[1]
একটি প্রশ্ন কখনও কখনও ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ে। সেই প্রশ্নটি তলোয়ারের মতো নয়—যা শব্দ করে আঘাত করে। বরং মরুভূমির বাতাসের মতো—নীরবে আসে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের গভীর বালুকণাগুলোকে নড়িয়ে দেয়।
রিয়াদের একটি পুরোনো লাইব্রেরিতে বসে ছিল যুবকটি। বাইরে রাত নেমেছে। যুবকটির হাতে একটি পুরোনো কিতাব, কিন্তু তার চোখ বইয়ের অক্ষরে স্থির ছিল না। তার মাথার ভেতর ঘুরছিল কিছু প্রশ্ন। একসময় সে অস্ফুট স্বরে নিজেকেই বলল,
“যদি সময় বদলে যায়, তবে নিয়ম কেন বদলায় না?”
তার সামনেই বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ শিক্ষক। তিনি ধীরে কিতাবটি বন্ধ করলেন।
“তুমি কি জানো,” তিনি বললেন, “প্রশ্ন মানুষের শত্রু নয়। প্রশ্ন হচ্ছে জ্ঞানের প্রবেশদ্বার। কিন্তু দরজায় কড়া নাড়ার আগে জানতে হয়—সেই দরজার ওপারে কী আছে।”
যুবকটি একটু নড়েচড়ে বসল।
“আমার প্রশ্নগুলো খুব সরল,” সে বলল। “চৌদ্দশো বছর আগে আরব ছিল ভিন্ন। তখন ঘরে ঘরে শৌচাগার ছিল না, আজকের মতো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। পর্দার বিধান কি কেবল সেই যুগের প্রতিকূলতা থেকে বাঁচার জন্য একটি সাময়িক কৌশল ছিল না? আজ তো পৃথিবী আধুনিক হয়েছে, নিরাপত্তা বেড়েছে।”
বৃদ্ধ শিক্ষক মৃদু হাসলেন।
“পৃথিবী বদলেছে—এটা সত্য। কিন্তু মানুষের ভেতরের জগত কি বদলেছে?”
যুবকটি চুপ করে রইল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “একটি প্রশ্ন আমি তোমাকে করি। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি কি চৌদ্দশো বছর আগের চেয়ে উন্নত?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে যৌন অপরাধ, শোষণ, আর পৈশাচিক লালসা—এসব কি কমেছে? বরং পরিসংখ্যান বলছে, আধুনিকতা যত বেড়েছে, নৈতিক অবক্ষয় তত জটিল রূপ নিয়েছে।”
যুবকটি উত্তর দিতে পারল না। বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন,
“ইসলাম যখন কোনো নৈতিক আইন দেয়, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ভূখণ্ডের জন্য দেয় না। তা দেয় মানুষের চিরন্তন প্রকৃতির (ফিতরাত) জন্য। প্রযুক্তি বদলালেও মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তি আর রিপুগুলো বদলায়নি। আর শৌচাগার বা অন্ধকারের যে যুক্তিটি তুমি দিলে, সেটি পর্দার বিধানের একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল না। কুরআনের সুরা আহজাবে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে যেন নারীদের চেনা যায় (তাদের অনন্য মর্যাদা ও স্বতন্ত্র পরিচয় বোঝা যায়) এবং তাদের উত্যক্ত করা না হয়। অর্থাৎ এটি ছিল নারীর সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তার একটি স্থায়ী বর্ম।”
তারপর তিনি ধীরে একটি আয়াত পাঠ করলেন— “মুমিন পুরুষদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে...” (সুরা নূর: ৩০)
তিনি থামলেন।
“দেখলে? এখানে প্রথম নির্দেশটি নারীকে নয়, বরং পুরুষকে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম সমস্যার সমাধান কেবল কাপড়ের আবরণে খুঁজেনি, বরং সমস্যার মূলে—মানুষের মনস্তাত্ত্বিক কামনার উৎসে (চোখে) প্রথম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ইসলাম নৈতিকতাকে কেবল পোশাকে সীমাবদ্ধ করেনি, সে হাত দিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। পর্দা আসলে কোনো দেয়াল নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। বৃদ্ধের চোখে গভীর প্রজ্ঞা।
“তুমি কি জানো রোমান বা পারস্য সভ্যতা কেন ধ্বংস হয়েছিল? কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, বরং চরম নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে। নবীজি (সা.) জানতেন, মানুষের সমাজে দুটি জিনিস সবসময় থাকবে—দৃষ্টি এবং প্রবৃত্তি। আর যখন এই দুটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে উন্নত সভ্যতাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।”
যুবকটি এবার ধীরে বলল, “কিন্তু আজকের পৃথিবীতে তো মানুষ ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’র কথা বলে। পর্দা কি সেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়?”
বৃদ্ধের মুখে ম্লান হাসি। “স্বাধীনতা।” তিনি শব্দটি এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যেন সেটিকে ওজন করছেন। “একটি পাখি যখন দিগন্ত বিস্তৃত আকাশে উড়ে, তখন সে স্বাধীন। কিন্তু সে যদি ঝড়ের মরণনেশায় ঢুকে পড়ে, তবে কি সে সত্যিই স্বাধীন থাকে? স্বাধীনতার সাথে প্রজ্ঞার প্রয়োজন। ইসলাম যখন পর্দার কথা বলে, তখন সে কেবল কাপড়ের কথা বলে না। সে একটি সামাজিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরি করতে চায়—যেখানে মানুষ মানুষকে নিছক দেহের মোড়কে নয়, বরং মানুষ হিসেবে সম্মান করবে।”
লাইব্রেরির বাইরে বাতাস বইছিল। বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তুমি কি জানো সালাফদের (পূর্বসূরী) সমাজে একটি অদ্ভুত বিষয় ছিল? তারা আইনকে প্রশ্ন করার আগে নিজেদের আত্মাকে প্রশ্ন করত। এক যুবককে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক আলেম বললেন—রাস্তারও কিছু অধিকার আছে। যুবকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—রাস্তার অধিকার কী? আলেম উত্তর দিলেন—দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া এবং সালামের উত্তর দেওয়া।”
যুবকটি হঠাৎ এক গভীর সত্যের মুখোমুখি হলো। এই পুরো আলোচনা আসলে কেবল কাপড় নিয়ে নয়। এটি চোখ নিয়ে। এটি হৃদয় নিয়ে। এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষা নিয়ে। লাইব্রেরির আলো তখন ম্লান হয়ে এসেছে। বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“মানুষ যখন নিজের চোখকে পাহারা দেয় না, তখন তাকে আইন দিয়ে পাহারা দিতে হয়। আর যখন মানুষের হৃদয় জেগে ওঠে, তখন আইন আর বোঝা মনে হয় না; তখন তা হয়ে ওঠে সম্মানের এক অভেদ্য ঢাল।”
রাত আরও গভীর হলো। যুবকটির মনে শেষ একটি প্রশ্ন জন্ম নিল—
“যদি কেউ দাবি করে—একজন নারীকে উদ্দেশ্যহীনভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল বা তার ব্যক্তিগত সীমানা লঙ্ঘন করা হয়েছে—তবে কি সেটি আধুনিক ভাষায় ‘স্টকিং’ নয়? ইসলাম কি একে অপরাধ গণ্য করে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে তার দিকে তাকালেন।
“ইসলামি শরিয়তে একে বলা হয় মানুষের ‘হুরমাহ’ বা অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার লঙ্ঘন। কারও ব্যক্তিগত পথে বাধা হওয়া, তাকে অস্বস্তিতে ফেলা বা তার অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, এটি আখিরাতের আমলনামাতেও একটি কালো দাগ। ইসলামে মানুষের সম্মান রক্ষা করা প্রাণের চেয়েও মূল্যবান।”
বৃদ্ধের কন্ঠস্বর আরও গম্ভীর হলো—
“চলো দেখি, নবীজি (সা.) কীভাবে মদিনার রাস্তায় নারী-পুরুষের এই সামাজিক আচরণের সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল পর্দার আদেশ দেননি, তিনি পুরুষদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা নিচু করে হাঁটতে হয় এবং নারীদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্বকে সুরক্ষিত রেখে সমাজে ভূমিকা রাখতে হয়। সেই সমাজটি ছিল লজ্জা এবং সম্মানের সমন্বয়ে গড়া এক অনন্য দুর্গ।”
লাইব্রেরির বাইরের রাস্তা প্রায় নিঃশব্দ। দূরের মিনার থেকে ইশার নামাজের পরের নীরবতা যেন রিয়াদের আধুনিক স্থাপত্য আর মরুভূমির ধূলিকণার ওপর একটি কোমল চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। যুবকটি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল—প্রশ্নগুলো যেন ধীরে ধীরে অন্য রূপ নিচ্ছে।
বৃদ্ধ শিক্ষক জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের রাস্তায় জ্বলজ্বল করা সিসিটিভি ক্যামেরা আর আধুনিক নিরাপত্তা বাতিগুলোর দিকে ইশারা করে তিনি ধীরে বললেন, “তুমি একটু আগে যে প্রশ্নটি করলে—কেউ যদি কোনো নারীকে অনুসরণ করে, তবে কি সেটি আধুনিক ভাষায় ‘স্টকিং’ নয়? ইসলাম কি একে অপরাধ গণ্য করে?”
তিনি ঘুরে তাকালেন। “প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাসকে ভুলভাবে পড়লে মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।”
বৃদ্ধ টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো কিতাব খুললেন। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, যেন সময়ের ধুলো জমে আছে তার ওপর। “মদিনার সেই সমাজটি কল্পনা করো,” তিনি বললেন। “একটি শহর যেখানে নবী (সা.) মানুষকে নতুন করে সভ্যতা শিখাচ্ছেন। সেখানে তিনি কেবল আত্মিক শুদ্ধিই শেখাননি, বরং ‘হুরমাহ’ বা মানুষের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার এক কঠিন সামাজিক প্রাচীর গড়ে দিয়েছিলেন।”
যুবকটি ধীরে বলল, “কিন্তু কিছু মানুষ তো দাবি করে সাহাবীদের যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে কেউ কাউকে অনুসরণ করেছে বা দূর থেকে দেখেছে...”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “বাস্তবতা হলো, ইসলামে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ‘প্রাইভেসি’ লঙ্ঘন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নবী (সা.)-এর একটি ঘোষণা শোনো—কেউ যদি অন্যের ঘরের ভেতরে অনুমতি ছাড়া উঁকি দেয়, তবে তার চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গৃহকর্তার ওপর কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার দায় নেই। এই একটি ঘোষণা থেকেই বোঝা যায়, ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষায় ইসলাম কতটা কঠোর।”
যুবকটি বিস্মিত হয়ে তাকাল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “দেখো, আধুনিক রাষ্ট্র আজ রাস্তায় হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলো অবশ্যই প্রয়োজন এবং এগুলো আমাদের সহায়ক। কিন্তু একটি প্রশ্ন করো নিজেকে—যদি মানুষের হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়, তবে কি কেবল ক্যামেরা তাকে থামাতে পারবে? আজ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির দেশেও কি অপরাধ থেমে আছে?”
যুবকটি চুপ করে রইল। বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন, “প্রযুক্তি অপরাধী ধরতে পারে, কিন্তু অপরাধ করার মানসিকতা মুছে দিতে পারে না। ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধী নয়, কিন্তু ইসলাম মনে করে প্রযুক্তি হলো বাইরের প্রহরী। আর প্রকৃত নিরাপত্তা আসে তখন, যখন মানুষের ভেতরে একটি অদৃশ্য ‘ভেতরের প্রহরী’ বা তাকওয়া জেগে ওঠে। ইসলাম মানুষের সেই বিবেককে পাহারা দিতে শেখায়।”
লাইব্রেরির বাতাসে কাগজের পাতার শব্দ হলো। যুবকটি ধীরে বলল, “তাহলে কেন অনেক মানুষ মনে করে—পর্দা নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “কারণ তারা স্বাধীনতাকে দেখে ‘ইন্দ্রীয়র দাসত্ব’ হিসেবে। কিন্তু ইসলামের চোখে পর্দা কোনো বাধা নয়—এটি একটি পরিচয়। কুরআনের ভাষায়—‘এটি তাদেরকে চেনার জন্য এবং যাতে তারা উত্যক্ত না হয়’। অর্থাৎ পর্দা নারীকে সমাজ থেকে আলাদা করে না, বরং তাকে একটি সম্মানিত আসনে বসিয়ে নিরাপত্তা দেয়।”
বৃদ্ধ এবার যুবকের কাছে এসে দাঁড়ালেন। “তুমি রাস্তার হকের কথা শুনেছিলে? নবী (সা.) যখন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করার এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি মূলত একটি ‘পাবলিক স্পেস এথিক্স’ বা জনসমাগমস্থলে আচরণের নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। সেখানে নারীর কাপড় যেমন একটি ঢাল, পুরুষের লজ্জাশীল চোখও তেমনি একটি দেয়াল।”
বৃদ্ধের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত গভীরতা। “একটি সভ্যতা তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তার আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানুষের নৈতিক শক্তি—দুটোই একসাথে কাজ করে। যখন আইন কেবল বাইরে নয়, মানুষের হৃদয়েও রাজত্ব করে।”
যুবকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হচ্ছিল—তার প্রশ্নগুলোর কঠোরতা ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক তখনই আরেকটি নতুন প্রশ্ন উঁকি দিল। সে ধীরে বলল, “কিন্তু যদি কেউ বলে—পোশাক তো একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ। কেন একটি ধর্মের নিয়ম আজকের গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে সবার ওপর প্রয়োগ হবে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন। তার চোখে তখন মরুভূমির রাতের মতো এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি বললেন, “তাহলে আমাদের তৃতীয় আলোচনায় যেতে হবে। সেখানে আমরা দেখব—ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সামাজিক নৈতিকতার ভারসাম্য কোথায়।”
লাইব্রেরির ভেতরে এখন কেবল দুটি আলো জ্বলছে—একটি টেবিল ল্যাম্প, আরেকটি জানালার বাইরে শহরের আলো। দূরে কোনো গাড়ি চলে গেলে তার শব্দ কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকে, তারপর আবার নীরবতা। যুবকটি এবার আগের চেয়ে শান্ত। কিন্তু তার ভেতরে নতুন একটি প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।
সে ধীরে বলল, “কিন্তু যদি কেউ বলে—পোশাক তো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। একজন মানুষ কী পরবে, সেটি কি তার নিজের অধিকার নয়?”
বৃদ্ধ শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। যেন প্রশ্নটিকে তিনি তাড়াহুড়া করে উত্তর দিতে চান না। তিনি ধীরে টেবিলে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন, “স্বাধীনতা শব্দটি মানুষ খুব ভালোবাসে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে—স্বাধীনতার সীমা কোথায় শেষ হয়।”
যুবকটি তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধ বললেন, “একটি উদাহরণ দিই।” তিনি জানালার দিকে ইশারা করলেন। “ওই রাস্তাটি দেখছো? ধরো, কেউ বলল—আমি স্বাধীন। তাই আমি গাড়ি চালাব, কিন্তু কোনো নিয়ম মানব না। লাল বাতি মানব না, গতির সীমা মানব না। তাহলে কী হবে?”
যুবকটি বলল, “দুর্ঘটনা।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক তাই। তাই সভ্য সমাজে স্বাধীনতার সাথে দায়িত্বও থাকে। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারকে অস্বীকার করে না। বরং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনেক মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে—নারীর সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার, এমনকি বিবাহে সম্মতির অধিকার। কিন্তু একই সাথে ইসলাম একটি প্রশ্ন করে—ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা কি সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলে না?”
যুবকটি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “অবশ্যই ফেলে।”
বৃদ্ধ বললেন, “এটাই সামাজিক নৈতিকতার মূল প্রশ্ন। ইসলাম মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না। বরং সে জানে—মানুষের ভেতরে আকর্ষণ আছে, কামনা আছে। তাই সে সমাজকে এমনভাবে সাজাতে চায় যাতে সেই প্রবৃত্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে। আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই একটি ভুল করি—আমরা মনে করি নৈতিকতা কেবল একটি ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু বাস্তবে নৈতিকতা সবসময়ই সামাজিক। কারণ একজনের অনৈতিকতা অন্যজনের নিরাপত্তার অভাব তৈরি করে।”
তারপর তিনি একটি ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টানলেন। “একসময় আন্দালুস (স্পেন) ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত সভ্যতা। সেখানে বিজ্ঞান ছিল, জ্ঞান ছিল। কিন্তু যখন সেই সমাজ তার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে কেবল বিলাসিতা আর ইন্দ্রিয়পরায়ণতায় ডুবে গেল, তখন তার জ্ঞানও তাকে পতন থেকে রক্ষা করতে পারল না।”
যুবকটি গভীরভাবে শুনছিল। বৃদ্ধ বললেন, “তাই ইসলাম যখন শালীনতার কথা বলে, তখন সে কেবল কোনো বিশেষ লিঙ্গের পোশাক নিয়ে কথা বলে না। সে একটি শুদ্ধ সংস্কৃতি তৈরি করতে চায়। যেখানে পুরুষ তার চোখকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নারী তার মর্যাদাকে সুরক্ষিত রাখবে। সমাজ এমন হবে যেখানে মানুষকে নিছক ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে সম্মান করা হবে।”
যুবকটি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কি পর্দার কারণে নারীরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না?”
বৃদ্ধ হাসলেন। “নবী (সা.)-এর যুগের দিকে তাকাও। সেখানে নারীরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তারা মসজিদে আসতেন, ব্যবসা করতেন, এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে পরামর্শে অংশ নিতেন। পর্দার বিধান তাদের পথ রুদ্ধ করেনি, বরং তাদের জন্য একটি নিরাপদ বলয় তৈরি করেছিল—যাতে তারা তাদের মেধা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারেন, দেহ দিয়ে নয়।”
লাইব্রেরির বাতাসে যেন একটি গভীর শান্তি নেমে এসেছে। বৃদ্ধ আবার বললেন, “একটি কথা মনে রেখো। মানুষ যখন নিজের মর্যাদাকে সস্তা করে, তখন সমাজ তাকে সস্তা দৃষ্টিতেই দেখতে শুরু করে। আর যখন সমাজ নারীকে কেবল তার বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে বিচার করতে শুরু করে, তখন তার প্রকৃত মেধা ও আত্মা অবহেলিত থেকে যায়।”
যুবকটি দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার ভেতরে এখনও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে। সে ধীরে বলল, “কিন্তু অনেকেই বলে—এই নিয়মগুলো হয়তো অতীতের কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এসেছিল।”
বৃদ্ধ শিক্ষক এবার গভীরভাবে তাকালেন। তিনি টেবিলের উপর রাখা কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ‘ওহি’র দর্শন। কারণ মানুষের তৈরি আইন সময়ের সাথে তামাদি হয়ে যায়, কিন্তু স্রষ্টার আইন কেন সর্বজনীন?”
তিনি ধীরে বসে বললেন, “চলো, আমরা সেই ইতিহাসের দিকে তাকাই—যেখানে মানুষ বুঝেছিল, প্রকৃত আইন মানুষের ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয় না। বরং তা আসে পরম করুণাময়ের কাছ থেকে, যিনি মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।”
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। সময় যেন থেমে নেই, কিন্তু খুব ধীরে হাঁটছে। জানালার বাইরে রিয়াদের আকাশে শহরের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত সোনালি কুয়াশা তৈরি করেছে। বৃদ্ধ শিক্ষক টেবিলের উপর রাখা কুরআনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে এমন এক গভীরতা—যেন বহু বছরের প্রজ্ঞা সেখানে জমে আছে।
যুবকটি ধীরে বলল, “আপনি বলছিলেন—ওহি মানুষের ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয় না।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। এটিই বোঝা সবচেয়ে জরুরি। যখন মানুষ বলে—কোনো বিধান হয়তো একটি বিশেষ ঘটনার কারণে এসেছে, তখন তারা প্রায়ই ভুলে যায় একটি মৌলিক সত্য। ইসলামি শরিয়তে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বিধান নাজিলের ‘উপলক্ষ’ (সাবাবুন নুযুল) হতে পারে, কিন্তু বিধানের ‘উৎস’ নয়। উৎস হচ্ছে আল্লাহর শাশ্বত জ্ঞান।”
তিনি একটু থামলেন। “একটি উদাহরণ দিই। ধরো, আকাশে মেঘ জমেছে, তারপর বৃষ্টি নামল। কেউ যদি বলে—গাছের পাতার কারণে বৃষ্টি হয়েছে, তবে কি তা সঠিক হবে? পাতা হয়তো বৃষ্টির ফোঁটা ধরে রাখে, কিন্তু বৃষ্টি তৈরি করে না। ঠিক তেমনি ইতিহাসের কিছু ঘটনা ওহির প্রেক্ষাপট হতে পারে, কিন্তু ওহির স্রষ্টা নয়।”
লাইব্রেরির বাতাসে যেন কথাগুলো আরও ভারী হয়ে উঠল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “কুরআন ঘোষণা করেছে—আল্লাহ যা চান তাই বিধান দেন। কারণ তিনি মানুষের স্রষ্টা, আর স্রষ্টাই সবচেয়ে ভালো জানেন তার সৃষ্টির জন্য কোন নিয়মটি সব সময়ের জন্য কার্যকর।”
যুবকটি একটু সামনে ঝুঁকল। “কিন্তু অনেকেই বলে—কিছু সাহাবি কোনো বিষয়ে মতামত দিয়েছিলেন, তারপর সেই অনুযায়ী আয়াত নাজিল হয়েছিল। এতে কি মানুষের প্রভাব বোঝা যায় না?”
বৃদ্ধ শান্তভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “ইতিহাসে এমন ঘটনা আছে, যাকে ‘মুওয়াফাকাত’ বলা হয়। কিন্তু সেগুলোকে ভুলভাবে বোঝা হয়। যখন কোনো সাহাবি (যেমন ওমর রা.) একটি মত প্রকাশ করতেন এবং পরে সেই বিষয়ের সাথে মিল রেখে আয়াত নাজিল হতো, তখন তারা সেটিকে নিজেদের বিজয় মনে করতেন না। বরং তারা প্রকম্পিত হতেন এই ভেবে যে—আল্লাহর ইচ্ছা ও তার জ্ঞান কত সুদূরপ্রসারী। তারা জানতেন, ওহি কোনো মানুষের ইচ্ছার অনুগামী নয়, বরং মানুষের ইচ্ছাই ওহির অনুগামী।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, “তুমি কি জানো সেই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কী ছিল? তারা নিজেদের যুক্তির চেয়ে ওহির প্রজ্ঞাকে অগ্রাধিকার দিত। যখন কোনো বিধান নাজিল হতো, তারা ‘কেন’ বা ‘কীভাবে’ বলে সময় নষ্ট করত না। তারা জানতেন, মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন। তারা নিজেদের অহংকারকে আইন বানায়নি, বরং নিজেদেরকে ওহির ছাঁচে গড়ে নিয়েছিল।”
তিনি আবার একটি কাব্যিক বাক্য উচ্চারণ করলেন—
“যে হৃদয় আকাশের আলোর দিকে তাকাতে শেখে, পৃথিবীর ধুলোবালি তাকে আর অন্ধ করতে পারে না।”
যুবকটি দীর্ঘ সময় নীরব রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই আলোচনা যেন কেবল একটি সামাজিক বিধান নিয়ে নয়। এটি আসলে মানুষের অহংকার আর স্রষ্টার প্রতি বিনয়ের এক চিরন্তন লড়াই।
বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তুমি একটি বিষয় মনে রেখো। ইসলামে পর্দা বা শালীনতা কেবল একটি পোশাক নয়। এটি একটি সামগ্রিক জীবনদর্শনের অংশ। একটি সমাজ তখনই শান্তিময় হয়, যখন সেখানে তিনটি জিনিস থাকে—লজ্জা (হায়া), পারস্পরিক সম্মান এবং আত্মসংযম। যেখানে চোখ সংযত, সেখানে হৃদয় নিরাপদ। আর যেখানে হৃদয় নিরাপদ, সেখানে সমাজও নিরাপদ।”
যুবকটি ধীরে মাথা নিচু করল। তার মনে হচ্ছিল—তার বিক্ষিপ্ত প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর ছবির মধ্যে মিশে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে বলল, “তাহলে আসল প্রশ্নটি হয়তো নিয়ম বদলানো নিয়ে নয়। আসল প্রশ্নটি হলো—মানুষ কি তার ভেতরের পৈশাচিক প্রবৃত্তিকে জয় করতে পেরেছে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক মৃদু হাসলেন। তার চোখে তখন গভীর প্রশান্তি। তিনি বললেন, “যেদিন মানুষ নিজের ভেতরকে শুদ্ধ করতে শিখবে, সেদিন আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি বিধান তার কাছে বোঝা নয়, বরং সম্মানের এক অভেদ্য ঢাল মনে হবে। কারণ এই বিধানগুলো মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং তাকে পাশবিকতার স্তর থেকে তুলে ফেরেশতাদের মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।”
লাইব্রেরির আলো তখন ধীরে নিভে এল। আর সেই নীরব রাতের ভেতরে একটি শেষ প্রশ্ন যেন বাতাসে ভেসে রইল—
“মানুষ কি সত্যিই আধুনিক হয়েছে, নাকি কেবল তার প্রযুক্তি আধুনিক হয়েছে—কিন্তু তার হৃদয় এখনও সেই প্রাচীন অন্ধকারেই রয়ে গেছে?”
[সময়ের ওপারে শাশ্বত আইন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
[1]
একটি প্রশ্ন কখনও কখনও ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ে। সেই প্রশ্নটি তলোয়ারের মতো নয়—যা শব্দ করে আঘাত করে। বরং মরুভূমির বাতাসের মতো—নীরবে আসে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের গভীর বালুকণাগুলোকে নড়িয়ে দেয়।
রিয়াদের একটি পুরোনো লাইব্রেরিতে বসে ছিল যুবকটি। বাইরে রাত নেমেছে। যুবকটির হাতে একটি পুরোনো কিতাব, কিন্তু তার চোখ বইয়ের অক্ষরে স্থির ছিল না। তার মাথার ভেতর ঘুরছিল কিছু প্রশ্ন। একসময় সে অস্ফুট স্বরে নিজেকেই বলল,
“যদি সময় বদলে যায়, তবে নিয়ম কেন বদলায় না?”
তার সামনেই বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ শিক্ষক। তিনি ধীরে কিতাবটি বন্ধ করলেন।
“তুমি কি জানো,” তিনি বললেন, “প্রশ্ন মানুষের শত্রু নয়। প্রশ্ন হচ্ছে জ্ঞানের প্রবেশদ্বার। কিন্তু দরজায় কড়া নাড়ার আগে জানতে হয়—সেই দরজার ওপারে কী আছে।”
যুবকটি একটু নড়েচড়ে বসল।
“আমার প্রশ্নগুলো খুব সরল,” সে বলল। “চৌদ্দশো বছর আগে আরব ছিল ভিন্ন। তখন ঘরে ঘরে শৌচাগার ছিল না, আজকের মতো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। পর্দার বিধান কি কেবল সেই যুগের প্রতিকূলতা থেকে বাঁচার জন্য একটি সাময়িক কৌশল ছিল না? আজ তো পৃথিবী আধুনিক হয়েছে, নিরাপত্তা বেড়েছে।”
বৃদ্ধ শিক্ষক মৃদু হাসলেন।
“পৃথিবী বদলেছে—এটা সত্য। কিন্তু মানুষের ভেতরের জগত কি বদলেছে?”
যুবকটি চুপ করে রইল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “একটি প্রশ্ন আমি তোমাকে করি। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি কি চৌদ্দশো বছর আগের চেয়ে উন্নত?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে যৌন অপরাধ, শোষণ, আর পৈশাচিক লালসা—এসব কি কমেছে? বরং পরিসংখ্যান বলছে, আধুনিকতা যত বেড়েছে, নৈতিক অবক্ষয় তত জটিল রূপ নিয়েছে।”
যুবকটি উত্তর দিতে পারল না। বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন,
“ইসলাম যখন কোনো নৈতিক আইন দেয়, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ভূখণ্ডের জন্য দেয় না। তা দেয় মানুষের চিরন্তন প্রকৃতির (ফিতরাত) জন্য। প্রযুক্তি বদলালেও মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তি আর রিপুগুলো বদলায়নি। আর শৌচাগার বা অন্ধকারের যে যুক্তিটি তুমি দিলে, সেটি পর্দার বিধানের একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল না। কুরআনের সুরা আহজাবে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে যেন নারীদের চেনা যায় (তাদের অনন্য মর্যাদা ও স্বতন্ত্র পরিচয় বোঝা যায়) এবং তাদের উত্যক্ত করা না হয়। অর্থাৎ এটি ছিল নারীর সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তার একটি স্থায়ী বর্ম।”
তারপর তিনি ধীরে একটি আয়াত পাঠ করলেন— “মুমিন পুরুষদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে...” (সুরা নূর: ৩০)
তিনি থামলেন।
“দেখলে? এখানে প্রথম নির্দেশটি নারীকে নয়, বরং পুরুষকে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম সমস্যার সমাধান কেবল কাপড়ের আবরণে খুঁজেনি, বরং সমস্যার মূলে—মানুষের মনস্তাত্ত্বিক কামনার উৎসে (চোখে) প্রথম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ইসলাম নৈতিকতাকে কেবল পোশাকে সীমাবদ্ধ করেনি, সে হাত দিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। পর্দা আসলে কোনো দেয়াল নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। বৃদ্ধের চোখে গভীর প্রজ্ঞা।
“তুমি কি জানো রোমান বা পারস্য সভ্যতা কেন ধ্বংস হয়েছিল? কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, বরং চরম নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে। নবীজি (সা.) জানতেন, মানুষের সমাজে দুটি জিনিস সবসময় থাকবে—দৃষ্টি এবং প্রবৃত্তি। আর যখন এই দুটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে উন্নত সভ্যতাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।”
যুবকটি এবার ধীরে বলল, “কিন্তু আজকের পৃথিবীতে তো মানুষ ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’র কথা বলে। পর্দা কি সেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়?”
বৃদ্ধের মুখে ম্লান হাসি। “স্বাধীনতা।” তিনি শব্দটি এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যেন সেটিকে ওজন করছেন। “একটি পাখি যখন দিগন্ত বিস্তৃত আকাশে উড়ে, তখন সে স্বাধীন। কিন্তু সে যদি ঝড়ের মরণনেশায় ঢুকে পড়ে, তবে কি সে সত্যিই স্বাধীন থাকে? স্বাধীনতার সাথে প্রজ্ঞার প্রয়োজন। ইসলাম যখন পর্দার কথা বলে, তখন সে কেবল কাপড়ের কথা বলে না। সে একটি সামাজিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরি করতে চায়—যেখানে মানুষ মানুষকে নিছক দেহের মোড়কে নয়, বরং মানুষ হিসেবে সম্মান করবে।”
লাইব্রেরির বাইরে বাতাস বইছিল। বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তুমি কি জানো সালাফদের (পূর্বসূরী) সমাজে একটি অদ্ভুত বিষয় ছিল? তারা আইনকে প্রশ্ন করার আগে নিজেদের আত্মাকে প্রশ্ন করত। এক যুবককে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক আলেম বললেন—রাস্তারও কিছু অধিকার আছে। যুবকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—রাস্তার অধিকার কী? আলেম উত্তর দিলেন—দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া এবং সালামের উত্তর দেওয়া।”
যুবকটি হঠাৎ এক গভীর সত্যের মুখোমুখি হলো। এই পুরো আলোচনা আসলে কেবল কাপড় নিয়ে নয়। এটি চোখ নিয়ে। এটি হৃদয় নিয়ে। এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষা নিয়ে। লাইব্রেরির আলো তখন ম্লান হয়ে এসেছে। বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“মানুষ যখন নিজের চোখকে পাহারা দেয় না, তখন তাকে আইন দিয়ে পাহারা দিতে হয়। আর যখন মানুষের হৃদয় জেগে ওঠে, তখন আইন আর বোঝা মনে হয় না; তখন তা হয়ে ওঠে সম্মানের এক অভেদ্য ঢাল।”
রাত আরও গভীর হলো। যুবকটির মনে শেষ একটি প্রশ্ন জন্ম নিল—
“যদি কেউ দাবি করে—একজন নারীকে উদ্দেশ্যহীনভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল বা তার ব্যক্তিগত সীমানা লঙ্ঘন করা হয়েছে—তবে কি সেটি আধুনিক ভাষায় ‘স্টকিং’ নয়? ইসলাম কি একে অপরাধ গণ্য করে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে তার দিকে তাকালেন।
“ইসলামি শরিয়তে একে বলা হয় মানুষের ‘হুরমাহ’ বা অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার লঙ্ঘন। কারও ব্যক্তিগত পথে বাধা হওয়া, তাকে অস্বস্তিতে ফেলা বা তার অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, এটি আখিরাতের আমলনামাতেও একটি কালো দাগ। ইসলামে মানুষের সম্মান রক্ষা করা প্রাণের চেয়েও মূল্যবান।”
বৃদ্ধের কন্ঠস্বর আরও গম্ভীর হলো—
“চলো দেখি, নবীজি (সা.) কীভাবে মদিনার রাস্তায় নারী-পুরুষের এই সামাজিক আচরণের সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল পর্দার আদেশ দেননি, তিনি পুরুষদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা নিচু করে হাঁটতে হয় এবং নারীদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্বকে সুরক্ষিত রেখে সমাজে ভূমিকা রাখতে হয়। সেই সমাজটি ছিল লজ্জা এবং সম্মানের সমন্বয়ে গড়া এক অনন্য দুর্গ।”
লাইব্রেরির বাইরের রাস্তা প্রায় নিঃশব্দ। দূরের মিনার থেকে ইশার নামাজের পরের নীরবতা যেন রিয়াদের আধুনিক স্থাপত্য আর মরুভূমির ধূলিকণার ওপর একটি কোমল চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। যুবকটি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল—প্রশ্নগুলো যেন ধীরে ধীরে অন্য রূপ নিচ্ছে।
বৃদ্ধ শিক্ষক জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের রাস্তায় জ্বলজ্বল করা সিসিটিভি ক্যামেরা আর আধুনিক নিরাপত্তা বাতিগুলোর দিকে ইশারা করে তিনি ধীরে বললেন, “তুমি একটু আগে যে প্রশ্নটি করলে—কেউ যদি কোনো নারীকে অনুসরণ করে, তবে কি সেটি আধুনিক ভাষায় ‘স্টকিং’ নয়? ইসলাম কি একে অপরাধ গণ্য করে?”
তিনি ঘুরে তাকালেন। “প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাসকে ভুলভাবে পড়লে মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।”
বৃদ্ধ টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো কিতাব খুললেন। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, যেন সময়ের ধুলো জমে আছে তার ওপর। “মদিনার সেই সমাজটি কল্পনা করো,” তিনি বললেন। “একটি শহর যেখানে নবী (সা.) মানুষকে নতুন করে সভ্যতা শিখাচ্ছেন। সেখানে তিনি কেবল আত্মিক শুদ্ধিই শেখাননি, বরং ‘হুরমাহ’ বা মানুষের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতার এক কঠিন সামাজিক প্রাচীর গড়ে দিয়েছিলেন।”
যুবকটি ধীরে বলল, “কিন্তু কিছু মানুষ তো দাবি করে সাহাবীদের যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে কেউ কাউকে অনুসরণ করেছে বা দূর থেকে দেখেছে...”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “বাস্তবতা হলো, ইসলামে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ‘প্রাইভেসি’ লঙ্ঘন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নবী (সা.)-এর একটি ঘোষণা শোনো—কেউ যদি অন্যের ঘরের ভেতরে অনুমতি ছাড়া উঁকি দেয়, তবে তার চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গৃহকর্তার ওপর কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার দায় নেই। এই একটি ঘোষণা থেকেই বোঝা যায়, ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষায় ইসলাম কতটা কঠোর।”
যুবকটি বিস্মিত হয়ে তাকাল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “দেখো, আধুনিক রাষ্ট্র আজ রাস্তায় হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলো অবশ্যই প্রয়োজন এবং এগুলো আমাদের সহায়ক। কিন্তু একটি প্রশ্ন করো নিজেকে—যদি মানুষের হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়, তবে কি কেবল ক্যামেরা তাকে থামাতে পারবে? আজ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির দেশেও কি অপরাধ থেমে আছে?”
যুবকটি চুপ করে রইল। বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন, “প্রযুক্তি অপরাধী ধরতে পারে, কিন্তু অপরাধ করার মানসিকতা মুছে দিতে পারে না। ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধী নয়, কিন্তু ইসলাম মনে করে প্রযুক্তি হলো বাইরের প্রহরী। আর প্রকৃত নিরাপত্তা আসে তখন, যখন মানুষের ভেতরে একটি অদৃশ্য ‘ভেতরের প্রহরী’ বা তাকওয়া জেগে ওঠে। ইসলাম মানুষের সেই বিবেককে পাহারা দিতে শেখায়।”
লাইব্রেরির বাতাসে কাগজের পাতার শব্দ হলো। যুবকটি ধীরে বলল, “তাহলে কেন অনেক মানুষ মনে করে—পর্দা নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “কারণ তারা স্বাধীনতাকে দেখে ‘ইন্দ্রীয়র দাসত্ব’ হিসেবে। কিন্তু ইসলামের চোখে পর্দা কোনো বাধা নয়—এটি একটি পরিচয়। কুরআনের ভাষায়—‘এটি তাদেরকে চেনার জন্য এবং যাতে তারা উত্যক্ত না হয়’। অর্থাৎ পর্দা নারীকে সমাজ থেকে আলাদা করে না, বরং তাকে একটি সম্মানিত আসনে বসিয়ে নিরাপত্তা দেয়।”
বৃদ্ধ এবার যুবকের কাছে এসে দাঁড়ালেন। “তুমি রাস্তার হকের কথা শুনেছিলে? নবী (সা.) যখন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করার এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি মূলত একটি ‘পাবলিক স্পেস এথিক্স’ বা জনসমাগমস্থলে আচরণের নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। সেখানে নারীর কাপড় যেমন একটি ঢাল, পুরুষের লজ্জাশীল চোখও তেমনি একটি দেয়াল।”
বৃদ্ধের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত গভীরতা। “একটি সভ্যতা তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তার আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানুষের নৈতিক শক্তি—দুটোই একসাথে কাজ করে। যখন আইন কেবল বাইরে নয়, মানুষের হৃদয়েও রাজত্ব করে।”
যুবকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হচ্ছিল—তার প্রশ্নগুলোর কঠোরতা ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক তখনই আরেকটি নতুন প্রশ্ন উঁকি দিল। সে ধীরে বলল, “কিন্তু যদি কেউ বলে—পোশাক তো একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ। কেন একটি ধর্মের নিয়ম আজকের গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে সবার ওপর প্রয়োগ হবে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন। তার চোখে তখন মরুভূমির রাতের মতো এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি বললেন, “তাহলে আমাদের তৃতীয় আলোচনায় যেতে হবে। সেখানে আমরা দেখব—ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সামাজিক নৈতিকতার ভারসাম্য কোথায়।”
লাইব্রেরির ভেতরে এখন কেবল দুটি আলো জ্বলছে—একটি টেবিল ল্যাম্প, আরেকটি জানালার বাইরে শহরের আলো। দূরে কোনো গাড়ি চলে গেলে তার শব্দ কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকে, তারপর আবার নীরবতা। যুবকটি এবার আগের চেয়ে শান্ত। কিন্তু তার ভেতরে নতুন একটি প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।
সে ধীরে বলল, “কিন্তু যদি কেউ বলে—পোশাক তো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। একজন মানুষ কী পরবে, সেটি কি তার নিজের অধিকার নয়?”
বৃদ্ধ শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। যেন প্রশ্নটিকে তিনি তাড়াহুড়া করে উত্তর দিতে চান না। তিনি ধীরে টেবিলে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন, “স্বাধীনতা শব্দটি মানুষ খুব ভালোবাসে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে—স্বাধীনতার সীমা কোথায় শেষ হয়।”
যুবকটি তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধ বললেন, “একটি উদাহরণ দিই।” তিনি জানালার দিকে ইশারা করলেন। “ওই রাস্তাটি দেখছো? ধরো, কেউ বলল—আমি স্বাধীন। তাই আমি গাড়ি চালাব, কিন্তু কোনো নিয়ম মানব না। লাল বাতি মানব না, গতির সীমা মানব না। তাহলে কী হবে?”
যুবকটি বলল, “দুর্ঘটনা।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক তাই। তাই সভ্য সমাজে স্বাধীনতার সাথে দায়িত্বও থাকে। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারকে অস্বীকার করে না। বরং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনেক মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে—নারীর সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার, এমনকি বিবাহে সম্মতির অধিকার। কিন্তু একই সাথে ইসলাম একটি প্রশ্ন করে—ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা কি সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলে না?”
যুবকটি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “অবশ্যই ফেলে।”
বৃদ্ধ বললেন, “এটাই সামাজিক নৈতিকতার মূল প্রশ্ন। ইসলাম মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না। বরং সে জানে—মানুষের ভেতরে আকর্ষণ আছে, কামনা আছে। তাই সে সমাজকে এমনভাবে সাজাতে চায় যাতে সেই প্রবৃত্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে। আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই একটি ভুল করি—আমরা মনে করি নৈতিকতা কেবল একটি ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু বাস্তবে নৈতিকতা সবসময়ই সামাজিক। কারণ একজনের অনৈতিকতা অন্যজনের নিরাপত্তার অভাব তৈরি করে।”
তারপর তিনি একটি ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টানলেন। “একসময় আন্দালুস (স্পেন) ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত সভ্যতা। সেখানে বিজ্ঞান ছিল, জ্ঞান ছিল। কিন্তু যখন সেই সমাজ তার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে কেবল বিলাসিতা আর ইন্দ্রিয়পরায়ণতায় ডুবে গেল, তখন তার জ্ঞানও তাকে পতন থেকে রক্ষা করতে পারল না।”
যুবকটি গভীরভাবে শুনছিল। বৃদ্ধ বললেন, “তাই ইসলাম যখন শালীনতার কথা বলে, তখন সে কেবল কোনো বিশেষ লিঙ্গের পোশাক নিয়ে কথা বলে না। সে একটি শুদ্ধ সংস্কৃতি তৈরি করতে চায়। যেখানে পুরুষ তার চোখকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নারী তার মর্যাদাকে সুরক্ষিত রাখবে। সমাজ এমন হবে যেখানে মানুষকে নিছক ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে সম্মান করা হবে।”
যুবকটি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কি পর্দার কারণে নারীরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না?”
বৃদ্ধ হাসলেন। “নবী (সা.)-এর যুগের দিকে তাকাও। সেখানে নারীরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তারা মসজিদে আসতেন, ব্যবসা করতেন, এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে পরামর্শে অংশ নিতেন। পর্দার বিধান তাদের পথ রুদ্ধ করেনি, বরং তাদের জন্য একটি নিরাপদ বলয় তৈরি করেছিল—যাতে তারা তাদের মেধা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারেন, দেহ দিয়ে নয়।”
লাইব্রেরির বাতাসে যেন একটি গভীর শান্তি নেমে এসেছে। বৃদ্ধ আবার বললেন, “একটি কথা মনে রেখো। মানুষ যখন নিজের মর্যাদাকে সস্তা করে, তখন সমাজ তাকে সস্তা দৃষ্টিতেই দেখতে শুরু করে। আর যখন সমাজ নারীকে কেবল তার বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে বিচার করতে শুরু করে, তখন তার প্রকৃত মেধা ও আত্মা অবহেলিত থেকে যায়।”
যুবকটি দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার ভেতরে এখনও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে। সে ধীরে বলল, “কিন্তু অনেকেই বলে—এই নিয়মগুলো হয়তো অতীতের কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এসেছিল।”
বৃদ্ধ শিক্ষক এবার গভীরভাবে তাকালেন। তিনি টেবিলের উপর রাখা কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ‘ওহি’র দর্শন। কারণ মানুষের তৈরি আইন সময়ের সাথে তামাদি হয়ে যায়, কিন্তু স্রষ্টার আইন কেন সর্বজনীন?”
তিনি ধীরে বসে বললেন, “চলো, আমরা সেই ইতিহাসের দিকে তাকাই—যেখানে মানুষ বুঝেছিল, প্রকৃত আইন মানুষের ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয় না। বরং তা আসে পরম করুণাময়ের কাছ থেকে, যিনি মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।”
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। সময় যেন থেমে নেই, কিন্তু খুব ধীরে হাঁটছে। জানালার বাইরে রিয়াদের আকাশে শহরের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত সোনালি কুয়াশা তৈরি করেছে। বৃদ্ধ শিক্ষক টেবিলের উপর রাখা কুরআনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে এমন এক গভীরতা—যেন বহু বছরের প্রজ্ঞা সেখানে জমে আছে।
যুবকটি ধীরে বলল, “আপনি বলছিলেন—ওহি মানুষের ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয় না।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। এটিই বোঝা সবচেয়ে জরুরি। যখন মানুষ বলে—কোনো বিধান হয়তো একটি বিশেষ ঘটনার কারণে এসেছে, তখন তারা প্রায়ই ভুলে যায় একটি মৌলিক সত্য। ইসলামি শরিয়তে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বিধান নাজিলের ‘উপলক্ষ’ (সাবাবুন নুযুল) হতে পারে, কিন্তু বিধানের ‘উৎস’ নয়। উৎস হচ্ছে আল্লাহর শাশ্বত জ্ঞান।”
তিনি একটু থামলেন। “একটি উদাহরণ দিই। ধরো, আকাশে মেঘ জমেছে, তারপর বৃষ্টি নামল। কেউ যদি বলে—গাছের পাতার কারণে বৃষ্টি হয়েছে, তবে কি তা সঠিক হবে? পাতা হয়তো বৃষ্টির ফোঁটা ধরে রাখে, কিন্তু বৃষ্টি তৈরি করে না। ঠিক তেমনি ইতিহাসের কিছু ঘটনা ওহির প্রেক্ষাপট হতে পারে, কিন্তু ওহির স্রষ্টা নয়।”
লাইব্রেরির বাতাসে যেন কথাগুলো আরও ভারী হয়ে উঠল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “কুরআন ঘোষণা করেছে—আল্লাহ যা চান তাই বিধান দেন। কারণ তিনি মানুষের স্রষ্টা, আর স্রষ্টাই সবচেয়ে ভালো জানেন তার সৃষ্টির জন্য কোন নিয়মটি সব সময়ের জন্য কার্যকর।”
যুবকটি একটু সামনে ঝুঁকল। “কিন্তু অনেকেই বলে—কিছু সাহাবি কোনো বিষয়ে মতামত দিয়েছিলেন, তারপর সেই অনুযায়ী আয়াত নাজিল হয়েছিল। এতে কি মানুষের প্রভাব বোঝা যায় না?”
বৃদ্ধ শান্তভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “ইতিহাসে এমন ঘটনা আছে, যাকে ‘মুওয়াফাকাত’ বলা হয়। কিন্তু সেগুলোকে ভুলভাবে বোঝা হয়। যখন কোনো সাহাবি (যেমন ওমর রা.) একটি মত প্রকাশ করতেন এবং পরে সেই বিষয়ের সাথে মিল রেখে আয়াত নাজিল হতো, তখন তারা সেটিকে নিজেদের বিজয় মনে করতেন না। বরং তারা প্রকম্পিত হতেন এই ভেবে যে—আল্লাহর ইচ্ছা ও তার জ্ঞান কত সুদূরপ্রসারী। তারা জানতেন, ওহি কোনো মানুষের ইচ্ছার অনুগামী নয়, বরং মানুষের ইচ্ছাই ওহির অনুগামী।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, “তুমি কি জানো সেই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কী ছিল? তারা নিজেদের যুক্তির চেয়ে ওহির প্রজ্ঞাকে অগ্রাধিকার দিত। যখন কোনো বিধান নাজিল হতো, তারা ‘কেন’ বা ‘কীভাবে’ বলে সময় নষ্ট করত না। তারা জানতেন, মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন। তারা নিজেদের অহংকারকে আইন বানায়নি, বরং নিজেদেরকে ওহির ছাঁচে গড়ে নিয়েছিল।”
তিনি আবার একটি কাব্যিক বাক্য উচ্চারণ করলেন—
“যে হৃদয় আকাশের আলোর দিকে তাকাতে শেখে, পৃথিবীর ধুলোবালি তাকে আর অন্ধ করতে পারে না।”
যুবকটি দীর্ঘ সময় নীরব রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই আলোচনা যেন কেবল একটি সামাজিক বিধান নিয়ে নয়। এটি আসলে মানুষের অহংকার আর স্রষ্টার প্রতি বিনয়ের এক চিরন্তন লড়াই।
বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তুমি একটি বিষয় মনে রেখো। ইসলামে পর্দা বা শালীনতা কেবল একটি পোশাক নয়। এটি একটি সামগ্রিক জীবনদর্শনের অংশ। একটি সমাজ তখনই শান্তিময় হয়, যখন সেখানে তিনটি জিনিস থাকে—লজ্জা (হায়া), পারস্পরিক সম্মান এবং আত্মসংযম। যেখানে চোখ সংযত, সেখানে হৃদয় নিরাপদ। আর যেখানে হৃদয় নিরাপদ, সেখানে সমাজও নিরাপদ।”
যুবকটি ধীরে মাথা নিচু করল। তার মনে হচ্ছিল—তার বিক্ষিপ্ত প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর ছবির মধ্যে মিশে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে বলল, “তাহলে আসল প্রশ্নটি হয়তো নিয়ম বদলানো নিয়ে নয়। আসল প্রশ্নটি হলো—মানুষ কি তার ভেতরের পৈশাচিক প্রবৃত্তিকে জয় করতে পেরেছে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক মৃদু হাসলেন। তার চোখে তখন গভীর প্রশান্তি। তিনি বললেন, “যেদিন মানুষ নিজের ভেতরকে শুদ্ধ করতে শিখবে, সেদিন আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি বিধান তার কাছে বোঝা নয়, বরং সম্মানের এক অভেদ্য ঢাল মনে হবে। কারণ এই বিধানগুলো মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং তাকে পাশবিকতার স্তর থেকে তুলে ফেরেশতাদের মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।”
লাইব্রেরির আলো তখন ধীরে নিভে এল। আর সেই নীরব রাতের ভেতরে একটি শেষ প্রশ্ন যেন বাতাসে ভেসে রইল—
“মানুষ কি সত্যিই আধুনিক হয়েছে, নাকি কেবল তার প্রযুক্তি আধুনিক হয়েছে—কিন্তু তার হৃদয় এখনও সেই প্রাচীন অন্ধকারেই রয়ে গেছে?”
[সময়ের ওপারে শাশ্বত আইন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group
