একটি মা-হারা বানরছানা তার বুকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে একটি তুলতুলে পুতুল। প্রাণীটির চোখের কোণে জমে আছে নিঃশব্দ আকুতি—যেন নির্বাক ভাষায় খুঁজছে একটু উষ্ণতা, একটু আশ্রয়। এই একটিমাত্র ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। লাখো মানুষ শেয়ার করে, কমেন্ট বক্সে আছড়ে পড়ে সহানুভূতির বিশাল ঢেউ। চোখের জল আর ভাঙা হৃদয়ের ইমোজিতে ভরে যায় টাইমলাইন। "প্রাণীরাও অনুভূতি বোঝে", "এমন নিষ্ঠুরতা বন্ধ হোক"—এই আবেগঘন শিরোনামগুলো কয়েকদিন ধরে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ের শীর্ষে থাকে। একটি বানরের পুতুল রাতারাতি হয়ে ওঠে আধুনিক মানবিকতার প্রতীক।
কিন্তু এই আলোকিত পর্দার ঠিক পেছনেই, আমাদের চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেক নির্মম বাস্তবতা, যা ক্যামেরার লেন্সে উঠে এলেও হারিয়ে যায় অ্যালগরিদম আর সংখ্যার ভিড়ে। গাজার ধুলোমাখা, রক্তস্নাত রাস্তায় হয়তো পড়ে আছে এক শিশুর নিথর দেহ; যার শরীরের নিচের অর্ধেক অংশই নেই, বাকি অংশটুকু মোড়া রক্তাক্ত ব্যান্ডেজে। যে শিশুটি গতকালও মায়ের কোলে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল, আজ সে হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচে, কিংবা এতিমখানার এক অন্ধকার কোণে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাজার হাজার শিশু—কেউ নিহত, কেউ অঙ্গহীন, কেউ অনাথ, কেউবা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া কবরবিহীন এক লাশ।
অদ্ভুত এই আধুনিক সভ্যতা! এখানে এগুলো কেবলই কিছু পরিসংখ্যান—"আজ এত হাজার শিশু নিহত, এত হাজার আহত"। এদের কোনো ব্যক্তিগত গল্প নেই, এদের নিয়ে কোনো হৃদয়বিদারক শিরোনাম নেই। বানরের পুতুলটি যেখানে ট্রেন্ডিং নিউজ, সেখানে মানুষের শিশুর ছিন্নভিন্ন দেহ কেবলই স্ট্যাটিসটিক্স। এই সভ্যতা প্রাণীর অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে, কিন্তু একই সভ্যতা যখন ‘আত্মরক্ষা’ বা ‘যুদ্ধ’-এর নামে নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করে, তাদের জীবনকে পরীক্ষাগারের ইঁদুরের মতো ব্যবহার করে—তখন সবাই মুখে কুলুপ আঁটে। এক ঘণ্টায় এক শিশুর মৃত্যু—এটা শুধু খবরের কাগজের শিরোনাম নয়, এটি একেকটি হৃদয়ের চিরতরে থেমে যাওয়া, একেকটি মায়ের কোলে সন্তানের শেষ নিঃশ্বাস।
পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, কিন্তু মানুষের জীবনের অধিকারকে ইসলাম সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বনী আদমকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে আমরা এক অদ্ভুত ‘নির্বাচিত করুণার’ চর্চা দেখছি।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ اخْتَارَ آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ
"নিশ্চয় আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীমের বংশ এবং ইমরানের বংশকে বিশ্ববাসীদের উপর নির্বাচন করেছেন।" (সূরা আল-ইমরান: ৩৩)
এই আয়াতে আল্লাহ যাদের নির্বাচিত করেছেন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন পৃথিবীতে ন্যায়বিচার, তাওহিদ ও মানবতার মূর্ত প্রতীক। আল্লাহর এই নির্বাচন কখনো জালিমের পক্ষে যায় না, আর যারা ন্যায়ের পথে হাঁটে তারা কখনো মজলুমের প্রতি অন্ধ হতে পারে না। যারা বানরের জন্য কাঁদে কিন্তু ক্ষমতাশালীদের ভয়ে মানুষের শিশুর জন্য নীরব থাকে, তাদের এই ভণ্ডামিপূর্ণ করুণা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই বৈপরীত্যের মূলে রয়েছে আমাদের হৃদয়ের শূন্যতা। যে হৃদয় আল্লাহর ভয় ও প্রকৃত দয়া হারিয়ে ফেলে, তার কাছে করুণা হয়ে যায় সুবিধাবাদী। সুবিধাজনক ক্ষেত্রে, যেখানে কোনো ঝুঁকি নেই, সেখানে মানবিকতা দেখানো খুব সহজ। কিন্তু ক্ষমতা আর অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের কথা বলা ভীষণ কঠিন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ
"তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।" (সুনানে তিরমিজি: ১৯২৪)
এই দয়া কোনো ফিল্টার মেনে চলে না। এটি জাতি, ধর্ম, বা ভূখণ্ডের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় না। আধুনিক মানবিকতা এক প্রকার বাছাই করা করুণায় পরিণত হয়েছে। পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিন্দনীয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে শিশুহত্যা তাদের ভাষায় ‘জটিল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু’। বানরের পুতুল আঁকড়ে থাকা দেখে অশ্রুসিক্ত হওয়া সহজ; কিন্তু গাজায় এক মা যখন তিন সন্তানের লাশ শাড়ির আঁচলে বেঁধে গোরস্থানের দিকে হাঁটেন—এটা সামনে আনলে বিশ্বমোড়লদের নগ্ন চেহারা ফুটে ওঠে। তাই সেই ছবি ঠেলে দেওয়া হয় খবরের একদম প্রান্তে।
আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের বিবেককে নাড়া দিয়ে বলেন:
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ
"তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেইসব দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছ না?" (সূরা আন-নিসা: ৭৫)
এই আয়াতে দুর্বলদের যে আর্তনাদ শোনা যায়—তা গাজার শিশুদের কান্না, পশ্চিম তীরের গুলিবিদ্ধ কিশোরের গোঙানি, কিংবা সিরিয়া-ইয়েমেনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের ডাক। এই আহ্বানের জবাব আজ কোথায়? এখানেই পরীক্ষা হয় মানবতার এবং ঈমানের। তুমি কাদের পাশে দাঁড়াবে? একটি প্রাণীর, যার কষ্ট বাস্তব কিন্তু যার পক্ষে দাঁড়ালে ক্ষমতার রোষানলে পড়তে হয় না? নাকি সেই মজলুম শিশুর, যার পাশে দাঁড়ানো মানে বিশ্বশক্তির চোখের দিকে তাকিয়ে সত্য বলা?
জালিমদের আস্ফালন দেখে যারা হতাশ হন, তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার সুস্পষ্ট ঘোষণা:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ ۚ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمَةٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ
"তুমি জালিমদের কাজ সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো অসচেতন মনে করো না। তিনি তো তাদেরকে কেবল সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিচ্ছেন, যেদিন (ভয়ে) মানুষের চোখগুলো স্থির হয়ে যাবে।" (সূরা ইবরাহিম: ৪২)
সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফগণ জুলুম দেখলে নিজেদের প্রশ্ন করতেন—"আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?" মক্কার অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে মদিনায় যখন তারা ইসলামি সমাজ গড়ছেন, তখনও তারা দূরবর্তী মজলুমদের কথা ভুলতেন না। তারা জানতেন, জালিমকে তাৎক্ষণিক থামাতে না পারলেও, নীরব থেকে জুলুমকে কখনো স্বাভাবিক বা বৈধতা দেওয়া যাবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন:
اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ
"মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কেননা তার দোয়া এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।" (সহিহ বুখারি: ২৪৪৮)
গাজার কোনো শিশু যখন রক্তমাখা হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফরিয়াদ করে, সেই ফরিয়াদ কোনো বাধার সম্মুখীন হয় না। আমাদের এই নির্লিপ্ততা আর নীরবতা একদিন সেই ফরিয়াদের মুখোমুখি হবে।
সালাফেরা জানতেন, জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে কেবল তলোয়ার হাতে নেওয়া নয়; বরং অন্তরে জুলুমের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা, সত্য উচ্চারণ করা এবং ন্যায়ের পক্ষে জনমত গঠন করা।
আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও—যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতার বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেও যায়।" (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
আধুনিক এই ভণ্ড সভ্যতার মুখোশ ভেদ করতে হলে আমাদের হৃদয়কে জাগাতে হবে। খবরের কাগজের মৃতদেহগুলোকে কেবল সংখ্যা নয়, বরং রক্তমাখা জামা পরা আমাদেরই ভাই-বোন হিসেবে দেখতে হবে। তাদের জন্য দোয়া করতে হবে, কলম ধরতে হবে, সত্য বলতে হবে এবং ন্যায়ের দাবি তুলতে হবে। কারণ, জুলুমের বিরুদ্ধে নীরব থাকা প্রকারান্তরে জালিমেরই সহায়তা করা।
রক্তমাখা হাতে লেখা ইতিহাসের পাতায়,
শিশুর কান্না আজ কেবলই নির্বাক স্বাক্ষর।
সভ্যতার মিথ্যা মুখোশ লুটিয়ে পড়ে ধুলোয়,
যখন মানবতা জেগে ওঠে সত্যের তীব্র আলোয়।
এই জাগরণই হলো প্রকৃত সভ্যতা—যেখানে বানরের কষ্টের পাশাপাশি মানুষের শিশুর কান্নাও সমান গুরুত্বের সাথে শোনা যায়, যেখানে করুণা কোনো ভূ-রাজনৈতিক ফিল্টার মেনে চলে না। এটাই ঈমানের, তাকওয়ার এবং প্রকৃত মানবতার দাবি।
[সভ্যতার দ্বিমুখী আয়না]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
একটি মা-হারা বানরছানা তার বুকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে একটি তুলতুলে পুতুল। প্রাণীটির চোখের কোণে জমে আছে নিঃশব্দ আকুতি—যেন নির্বাক ভাষায় খুঁজছে একটু উষ্ণতা, একটু আশ্রয়। এই একটিমাত্র ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। লাখো মানুষ শেয়ার করে, কমেন্ট বক্সে আছড়ে পড়ে সহানুভূতির বিশাল ঢেউ। চোখের জল আর ভাঙা হৃদয়ের ইমোজিতে ভরে যায় টাইমলাইন। "প্রাণীরাও অনুভূতি বোঝে", "এমন নিষ্ঠুরতা বন্ধ হোক"—এই আবেগঘন শিরোনামগুলো কয়েকদিন ধরে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ের শীর্ষে থাকে। একটি বানরের পুতুল রাতারাতি হয়ে ওঠে আধুনিক মানবিকতার প্রতীক।
কিন্তু এই আলোকিত পর্দার ঠিক পেছনেই, আমাদের চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেক নির্মম বাস্তবতা, যা ক্যামেরার লেন্সে উঠে এলেও হারিয়ে যায় অ্যালগরিদম আর সংখ্যার ভিড়ে। গাজার ধুলোমাখা, রক্তস্নাত রাস্তায় হয়তো পড়ে আছে এক শিশুর নিথর দেহ; যার শরীরের নিচের অর্ধেক অংশই নেই, বাকি অংশটুকু মোড়া রক্তাক্ত ব্যান্ডেজে। যে শিশুটি গতকালও মায়ের কোলে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল, আজ সে হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচে, কিংবা এতিমখানার এক অন্ধকার কোণে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাজার হাজার শিশু—কেউ নিহত, কেউ অঙ্গহীন, কেউ অনাথ, কেউবা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া কবরবিহীন এক লাশ।
অদ্ভুত এই আধুনিক সভ্যতা! এখানে এগুলো কেবলই কিছু পরিসংখ্যান—"আজ এত হাজার শিশু নিহত, এত হাজার আহত"। এদের কোনো ব্যক্তিগত গল্প নেই, এদের নিয়ে কোনো হৃদয়বিদারক শিরোনাম নেই। বানরের পুতুলটি যেখানে ট্রেন্ডিং নিউজ, সেখানে মানুষের শিশুর ছিন্নভিন্ন দেহ কেবলই স্ট্যাটিসটিক্স। এই সভ্যতা প্রাণীর অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে, কিন্তু একই সভ্যতা যখন ‘আত্মরক্ষা’ বা ‘যুদ্ধ’-এর নামে নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করে, তাদের জীবনকে পরীক্ষাগারের ইঁদুরের মতো ব্যবহার করে—তখন সবাই মুখে কুলুপ আঁটে। এক ঘণ্টায় এক শিশুর মৃত্যু—এটা শুধু খবরের কাগজের শিরোনাম নয়, এটি একেকটি হৃদয়ের চিরতরে থেমে যাওয়া, একেকটি মায়ের কোলে সন্তানের শেষ নিঃশ্বাস।
পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, কিন্তু মানুষের জীবনের অধিকারকে ইসলাম সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বনী আদমকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে আমরা এক অদ্ভুত ‘নির্বাচিত করুণার’ চর্চা দেখছি।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ اخْتَارَ آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ
"নিশ্চয় আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীমের বংশ এবং ইমরানের বংশকে বিশ্ববাসীদের উপর নির্বাচন করেছেন।" (সূরা আল-ইমরান: ৩৩)
এই আয়াতে আল্লাহ যাদের নির্বাচিত করেছেন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন পৃথিবীতে ন্যায়বিচার, তাওহিদ ও মানবতার মূর্ত প্রতীক। আল্লাহর এই নির্বাচন কখনো জালিমের পক্ষে যায় না, আর যারা ন্যায়ের পথে হাঁটে তারা কখনো মজলুমের প্রতি অন্ধ হতে পারে না। যারা বানরের জন্য কাঁদে কিন্তু ক্ষমতাশালীদের ভয়ে মানুষের শিশুর জন্য নীরব থাকে, তাদের এই ভণ্ডামিপূর্ণ করুণা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই বৈপরীত্যের মূলে রয়েছে আমাদের হৃদয়ের শূন্যতা। যে হৃদয় আল্লাহর ভয় ও প্রকৃত দয়া হারিয়ে ফেলে, তার কাছে করুণা হয়ে যায় সুবিধাবাদী। সুবিধাজনক ক্ষেত্রে, যেখানে কোনো ঝুঁকি নেই, সেখানে মানবিকতা দেখানো খুব সহজ। কিন্তু ক্ষমতা আর অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের কথা বলা ভীষণ কঠিন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ
"তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।" (সুনানে তিরমিজি: ১৯২৪)
এই দয়া কোনো ফিল্টার মেনে চলে না। এটি জাতি, ধর্ম, বা ভূখণ্ডের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় না। আধুনিক মানবিকতা এক প্রকার বাছাই করা করুণায় পরিণত হয়েছে। পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিন্দনীয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে শিশুহত্যা তাদের ভাষায় ‘জটিল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু’। বানরের পুতুল আঁকড়ে থাকা দেখে অশ্রুসিক্ত হওয়া সহজ; কিন্তু গাজায় এক মা যখন তিন সন্তানের লাশ শাড়ির আঁচলে বেঁধে গোরস্থানের দিকে হাঁটেন—এটা সামনে আনলে বিশ্বমোড়লদের নগ্ন চেহারা ফুটে ওঠে। তাই সেই ছবি ঠেলে দেওয়া হয় খবরের একদম প্রান্তে।
আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের বিবেককে নাড়া দিয়ে বলেন:
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ
"তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেইসব দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছ না?" (সূরা আন-নিসা: ৭৫)
এই আয়াতে দুর্বলদের যে আর্তনাদ শোনা যায়—তা গাজার শিশুদের কান্না, পশ্চিম তীরের গুলিবিদ্ধ কিশোরের গোঙানি, কিংবা সিরিয়া-ইয়েমেনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের ডাক। এই আহ্বানের জবাব আজ কোথায়? এখানেই পরীক্ষা হয় মানবতার এবং ঈমানের। তুমি কাদের পাশে দাঁড়াবে? একটি প্রাণীর, যার কষ্ট বাস্তব কিন্তু যার পক্ষে দাঁড়ালে ক্ষমতার রোষানলে পড়তে হয় না? নাকি সেই মজলুম শিশুর, যার পাশে দাঁড়ানো মানে বিশ্বশক্তির চোখের দিকে তাকিয়ে সত্য বলা?
জালিমদের আস্ফালন দেখে যারা হতাশ হন, তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার সুস্পষ্ট ঘোষণা:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ ۚ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمَةٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ
"তুমি জালিমদের কাজ সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো অসচেতন মনে করো না। তিনি তো তাদেরকে কেবল সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিচ্ছেন, যেদিন (ভয়ে) মানুষের চোখগুলো স্থির হয়ে যাবে।" (সূরা ইবরাহিম: ৪২)
সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফগণ জুলুম দেখলে নিজেদের প্রশ্ন করতেন—"আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?" মক্কার অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে মদিনায় যখন তারা ইসলামি সমাজ গড়ছেন, তখনও তারা দূরবর্তী মজলুমদের কথা ভুলতেন না। তারা জানতেন, জালিমকে তাৎক্ষণিক থামাতে না পারলেও, নীরব থেকে জুলুমকে কখনো স্বাভাবিক বা বৈধতা দেওয়া যাবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন:
اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ
"মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কেননা তার দোয়া এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।" (সহিহ বুখারি: ২৪৪৮)
গাজার কোনো শিশু যখন রক্তমাখা হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফরিয়াদ করে, সেই ফরিয়াদ কোনো বাধার সম্মুখীন হয় না। আমাদের এই নির্লিপ্ততা আর নীরবতা একদিন সেই ফরিয়াদের মুখোমুখি হবে।
সালাফেরা জানতেন, জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে কেবল তলোয়ার হাতে নেওয়া নয়; বরং অন্তরে জুলুমের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা, সত্য উচ্চারণ করা এবং ন্যায়ের পক্ষে জনমত গঠন করা।
আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও—যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতার বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেও যায়।" (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
আধুনিক এই ভণ্ড সভ্যতার মুখোশ ভেদ করতে হলে আমাদের হৃদয়কে জাগাতে হবে। খবরের কাগজের মৃতদেহগুলোকে কেবল সংখ্যা নয়, বরং রক্তমাখা জামা পরা আমাদেরই ভাই-বোন হিসেবে দেখতে হবে। তাদের জন্য দোয়া করতে হবে, কলম ধরতে হবে, সত্য বলতে হবে এবং ন্যায়ের দাবি তুলতে হবে। কারণ, জুলুমের বিরুদ্ধে নীরব থাকা প্রকারান্তরে জালিমেরই সহায়তা করা।
রক্তমাখা হাতে লেখা ইতিহাসের পাতায়,
শিশুর কান্না আজ কেবলই নির্বাক স্বাক্ষর।
সভ্যতার মিথ্যা মুখোশ লুটিয়ে পড়ে ধুলোয়,
যখন মানবতা জেগে ওঠে সত্যের তীব্র আলোয়।
এই জাগরণই হলো প্রকৃত সভ্যতা—যেখানে বানরের কষ্টের পাশাপাশি মানুষের শিশুর কান্নাও সমান গুরুত্বের সাথে শোনা যায়, যেখানে করুণা কোনো ভূ-রাজনৈতিক ফিল্টার মেনে চলে না। এটাই ঈমানের, তাকওয়ার এবং প্রকৃত মানবতার দাবি।
[সভ্যতার দ্বিমুখী আয়না]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group
