Translation is not possible.
একটা সময় আসবে, যখন মানুষ হারামকে আর হারাম বলে মনে করবে না। তারা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এবং বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য পাপের নতুন নতুন গালভরা নাম আবিষ্কার করবে। হারাম সম্পর্ক, পর্দার লঙ্ঘন কিংবা দৃষ্টির অবাধ স্বাধীনতাকে তারা আধুনিকতার ‘প্রসেস’, ‘ট্রেন্ড’ কিংবা বয়সের একটি স্বাভাবিক ‘ফেজ’ বা ধাপ বলে চালিয়ে দেবে। তওবা বা অনুশোচনার মতো ঐশী ও জীবনমুখী বিষয়গুলোকে তারা আর জরুরি মনে করবে না। কারণ, শয়তান তাদের মনের গভীরে এই আত্মঘাতী বিশ্বাসটি অত্যন্ত সুকৌশলে বদ্ধমূল করে দেবে যে, জীবনের কোনো এক মোড়ে গিয়ে—বিশেষ করে বয়স বাড়লে বা বিয়ে করলে—সবকিছু জাদুর মতো এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।
এই চিন্তাটাই হলো আজকের প্রজন্মের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ভয়াবহ আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষ যখন পাপ করতে করতে পাপের অনুভূতিটাই হারিয়ে ফেলে, তখন তার হৃদয় এমন এক অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ সে আর সহজে খুঁজে পায় না। পাপকে মনস্তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রাখার এই প্রবণতা মানুষের ভেতরের ঐশী বিবেক বা ‘ফিতরাত’কে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়।
আজকের দিনে একজন যুবক বা যুবতী যখন নিজের দৃষ্টিকে অবাধে ছেড়ে দেয়, যখন তার চোখে পর্দাহীনতা, নগ্নতা বা অশ্লীলতা একদম স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়, যখন তার হাত সীমালঙ্ঘনের দুঃসাহস পায় এবং যখন তার লজ্জাস্থান আল্লাহর নির্ধারিত পবিত্র সীমার বাইরে গিয়ে হারাম উপায়ে তৃপ্তি খুঁজতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে—আর তারপর সে নিজের নফসকে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, “বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে”—তখন সে কেবল একটি মারাত্মক ভুল ধারণাই পোষণ করছে না, বরং সে পবিত্র কুরআনের মৌলিক নির্দেশনা ও মানবচরিত্রের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বকেই এক প্রকার অস্বীকার করছে।
এই ধারণাটি একটি মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। শয়তানের অন্যতম বড় একটি ধোঁকা হলো, সে মানুষকে ভবিষ্যতের কোনো একটি হালাল কাজের আশা দেখিয়ে বর্তমানের হারাম কাজকে চালিয়ে যাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দেয়। সে বোঝায়, “এখন তো যৌবন, একটু উপভোগ করে নাও, বিয়ের পর তো তুমি সৎ হয়েই যাবে।” অথচ বাস্তবতা হলো, যে ব্যক্তি দিনের পর দিন হারামে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, হালাল তার কাছে একটা সময় অত্যন্ত পানসে ও আকর্ষণহীন মনে হতে শুরু করে। এর ফলে তার দাম্পত্য জীবনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়, যা সে বিয়ের আগে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি।
কুরআনুল কারীমের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
​"قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ"
“মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে; এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।”
এই আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে দৃষ্টি অবনত রাখা বা সংযত রাখার (গাদদুল বাসার) অর্থ শুধু সাময়িকভাবে চোখ নামিয়ে নেওয়া নয়; বরং এটি হলো এমন সব কিছু থেকে নিজের দৃষ্টি ও মনকে সরিয়ে নেওয়া, যা নফসকে বা প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করে এবং যা মানুষকে হারামের দিকে প্রবলভাবে টেনে নেয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা লজ্জাস্থান হেফাজতের নির্দেশের আগে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ দৃষ্টি হলো প্রবেশদ্বার, আর লজ্জাস্থান হলো তার চূড়ান্ত পরিণতি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বিয়ের কোনো শর্ত দেননি। তিনি এমন কথা বলেননি যে, যারা অবিবাহিত কেবল তারাই চোখ সংযত রাখবে। বরং তিনি এটিকে মুমিনের ‘ঈমানের’ একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, দৃষ্টি সংযত রাখা একজন মুমিনের স্থায়ী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত। বিবাহিত হলেই যে দৃষ্টির হেফাজত করা থেকে কেউ চিরতরে অব্যাহতি পেয়ে যায়, এমন ভাবার কোনো অবকাশ ইসলামে নেই। বরং যে ব্যক্তি অবিবাহিত অবস্থায় নিজের দৃষ্টির লাগাম টেনে ধরতে শেখেনি, বিবাহিত জীবনেও তার চোখ বাইরের হারাম সৌন্দর্যের মোহে পড়ে যাওয়ার এবং ঘরোয়া শান্তিতে অতৃপ্ত থাকার তীব্র ঝুঁকিতে থাকে।
ইসলামের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক চিকিৎসক ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোতে দৃষ্টির ভয়াবহতা নিয়ে অসাধারণ সব মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, দৃষ্টি হচ্ছে হৃদয়ের প্রবেশদ্বার এবং মনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বার্তাবাহক। এই দরজা দিয়ে যা কিছু ভেতরে ঢোকে, তা-ই অন্তরের গভীরে গিয়ে শক্তভাবে বাসা বাঁধে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “চোখ যিনা করে, আর তার যিনা হলো হারাম দৃষ্টি।” (সহিহ মুসলিম, ২৬৫৭)
ফিকহ বা ইসলামি আইনের পরিভাষায় এখানে 'যিনা' শব্দটি রূপক বা 'মাজাজি' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি 'হাকিকি' বা আইনি যিনা নয়, যার কারণে পৃথিবীতে ইসলামি দণ্ডবিধি বা 'হদ' (যেমন বেত্রাঘাত বা রজম) কার্যকর হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) এখানে একে 'যিনা' বলে আখ্যায়িত করেছেন মূলত এর ভয়াবহতা ও জঘন্যতা বোঝাতে। এটি হলো প্রকৃত ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক ধাপ বা 'Prelude'। এটি 'হাকিকি' যিনা না হলেও 'মাজাজি' বা আধ্যাত্মিক যিনা হিসেবে অত্যন্ত গুরুতর, যা মানুষের আত্মিক পবিত্রতাকে ধ্বংস করে দেয়।
আধ্যাত্মিক পতন একদিনে ঘটে না। প্রথমে একটি অবৈধ দৃষ্টি মানুষের মস্তিষ্কে হানা দেয় (খাওয়াতের)। সেই দৃষ্টি মস্তিষ্কে তৈরি করে একটি নিরন্তর ফ্যান্টাসি বা কল্পনা (আফকার)। সেই কল্পনা হৃদয়ের গভীরে জন্ম দেয় তীব্র কু-বাসনা বা শাহওয়াহ (ইরাদা)। এরপর সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হয় পাপ করার দৃঢ় সংকল্প (আযিমাহ)। এবং পরিশেষে সেই সংকল্প মানুষকে ঠেলে দেয় বাস্তব পাপে বা দৈহিক ব্যভিচারে (ফি'ল)। সুতরাং, যে ব্যক্তি প্রথম ধাপেই নিজের দৃষ্টির আগল টেনে ধরতে পারল না, সে শেষ ধাপে গিয়ে নিজেকে জাদুকরীভাবে আটকে রাখতে পারবে—এমনটা ভাবা চরম বোকামি। প্রতিটি হারাম দৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে একটি অন্ধকারের কালো ছোপ ফেলে দেয়।
হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে নিজের দৃষ্টি সংযত রাখে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরকে ঈমানের নূর বা আলো দিয়ে আলোকিত করে দেন এবং তার অন্তর্দৃষ্টি (বসিরাহ) প্রখর করে দেন। আর যে তার দৃষ্টিকে অবাধ করে দেয়, তার অন্তর ধীরে ধীরে অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যায়।
পাপের পুনরাবৃত্তি কীভাবে মানুষের হৃদয়কে ধ্বংস করে দেয়, তা আল্লাহ তাআলা কুরআনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। সূরা আল-মুতাফফিফিনে আল্লাহ বলেছেন:
​"كَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ"
“কখনোই নয়, বরং তাদের অপকর্মের কারণেই তাদের অন্তরে মরিচা পড়ে গেছে।” (আল-মুতাফফিফীন, ১৪)
এই মরিচা বা ‘রান’ সম্পর্কে মুফাসসিরগণ এবং হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। সে যদি দ্রুত তওবা করে ফিরে আসে, তবে অন্তর আবার আগের মতো পরিষ্কার ও স্ফটিকস্বচ্ছ হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি গুনাহ চালিয়ে যেতেই থাকে এবং তওবার প্রয়োজন মনে না করে, তবে কালো দাগ বাড়তে বাড়তে একসময় পুরো হৃদয়কে লোহার মরিচার মতো আবৃত করে ফেলে। তখন সেই হৃদয় আর সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে বর্জন করতে পারে না।
এখন একজন যুবক বা যুবতী নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারে—যে হৃদয় আজ পাপে আবৃত, যে চোখ আজ পর্নোগ্রাফি বা পর্দার বাইরের অশ্লীলতায় মারাত্মকভাবে আসক্ত, যে নফস আজ হারাম উত্তেজনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে—সে কি আগামীকাল শুধুমাত্র একটি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা (কবুল বলা এবং সাইন করা) শেষ করার মাধ্যমে হঠাৎ করে জাদুকরীভাবে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে? বাস্তবতা হলো, তওবা এবং আত্মশুদ্ধির দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছাড়া এটি অসম্ভব।
আজকের সমাজের একটি বড় এবং নীরব ট্র্যাজেডি হলো, আমরা বিয়েকে মানসিক বা চারিত্রিক রোগের কোনো চিকিৎসালয় বা রিহ্যাব সেন্টার বলে মনে করি। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছেলে বখে গেছে, ড্রাগস বা নারীতে আসক্ত, কিংবা মেয়ে অবাধ্য হয়ে গেছে—বিয়ে করিয়ে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। অনেক যুবক নিজে নিজেই ভাবে, আমার এখন যে সব বাজে অভ্যাস বা পর্নোগ্রাফির আসক্তি আছে, বিয়ে করলে সেগুলো এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে।
কিন্তু বিয়ে কোনো জাদুর কাঠি নয়; এটি একটি অত্যন্ত গুরুদায়িত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং একটি মহান ইবাদত। এর জন্য শারীরিক ও আর্থিক প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিরও প্রবল প্রয়োজন। আর এই প্রস্তুতির মূল ভিত্তিটাই হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
​"وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا"
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে বা তাকওয়া অবলম্বন করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।” (আত-তালাক: ২-এর শেষ অংশ)
যে যুবক বা যুবতী তাকওয়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণের কঠিন প্রশিক্ষণ না নিয়েই বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে প্রবেশ করে, সে আসলে চোরাবালির ওপর একটি বিশাল অট্টালিকা তৈরি করার চেষ্টা করছে। বাইরে থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়তো অনেক জাঁকজমকপূর্ণ দেখাতে পারে, কিন্তু ভেতরে সেই সম্পর্কটি থাকে চরম নড়বড়ে ও অস্থির। একবার নিজের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর কথা গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত। সে হয়তো নিজের সতীত্ব, চরিত্র ও দৃষ্টি রক্ষা করে আপনার জন্য সযতনে অপেক্ষা করছে, আর আপনি তাকে উপহার দিতে যাচ্ছেন একটি পাপে ক্লিষ্ট, আসক্ত ও অন্ধকার হৃদয়! এটি কি আপনার সেই পবিত্র সঙ্গীর প্রতি চরম অবিচার ও প্রতারণা নয়?
সূরা আন-নূরের ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শাশ্বত মূলনীতি উল্লেখ করেছেন:
​"الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ"
“দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য; আর পবিত্রা নারীরা পবিত্র পুরুষদের জন্য এবং পবিত্র পুরুষরা পবিত্রা নারীদের জন্য।”
মুফাসসিরগণ স্পষ্ট করেছেন যে, এটি একটি আদর্শিক সামঞ্জস্য বা চারিত্রিক মূলনীতি, যা সাধারণত মানবসমাজে প্রতিফলিত হয়। তবে একে কোনো অনিবার্য জাগতিক বা গাণিতিক নিয়ম হিসেবে দেখা যাবে না যার কোনো ব্যতিক্রম নেই। কারণ, মহান আল্লাহর অসীম হিকমতে ইতিহাসে আমরা এর ব্যতিক্রমও দেখেছি। যেমন—নবী লুত (আ.) ও নূহ (আ.)-এর স্ত্রীরা তাদের মতো পবিত্র চরিত্রের ছিলেন না। আবার উল্টোদিকে, ফেরাউনের মতো ইতিহাসের সবচেয়ে পাপিষ্ঠ ও জালিম ব্যক্তির ঘরে আছিয়া (আ.)-এর মতো পরম নেককার ও জান্নাতি নারী ছিলেন।
সুতরাং, এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো—সাধারণত আল্লাহ তাআলা পবিত্রদের সাথে পবিত্রদের মিল করিয়ে দেন এবং অপবিত্রদের কপালে অপবিত্ররাই জোটে। অর্থাৎ, নিজেকে পবিত্র করার মাধ্যমে একজন মুমিনের জন্য পবিত্র ও নেককার জীবনসঙ্গী পাওয়ার একটি জোরালো, যৌক্তিক ও শক্তিশালী সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই কেউ যদি একজন পবিত্র সঙ্গীর আশা করে, তবে যুক্তি, ন্যায় ও ইনসাফের খাতিরেই তাকে প্রথমে নিজেকে পবিত্র করার চেষ্টা করতে হবে। হারামের পথে হাঁটা অবস্থায় একজন পুত-পবিত্র, সতী-সাধ্বী সঙ্গীর স্বপ্ন দেখা অনেকটা মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রবল বৃষ্টির প্রত্যাশা করার মতো, যা অসম্ভব না হলেও প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের পরিপন্থী।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদের মনস্তত্ত্ব, বয়সের উন্মাদনা এবং তাদের শারীরিক চাহিদা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালোভাবে জানতেন। তাই তিনি অত্যন্ত দরদভরা কণ্ঠে যুবকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন: “হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।” (সহিহ মুসলিম, ১৪০০)
এই হাদিসটির শিক্ষা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বিয়ের সামর্থ্য না আসা পর্যন্ত নিজেকে কোনোভাবেই হারামে জড়িয়ে ফেলা যাবে না, বরং আত্মসংযমের বা নিজের প্রবৃত্তিকে অবদমিত রাখার ঐশী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। রোজা এখানে কেবল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকার নাম নয়; বরং এটি হলো নিজের অবাধ্য নফসকে শৃঙ্খলিত করার একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।
ইমাম কুরতুবী (রহ.) এই প্রসঙ্গে বলেছেন, এই হাদিস অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, বিয়ের আগে আত্মসংযম শেখা কতটা জরুরি। কারণ যে ব্যক্তি অবিবাহিত অবস্থায় নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে বিয়ের পর বৈধ সম্পর্কের সীমাবদ্ধতাগুলোও মানতে পারবে না। দাম্পত্য জীবনে যখনই কোনো দূরত্ব, রাগ-অভিমান বা সাময়িক শারীরিক সমস্যা আসবে, সে তখন অত্যন্ত সহজেই তার পুরনো হারামের নেশায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিয়ের আগে সংযমের কঠিন পাঠ গ্রহণ করেনি, সে বিয়ের পরেও পরকীয়া বা অন্যান্য পাপে লিপ্ত হয়ে নিজের সাজানো সোনার সংসার ছারখার করে দিতে পারে।
আধুনিক বিজ্ঞান আজ ইসলামের সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন করে প্রমাণ করছে। হারামের দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস হালালের স্বাভাবিক স্বাদকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দেয়।
যে চোখ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বা রাস্তায় প্রতিদিন কৃত্রিম, ফিল্টারযুক্ত ও অশ্লীল সৌন্দর্য দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তার মস্তিষ্ক ‘ডোপামিন’ নামক রিওয়ার্ড হরমোনের অস্বাভাবিক ক্ষরণে এক প্রকার আসক্ত হয়ে পড়ে। পর্নোগ্রাফি বা অবাধ দৃষ্টি মস্তিষ্কের নিউরাল পাথওয়েকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সে যখন বাস্তবে একটি বৈধ সম্পর্কের শান্ত, স্নিগ্ধ ও মার্জিত জগতে প্রবেশ করে, তখন তার স্ত্রীর স্বাভাবিক, মানবিক ও পবিত্র সৌন্দর্য তাকে আর আগের মতো তৃপ্তি দিতে পারে না। তার অবচেতন মন সর্বদা সেই নিষিদ্ধ, উগ্র এবং কৃত্রিম কল্পনার জগতেই বিচরণ করতে চায়।
সে বাস্তব সম্পর্কের গভীরতা, আবেগ, স্পর্শ ও মানসিক প্রশান্তি উপলব্ধি করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে বিয়ে তার জন্য শান্তির নীড় বা ‘সাকিনাহ’ হওয়ার বদলে এক নতুন মানসিক অস্থিরতা ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অদৃশ্য এক মনস্তাত্ত্বিক দেওয়াল তৈরি হয়, যার ফলে সম্পর্কে তিক্ততা, দূরত্ব এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বিচ্ছেদ নেমে আসে।
আমাদের পূর্বসূরি নেককারদের বা সালাফ আস-সালেহীনের জীবন এই জায়গায় আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তারা শুধু যে প্রকাশ্য হারাম থেকে দূরে থাকতেন তা নয়; বরং সন্দেহজনক বিষয় এবং অনর্থক দৃষ্টি থেকেও নিজেদের সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতেন। তাদের কাছে পবিত্রতা ছিল আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের এক অনন্য ভিত্তি।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) একবার তাঁর শিক্ষক ইমাম ওয়াকীর কাছে নিজের স্মরণশক্তি সামান্য কমে যাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। তখন শিক্ষক তাঁকে সমস্ত পাপকাজ (এমনকি অনিচ্ছাকৃত হারাম দৃষ্টি) ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “ইলম হলো আল্লাহর নূর, যা কোনো পাপী ব্যক্তিকে দান করা হয় না।” আরেকজন সালাফ বলেছিলেন, “আমি দুনিয়াতে একটি হারাম দৃষ্টিকে শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে সংযত করেছি, আর তার বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে অন্তরে এমন ঈমানের মিষ্টতা দান করেছেন, যা আমি আগে কখনো পাইনি।” যখন কোনো বান্দা কেবল আল্লাহর ভয়ে নিজের নফসের প্রবল ইচ্ছার লাগাম টেনে ধরে, আল্লাহ তার অন্তরকে এমন এক প্রশান্তি দান করেন যা পৃথিবীর কোনো সম্পদের বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয়। বিয়ের আগে এই আত্মিক পবিত্রতা অর্জন করা তাই একজন তরুণ বা তরুণীর জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।
যে ব্যক্তি বলে, “এখন যা করছি করি, পরে একসময় ঠিক হয়ে যাব”, সে আসলে নিজের চরিত্র ও ভবিষ্যৎকে নিজ হাতে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ আজকের অবাধ দৃষ্টি হলো আগামী দিনের দাম্পত্য অস্থিরতার বীজ। আজকের হারাম স্পর্শ বা অবৈধ চ্যাটিং হলো আগামী দিনের মানসিক শূন্যতার কারণ। আজকের পর্নোগ্রাফি আসক্তি হলো আগামী দিনের বৈবাহিক জীবনে অতৃপ্তির মূল নিয়ামক।
ইসলাম বৈরাগ্যবাদে বিশ্বাসী নয়, এটি মানুষের জৈবিক কামনাকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে। কিন্তু ইসলাম সেই কামনাকে একটি পবিত্র কাঠামোর (বিবাহ) ভেতরে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। কারণ নিয়ন্ত্রিত কামনা ইবাদতে পরিণত হয় (যেমন স্ত্রী সহবাসকেও ইসলামে সদাকাহ বলা হয়েছে), আর অনিয়ন্ত্রিত কামনা পশুবৃত্তিতে পরিণত হয়ে মানুষকে ধ্বংস করে। তাই আত্মশুদ্ধি ছাড়া বিয়ে কখনোই হারামের জগৎ থেকে মুক্তির সহজ পথ হতে পারে না।
তবে কি যারা ভুল পথে হেঁটেছে তাদের ফেরার কোনো উপায় নেই? অবশ্যই আছে। ইসলামের সৌন্দর্যই হলো এর ক্ষমা ও ক্ষমার বিস্তৃতি। আল্লাহ তাআলা গাফুরুর রাহীম। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, আন্তরিক তওবা বা 'তওবাতুন নাসুহা'র মাধ্যমে মানুষ যদি ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তার অন্তরকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দেন যে, সে যেন কোনোদিন পাপই করেনি। তওবাতুন নাসুহার শর্ত হলো—পাপের জন্য তীব্র অনুশোচনা করা, সাথে সাথে পাপ ছেড়ে দেওয়া, ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প করা এবং বান্দার হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া। এই তওবা ছাড়া কেবল সময়ের ওপর বা বিয়ের ওপর ভরসা করা হলো আত্মপ্রবঞ্চনা।
নিজের জীবনের সমীকরণটি আজই মেলাতে চেষ্টা করুন। আপনি কি বিয়েকে ব্যবহার করতে চান আপনার বিগত জীবনের পাপ ঢাকার একটি পর্দা হিসেবে? নাকি আপনি নিজেকে তওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নতুনভাবে প্রস্তুত করছেন একটি পবিত্র ও দায়িত্বশীল সম্পর্কের জন্য?
দুনিয়ার মানুষের চোখে আপনি নিজেকে খুব ভালো, ভদ্র ও ধার্মিক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সবকিছুই জানেন। আপনার গোপন দৃষ্টির লক্ষ্য কী, আপনার নিঃশব্দ চিন্তাগুলো কতটা দূষিত, একাকীত্বের অন্ধকারে আপনার হাতের স্ক্রিনে কী ভাসছে—সবই তাঁর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
​"يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ"
“চোখের খেয়ানত এবং অন্তর যা গোপন রাখে, সে সম্পর্কে তিনি সবিশেষ অবগত।” (সূরা গাফির: ১৯)
তাই, বিয়ের স্বপ্ন দেখার আগে নিজের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি পবিত্র? নিজের চোখকে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি সংযত? নিজের নফসকে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি নিয়ন্ত্রিত? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই; আজই তওবা করুন। আল্লাহর রহমত বিশাল। আন্তরিক তওবা করলে আল্লাহ কেবল পাপ মাফই করেন না, বরং পাপের ফলে অন্তরে যে অন্ধকার ও মরিচা তৈরি হয়েছিল তাও ধুয়ে মুছে সাফ করে দেন।
চোখকে অনুশোচনায় কাঁদিয়ে হৃদয়কে পরিষ্কার করুন। কারণ একটি পবিত্র ও শান্তিময় সংসার শুরু হয় একটি পবিত্র ও প্রশান্ত আত্মা থেকেই। যে নিজে শুদ্ধ হতে জানে, সেই কেবল অন্য কারো জীবনে শান্তির ছায়া হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটাই ধ্রুব বাস্তবতা, এটাই চিরন্তন সত্য এবং এটাই সেই একমাত্র পথ, যা মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে প্রকৃত সফলতা ও প্রশান্তি এনে দেয়।
নিজেকে শুদ্ধ করার এই প্রক্রিয়াই একজন মুমিনের জীবনের সার্থকতা। আসুন, প্রবঞ্চনার মরীচিকা ছেড়ে আমরা হাকিকত বা বাস্তবের আলোতে ফিরি। তওবার মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে সাজাই, যাতে আমাদের আগামী দিনের সম্পর্কগুলো কেবল শরীরী মিলন না হয়ে, বরং দুটি পবিত্র আত্মার এক জান্নাতি মহামিলন হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের দৃষ্টি, আমাদের মন এবং আমাদের চরিত্রকে যাবতীয় ফিতনা থেকে হেফাজত করেন এবং আমাদের একটি পবিত্র, স্নিগ্ধ ও তাকওয়াপূর্ণ জীবন উপহার দেন। আমীন। ইয়া রাব্বাল আলামীন।
[মরীচিকার মোহে আত্মহনন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group