Translation is not possible.
[২]
বৃদ্ধ শিক্ষক টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরে শহরের আলো ঝিলমিল করছে, কিন্তু তার চোখ যেন আরেক শহর দেখছে—চৌদ্দশো বছর আগের একটি শহর। তিনি ধীরে বললেন, “চলো আমরা একটু সময়ের পেছনে ফিরে যাই।”
যুবকটি চুপচাপ শুনছিল। বৃদ্ধ বললেন, “মরুভূমির মাঝে একটি ছোট শহর—মদিনা। চারদিকে খেজুর বাগান, সরু পথ, মাটির ঘর। কিন্তু সেই শহরেই তখন একটি নতুন সভ্যতার জন্ম হচ্ছে। সন্ধ্যার পর মানুষ মসজিদে নববীতে জড়ো হতো। কেউ জ্ঞান শিখছে, কেউ কুরআন শুনছে, কেউ নবীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে এমনভাবে—যেন তার প্রতিটি শব্দ তাদের হৃদয়ের ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দেয়।”
বৃদ্ধ একটু থামলেন। “এই সমাজটি ছিল আমূল পরিবর্তনের পথে। যে আরব সমাজ একসময় কন্যাশিশুকে বোঝা মনে করত, সেই সমাজ এখন নারীদের জান্নাতের চাবিকাঠি হিসেবে সম্মান করতে শিখছে। যে সমাজ নারীকে কেবল ভোগের সামগ্রী মনে করত, সেই সমাজ এখন তাদের অলঙ্ঘনীয় অধিকার স্বীকার করছে।”
যুবকটি ধীরে বলল, “এটি সত্যিই একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছিল।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। আর এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। কুরআনের বিধানগুলো দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে ধীরে ধীরে নাজিল হয়েছে। কারণ মানুষের স্বভাব আর শতাব্দী প্রাচীন অভ্যাস বদলাতে সময় লাগে। তুমি কি জানো, কেন পর্দা বা মদের মতো বড় বিধানগুলো হিজরতের অনেক পরে নাজিল হয়েছিল?”
যুবকটি বলল, “না।”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “কারণ আগে মানুষের হৃদয়কে প্রস্তুত করতে হয়েছিল। যখন মানুষের অন্তরে ‘তাকওয়া’ (আল্লাহর সচেতনতা) এবং পরকালের জবাবদিহিতার চেতনা গেঁথে যায়, তখন আল্লাহর দেওয়া যেকোনো কঠিন আইনও তার কাছে অত্যন্ত সহজ এবং মধুময় মনে হয়। সেই মদিনার সমাজে এভাবেই একটি বিশেষ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল—যাকে আমরা বলি ‘লজ্জা ও পবিত্রতার সংস্কৃতি’।”
তিনি ব্যাখ্যা করলেন, “মদিনার নারীরা প্রয়োজনে বাইরে যেতেন, তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু সেই সমাজে একটি অলিখিত নিয়ম খুব শক্তিশালী ছিল—তা হলো একে অপরের ‘হুরমাহ’ বা মর্যাদার প্রতি পরম শ্রদ্ধা। তারা জানতেন, পোশাকের আবরণের চেয়েও বড় আবরণ হলো হৃদয়ের পবিত্রতা।”
যুবকটি বলল, “তবুও কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা তো ইতিহাসে পাওয়া যায়, যা ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, মানুষ হিসেবে ভুল-ভ্রান্তি বা দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের আনাগোনা সব সমাজেই থাকে। তবে মনে রাখতে হবে—সেই ঘটনাগুলো ছিল কেবল এক একটি ‘উপলক্ষ’ মাত্র। ওই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আল্লাহ এমন এক বিধান দিলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত আসা সকল মানুষের জন্য একটি স্থায়ী জীবনবিধান হয়ে রইল। যেমনটি আমি আগে বলেছিলাম—বৃষ্টির জন্য মেঘ লাগে, কিন্তু মেঘ বৃষ্টি সৃষ্টি করে না; সৃষ্টি করেন আল্লাহ।”
বৃদ্ধ টেবিলের উপর রাখা একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপি খুললেন। পাতায় সময়ের ছাপ। তিনি বললেন, “ইসলামি সমাজব্যবস্থায় নারী-পুরুষের একটি অদ্ভুত সুন্দর ভারসাম্য ছিল। সেখানে শালীনতা মানে অবরোধ নয়, বরং শালীনতা মানে হলো এমন এক পরিবেশ—যেখানে একজন মানুষ অন্য মানুষকে তার লিঙ্গ বা বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে নয়, বরং তার সততা ও মেধা দিয়ে বিচার করবে।”
তিনি আরও গভীর কণ্ঠে বললেন, “নবীজি (সা.) বলেছিলেন—‘প্রত্যেক ধর্মের একটি নিজস্ব স্বভাব আছে, আর ইসলামের স্বভাব হলো লজ্জা বা হায়া।’ লজ্জা কেবল জড়তা নয়, বরং এটি একটি আত্মিক শক্তি যা মানুষকে অন্যায় থেকে দূরে রাখে। যে সমাজে লজ্জা মরে যায়, সেখানে হাজারো আইন করেও মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।”
যুবকটি রিয়াদের ঝলমলে শহরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছি, কিন্তু আমাদের সমাজ কি সত্যিই সেই ‘হায়া’ আর মর্যাদার সংস্কৃতি ধরে রাখতে পেরেছে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক তার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখে তখন একই সাথে বেদনা এবং আশা। তিনি বললেন,
“প্রযুক্তি আমাদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু চরিত্র দেয়নি। আজকের পৃথিবীর ট্র্যাজেডি হলো—আমরা শরীরকে ঢাকতে শিখেছি দামি পোশাকে, কিন্তু দৃষ্টিকে উন্মুক্ত করে দিয়েছি অশালীনতায়।”
তিনি ধীরে বইটি বন্ধ করলেন। “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ বইয়ের পাতায় নয়—মানুষের যাপিত জীবনে লেখা থাকে। সালাফরা (পূর্বসূরিরা) কেবল আইন জানতেন না, তারা আইনকে ভালোবাসতেন। কারণ তারা সেই আইনের ভেতরে নিজেদের মুক্তি দেখতে পেতেন।”
লাইব্রেরির ভেতরে তখন এক অপার্থিব নীরবতা। যুবকটি বুঝতে পারল, তার অনুসন্ধান কেবল একটি নিয়মের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন তার নিজের আত্মপরিচয় খোঁজার এক মহাযাত্রায় পরিণত হয়েছে।
লাইব্রেরির বাইরে শহর জেগে আছে, কিন্তু ভেতরে সময় যেন ধীরে হাঁটছে। বৃদ্ধ শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। যেন তিনি মনে মনে বহু শতাব্দী পেছনে ফিরে যাচ্ছেন। তারপর তিনি ধীরে বললেন, “তুমি কি জানো, ইতিহাসে এমন একটি প্রজন্ম ছিল যারা কেবল বই পড়ে বড় হয়নি—বরং ওহির নূর শুনে মানুষ হয়েছিল?”
যুবকটি তাকাল। বৃদ্ধ বললেন, “সেই প্রজন্মকে আমরা ‘সালাফ’ বা আমাদের পূর্বসূরি বলি। তারা শরিয়তের বিধানকে কেবল শুষ্ক কিছু নিয়ম হিসেবে দেখেনি; তারা একে দেখেছিল আল্লাহর সাথে তাদের প্রেমের সম্পর্কের অংশ হিসেবে। এই কারণেই তাদের সমাজে একটি বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যেত। যখন কুরআনের কোনো আয়াত নাজিল হতো, তখন সেটি কেবল মসজিদের দেয়াল বা মিম্বরে সীমাবদ্ধ থাকত না—তা মুহূর্তেই মানুষের জীবনবোধ বদলে দিত।”
যুবকটি বলল, “কীভাবে?”
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। “ধরো, যেদিন দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ নাজিল হলো—পরদিন থেকেই মদিনার রাজপথে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা গেল। কেউ তাদের ওপর পুলিশ বসায়নি, কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল মিলিটারি। কিন্তু তাদের হৃদয়ের গভীরে একজন ‘প্রহরী’ জেগে উঠেছিল। একজন তরুণ সাহাবি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন। হঠাৎ তার চোখ একটি নারীর দিকে চলে গেল। পরক্ষণেই তিনি তলোয়ারের আঘাতের মতো যন্ত্রণায় দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।
তিনি বলেছিলেন—‘আমি আমার স্রষ্টাকে ভয় পেলাম।’ দেখো, এখানে আইন বাইরে নয়—ভেতরে কাজ করছে।”
লাইব্রেরির বাতাসে পুরোনো কাগজের ঘ্রাণ। বৃদ্ধ আবার বললেন, “সালাফদের সমাজে নারীর মর্যাদা ছিল একটি অলঙ্ঘনীয় সীমান্ত। নবীজি (সা.) শিখিয়েছিলেন—একজন মানুষের সম্মান কাবার চেয়েও পবিত্র। তুমি ভেবে দেখো, কেউ যদি কাবার গায়ে কুড়াল চালায়, তবে পুরো মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে। অথচ ইসলাম বলছে, একজন মুমিনের ইজ্জত হরণ করা তার চেয়েও বড় অপরাধ। এই বোধটি ছিল বলেই সেই সমাজে নারীরা পরম নিরাপত্তায় বিচরণ করতে পারতেন। সেখানে শালীনতা কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না, বরং তা ছিল একটি গর্বিত সংস্কৃতি।”
যুবকটি জানালার বাইরে তাকাল। রিয়াদের আধুনিক শহর—নিয়ন আলো, ঝলমলে বিজ্ঞাপন আর যান্ত্রিক ব্যস্ততা। তার মনে হলো—সময়ের দূরত্ব কত বিশাল। সে ধীরে বলল, “আজকের পৃথিবীতে তো পরিস্থিতি একদম ভিন্ন।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “পরিবেশ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয় কি খুব বদলেছে? আমরা আজ প্রযুক্তিতে আকাশ ছুঁয়েছি, কিন্তু আমাদের দৃষ্টি কি আরও সংযত হয়েছে, নাকি আরও অস্থির? আধুনিকতা মানে কি প্রবৃত্তির দাসত্ব, নাকি আত্মিক নিয়ন্ত্রণ?”
তিনি একটু থামলেন। তারপর একটি কাব্যিক বাক্য উচ্চারণ করলেন—
“লজ্জা হলো আত্মার নীরব আলো; যেখানে তা জ্বলে, সেখানে অন্ধকারের কোনো অস্তিত্ব থাকে না।”
যুবকটি দীর্ঘক্ষণ কিছু বলল না। বৃদ্ধ শিক্ষক আবার বললেন, “সালাফরা একটি বিষয় খুব ভালো বুঝতেন—রাষ্ট্রীয় আইন কখনোই মানুষের হৃদয়ের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে না। তাই তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আগে নিজেদের অন্তরের ওপর খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতেন। তুমি কি জানো কেন সেই জীর্ণবসন প্রজন্মটি এত দ্রুত পৃথিবী বদলে দিয়েছিল?”
যুবকটি মাথা নাড়ল। বৃদ্ধ বললেন, “কারণ তারা নিজেদের বদলাতে ভয় পেত না। যে মানুষ নিজের প্রবৃত্তি আর অহংকারকে ওহির আয়নায় সংশোধন করতে পারে, ইতিহাস তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে।”
লাইব্রেরির আলো তখন প্রায় নিভে আসছে। যুবকটি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “তবুও অনেক আধুনিক মানুষ বলে—এই নিয়মগুলো নাকি বর্তমান যুগের সাথে খাপ খায় না। সময় নাকি সমাজকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।”
বৃদ্ধ শিক্ষক তার দিকে তাকালেন। তার চোখে এক শান্ত আত্মবিশ্বাস। তিনি ধীরে বললেন, “তাহলে আমাদের আরেকটি বিষয় বুঝতে হবে। আধুনিকতা আসলে কী? মানুষ কি সত্যিই আধুনিক হয়েছে, নাকি কেবল তার পোশাক আর যন্ত্রগুলো আধুনিক হয়েছে—কিন্তু তার আদিম রিপুগুলো এখনও সেই জাহেলি যুগের অন্ধকারেই রয়ে গেছে?”
লাইব্রেরির জানালার বাইরে শহরের আলো এখনও জ্বলছে, কিন্তু আকাশের কোথাও যেন ফজরের আগাম নীল আভা জন্ম নিতে শুরু করেছে। বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে বললেন, “তুমি একটু আগে বলেছিলে—সময় বদলেছে।”
যুবকটি মাথা তুলল। বৃদ্ধ আবার বললেন, “এই কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেকে জিজ্ঞেস করে—সময় বদলেছে মানে আসলে কী বদলেছে?”
তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো কলম হাতে নিলেন। “এই কলমটি দেখো। একসময় মানুষ পালকের কলম দিয়ে লিখত। তারপর এল ঝরনা কলম। এখন আমরা ডিজিটাল ডিভাইসে লিখি। যন্ত্র বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু লেখার উদ্দেশ্য কি বদলেছে?”
যুবকটি বলল, “না।”
বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “ঠিক তাই। সভ্যতার অনেক কিছু বদলায়—স্থাপত্য বদলায়, গতির সীমা বদলায়, তথ্যপ্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু মানুষের ভেতরের কিছু মৌলিক প্রবৃত্তি কখনোই বদলায় না। মানুষ আজও ভালোবাসে, আজও ঈর্ষা করে, আজও লোভ করে। আর মানুষ আজও তার আদিম কামনার কাছে একইভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কারণেই নৈতিকতার কিছু মূলনীতি সব যুগেই অভিন্ন থাকে।”
লাইব্রেরির বাতাসে তার কণ্ঠ যেন আরও গম্ভীর শোনাল। “আজকের পৃথিবীতে আমরা আধুনিকতার কথা বলি, স্বাধীনতার কথা বলি। কিন্তু একই সাথে আমরা এক অদ্ভুত ‘পণ্য সংস্কৃতির’ সংকটে আছি। জানালার বাইরে ওই উজ্জ্বল বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে তাকাও। সেখানে মানুষের শরীরকে নিছক পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিনোদন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সব জায়গায় মানুষের মর্যাদাকে তার বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে মূল্যায়ন করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে।”
যুবকটি চুপচাপ শুনছিল। বৃদ্ধ বললেন, “এখানেই ইসলামের দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব। ইসলাম চায়—মানুষকে তার দেহ নয়, বরং তার ‘রুহ’ বা আত্মা এবং চরিত্র দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক। পর্দা সেই সুমহান দর্শনেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। এটি মানুষকে সমাজ থেকে অদৃশ্য করে দেওয়ার জন্য নয়; বরং মানুষের ব্যক্তিত্বকে এমন এক উচ্চতায় উপস্থাপন করার জন্য—যাতে তাকে কৌতূহলী ও লোলুপ দৃষ্টির বস্তু বানানো না হয়।”
বৃদ্ধ একটি গভীর সত্য উচ্চারণ করলেন, “যখন একটি সমাজ মানুষকে কেবল তার চামড়ার রঙ আর দেহের গঠন দিয়ে বিচার করতে শুরু করে, তখন সেই সমাজ মানুষের প্রকৃত সম্মান হারিয়ে ফেলে। পর্দা হলো সেই রক্ষাকবচ, যা মানুষের দেহকে আড়াল করে তার মেধা আর চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসে।”
যুবকটি ধীরে মাথা নিচু করল। তার মনে হচ্ছিল—এই আলোচনা কেবল একটি বিধান নিয়ে নয়, এটি মানুষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই। বৃদ্ধ আবার বললেন,
“স্বাধীনতা কখনোই সীমাহীন হতে পারে না। যখন একজন মানুষ সমাজে বাস করে, তখন তার ব্যক্তিগত রুচি ও কাজ অন্য মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। ইসলাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে এক অপূর্ব ভারসাম্য তৈরি করে। এটি মানুষকে বন্দী করে না, বরং পাশবিক লালসা থেকে মুক্তি দিয়ে এক অপার্থিব মর্যাদা দান করে—যা সময়ের সাথে ক্ষয়ে যায় না।”
জানালার বাইরে আকাশ এখন একটু উজ্জ্বল। বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “সভ্যতার ইতিহাসে অনেক প্রতাপশালী সমাজ এসেছে, আবার ধূলোয় মিশে গেছে। কিন্তু যে সমাজ মানুষের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না।”
যুবকটি ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এখন আর আগের সেই সংশয় নেই। সে ধীরে বলল, “তাহলে শেষ প্রশ্নটি হয়তো এটাই—মানুষ কি সত্যিই বুঝতে পারবে কেন এই বিধানগুলো এসেছে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক শান্তভাবে তার দিকে তাকালেন। তার চোখে তখন ভোরের আলোর মতো প্রশান্তি। তিনি ধীরে বললেন, “মানুষ যখন সত্যকে জানবার জন্য বিনয় নিয়ে দাঁড়ায়, তখন স্রষ্টা তার হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে দেন। কারণ এই বিধানগুলো মানুষের চলার পথে কোনো দেয়াল নয়; বরং এগুলো মানুষের মর্যাদাকে আকাশের উচ্চতায় তুলে ধরার জন্য এক ‘আকাশি আমানত’।”
লাইব্রেরির জানালার বাইরে আকাশের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। রাতের গভীর নীল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গিয়ে তার জায়গায় উঠে আসছে এক শান্ত সোনালি আভা। ঠিক সেই মুহূর্তে দূরের কোনো মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এল—
“আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার...”
শব্দটি বাতাসের ঢেউয়ে ভেসে এসে লাইব্রেরির দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে দিল। যুবকটি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই দীর্ঘ রাতের আলোচনা যেন তার ভেতরে অনেক কিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। তার প্রশ্নগুলো এখনও আছে, কিন্তু সেগুলোর আগের সেই তীক্ষ্ণতা আর নেই। যেন সেগুলো এখন উত্তর খুঁজে পাওয়ার প্রশান্তিতে নুয়ে পড়েছে।
বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখছো? রাত যত গভীরই হোক, ভোর শেষ পর্যন্ত আসেই। মানুষের হৃদয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। সংশয়ের অন্ধকার যত গাঢ় হয়, সত্যের আলো তার চেয়েও বেশি তীব্র হয়ে ফিরে আসে।”
যুবকটি শান্ত স্বরে বলল, “আপনি কি মনে করেন—মানুষ সত্যিই বুঝতে পারবে এই নৈতিক বিধানগুলোর আসল মহিমা?”
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। “সবাই হয়তো একসাথে বুঝবে না। কিন্তু যারা সত্যানুসন্ধানী, তারা জীবনের কোনো না কোনো বাঁকে ঠিকই বুঝে ফেলে। এই ওহি মানুষকে কেবল কিছু শুষ্ক আইন দেয় না; এটি মানুষের দেখার দৃষ্টিকে বদলে দেয়। আর যখন দৃষ্টি বদলে যায়, তখন পুরো পৃথিবীটাই অন্যরকম মনে হয়।”
যুবকটি ভাবছিল রাতের শুরুতে করা নিজের সেই প্রশ্নটি— “যদি সময় বদলে যায়, তবে নিয়ম কেন বদলায় না?” এখন সেই প্রশ্নটিই তার কাছে একদম নতুন এক অর্থ নিয়ে ধরা দিয়েছে। সে ধীরে বলল, “সম্ভবত কিছু নিয়ম সময়ের পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং মানুষের চিরন্তন প্রকৃতির (ফিতরাত) জন্য।”
বৃদ্ধের চোখে তৃপ্তির এক নীরব হাসি ফুটে উঠল। “ঠিক তাই। কারণ মানুষের জৈবিক ও আত্মিক গঠন সব যুগেই প্রায় অভিন্ন। সভ্যতা যতই আধুনিক হোক, মানুষের হৃদয় আজও সেই একই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়—লোভ, প্রবৃত্তি, আর নৈতিকতার লড়াই। এই কারণেই কুরআনের শিক্ষাগুলো কখনো পুরোনো হয় না। এগুলো কোনো নির্দিষ্ট যুগের জন্য নয়, এগুলো মানুষের আত্মার জন্য।”
লাইব্রেরির ভেতরে এখন ভোরের নির্মল আলো। বৃদ্ধ কুরআনের ওপর হাত রেখে বললেন, “ইসলামের প্রতিটি বিধান—তা দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণ হোক কিংবা পর্দার শালীনতা—মানুষকে ছোট করার জন্য নয়। বরং এগুলো মানুষকে এমন এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যেখানে সে নিজেকে এবং সৃষ্টিজগতকে নিছক ‘বস্তু’ হিসেবে নয়, বরং স্রষ্টার এক পবিত্র আমানত হিসেবে সম্মান করতে শেখে।”
যুবকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তাহলে পর্দা আসলে কেবল একটি পোশাক নয়; এটি একটি উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি, একটি শুদ্ধ সংস্কৃতি।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে সায় দিলেন। “এটি সেই সংস্কৃতি, যেখানে মানুষ শেখে কীভাবে নিজের চোখকে সংযত রাখতে হয় এবং কীভাবে অন্যের অলঙ্ঘনীয় মর্যাদাকে (হুরমাহ) শ্রদ্ধা করতে হয়।”
বাইরে সূর্যের আলো পুরো রিয়াদ শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। যুবকটি ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মনে হচ্ছিল—রাতের অন্ধকারের সাথে সাথে তার মনের অনেক বিভ্রান্তিও যেন কুয়াশার মতো কেটে গেছে। বৃদ্ধ শিক্ষক দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “জ্ঞান মানে কেবল সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নয়; জ্ঞান মানে হলো সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মতো সঠিক প্রশ্নটি খুঁজে পাওয়া।”
যুবকটি দরজার কাছে এসে শেষবারের মতো পেছনের দিকে তাকাল। সোনালি আলোয় ভেজা সেই পুরোনো লাইব্রেরি আর শান্ত বৃদ্ধ শিক্ষক। তার মনে এখন একটি অবিচল উপলব্ধি— মানুষ হয়তো সবসময় নিয়মের ‘কেন’ খুঁজে পায় না, কিন্তু যখন সে বিনয় নিয়ে সত্যের দিকে নিজের হৃদয়কে উন্মুক্ত করে, তখন সেই নিয়মগুলো আর শৃঙ্খল মনে হয় না; সেগুলো হয়ে ওঠে সম্মানের এক অভেদ্য ঢাল।
ইতিহাসের দীর্ঘ পথে সেই সত্যটিই বারবার প্রতিধ্বনিত হয়— “যে সমাজ নিজের লজ্জাকে রক্ষা করতে জানে, সে সমাজ আসলে নিজের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎকেই রক্ষা করে।”
[সময়ের ওপারে শাশ্বত আইন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group