“আপনার স্বামীর সঙ্গে যদি পরের জন্মে আবার বিয়ে করার সুযোগ হয়, তাহলে কি করবেন?”
হয়তো কোনো পেজ বা গ্রুপ থেকে নিছক বিনোদন বা এঙ্গেজমেন্ট বাড়ানোর জন্যই পোস্টটি করা হয়েছিল। কিন্তু এর মন্তব্যের ঘরে চোখ রাখলে শিউরে উঠতে হয়। হাজার হাজার নারী সেখানে দ্বিধাহীনভাবে, নির্দ্বিধায় একটিই উত্তর দিচ্ছেন— "না!"
এই অসংখ্য "না"-এর নিচে চাপা পড়ে আছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অভিমান, মানসিক ক্লান্তি এবং বহু ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ। মানুষ যখন এমন একটি প্রশ্নে এতটা সরাসরি “না” লেখে, তখন সেটি কেবল একটি সম্পর্কের মূল্যায়ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এক নীরব, করুণ বিদ্রোহ।
কিন্তু এই বিদ্রোহ যখন নিজের অজান্তেই ইসলামি আকিদা বা বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করতে শুরু করে, তখন বিষয়টি আর কেবল সমাজবিজ্ঞানের ফ্রেমে আটকে থাকে না। এটি রূপ নেয় বিশ্বাস ও আবেগের এক ভয়ংকর সংঘাতে। আর ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের মুসলিম পরিচয়ের এক সূক্ষ্ম, অথচ ভয়াবহ ক্ষয় শুরু হয়েছে।
হাজারো নারীর এই “না” বলার নেপথ্যে যে নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তারা এই উত্তর দিচ্ছেন কারণ তাদের কাছে দাম্পত্য জীবন কোনো শান্তির নীড় নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে এক অন্তহীন ক্লান্তির কারাগার।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারীকে বিয়ের পর যে পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই অমানবিক। স্বামীর দিনের পর দিন অবহেলা, কথায় কথায় রূঢ়তা, দায়িত্বহীনতা, অর্থনৈতিক চাপ, শ্বশুরবাড়ির একতরফা দায়ভার কাঁধে নেওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন—এসব কিছু মিলিয়ে তাদের হৃদয়ে জমেছে কালচে এক ক্ষত। তারা সারাদিন পরিশ্রম করেন, কিন্তু বিনিময়ে একটুখানি প্রশংসা বা ভালোবাসার অভাব তাদের ভেতরটাকে কুরে কুরে খায়। সেই অবদমিত ক্ষতের গভীর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসছে এই “না”। এটি অত্যন্ত মানবিক একটি প্রতিক্রিয়া।
পবিত্র কুরআন মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজন ও দুর্বলতাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধারণ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে সাকিনা (প্রশান্তি) লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে মাওয়াদ্দাহ (গভীর ভালোবাসা) ও রাহমাহ (দয়া-মায়া) সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে সেই সীম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তাভাবনা করে।” (সূরা রুম, ৩০:২১)
এই আয়াতের তাফসীরে ইসলামি স্কলারগণ স্পষ্ট করেছেন যে, বিবাহের মূল উদ্দেশ্য কেবল জৈবিক চাহিদা মেটানো বা বংশবৃদ্ধি নয়; বরং এর আত্মিক ভিত্তি হলো— সাকিনা, মাওয়াদ্দাহ এবং রাহমাহ।
একটি সংসারে যখন এই তিনটি গুণের লেশমাত্র থাকে না, স্বামী যখন স্ত্রীর অনুভূতির মূল্য দেন না, তখন সেই সম্পর্ক নারীর জন্য এক জীবন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়। তখন নারী “না” লিখে তার যন্ত্রণার ভার কিছুটা হলেও লাঘব করতে চায়। আমাদের এই যন্ত্রণাকে শুনতে হবে, তাদের আর্তনাদকে সম্মান জানাতে হবে। সমাজ হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা তাদের এই কষ্টকে ধারণ করতে পারিনি। কিন্তু এই যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ যেন আমাদের ঈমানের শেকড় কেটে না দেয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য।
এই ভাইরাল ট্রেন্ডটির সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটি লুকিয়ে আছে এর প্রশ্নকাঠামোতে— "পরের জন্ম"।
ইসলামি আকিদায় 'পুনর্জন্ম' বা জন্মান্তরবাদের কোনো স্থান নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধর্মীয় বিশ্বাস (বিশেষত সনাতন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের), যেখানে মনে করা হয় আত্মা বারবার পৃথিবীতে নতুন রূপ নিয়ে ফিরে আসে। কর্মফল অনুযায়ী কেউ মানুষ, কেউ প্রাণী হয়ে বারবার জন্ম নেয়। একজন মুসলিমের জীবনদর্শন এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদের সবাইকে আমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।” (সূরা আনকাবুত, ২৯:৫৭)
দুনিয়ার জীবন একবারই। মৃত্যু একবার, কবরের জীবন (বারযাখ) একবার, পুনরুত্থান (হাশর) একবার এবং চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশও একবারই হবে। নতুন করে একই পরিচয়ে, বা ভিন্ন কোনো পরিচয়ে এই পৃথিবীতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ বা বাস্তবতা নেই।
কুরআনে আল্লাহ আরও বলেন: “অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, সে বলে, 'হে আমার রব! আমাকে পুনরায় (দুনিয়ায়) পাঠিয়ে দিন, যাতে আমি যে সৎকর্ম করিনি, তা করতে পারি।' কখনোই নয়! এটি তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে বারযাখ (পর্দা) রয়েছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।” (সূরা মুমিনুন, ২৩:৯৯-১০০)
তাই, এই প্রশ্ন যখন কোনো মুসলিমের মুখে উচ্চারিত হয় বা কোনো মুসলিম নারী যখন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে "পরের জন্মে এই স্বামী চাই না" বলেন, তখন সেটি নিছক ক্ষোভের প্রকাশ থাকে না; এটি পরিণত হয় আকিদার সীমালঙ্ঘনে। মিডিয়া, নাটক-সিনেমা এবং সাহিত্যের প্রভাবে "সাত জনম", "পরের জন্ম" শব্দগুলো আমাদের রোজকার ভাষায় এমনভাবে মিশে গেছে যে, আমরা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারি না।
যে সমাজে মুসলিমরা হাসি-ঠাট্টা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে "পরের জন্ম" ধারণাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করবে, সেই সমাজে কিয়ামত, হাশর, মিজান এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার ভয় ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাবে। তাওহীদের এই স্খলন একটি সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত। কারণ, যখন কেউ মনে করে সে আবার ফিরে আসবে, তখন পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামের ধারণা তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে যে নারী এই দুনিয়ায় এক অত্যাচারী, অবহেলাকারী স্বামীর সাথে জীবন কাটালেন, তার এই কষ্টের কি কোনো প্রতিদান নেই? আখিরাতে কি তাকে আবার সেই একই স্বামীর সাথেই থাকতে হবে? জান্নাতে কি নারীদের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতার মূল্য থাকবে না?
ইসলাম এর অত্যন্ত যৌক্তিক, হৃদয়গ্রাহী এবং ইনসাফপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। দুনিয়ার জীবনে যারা মজলুম, আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে অকল্পনীয় ক্ষতিপূরণ। যদি কোনো নারী দুনিয়ায় স্বামীর জুলুমের শিকার হন এবং ধৈর্য ধারণ করে ঈমানের ওপর অটল থাকেন, তবে জান্নাতে আল্লাহ তার সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেবেন।
জান্নাতবাসীদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
“আর আমি তাদের অন্তর থেকে সব ধরনের ক্ষোভ ও মালিন্য বের করে দেব...” (সূরা হিজর, ১৫:৪৭)
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জান্নাতে যদি কোনো নারী তার দুনিয়ার স্বামীকেই জান্নাতি হিসেবে পান এবং তারা উভয়েই সেখানে একসাথে থাকতে চান, তবে আল্লাহ তাদের সেই পবিত্র বন্ধনকে জান্নাতেও অটুট রাখবেন। তারা সেখানে অনন্তকাল আনন্দময় জীবন কাটাবেন। কিন্তু যদি কেউ দুনিয়ার তিক্ত স্মৃতির কারণে, বা স্বামীর কোনো খারাপ আচরণের ট্রমা থেকে জান্নাতে তাকে আর জীবনসঙ্গী হিসেবে না চান, তবে জান্নাতে কোনো জোর-জবরদস্তি থাকবে না।
জান্নাত হলো এমন এক স্থান, যেখানে আল্লাহ বান্দাকে চূড়ান্তভাবে সন্তুষ্ট করবেন। আল্লাহ বলেছেন, "সেখানে তোমাদের মন যা চাইবে, তা-ই তোমাদের জন্য রয়েছে এবং তোমরা যা দাবি করবে, তা-ই দেওয়া হবে।" (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩১)।
দুনিয়ার যে স্বামী স্ত্রীর হক আদায় করেনি, জুলুম করেছে, সে যদি তওবা না করে মারা যায়, তবে আখিরাতে তাকে এর জন্য কঠিন হিসাব দিতে হবে। আর স্ত্রী যদি তার নেক আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেন, তবে জান্নাতে তাকে কোনো অপছন্দের ব্যক্তির সাথে জোর করে রাখা হবে না। দুনিয়ার ট্রমা বা ক্ষতের কারণে কেউ যদি অন্য কাউকে বা নতুন কোনো শুরু চান, আল্লাহ তাকে তা-ই দেবেন যাতে সে চূড়ান্তভাবে সন্তুষ্ট হয়। জান্নাত কোনো আপস করার জায়গা নয়; এটি পরম প্রাপ্তির ও অবারিত স্বাধীনতার জায়গা।
এর সবচেয়ে বড় ও জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আসিয়া (আলাইহাস সালাম)। ফেরাউন ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারী এবং নিকৃষ্টতম স্বামী। কিন্তু আসিয়া (আ.) এই জুলুমের মাঝেও আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলেন। তিনি "পরের জন্মে"র কাল্পনিক হিসাব করেননি বা আক্ষেপ করে বসে থাকেননি, বরং তিনি সরাসরি আল্লাহর কাছে জান্নাতের চিরস্থায়ী ঠিকানা ও নতুন জীবনের দোয়া করেছিলেন: “হে আমার রব! আপনার সান্নিধ্যে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন...”** (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:১১)
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কষ্টগুলোকে ভাইরাল করতে শেখায়, কিন্তু নিরাময়ের পথ দেখায় না। একটি পোস্টে হাজারো নারী যখন “না” লিখে তাদের বেদনাকে একত্রিত করেন, তখন পুরো সমাজের সামনে একটি নেতিবাচক আবহ তৈরি হয়। এর ফলে নারী-পুরুষের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ও বিভেদ তৈরি হচ্ছে। পুরুষের চোখে নারী হয়ে উঠছে অসহনশীল, আর নারীর চোখে পুরুষ হয়ে উঠছে জালিম।
অথচ ইসলাম এই ভারসাম্যহীনতাকে প্রশ্রয় দেয় না। ইসলামে যেমন স্বামীর অধিকার রয়েছে, তেমনি স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে পূর্ণমাত্রায়। যখন কোনো দাম্পত্য জীবনে অশান্তি চরমে পৌঁছায়, কুরআন তখন বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়। কুরআন বলেছে— প্রথমে বোঝাও (নসিহত), এরপরও কাজ না হলে নিজেদের বিছানা আলাদা করো, তাতেও সমাধান না হলে দুই পরিবার থেকে সালিশ বা প্রতিনিধি পাঠাও। (সূরা নিসা, ৪:৩৪-৩৫)
আর যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, স্বামীর জুলুমের কারণে স্ত্রীর দ্বীন, সম্মান বা জীবন হুমকির মুখে, তবে ইসলাম নারীকে সেখানে আজীবন পড়ে থেকে নীরবে কাঁদতে বলেনি। ইসলাম নারীকে শরিয়তের সীমার ভেতরে থেকে 'খুলা' (স্ত্রী কর্তৃক বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার) বা তালাকের অধিকার দিয়েছে। যদি স্বামী চরম মাত্রায় অবহেলাকারী, চরিত্রহীন বা জালিম হয়, তবে একজন মুসলিম নারী বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে পারেন। এই এক জীবনেই তাকে তার সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করার আইনি ও ধর্মীয় পথ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থায় "তালাকপ্রাপ্তা" নারীকে এমনভাবে দেখা হয় যেন সে বড় কোনো অপরাধী। সমাজ নারীকে তালাক নিতে নিরুৎসাহিত করে। "লোকলজ্জা", "বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ" বা "মেয়েরা একটু সহ্য করেই নেয়"—এমন হাজারো খোঁড়া যুক্তিতে সমাজ নারীকে আজীবন জুলুম সইতে বাধ্য করে। যখন শরিয়ত প্রদত্ত অধিকার সমাজ কেড়ে নেয়, তখন সেই অসহায়, বাধ্য নারীটি সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে "পরের জন্মে এই স্বামী চাই না" লিখে আক্ষেপ করে। সমাজ শরিয়ত মানে না বলেই আজ নারীদের আকিদা নষ্টকারী মরীচিকার পেছনে ছুটতে হচ্ছে।
আমাদের বর্তমান সমাজের এই হাহাকারের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনের চিত্র মেলালে আমরা বুঝতে পারি, আমরা আদর্শ থেকে কতটা দূরে সরে এসেছি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামীর চূড়ান্ত উদাহরণ। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিযি)।
তিনি দশ হাজার সাহাবীর সামনে বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট করে গেছেন, "নারীদের বিষয়ে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।" তিনি নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন এবং স্ত্রীদের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন।
হযরত খাদিজা (রা.) রাসূল (সা.)-কে সেই কঠিন সময়ে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, যখন পুরো মক্কা তার শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। তাদের সম্পর্ক ছিল গভীর আমানত ও ভালোবাসার। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথেও মাঝে মাঝে মান-অভিমান হতো, কিন্তু সেখানে বিন্দুমাত্র অসম্মান ছিল না; ছিল তাকওয়া। হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.) সংসারের কাজ ভাগ করে নিতেন।
হযরত উমর (রা.)-এর মতো বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী খলিফাও নিজ স্ত্রীর বকাঝকা চুপচাপ শুনে নিতেন এই ভেবে যে, "সে আমার সন্তানের মা, আমার ঘরের রক্ষক। সে আমার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, আমি কি তার একটু কড়া কথা সহ্য করতে পারব না?"
সাহাবীরা জানতেন, স্ত্রী বা স্বামীকে কষ্ট দেওয়া কেবল একটি ভুল নয়, এটি একটি কবিরা গুনাহ। বান্দার হক নষ্ট করার অপরাধে হাশরের ময়দানে নিজের নেকি দিয়ে দিতে হবে। আমাদের আবেগ যেখানে “আমি আর সইতে পারছি না” বলে থেমে যায়, সাহাবীদের আবেগ সেখানে “আল্লাহর সন্তুষ্টি কিসে” সেই দিকে ধাবিত হতো। আমরা কষ্টে ভেঙে পড়ে কল্পিত জন্মে শান্তি খুঁজি, আর তারা এই জীবনের কষ্টকে আখিরাতের পুঁজি বানাতেন।
আবেগকে খাটো করার কোনো সুযোগ নেই, তবে একে আসমানি কাঠামোর (কুরআন-সুন্নাহর) মধ্যে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনো নারী কষ্ট পেয়ে এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে “না” বলেন, তবে তাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করতে হবে— “আপনার এই ক্ষতের মূল কারণ কী?”
হয়তো কারণগুলো হলো— সম্মান না পাওয়া, অর্থনৈতিক অবহেলা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, কিংবা শ্বশুরবাড়ির অন্যায় চাপ। এই গভীর ক্ষতগুলোর নিরাময় সোশ্যাল মিডিয়ার এক লাইনের কমেন্টে বা কল্পিত জন্মে হবে না। এর নিরাময় হবে তখন, যখন সমাজে 'আল্লাহভীতি' বা তাকওয়ার সংস্কৃতি ফিরে আসবে।
একজন মুসলিম স্বামী যেদিন সত্যিকার অর্থে বুঝতে শিখবেন যে, তার স্ত্রী কোনো দাসী বা কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় 'আমানত', এবং এই আমানতের খেয়ানত করলে রোজ হাশরে তাকে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে— সেদিন এই অবহেলার অবসান ঘটবে। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বিবাহকে "মীসাকান গালিযা" বা 'দৃঢ় অঙ্গীকার' বলেছেন। এটি কেবল দুটি মানুষের চুক্তি নয়, এর সাক্ষী স্বয়ং আল্লাহ।
একইভাবে একজন স্ত্রীকেও বুঝতে হবে যে, তার স্বামী কোনো ফেরেশতা নন, তারও ভুল-ত্রুটি হতে পারে, অর্থনৈতিক সংকট থাকতে পারে। এই পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, সম্মান প্রদর্শন এবং জবাবদিহির বোধই পারে একটি মৃতপ্রায় দাম্পত্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে।
এই ভাইরাল ট্রেন্ডটি আসলে আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের ঘরগুলোতে কতটা অন্ধকার জমেছে। কিন্তু এই অন্ধকারের সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমরা যেন অন্ধকারেরই অন্য এক গলিতে—আকিদা নষ্টকারী, শিরক ও কুফর মিশ্রিত ধারণায়—হারিয়ে না যাই।
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের উত্তর খুব স্পষ্ট হওয়া উচিত: আমাদের কোনো 'পরের জন্ম' নেই। যা করার, এই এক জীবনেই করতে হবে। অন্যায় থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, অধিকার বঞ্চিত হলে তা আদায় করতে হবে, আর জুলুম সীমার বাইরে গেলে আল্লাহর দেওয়া নিয়মে বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই কল্পিত জন্মে বিচার চাওয়া যাবে না বা আক্ষেপ করা যাবে না। কারণ কল্পিত জন্মে আল্লাহ নেই, হাশর নেই, ইনসাফ নেই, হিসাব-নিকাশ নেই। সেটি কেবলই একটি মিথ্যে মরীচিকা।
আসুন, আমরা আবেগের লাগাম টেনে ধরি। সম্পর্কগুলোকে সিনেমা বা উপন্যাসের বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে না দেখে, আল্লাহর দেওয়া আলোয় দেখতে শিখি। একে অপরের কষ্টকে শুনি, সম্মান করি, কিন্তু সেই কষ্টকে কখনোই শরিয়ত ও আকিদার ওপরে স্থান না দিই। তাহলেই আমাদের এই এক জীবনেই দাম্পত্যে রহমতের বারিধারা নেমে আসবে, জান্নাতে পরম প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে এবং আমাদের ঈমান থাকবে পাহাড়ের মতো অটুট।
[ছদ্মবেশী পরের জন্ম]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
“আপনার স্বামীর সঙ্গে যদি পরের জন্মে আবার বিয়ে করার সুযোগ হয়, তাহলে কি করবেন?”
হয়তো কোনো পেজ বা গ্রুপ থেকে নিছক বিনোদন বা এঙ্গেজমেন্ট বাড়ানোর জন্যই পোস্টটি করা হয়েছিল। কিন্তু এর মন্তব্যের ঘরে চোখ রাখলে শিউরে উঠতে হয়। হাজার হাজার নারী সেখানে দ্বিধাহীনভাবে, নির্দ্বিধায় একটিই উত্তর দিচ্ছেন— "না!"
এই অসংখ্য "না"-এর নিচে চাপা পড়ে আছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অভিমান, মানসিক ক্লান্তি এবং বহু ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ। মানুষ যখন এমন একটি প্রশ্নে এতটা সরাসরি “না” লেখে, তখন সেটি কেবল একটি সম্পর্কের মূল্যায়ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এক নীরব, করুণ বিদ্রোহ।
কিন্তু এই বিদ্রোহ যখন নিজের অজান্তেই ইসলামি আকিদা বা বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করতে শুরু করে, তখন বিষয়টি আর কেবল সমাজবিজ্ঞানের ফ্রেমে আটকে থাকে না। এটি রূপ নেয় বিশ্বাস ও আবেগের এক ভয়ংকর সংঘাতে। আর ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের মুসলিম পরিচয়ের এক সূক্ষ্ম, অথচ ভয়াবহ ক্ষয় শুরু হয়েছে।
হাজারো নারীর এই “না” বলার নেপথ্যে যে নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তারা এই উত্তর দিচ্ছেন কারণ তাদের কাছে দাম্পত্য জীবন কোনো শান্তির নীড় নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে এক অন্তহীন ক্লান্তির কারাগার।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারীকে বিয়ের পর যে পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই অমানবিক। স্বামীর দিনের পর দিন অবহেলা, কথায় কথায় রূঢ়তা, দায়িত্বহীনতা, অর্থনৈতিক চাপ, শ্বশুরবাড়ির একতরফা দায়ভার কাঁধে নেওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন—এসব কিছু মিলিয়ে তাদের হৃদয়ে জমেছে কালচে এক ক্ষত। তারা সারাদিন পরিশ্রম করেন, কিন্তু বিনিময়ে একটুখানি প্রশংসা বা ভালোবাসার অভাব তাদের ভেতরটাকে কুরে কুরে খায়। সেই অবদমিত ক্ষতের গভীর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসছে এই “না”। এটি অত্যন্ত মানবিক একটি প্রতিক্রিয়া।
পবিত্র কুরআন মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজন ও দুর্বলতাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধারণ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে সাকিনা (প্রশান্তি) লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে মাওয়াদ্দাহ (গভীর ভালোবাসা) ও রাহমাহ (দয়া-মায়া) সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে সেই সীম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তাভাবনা করে।” (সূরা রুম, ৩০:২১)
এই আয়াতের তাফসীরে ইসলামি স্কলারগণ স্পষ্ট করেছেন যে, বিবাহের মূল উদ্দেশ্য কেবল জৈবিক চাহিদা মেটানো বা বংশবৃদ্ধি নয়; বরং এর আত্মিক ভিত্তি হলো— সাকিনা, মাওয়াদ্দাহ এবং রাহমাহ।
একটি সংসারে যখন এই তিনটি গুণের লেশমাত্র থাকে না, স্বামী যখন স্ত্রীর অনুভূতির মূল্য দেন না, তখন সেই সম্পর্ক নারীর জন্য এক জীবন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়। তখন নারী “না” লিখে তার যন্ত্রণার ভার কিছুটা হলেও লাঘব করতে চায়। আমাদের এই যন্ত্রণাকে শুনতে হবে, তাদের আর্তনাদকে সম্মান জানাতে হবে। সমাজ হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা তাদের এই কষ্টকে ধারণ করতে পারিনি। কিন্তু এই যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ যেন আমাদের ঈমানের শেকড় কেটে না দেয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য।
এই ভাইরাল ট্রেন্ডটির সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটি লুকিয়ে আছে এর প্রশ্নকাঠামোতে— "পরের জন্ম"।
ইসলামি আকিদায় 'পুনর্জন্ম' বা জন্মান্তরবাদের কোনো স্থান নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধর্মীয় বিশ্বাস (বিশেষত সনাতন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের), যেখানে মনে করা হয় আত্মা বারবার পৃথিবীতে নতুন রূপ নিয়ে ফিরে আসে। কর্মফল অনুযায়ী কেউ মানুষ, কেউ প্রাণী হয়ে বারবার জন্ম নেয়। একজন মুসলিমের জীবনদর্শন এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদের সবাইকে আমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।” (সূরা আনকাবুত, ২৯:৫৭)
দুনিয়ার জীবন একবারই। মৃত্যু একবার, কবরের জীবন (বারযাখ) একবার, পুনরুত্থান (হাশর) একবার এবং চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশও একবারই হবে। নতুন করে একই পরিচয়ে, বা ভিন্ন কোনো পরিচয়ে এই পৃথিবীতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ বা বাস্তবতা নেই।
কুরআনে আল্লাহ আরও বলেন: “অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, সে বলে, 'হে আমার রব! আমাকে পুনরায় (দুনিয়ায়) পাঠিয়ে দিন, যাতে আমি যে সৎকর্ম করিনি, তা করতে পারি।' কখনোই নয়! এটি তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে বারযাখ (পর্দা) রয়েছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।” (সূরা মুমিনুন, ২৩:৯৯-১০০)
তাই, এই প্রশ্ন যখন কোনো মুসলিমের মুখে উচ্চারিত হয় বা কোনো মুসলিম নারী যখন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে "পরের জন্মে এই স্বামী চাই না" বলেন, তখন সেটি নিছক ক্ষোভের প্রকাশ থাকে না; এটি পরিণত হয় আকিদার সীমালঙ্ঘনে। মিডিয়া, নাটক-সিনেমা এবং সাহিত্যের প্রভাবে "সাত জনম", "পরের জন্ম" শব্দগুলো আমাদের রোজকার ভাষায় এমনভাবে মিশে গেছে যে, আমরা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারি না।
যে সমাজে মুসলিমরা হাসি-ঠাট্টা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে "পরের জন্ম" ধারণাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করবে, সেই সমাজে কিয়ামত, হাশর, মিজান এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার ভয় ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাবে। তাওহীদের এই স্খলন একটি সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত। কারণ, যখন কেউ মনে করে সে আবার ফিরে আসবে, তখন পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামের ধারণা তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে যে নারী এই দুনিয়ায় এক অত্যাচারী, অবহেলাকারী স্বামীর সাথে জীবন কাটালেন, তার এই কষ্টের কি কোনো প্রতিদান নেই? আখিরাতে কি তাকে আবার সেই একই স্বামীর সাথেই থাকতে হবে? জান্নাতে কি নারীদের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতার মূল্য থাকবে না?
ইসলাম এর অত্যন্ত যৌক্তিক, হৃদয়গ্রাহী এবং ইনসাফপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। দুনিয়ার জীবনে যারা মজলুম, আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে অকল্পনীয় ক্ষতিপূরণ। যদি কোনো নারী দুনিয়ায় স্বামীর জুলুমের শিকার হন এবং ধৈর্য ধারণ করে ঈমানের ওপর অটল থাকেন, তবে জান্নাতে আল্লাহ তার সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেবেন।
জান্নাতবাসীদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
“আর আমি তাদের অন্তর থেকে সব ধরনের ক্ষোভ ও মালিন্য বের করে দেব...” (সূরা হিজর, ১৫:৪৭)
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জান্নাতে যদি কোনো নারী তার দুনিয়ার স্বামীকেই জান্নাতি হিসেবে পান এবং তারা উভয়েই সেখানে একসাথে থাকতে চান, তবে আল্লাহ তাদের সেই পবিত্র বন্ধনকে জান্নাতেও অটুট রাখবেন। তারা সেখানে অনন্তকাল আনন্দময় জীবন কাটাবেন। কিন্তু যদি কেউ দুনিয়ার তিক্ত স্মৃতির কারণে, বা স্বামীর কোনো খারাপ আচরণের ট্রমা থেকে জান্নাতে তাকে আর জীবনসঙ্গী হিসেবে না চান, তবে জান্নাতে কোনো জোর-জবরদস্তি থাকবে না।
জান্নাত হলো এমন এক স্থান, যেখানে আল্লাহ বান্দাকে চূড়ান্তভাবে সন্তুষ্ট করবেন। আল্লাহ বলেছেন, "সেখানে তোমাদের মন যা চাইবে, তা-ই তোমাদের জন্য রয়েছে এবং তোমরা যা দাবি করবে, তা-ই দেওয়া হবে।" (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩১)।
দুনিয়ার যে স্বামী স্ত্রীর হক আদায় করেনি, জুলুম করেছে, সে যদি তওবা না করে মারা যায়, তবে আখিরাতে তাকে এর জন্য কঠিন হিসাব দিতে হবে। আর স্ত্রী যদি তার নেক আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেন, তবে জান্নাতে তাকে কোনো অপছন্দের ব্যক্তির সাথে জোর করে রাখা হবে না। দুনিয়ার ট্রমা বা ক্ষতের কারণে কেউ যদি অন্য কাউকে বা নতুন কোনো শুরু চান, আল্লাহ তাকে তা-ই দেবেন যাতে সে চূড়ান্তভাবে সন্তুষ্ট হয়। জান্নাত কোনো আপস করার জায়গা নয়; এটি পরম প্রাপ্তির ও অবারিত স্বাধীনতার জায়গা।
এর সবচেয়ে বড় ও জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আসিয়া (আলাইহাস সালাম)। ফেরাউন ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারী এবং নিকৃষ্টতম স্বামী। কিন্তু আসিয়া (আ.) এই জুলুমের মাঝেও আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলেন। তিনি "পরের জন্মে"র কাল্পনিক হিসাব করেননি বা আক্ষেপ করে বসে থাকেননি, বরং তিনি সরাসরি আল্লাহর কাছে জান্নাতের চিরস্থায়ী ঠিকানা ও নতুন জীবনের দোয়া করেছিলেন: “হে আমার রব! আপনার সান্নিধ্যে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন...”** (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:১১)
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কষ্টগুলোকে ভাইরাল করতে শেখায়, কিন্তু নিরাময়ের পথ দেখায় না। একটি পোস্টে হাজারো নারী যখন “না” লিখে তাদের বেদনাকে একত্রিত করেন, তখন পুরো সমাজের সামনে একটি নেতিবাচক আবহ তৈরি হয়। এর ফলে নারী-পুরুষের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ও বিভেদ তৈরি হচ্ছে। পুরুষের চোখে নারী হয়ে উঠছে অসহনশীল, আর নারীর চোখে পুরুষ হয়ে উঠছে জালিম।
অথচ ইসলাম এই ভারসাম্যহীনতাকে প্রশ্রয় দেয় না। ইসলামে যেমন স্বামীর অধিকার রয়েছে, তেমনি স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে পূর্ণমাত্রায়। যখন কোনো দাম্পত্য জীবনে অশান্তি চরমে পৌঁছায়, কুরআন তখন বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়। কুরআন বলেছে— প্রথমে বোঝাও (নসিহত), এরপরও কাজ না হলে নিজেদের বিছানা আলাদা করো, তাতেও সমাধান না হলে দুই পরিবার থেকে সালিশ বা প্রতিনিধি পাঠাও। (সূরা নিসা, ৪:৩৪-৩৫)
আর যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, স্বামীর জুলুমের কারণে স্ত্রীর দ্বীন, সম্মান বা জীবন হুমকির মুখে, তবে ইসলাম নারীকে সেখানে আজীবন পড়ে থেকে নীরবে কাঁদতে বলেনি। ইসলাম নারীকে শরিয়তের সীমার ভেতরে থেকে 'খুলা' (স্ত্রী কর্তৃক বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার) বা তালাকের অধিকার দিয়েছে। যদি স্বামী চরম মাত্রায় অবহেলাকারী, চরিত্রহীন বা জালিম হয়, তবে একজন মুসলিম নারী বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে পারেন। এই এক জীবনেই তাকে তার সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করার আইনি ও ধর্মীয় পথ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থায় "তালাকপ্রাপ্তা" নারীকে এমনভাবে দেখা হয় যেন সে বড় কোনো অপরাধী। সমাজ নারীকে তালাক নিতে নিরুৎসাহিত করে। "লোকলজ্জা", "বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ" বা "মেয়েরা একটু সহ্য করেই নেয়"—এমন হাজারো খোঁড়া যুক্তিতে সমাজ নারীকে আজীবন জুলুম সইতে বাধ্য করে। যখন শরিয়ত প্রদত্ত অধিকার সমাজ কেড়ে নেয়, তখন সেই অসহায়, বাধ্য নারীটি সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে "পরের জন্মে এই স্বামী চাই না" লিখে আক্ষেপ করে। সমাজ শরিয়ত মানে না বলেই আজ নারীদের আকিদা নষ্টকারী মরীচিকার পেছনে ছুটতে হচ্ছে।
আমাদের বর্তমান সমাজের এই হাহাকারের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনের চিত্র মেলালে আমরা বুঝতে পারি, আমরা আদর্শ থেকে কতটা দূরে সরে এসেছি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামীর চূড়ান্ত উদাহরণ। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিযি)।
তিনি দশ হাজার সাহাবীর সামনে বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট করে গেছেন, "নারীদের বিষয়ে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।" তিনি নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন এবং স্ত্রীদের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন।
হযরত খাদিজা (রা.) রাসূল (সা.)-কে সেই কঠিন সময়ে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, যখন পুরো মক্কা তার শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। তাদের সম্পর্ক ছিল গভীর আমানত ও ভালোবাসার। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথেও মাঝে মাঝে মান-অভিমান হতো, কিন্তু সেখানে বিন্দুমাত্র অসম্মান ছিল না; ছিল তাকওয়া। হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.) সংসারের কাজ ভাগ করে নিতেন।
হযরত উমর (রা.)-এর মতো বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী খলিফাও নিজ স্ত্রীর বকাঝকা চুপচাপ শুনে নিতেন এই ভেবে যে, "সে আমার সন্তানের মা, আমার ঘরের রক্ষক। সে আমার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, আমি কি তার একটু কড়া কথা সহ্য করতে পারব না?"
সাহাবীরা জানতেন, স্ত্রী বা স্বামীকে কষ্ট দেওয়া কেবল একটি ভুল নয়, এটি একটি কবিরা গুনাহ। বান্দার হক নষ্ট করার অপরাধে হাশরের ময়দানে নিজের নেকি দিয়ে দিতে হবে। আমাদের আবেগ যেখানে “আমি আর সইতে পারছি না” বলে থেমে যায়, সাহাবীদের আবেগ সেখানে “আল্লাহর সন্তুষ্টি কিসে” সেই দিকে ধাবিত হতো। আমরা কষ্টে ভেঙে পড়ে কল্পিত জন্মে শান্তি খুঁজি, আর তারা এই জীবনের কষ্টকে আখিরাতের পুঁজি বানাতেন।
আবেগকে খাটো করার কোনো সুযোগ নেই, তবে একে আসমানি কাঠামোর (কুরআন-সুন্নাহর) মধ্যে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনো নারী কষ্ট পেয়ে এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে “না” বলেন, তবে তাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করতে হবে— “আপনার এই ক্ষতের মূল কারণ কী?”
হয়তো কারণগুলো হলো— সম্মান না পাওয়া, অর্থনৈতিক অবহেলা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, কিংবা শ্বশুরবাড়ির অন্যায় চাপ। এই গভীর ক্ষতগুলোর নিরাময় সোশ্যাল মিডিয়ার এক লাইনের কমেন্টে বা কল্পিত জন্মে হবে না। এর নিরাময় হবে তখন, যখন সমাজে 'আল্লাহভীতি' বা তাকওয়ার সংস্কৃতি ফিরে আসবে।
একজন মুসলিম স্বামী যেদিন সত্যিকার অর্থে বুঝতে শিখবেন যে, তার স্ত্রী কোনো দাসী বা কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় 'আমানত', এবং এই আমানতের খেয়ানত করলে রোজ হাশরে তাকে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে— সেদিন এই অবহেলার অবসান ঘটবে। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বিবাহকে "মীসাকান গালিযা" বা 'দৃঢ় অঙ্গীকার' বলেছেন। এটি কেবল দুটি মানুষের চুক্তি নয়, এর সাক্ষী স্বয়ং আল্লাহ।
একইভাবে একজন স্ত্রীকেও বুঝতে হবে যে, তার স্বামী কোনো ফেরেশতা নন, তারও ভুল-ত্রুটি হতে পারে, অর্থনৈতিক সংকট থাকতে পারে। এই পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, সম্মান প্রদর্শন এবং জবাবদিহির বোধই পারে একটি মৃতপ্রায় দাম্পত্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে।
এই ভাইরাল ট্রেন্ডটি আসলে আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের ঘরগুলোতে কতটা অন্ধকার জমেছে। কিন্তু এই অন্ধকারের সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমরা যেন অন্ধকারেরই অন্য এক গলিতে—আকিদা নষ্টকারী, শিরক ও কুফর মিশ্রিত ধারণায়—হারিয়ে না যাই।
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের উত্তর খুব স্পষ্ট হওয়া উচিত: আমাদের কোনো 'পরের জন্ম' নেই। যা করার, এই এক জীবনেই করতে হবে। অন্যায় থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, অধিকার বঞ্চিত হলে তা আদায় করতে হবে, আর জুলুম সীমার বাইরে গেলে আল্লাহর দেওয়া নিয়মে বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই কল্পিত জন্মে বিচার চাওয়া যাবে না বা আক্ষেপ করা যাবে না। কারণ কল্পিত জন্মে আল্লাহ নেই, হাশর নেই, ইনসাফ নেই, হিসাব-নিকাশ নেই। সেটি কেবলই একটি মিথ্যে মরীচিকা।
আসুন, আমরা আবেগের লাগাম টেনে ধরি। সম্পর্কগুলোকে সিনেমা বা উপন্যাসের বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে না দেখে, আল্লাহর দেওয়া আলোয় দেখতে শিখি। একে অপরের কষ্টকে শুনি, সম্মান করি, কিন্তু সেই কষ্টকে কখনোই শরিয়ত ও আকিদার ওপরে স্থান না দিই। তাহলেই আমাদের এই এক জীবনেই দাম্পত্যে রহমতের বারিধারা নেমে আসবে, জান্নাতে পরম প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে এবং আমাদের ঈমান থাকবে পাহাড়ের মতো অটুট।
[ছদ্মবেশী পরের জন্ম]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group
