশা তৈরি করেছে। বৃদ্ধ শিক্ষক টেবিলের উপর রাখা কুরআনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে এমন এক গভীরতা—যেন বহু বছরের প্রজ্ঞা সেখানে জমে আছে।
যুবকটি ধীরে বলল, “আপনি বলছিলেন—ওহি মানুষের ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয় না।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। এটিই বোঝা সবচেয়ে জরুরি। যখন মানুষ বলে—কোনো বিধান হয়তো একটি বিশেষ ঘটনার কারণে এসেছে, তখন তারা প্রায়ই ভুলে যায় একটি মৌলিক সত্য। ইসলামি শরিয়তে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বিধান নাজিলের ‘উপলক্ষ’ (সাবাবুন নুযুল) হতে পারে, কিন্তু বিধানের ‘উৎস’ নয়। উৎস হচ্ছে আল্লাহর শাশ্বত জ্ঞান।”
তিনি একটু থামলেন। “একটি উদাহরণ দিই। ধরো, আকাশে মেঘ জমেছে, তারপর বৃষ্টি নামল। কেউ যদি বলে—গাছের পাতার কারণে বৃষ্টি হয়েছে, তবে কি তা সঠিক হবে? পাতা হয়তো বৃষ্টির ফোঁটা ধরে রাখে, কিন্তু বৃষ্টি তৈরি করে না। ঠিক তেমনি ইতিহাসের কিছু ঘটনা ওহির প্রেক্ষাপট হতে পারে, কিন্তু ওহির স্রষ্টা নয়।”
লাইব্রেরির বাতাসে যেন কথাগুলো আরও ভারী হয়ে উঠল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “কুরআন ঘোষণা করেছে—আল্লাহ যা চান তাই বিধান দেন। কারণ তিনি মানুষের স্রষ্টা, আর স্রষ্টাই সবচেয়ে ভালো জানেন তার সৃষ্টির জন্য কোন নিয়মটি সব সময়ের জন্য কার্যকর।”
যুবকটি একটু সামনে ঝুঁকল। “কিন্তু অনেকেই বলে—কিছু সাহাবি কোনো বিষয়ে মতামত দিয়েছিলেন, তারপর সেই অনুযায়ী আয়াত নাজিল হয়েছিল। এতে কি মানুষের প্রভাব বোঝা যায় না?”
বৃদ্ধ শান্তভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “ইতিহাসে এমন ঘটনা আছে, যাকে ‘মুওয়াফাকাত’ বলা হয়। কিন্তু সেগুলোকে ভুলভাবে বোঝা হয়। যখন কোনো সাহাবি (যেমন ওমর রা.) একটি মত প্রকাশ করতেন এবং পরে সেই বিষয়ের সাথে মিল রেখে আয়াত নাজিল হতো, তখন তারা সেটিকে নিজেদের বিজয় মনে করতেন না। বরং তারা প্রকম্পিত হতেন এই ভেবে যে—আল্লাহর ইচ্ছা ও তার জ্ঞান কত সুদূরপ্রসারী। তারা জানতেন, ওহি কোনো মানুষের ইচ্ছার অনুগামী নয়, বরং মানুষের ইচ্ছাই ওহির অনুগামী।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, “তুমি কি জানো সেই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কী ছিল? তারা নিজেদের যুক্তির চেয়ে ওহির প্রজ্ঞাকে অগ্রাধিকার দিত। যখন কোনো বিধান নাজিল হতো, তারা ‘কেন’ বা ‘কীভাবে’ বলে সময় নষ্ট করত না। তারা জানতেন, মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন। তারা নিজেদের অহংকারকে আইন বানায়নি, বরং নিজেদেরকে ওহির ছাঁচে গড়ে নিয়েছিল।”
তিনি আবার একটি কাব্যিক বাক্য উচ্চারণ করলেন—
“যে হৃদয় আকাশের আলোর দিকে তাকাতে শেখে, পৃথিবীর ধুলোবালি তাকে আর অন্ধ করতে পারে না।”
যুবকটি দীর্ঘ সময় নীরব রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই আলোচনা যেন কেবল একটি সামাজিক বিধান নিয়ে নয়। এটি আসলে মানুষের অহংকার আর স্রষ্টার প্রতি বিনয়ের এক চিরন্তন লড়াই।
বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তুমি একটি বিষয় মনে রেখো। ইসলামে পর্দা বা শালীনতা কেবল একটি পোশাক নয়। এটি একটি সামগ্রিক জীবনদর্শনের অংশ। একটি সমাজ তখনই শান্তিময় হয়, যখন সেখানে তিনটি জিনিস থাকে—লজ্জা (হায়া), পারস্পরিক সম্মান এবং আত্মসংযম। যেখানে চোখ সংযত, সেখানে হৃদয় নিরাপদ। আর যেখানে হৃদয় নিরাপদ, সেখানে সমাজও নিরাপদ।”
যুবকটি ধীরে মাথা নিচু করল। তার মনে হচ্ছিল—তার বিক্ষিপ্ত প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর ছবির মধ্যে মিশে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে বলল, “তাহলে আসল প্রশ্নটি হয়তো নিয়ম বদলানো নিয়ে নয়। আসল প্রশ্নটি হলো—মানুষ কি তার ভেতরের পৈশাচিক প্রবৃত্তিকে জয় করতে পেরেছে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক মৃদু হাসলেন। তার চোখে তখন গভীর প্রশান্তি। তিনি বললেন, “যেদিন মানুষ নিজের ভেতরকে শুদ্ধ করতে শিখবে, সেদিন আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি বিধান তার কাছে বোঝা নয়, বরং সম্মানের এক অভেদ্য ঢাল মনে হবে। কারণ এই বিধানগুলো মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং তাকে পাশবিকতার স্তর থেকে তুলে ফেরেশতাদের মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।”
লাইব্রেরির আলো তখন ধীরে নিভে এল। আর সেই নীরব রাতের ভেতরে একটি শেষ প্রশ্ন যেন বাতাসে ভেসে রইল—
“মানুষ কি সত্যিই আধুনিক হয়েছে, নাকি কেবল তার প্রযুক্তি আধুনিক হয়েছে—কিন্তু তার হৃদয় এখনও সেই প্রাচীন অন্ধকারেই রয়ে গেছে?”
[সময়ের ওপারে শাশ্বত আইন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group
Translation is not possible.
রমজান আসলে আকাশের দরজা একটু বেশি খোলা থাকে। পৃথিবীর দিকে নেমে আসে এক অদৃশ্য প্রশান্তি। মানুষের হৃদয় তখন একটু নরম হয়, চোখে পানি একটু সহজে আসে, আর দোয়ার শব্দগুলো যেন আকাশে একটু দ্রুত পৌঁছে যায়। এই মাসটাকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে সাজিয়েছেন, যেন প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, প্রতিটি সেহরি ও প্রতিটি ইফতার মানুষকে তাঁর দিকে একটু করে ফিরিয়ে নেয়। তবু বিস্ময়ের বিষয়, আমরা এই মাসের বিশাল সমুদ্রকে ছেড়ে একটি নির্দিষ্ট ঢেউয়ের পেছনে ছুটে যাই।
লাইলাতুল কদর নিয়ে আমাদের আবেগ সত্যিই অসীম। কেউ বলছে ২১, কেউ বলছে ২৩, কেউ আবার দৃঢ় কণ্ঠে বলছে ২৭ তারিখই সেই রাত। সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা, মসজিদে বিতর্ক, বন্ধুদের মাঝে তর্ক—আজ কি সেই রাত? কেউ জোড় সংখ্যা বলে বলছে আজ এমন, কাল তেমন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ হাদিস কী বলেছে? সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ লাইলাতুল কদরের সুনির্দিষ্ট তারিখ জানানোর জন্য ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। কিন্তু দুজন মুসলমানের মাঝে ঝগড়া হচ্ছিল। সেই ঝগড়ার কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীজির অন্তর থেকে সেই নির্দিষ্ট তারিখের জ্ঞান উঠিয়ে নেন। নবীজি ﷺ বললেন, "হয়তো এর ভেতরেই তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে। তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এর সন্ধান করো।"
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যেই মানুষ পুরো রমজান ঘুমিয়ে কাটিয়েছে, যার কুরআনের সাথে সম্পর্ক নেই, যার চোখ কখনো তাহাজ্জুদের অন্ধকারে ভিজে ওঠেনি, সে হঠাৎ করে একটি রাতের জন্য এত ব্যস্ত হয়ে ওঠে কেন? পুরো রমজান নিয়ে যাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই, তারা লাইলাতুল কদরের জন্য ভীষণ বিজি। মানলাম লাইলাতুল কদর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রমজানের প্রথম দিন থেকে শেষ অব্দি পর্যন্ত কি ইবাদাত করতে হবে না? ইসলাম কি কোনো 'শর্টকাট' বা ম্যাজিকের নাম, যেখানে ত্রিশ দিনের সাধনাকে বাদ দিয়ে কেবল এক রাতের আবেগে সব অর্জন করে নেওয়া যায়?
কুরআন যখন লাইলাতুল কদরের কথা বলেছে, তখন সেটিকে আলাদা করে মহিমান্বিত করেছে ঠিকই। আল্লাহ বলেন, "লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।" এই আয়াত মানুষের অন্তরে বিস্ময়ের আলো জ্বালায়। হাজার মাস—মানে প্রায় তিরাশি বছর চার মাসেরও বেশি সময়। একজন মানুষের গড় আয়ুর চেয়েও বড় একটি জীবন। একটি রাত, আর সেই রাতের ইবাদত এত দীর্ঘ সময়ের অবিরাম আমলের চেয়েও মূল্যবান। কিন্তু এই আয়াতের ভেতরে আরেকটি গভীর শিক্ষা আছে। আল্লাহ আমাদেরকে একটি রাতের মহিমা জানালেন, কিন্তু পুরো সূরার ভেতরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করলেন যেখানে মানুষ বুঝতে পারে—এই রাত হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না; এটি আসে সেই হৃদয়ে, যে হৃদয় পুরো মাস ধরে আল্লাহর দিকে হাঁটতে থাকে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন রমজানের শেষ দশ দিন পেতেন, তখন তাঁর জীবন বদলে যেত। উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রা.) বলেন, "রমজানের শেষ দশক শুরু হলে নবীজি ﷺ তাঁর কোমর বেঁধে নিতেন (ইবাদতের জন্য কঠোর প্রস্তুতি নিতেন), নিজে রাত জাগতেন এবং তাঁর পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন।" এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট রাতকে নিশ্চিত করে বলেননি—এই রাতেই লাইলাতুল কদর। কেন? কারণ আল্লাহ চেয়েছেন মানুষ যেন একটি রাতের জন্য নয়, একটি সময়ের জন্য জেগে ওঠে। যদি ২৭ তারিখকেই সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো, তবে মানুষ কেবল ওই একটি রাতেই মসজিদে ভিড় করত এবং বাকি পুরো বছর অবহেলায় কাটিয়ে দিত। আল্লাহ মানুষের এই মনস্তত্ত্ব জানেন বলেই রাতটিকে লুকিয়ে রেখেছেন, যাতে খোঁজার ছল করে মানুষ অন্তত দশটি রাত নিজের রবের সামনে দাঁড়ায়।
এইখানেই আমাদের বাস্তবতা একটু ব্যথা দেয়। রমজানের প্রথম বিশ দিন যেন আমাদের কাছে খুব সাধারণ দিন। মসজিদে লোক কম, তাহাজ্জুদ প্রায় শূন্য, কুরআন খতমের পরিকল্পনা অনেকের মাথায়ও আসে না। কিন্তু ২৭ রমজান এলে হঠাৎ করে মসজিদ ভরে যায়। রাতভর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে পানি, হাতে দোয়া, কণ্ঠে মিনতি। দৃশ্যটি সুন্দর, হৃদয়গ্রাহী। আল্লাহর রহমতের দরজা এতই প্রশস্ত যে, কেউ যদি ২৭তম রাতেও খাঁটি তওবা করে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকেও শূন্য হাতে ফেরান না। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়—যদি এই কান্না ১ রমজান থেকেই শুরু হতো? যদি এই জাগরণ পুরো মাস জুড়ে হতো, তবে আত্মা কতটুকু পবিত্র হতে পারত?
আল্লাহর কাছে সময়ের মূল্য মানুষের মতো নয়। মানুষের কাছে বিশেষ দিন মানে উৎসব, কিন্তু আল্লাহর কাছে বিশেষত্ব আসে ধারাবাহিকতায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা কম হয়। এই হাদিসটি আমাদের ইবাদতের দর্শন বদলে দেয়। ইসলাম কোনো "এক রাতের আবেগ" নয়; এটি একটি জীবনব্যাপী যাত্রা। একদিনে দশ পারা কুরআন পড়ে পুরো বছর কুরআন না ছোঁয়ার চেয়ে, প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা করে মৃত্যু অবধি পড়া আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
সালাফদের জীবনে আমরা এই সত্যের বাস্তব রূপ দেখি। তারা লাইলাতুল কদরের জন্য অপেক্ষা করতেন, কিন্তু সেটিকে আলাদা কোনো উৎসবে পরিণত করেননি। তাদের জন্য পুরো রমজানই ছিল প্রস্তুতির সময়। সালাফদের জীবনী ঘাঁটলে দেখা যায়, কেউ কেউ ছয় মাস ধরে দোয়া করতেন—আল্লাহ যেন তাদেরকে রমজান পর্যন্ত জীবিত রাখেন। আবার রমজান শেষ হলে ছয় মাস ধরে দোয়া করতেন—আল্লাহ যেন তাদের রমজানের আমল কবুল করেন। তারা রাতের অন্ধকারে এমনভাবে সিজদায় পড়ে থাকতেন যেন তাদের পিঠে পাখিরা এসে বসতে পারত। ভাবুন, যাদের হৃদয় এমন ছিল, যারা পুরো বছরকে রমজান বানিয়ে নিয়েছিলেন, তারা কি শুধু একটি রাতের জন্য ব্যস্ত হতেন?
একজন সালাফী আলেম বলেছিলেন, "যে মানুষ লাইলাতুল কদর পেতে চায়, সে যেন পুরো রমজানকে লাইলাতুল কদরের মতো করে কাটায়।" এই কথার ভেতরে গভীর সত্য আছে। কারণ আল্লাহ এমন একটি রাতকে লুকিয়ে রেখেছেন, যাতে মানুষ খোঁজার ভেতর দিয়ে নিজেকে বদলে ফেলে।
আজকের সমাজে আরেকটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। রমজানের শেষ দশ দিন শুরু হলেই মার্কেটগুলো ভরে যায়। মা-বোনদের বলি, মার্কেট করুন, ভালো কথা। তবে লাইলাতুল কদর বাদ দিয়ে? লাস্ট ১০ দিন তো উনাদের মার্কেটের ধুম পড়ে যায়। দোকানের আলো, কেনাকাটার ব্যস্ততা, ঈদের প্রস্তুতি—সবকিছু যেন একসাথে বিস্ফোরিত হয়। বিশেষ করে রাতের সময়, যখন মসজিদে কুরআনের তিলাওয়াত হচ্ছে, তখন শহরের অন্য প্রান্তে বাজারের কোলাহল চলছে। মানুষ জামা বেছে নিচ্ছে, দামাদামি করছে, ছবি তুলছে।
এখানে সমস্যাটা কেনাকাটায় নয়। ইসলাম কখনো সৌন্দর্য বা আনন্দের বিরুদ্ধে নয়। সমস্যা তখন হয়, যখন একটি পবিত্র সময়ের হৃদয় আমরা হারিয়ে ফেলি। যখন জিবরাইল (আ.) অগণিত ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে নামছেন, তখন আমরা কাপড়ের রং মেলাতে ব্যস্ত। যখন লাইলাতুল কদরের রাতগুলো আমাদের জীবনে শুধু কেনাকাটার মাঝে হারিয়ে যায়, তখন মনে হয় আমরা যেন অমূল্য হীরাকে খেলনার মতো ব্যবহার করছি। তিরাশি বছরের ইবাদতের সমান একটি রাতকে আমরা কয়েক গজ কাপড়ের জন্য বিক্রি করে দিচ্ছি।
কুরআন বলছে, "তারা আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা দেয়নি।" এই আয়াতটি শুধু মুশরিকদের জন্য নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও প্রশ্ন তোলে। আমরা কি সত্যিই আল্লাহর দেওয়া সময়ের মর্যাদা বুঝি?
রমজান আসলে আত্মার বিপ্লবের মাস। এখানে ক্ষুধা শুধু শরীরকে কষ্ট দেয় না; এটি হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। নফস বা প্রবৃত্তি যখন খাবারের অভাবে নিস্তেজ হতে থাকে, তখন রুহ বা আত্মা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যখন মানুষ সারাদিন পানি ছাড়া থাকে, তখন সে বুঝতে পারে তার ভেতরে কত দুর্বলতা আছে। সে অনুধাবন করে, আল্লাহর দেওয়া এক গ্লাস পানির কাছে দুনিয়ার সমস্ত ক্ষমতা কতটা তুচ্ছ। আর যখন সে রাতের অন্ধকারে সিজদায় মাথা রাখে, তখন তার আত্মা বুঝতে পারে—সে একা নয়, তার রব তাকে দেখছেন।
লাইলাতুল কদর সেই মুহূর্ত, যখন আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরি হয়। কুরআন বলছে, সেই রাতে ফেরেশতারা অবতরণ করেন। জিবরীলও অবতরণ করেন। হাদিসে এসেছে, সেই রাতে পৃথিবীতে নুড়িপাথরের চেয়েও বেশি সংখ্যক ফেরেশতা নেমে আসে। কল্পনা করুন সেই দৃশ্য—পৃথিবীর অন্ধকার রাত, আর আকাশ থেকে নেমে আসছে আলোর বাহিনী। তারা সেই ঘরগুলোর দিকে তাকায়, যেখানে মানুষ সিজদায় কাঁদছে। তারা আমিন আমিন বলে মানুষের দোয়ায় শরিক হয়। কিন্তু সেই ঘর কি আমাদের ঘর? নাকি সেই সময় আমরা বাজারের আলোয় ব্যস্ত?
কখনো কখনো মনে হয় আমরা ইসলামের গভীর সৌন্দর্যকে খুব সহজ করে ফেলেছি। আমরা ভাবি, একটি নির্দিষ্ট রাতেই সবকিছু হবে। অথচ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন—জীবনের পরিবর্তন আসে ধীরে ধীরে, ধারাবাহিকতায়।
একটি বীজ যেমন এক রাতে গাছ হয়ে যায় না, মাটির অন্ধকারে তাকে নীরবে লড়তে হয়, তেমনি একটি রাত মানুষকে বদলে দেয় না যদি তার ভেতরে প্রস্তুতি না থাকে।
রমজান সেই প্রস্তুতির নাম।
এই মাস আমাদের শেখায়—একটি হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরতে হলে তাকে ধীরে ধীরে নরম হতে হয়। কুরআনের শব্দ, সিজদার অশ্রু, দানের হাত, ধৈর্যের ক্ষুধা—সবকিছু মিলে একটি মানুষকে বদলে দেয়। লাইলাতুল কদর সেই পরিবর্তনের শিখর।
একজন মানুষ যদি পুরো রমজান আল্লাহকে ভুলে থাকে, আর শুধু একটি রাতে তাকে খুঁজে, তাহলে সেই খোঁজটা অনেকটা এমন—যেন কেউ সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে এক মুঠো পানি তুলে বলে, আমি সমুদ্রকে বুঝে ফেলেছি। সমুদ্র বুঝতে হলে তার গভীরে ডুব দিতে হয়, তার নোনাজল গায়ে মাখতে হয়।
সালাফদের জীবন পড়লে বোঝা যায়, তারা রাতকে ভয় পেতেন না; তারা রাতকে ভালোবাসতেন। কারণ রাত ছিল তাদের এবং আল্লাহর মাঝে একান্ত সময়। কেউ কুরআন পড়তেন, কেউ দীর্ঘ সিজদায় কাঁদতেন, কেউ নিঃশব্দে দোয়া করতেন। তাদের চোখে রাতের অন্ধকার ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তাদের রাত ছিল নীরব বিপ্লব।
আজকের পৃথিবী শব্দে ভরা। মোবাইলের আলো, নোটিফিকেশনের শব্দ, সামাজিক মাধ্যমের ব্যস্ততা—সবকিছু মানুষের হৃদয়কে বিভ্রান্ত করে রাখে। আমরা এক অদ্ভুত নেশায় বন্দি। আমরা কখনো কখনো নামাজ পড়ি, কিন্তু মন অন্য কোথাও থাকে। আমরা কুরআন পড়ি, কিন্তু শব্দগুলো হৃদয়ে পৌঁছায় না, কেবল ঠোঁটের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।
রাতের আকাশ যখন স্তব্ধ হয়, ফেরেশতারা নামে ডানা মেলে,
অন্ধকার চিরে আলো আসে, যদি হৃদয় সত্যি রবের পানে গলে।
লাইলাতুল কদর আসলে সেই রাত, যখন মানুষকে নিজের ভেতরে ফিরে যেতে হয়। দুনিয়ার সমস্ত কোলাহল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল রবের সামনে নিজের অস্তিত্বকে সমর্পণ করতে হয়।
একটি সিজদা, একটি দোয়া, একটি কান্না—এগুলোই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হয়ে যায়।
কখনো কখনো মনে হয় আকাশ থেকে একটি প্রশ্ন নেমে আসে— "হে মানুষ, তুমি কি সত্যিই আমাকে খুঁজছ?"
যদি আমরা সত্যিই খুঁজি, তাহলে সেই খোঁজ একটি রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা পুরো রমজান জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি রমজান শেষ হলেও সেই খোঁজ শেষ হবে না। কারণ যে অন্তর একবার তার রবের স্বাদ পেয়ে যায়, সে আর দুনিয়ার কোনো মরিচিকাতে তৃপ্ত হয় না।
কারণ আল্লাহকে যে সত্যিই খুঁজে পায়, তার কাছে প্রতিটি রাতই হয়ে যায় সম্ভাব্য লাইলাতুল কদর। হয়তো কোনো অজানা রাতের অন্ধকারে, যখন শহর ঘুমিয়ে আছে, কেউ একটি সিজদায় কাঁদছে—আর সেই মুহূর্তে তার আকাশ খুলে যাচ্ছে। হয়তো কোনো নিঃশব্দ দোয়ায় তার জীবনের পথ বদলে যাচ্ছে। হয়তো সেই রাতটাই তার জন্য লাইলাতুল কদর।
এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। এখানে রহস্য আছে, গভীরতা আছে, এবং আছে হৃদয়ের এক অন্তহীন যাত্রা। রমজান আমাদের শেখায়—আল্লাহকে পাওয়া যায় না হঠাৎ করে; তাকে পাওয়া যায় ধীরে ধীরে, প্রতিদিন একটু একটু করে।
আর যখন একটি হৃদয় সত্যিই জেগে ওঠে, তখন সে আর শুধু একটি রাত খোঁজে না।
সে পুরো জীবনটাই আল্লাহর দিকে হাঁটতে শুরু করে। কখনো নিঃশব্দে, কখনো অশ্রুতে, কখনো কুরআনের শব্দে। আর তখন আকাশের ফেরেশতারা হয়তো বলে ওঠে— "এই হৃদয়টি জেগে উঠেছে।" আর যখন একটি হৃদয় জেগে ওঠে, তখন তার কাছে পুরো পৃথিবী বদলে যায়।
[এক রাতের আবেগ নাকি এক জীবনের জাগরণ?]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group