আমরা যে সময়ে বসবাস করছি, তাকে এক কথায় ‘যৌনতার মহামারীকাল’ বললে খুব একটা ভুল হবে না। মানুষের পকেটে পকেটে এখন পৃথিবী, আর সেই কৃত্রিম পৃথিবীর নীল বিষে আসক্ত হয়ে আছে আমাদের তরুণ থেকে শুরু করে মাঝবয়সী পুরুষদের একটি বিশাল অংশ। যে চোখের কাজ ছিল সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে খোঁজা, সেই চোখ এখন ব্যস্ত নিষিদ্ধ পল্লীর ডিজিটাল সংস্করণ গিলতে। এই বিষাক্ত আসক্তি যখন একজন পুরুষের মগজে বাসা বাঁধে, তখন তার কাছে ‘স্ত্রী’ আর রক্ত-মাংসের মানুষ থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন কেবল নিজের বিকৃত কামলিপ্সা চরিতার্থ করার একটি যন্ত্রমাত্র।
অথচ ইসলামি জীবনব্যবস্থায় দাম্পত্য ছিল প্রশান্তির নীড়, কুরআনের ভাষায় যা ‘লিবাছ’ বা একে অপরের পরিচ্ছদ। কিন্তু যখন পর্দার আড়ালে পর্নোগ্রাফির করাল গ্রাস প্রবেশ করে, তখন সেই প্রশান্তির নীড়টি পরিণত হয় নির্যাতনের কারাগারে।
একজন স্বামী যখন বাইরের জগত থেকে, ইন্টারনেট থেকে নোংরা সব দৃশ্য দেখে এসে নিজের স্ত্রীর ওপর সেই ফ্যান্টাসি প্রয়োগ করতে চান, তখন তিনি মূলত তিনটি অপরাধ একসাথে করেন।
প্রথমত, তিনি চোখের জিনাহ করছেন এবং নিজের ফিতরাত বা স্বভাবজাত পবিত্রতা নষ্ট করছেন;
দ্বিতীয়ত, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছেন;
এবং তৃতীয়ত, তিনি তার স্ত্রীর ওপর এমন এক মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালাচ্ছেন যা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট জুলুম।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে। এটি কেবল রাস্তার বেগানা নারীর জন্য নয়, বরং ইন্টারনেটের কৃত্রিম নারীদেহের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
যে স্বামী এই নির্দেশ অমান্য করে নীল ছবির সাগরে ডুব দেয়, তার রুচি এবং মননশীলতা এতটাই বিকৃত হয়ে যায় যে, স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক তাকে আর তৃপ্তি দেয় না। সে তখন পশুর মতো আচরণ শুরু করে, আর ইসলামে পশুর আচরণের কোনো স্থান নেই।
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীর ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে না পড়ে (পশুর মতো মিলিত না হয়)। বরং তাদের উভয়ের মাঝে যেন একজন ‘দূত’ থাকে।” জিজ্ঞাসা করা হলো, “হে আল্লাহর রাসূল! সেই দূতটি কী?” তিনি বললেন, “চুম্বন এবং (প্রেমময়) কথোপকথন।’
যেই ধর্মে মিলনের আগে ভালোবাসার দূত প্রেরণের কথা বলা হয়েছে, সেই ধর্মে পর্নোগ্রাফির অনুকরণে স্ত্রীর ওপর জবরদস্তি বা বিকৃত যৌনাচার চালানো কীভাবে বৈধ হতে পারে?
আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা দ্বীনের আংশিক পালন করি এবং সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করাই। অনেক পুরুষ মনে করেন, বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর ওপর তার নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই মালিকানার দম্ভ থেকেই তারা স্ত্রীর অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা বা মানসিক অবস্থাকে তোয়াক্কা করেন না। অথচ ইসলামে বিয়ে কোনো মালিকানা স্বত্ব নয়, বরং এটি একটি পবিত্র চুক্তিনামা যার ভিত্তি হলো ভালোবাসা ও করুণা।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে দাম্পত্যের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো।’
এখন প্রশ্ন হলো, একজন অসুস্থ স্ত্রীকে জোরপূর্বক বিছানায় টেনে নেওয়া, জ্বরে বা ব্যথায় কাতরাতে থাকা শরীরটার ওপর নিজের পাশবিক জেদ চাপিয়ে দেওয়া—এটা কি প্রশান্তি? নাকি এটি সেই স্ত্রীর জন্য আজাব?
যিনি অসুস্থ, তিনি তো শরিয়তের দৃষ্টিতেই ‘মাজুর’ বা অক্ষম। আল্লাহ যেখানে অসুস্থ ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, সেখানে একজন স্বামী কোন যুক্তিতে অসুস্থ স্ত্রীর ওপর নিজের কামনার বোঝা চাপিয়ে দিতে পারেন? এটি কি আল্লাহর দেওয়া বিধানের চেয়েও নিজের নফসকে বড় মনে করা নয়?
অনেকেই হয়তো তর্কের খাতিরে বলবেন, হাদিসে তো স্বামীকে খুশি রাখার ব্যাপারে অনেক তাকিদ দেওয়া হয়েছে। ফেরেশতারা লানত দেন বলে যে হাদিসটি প্রচলিত, সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অনেক জালিম স্বামী নিজের অপকর্মকে জায়েজ করতে চান।
কিন্তু তারা হাদিসটির প্রেক্ষাপট এবং ইসলামের ‘লা দারা ওয়ালা দিরা’ (ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্যও করা যাবে না) নীতিটি বেমালুম ভুলে যান। ইসলামে কোনো ইবাদত বা আনুগত্যই নিজের জীবন বা শরীরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে করার বিধান নেই।
স্ত্রীর অসুস্থতার সময় তাকে জোর করা, তার অনিচ্ছায় এমন কোনো কাজ করা যা তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়—এটি স্পষ্টতই বান্দার হক নষ্ট করা। আর বান্দার হক নষ্ট করার অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না সেই বান্দা ক্ষমা করে।
তাই যারা মনে করেন স্ত্রীর অসুস্থতায় জোরজবরদস্তি করলে কোনো গুনাহ নেই, তারা মূলত বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এই জুলুমের বিচার শুধু হাশরের ময়দানেই হবে না, বরং ইহকালেও এর প্রতিবিধান থাকা আবশ্যক।
এখানেই আসে সেই মোক্ষম প্রশ্নটি—‘অসুস্থ অবস্থায় বা অনিচ্ছায় জোরপূর্বক মিলনের শাস্তি কি ইসলামে নেই?
উত্তর হলো—অবশ্যই আছে এবং তা অত্যন্ত কঠোর। ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রে ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাপ্রসূত শাস্তির একটি বিশাল অধ্যায় রয়েছে। যেই অপরাধের জন্য কুরআনে নির্দিষ্ট কোনো হুদুদ (যেমন চুরির জন্য হাত কাটা) নেই, কিন্তু যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর বা অন্যের ওপর জুলুম, তার জন্য শাসক বা বিচারক কঠোর শাস্তির বিধান করতে পারেন। একজন স্বামী যদি তার স্ত্রীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বা তাকে জিম্মি করে এমন আচরণ করেন যা তার শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের হানি ঘটায়, তবে ইসলামি আইনে সেই স্বামী অপরাধী।
স্ত্রী যদি কাজীর (বিচারক) কাছে অভিযোগ করেন যে তার স্বামী তাকে অসুস্থ অবস্থায় জোরপূর্বক ব্যবহার করেছেন বা বিকৃত যৌনাচারে বাধ্য করেছেন, তবে বিচারক সেই স্বামীকে দৈহিক শাস্তি, কারাদণ্ড, এমনকি জনসমক্ষে লজ্জিত করার মতো দণ্ডও দিতে পারেন। ইসলাম কখনোই নারীর ওপর এই পাশবিকতাকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যায় না।
বিশেষ করে, বিকৃত যৌনাচার, যেমন মলদ্বারে সঙ্গম, ইসলামে হারাম এবং জঘন্য অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নারীর মলদ্বারে সঙ্গম করে, সে অভিশপ্ত।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।
এখন চিন্তা করুন, যেই কাজের জন্য স্বয়ং আল্লাহর রাসূল লানত দিয়েছেন এবং আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলেছেন, সেই কাজটিকে রাষ্ট্র বা সমাজ কীভাবে লঘু করে দেখতে পারে? এটি কেবল পরকালীন বিষয় নয়।
ইসলামি রাষ্ট্রে এমন বিকৃত রুচির মানুষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ওয়াজিব। কারণ, এই ধরনের আচরণ কেবল একটি নারীর মর্যাদা হানি করে না, বরং পুরো প্রজন্মের রুচি ও ফিতরাতকে ধ্বংস করে দেয়।
পর্নোগ্রাফি দেখে যারা এই ধরনের কাজ করে, তারা মূলত লুত (আ.)-এর কওমের স্বভাব নিজেদের মধ্যে ধারণ করছে। তাদের এই বিকৃতি প্রতিরোধের জন্য ইহকালীন শাস্তির ব্যবস্থা থাকাটা ইসলামের ‘সাদদুজ যারাই’ (মন্দের পথ রুদ্ধ করা) নীতির অন্তর্ভুক্ত।
আমাদের বুঝতে হবে, ইসলাম নারীকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে সৃষ্টি করেনি। ইসলাম নারীকে দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান। তার শরীরের ওপর তার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অসুস্থতা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই সময়ে স্বামীর দায়িত্ব ছিল সেবা করা, কপালে জলপট্টি দেওয়া, রাত জেগে পাশে বসে থাকা। অথচ সেই সময়ে যে স্বামী তাকে ভোগ করতে চায়, সে মানুষ নামের কলঙ্ক। তার এই আচরণের বিচার চাওয়ার অধিকার স্ত্রীর আছে।
আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় হয়তো নারীরা লজ্জায় মুখ খোলেন না, অথবা তথাকথিত পারিবারিক সম্মানের ভয়ে চুপ থাকেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ইসলাম তাদের চুপ থাকতে বলেছে।
হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে আমরা দেখেছি, পারিবারিক অসঙ্গতি নিয়েও নারীরা সরাসরি খলিফার দরবারে অভিযোগ করেছেন এবং তিনি তার সমাধান দিয়েছেন। আজকের দিনেও যদি কোনো নারী তার স্বামীর এই পৈশাচিক আচরণের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি কোনো অন্যায় করবেন না। বরং এই জুলুম প্রতিরোধ করাটাই ঈমানের দাবি।
যুক্তি এবং আবেগের মিশেলে যদি আরেকটু গভীরে যাই, তবে দেখব—একজন অসুস্থ মানুষের ওপর জবরদস্তি করাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও ‘ট্রমা’ বা মানসিক আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসলাম মানুষের ‘আকল’ বা বুদ্ধিমত্তা এবং ‘নফস’ বা প্রাণের সুরক্ষাকে শরিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়ত) হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এখন কোনো স্বামীর আচরণ যদি স্ত্রীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে বা তার অসুস্থতাকে বাড়িয়ে প্রাণনাশের কারণ হয়, তবে সেই স্বামী কি শরিয়তের দৃষ্টিতে অপরাধী নন? অবশ্যই অপরাধী। এবং এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে সংশোধনাগারে পাঠানো, বেত্রাঘাত করা বা স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া—সবই ইসলামি বিচারব্যবস্থার এখতিয়ারভুক্ত। সুতরাং যারা বলেন, ‘স্বামীর শরীরের ওপর অধিকার আছে, তাই তিনি যা খুশি করতে পারেন’—তারা মূলত ইসলামের অপব্যাখ্যা করছেন এবং নিজেদের প্রবৃত্তির পূজা করছেন।
আমাদের যুবকদের মগজ ধোলাই করে দিয়েছে পশ্চিমা পর্ন ইন্ডাস্ট্রি। তারা শেখাচ্ছে যে, যৌনতা মানেই ভায়োলেন্স, চিৎকার আর আধিপত্য। অথচ আমাদের রাসুল (সা.)-এর সিরাত দেখুন। তিনি আয়েশা (রা.)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করছেন, একই পাত্র থেকে পানি পান করছেন, স্ত্রীর উরুতে মাথা রেখে শুয়ে থাকছেন। এই যে কোমলতা, এই যে মায়া—এটাই হলো ইসলামের রোমান্স। যেই রোমান্সে সম্মান নেই, যেই রোমান্সে অপরের কষ্টের অনুভূতি নেই, তা ইসলাম নয়, তা হলো পৈশাচিকতা। অসুস্থ স্ত্রীর সাথে জবরদস্তি করা সেই পৈশাচিকতারই চূড়ান্ত রূপ।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকার কারণে হয়তো আজ আমরা হাতেনাতে এর শাস্তি দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু এর মানে এই নয় যে ইসলামে এর বিধান নেই। একটি আদর্শ ইসলামি সমাজে এমন স্বামীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং আইনের আওতায় আনা জরুরি। কারণ, ঘরের ভেতর যে পুরুষটি অত্যাচারী, সে সমাজের জন্যও নিরাপদ নয়। যে তার অর্ধাঙ্গিনীর অসুস্থতা বোঝে না, সে মানবতার কোনো কল্যাণ করতে পারে না।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সমাজ কেন চুপ? সমাজ চুপ কারণ আমরা লজ্জা আর দ্বীনদারিতার সংজ্ঞাকে গুলিয়ে ফেলেছি। আমরা মনে করি, ঘরের কথা বাইরে বলাটা বেহায়াপনা। কিন্তু জুলুম সহ্য করা দ্বীনদারি নয়। ইসলামে আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। একজন নারী যখন তার স্বামীর বিকৃত যৌনাচারের শিকার হন, তখন তিনি কেবল শারীরিকভাবেই লাঞ্ছিত হন না, তার আত্মবিশ্বাস, তার ঈমানি শক্তি এবং তার মানসিক প্রশান্তি—সবই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই অবস্থায় তাকে বলা যে ‘তোমাকে হাশর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে’—এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীর জন্য ক্ষতিকর হন (তা শারীরিক বা মানসিক যেভাবেই হোক), তবে স্ত্রী ‘খুলা’ তালাক বা কাজীর মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন। এবং এই ক্ষতির কারণে তিনি ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন। এটিই তো ইহকালীন বিচারের একটি অংশ।
আরও গভীরে ভাবুন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুমিন পুরুষদের চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, কেবল তাদের স্ত্রী ও দাসী ছাড়া। এই ‘হেফাজত’ মানে কেবল জিনা থেকে বিরত থাকা নয়, বরং এর ব্যবহারকে শরিয়তসম্মত রাখা। পর্নোগ্রাফির অনুকরণে স্ত্রীকে ব্যবহার করা লজ্জাস্থানের হেফাজত নয়, বরং এটি তার অপব্যবহার। যারা এই যুক্তি দেন যে, ‘বাইরে জিনা করার চেয়ে স্ত্রীর সাথে যা খুশি করা ভালো’—তারা শয়তানের ধোঁকায় আছেন। হারাম কখনো হারামের বিকল্প হতে পারে না। মলদ্বারে সঙ্গম বা পিরিয়ড চলাকালীন সঙ্গম—এগুলো স্পষ্ট হারাম। স্ত্রীকে এই হারামে বাধ্য করা মানে তাকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেওয়া। আর যে স্বামী তার স্ত্রীকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়, সে ‘কাওয়াম’ বা অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা হারায়। রাষ্ট্র তাকে অভিভাবকত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে, নারীদের সুরক্ষা আইন বা পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনগুলো যদি ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে সেগুলো মেনে চলা এবং প্রয়োগ করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। অসুস্থ অবস্থায় জোরপূর্বক মিলনকে যদি আমরা ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করি, তবে ইসলাম এর পূর্ণ সমর্থন দেবে। কারণ ইসলাম এসেছে সহিংসতা দূর করতে, বাড়াতে নয়।
যেই স্বামী তার স্ত্রীর চোখের পানিকে উপেক্ষা করে নিজের কামনার আগুন নেভাতে ব্যস্ত, সে মূলত আবু লাহাব বা আবু জাহেলের উত্তরসূরি, মোহাম্মদী আদর্শের অনুসারী নয়। তাকে থামানো, তার হাত ধরে প্রতিহত করা সমাজের এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে।’ ঘরের ভেতরের এই অন্যায় প্রতিরোধ করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
পরিশেষে বলব, এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ একটাই—কুরআনের আলোয় ফিরে আসা এবং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। স্বামীদের বুঝতে হবে, স্ত্রী কোনো বাজারের পণ্য নয় যে তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে হবে। তিনি আমানত। আর আমানতের খেয়ানতকারীকে আল্লাহ মুনাফিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অসুস্থতা, অপারগতা এবং মানবিক সীমাবদ্ধতাকে সম্মান জানানোই প্রকৃত পৌরুষ। পর্নোগ্রাফি আসক্ত বিকৃত মস্তিষ্কের পুরুষদের চিকিৎসার প্রয়োজন এবং প্রয়োজন কঠোর শাসন। ইসলামি অনুশাসনে এই বিকৃতির কোনো স্থান নেই, থাকার প্রশ্নই আসে না। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে এই পৈশাচিকতাকে জায়েজ করতে চায়, তারা ইসলামের শত্রু। তাদের মুখোশ উন্মোচন করা এবং ইহকালেই তাদের বিচারের মুখোমুখি করা সময়ের দাবি। হাশরের বিচার তো আছেই, কিন্তু দুনিয়াতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করাও আল্লাহর নির্দেশ। নারীর সম্মান, সুরক্ষা এবং তার ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়া সেই ইনসাফেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিকে সংযত করি, আমাদের বিবেককে জাগ্রত করি। আমাদের ঘরগুলো হোক জান্নাতের টুকরো, জাহান্নামের গহ্বর নয়। অসুস্থ স্ত্রী যখন স্বামীর দিকে তাকাবেন, তার চোখে যেন ভয়ের বদলে ভরসা দেখতে পান—এটাই ইসলামের শিক্ষা, এটাই মানবতার দাবি।
[অসুস্থ স্ত্রীর অধিকার ও জালিম স্বামী]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
আমরা যে সময়ে বসবাস করছি, তাকে এক কথায় ‘যৌনতার মহামারীকাল’ বললে খুব একটা ভুল হবে না। মানুষের পকেটে পকেটে এখন পৃথিবী, আর সেই কৃত্রিম পৃথিবীর নীল বিষে আসক্ত হয়ে আছে আমাদের তরুণ থেকে শুরু করে মাঝবয়সী পুরুষদের একটি বিশাল অংশ। যে চোখের কাজ ছিল সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে খোঁজা, সেই চোখ এখন ব্যস্ত নিষিদ্ধ পল্লীর ডিজিটাল সংস্করণ গিলতে। এই বিষাক্ত আসক্তি যখন একজন পুরুষের মগজে বাসা বাঁধে, তখন তার কাছে ‘স্ত্রী’ আর রক্ত-মাংসের মানুষ থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন কেবল নিজের বিকৃত কামলিপ্সা চরিতার্থ করার একটি যন্ত্রমাত্র।
অথচ ইসলামি জীবনব্যবস্থায় দাম্পত্য ছিল প্রশান্তির নীড়, কুরআনের ভাষায় যা ‘লিবাছ’ বা একে অপরের পরিচ্ছদ। কিন্তু যখন পর্দার আড়ালে পর্নোগ্রাফির করাল গ্রাস প্রবেশ করে, তখন সেই প্রশান্তির নীড়টি পরিণত হয় নির্যাতনের কারাগারে।
একজন স্বামী যখন বাইরের জগত থেকে, ইন্টারনেট থেকে নোংরা সব দৃশ্য দেখে এসে নিজের স্ত্রীর ওপর সেই ফ্যান্টাসি প্রয়োগ করতে চান, তখন তিনি মূলত তিনটি অপরাধ একসাথে করেন।
প্রথমত, তিনি চোখের জিনাহ করছেন এবং নিজের ফিতরাত বা স্বভাবজাত পবিত্রতা নষ্ট করছেন;
দ্বিতীয়ত, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছেন;
এবং তৃতীয়ত, তিনি তার স্ত্রীর ওপর এমন এক মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালাচ্ছেন যা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট জুলুম।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে। এটি কেবল রাস্তার বেগানা নারীর জন্য নয়, বরং ইন্টারনেটের কৃত্রিম নারীদেহের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
যে স্বামী এই নির্দেশ অমান্য করে নীল ছবির সাগরে ডুব দেয়, তার রুচি এবং মননশীলতা এতটাই বিকৃত হয়ে যায় যে, স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক তাকে আর তৃপ্তি দেয় না। সে তখন পশুর মতো আচরণ শুরু করে, আর ইসলামে পশুর আচরণের কোনো স্থান নেই।
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীর ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে না পড়ে (পশুর মতো মিলিত না হয়)। বরং তাদের উভয়ের মাঝে যেন একজন ‘দূত’ থাকে।” জিজ্ঞাসা করা হলো, “হে আল্লাহর রাসূল! সেই দূতটি কী?” তিনি বললেন, “চুম্বন এবং (প্রেমময়) কথোপকথন।’
যেই ধর্মে মিলনের আগে ভালোবাসার দূত প্রেরণের কথা বলা হয়েছে, সেই ধর্মে পর্নোগ্রাফির অনুকরণে স্ত্রীর ওপর জবরদস্তি বা বিকৃত যৌনাচার চালানো কীভাবে বৈধ হতে পারে?
আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা দ্বীনের আংশিক পালন করি এবং সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করাই। অনেক পুরুষ মনে করেন, বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর ওপর তার নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই মালিকানার দম্ভ থেকেই তারা স্ত্রীর অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা বা মানসিক অবস্থাকে তোয়াক্কা করেন না। অথচ ইসলামে বিয়ে কোনো মালিকানা স্বত্ব নয়, বরং এটি একটি পবিত্র চুক্তিনামা যার ভিত্তি হলো ভালোবাসা ও করুণা।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে দাম্পত্যের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো।’
এখন প্রশ্ন হলো, একজন অসুস্থ স্ত্রীকে জোরপূর্বক বিছানায় টেনে নেওয়া, জ্বরে বা ব্যথায় কাতরাতে থাকা শরীরটার ওপর নিজের পাশবিক জেদ চাপিয়ে দেওয়া—এটা কি প্রশান্তি? নাকি এটি সেই স্ত্রীর জন্য আজাব?
যিনি অসুস্থ, তিনি তো শরিয়তের দৃষ্টিতেই ‘মাজুর’ বা অক্ষম। আল্লাহ যেখানে অসুস্থ ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, সেখানে একজন স্বামী কোন যুক্তিতে অসুস্থ স্ত্রীর ওপর নিজের কামনার বোঝা চাপিয়ে দিতে পারেন? এটি কি আল্লাহর দেওয়া বিধানের চেয়েও নিজের নফসকে বড় মনে করা নয়?
অনেকেই হয়তো তর্কের খাতিরে বলবেন, হাদিসে তো স্বামীকে খুশি রাখার ব্যাপারে অনেক তাকিদ দেওয়া হয়েছে। ফেরেশতারা লানত দেন বলে যে হাদিসটি প্রচলিত, সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অনেক জালিম স্বামী নিজের অপকর্মকে জায়েজ করতে চান।
কিন্তু তারা হাদিসটির প্রেক্ষাপট এবং ইসলামের ‘লা দারা ওয়ালা দিরা’ (ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্যও করা যাবে না) নীতিটি বেমালুম ভুলে যান। ইসলামে কোনো ইবাদত বা আনুগত্যই নিজের জীবন বা শরীরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে করার বিধান নেই।
স্ত্রীর অসুস্থতার সময় তাকে জোর করা, তার অনিচ্ছায় এমন কোনো কাজ করা যা তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়—এটি স্পষ্টতই বান্দার হক নষ্ট করা। আর বান্দার হক নষ্ট করার অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না সেই বান্দা ক্ষমা করে।
তাই যারা মনে করেন স্ত্রীর অসুস্থতায় জোরজবরদস্তি করলে কোনো গুনাহ নেই, তারা মূলত বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এই জুলুমের বিচার শুধু হাশরের ময়দানেই হবে না, বরং ইহকালেও এর প্রতিবিধান থাকা আবশ্যক।
এখানেই আসে সেই মোক্ষম প্রশ্নটি—‘অসুস্থ অবস্থায় বা অনিচ্ছায় জোরপূর্বক মিলনের শাস্তি কি ইসলামে নেই?
উত্তর হলো—অবশ্যই আছে এবং তা অত্যন্ত কঠোর। ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রে ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাপ্রসূত শাস্তির একটি বিশাল অধ্যায় রয়েছে। যেই অপরাধের জন্য কুরআনে নির্দিষ্ট কোনো হুদুদ (যেমন চুরির জন্য হাত কাটা) নেই, কিন্তু যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর বা অন্যের ওপর জুলুম, তার জন্য শাসক বা বিচারক কঠোর শাস্তির বিধান করতে পারেন। একজন স্বামী যদি তার স্ত্রীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বা তাকে জিম্মি করে এমন আচরণ করেন যা তার শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের হানি ঘটায়, তবে ইসলামি আইনে সেই স্বামী অপরাধী।
স্ত্রী যদি কাজীর (বিচারক) কাছে অভিযোগ করেন যে তার স্বামী তাকে অসুস্থ অবস্থায় জোরপূর্বক ব্যবহার করেছেন বা বিকৃত যৌনাচারে বাধ্য করেছেন, তবে বিচারক সেই স্বামীকে দৈহিক শাস্তি, কারাদণ্ড, এমনকি জনসমক্ষে লজ্জিত করার মতো দণ্ডও দিতে পারেন। ইসলাম কখনোই নারীর ওপর এই পাশবিকতাকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যায় না।
বিশেষ করে, বিকৃত যৌনাচার, যেমন মলদ্বারে সঙ্গম, ইসলামে হারাম এবং জঘন্য অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নারীর মলদ্বারে সঙ্গম করে, সে অভিশপ্ত।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।
এখন চিন্তা করুন, যেই কাজের জন্য স্বয়ং আল্লাহর রাসূল লানত দিয়েছেন এবং আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলেছেন, সেই কাজটিকে রাষ্ট্র বা সমাজ কীভাবে লঘু করে দেখতে পারে? এটি কেবল পরকালীন বিষয় নয়।
ইসলামি রাষ্ট্রে এমন বিকৃত রুচির মানুষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ওয়াজিব। কারণ, এই ধরনের আচরণ কেবল একটি নারীর মর্যাদা হানি করে না, বরং পুরো প্রজন্মের রুচি ও ফিতরাতকে ধ্বংস করে দেয়।
পর্নোগ্রাফি দেখে যারা এই ধরনের কাজ করে, তারা মূলত লুত (আ.)-এর কওমের স্বভাব নিজেদের মধ্যে ধারণ করছে। তাদের এই বিকৃতি প্রতিরোধের জন্য ইহকালীন শাস্তির ব্যবস্থা থাকাটা ইসলামের ‘সাদদুজ যারাই’ (মন্দের পথ রুদ্ধ করা) নীতির অন্তর্ভুক্ত।
আমাদের বুঝতে হবে, ইসলাম নারীকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে সৃষ্টি করেনি। ইসলাম নারীকে দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান। তার শরীরের ওপর তার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অসুস্থতা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই সময়ে স্বামীর দায়িত্ব ছিল সেবা করা, কপালে জলপট্টি দেওয়া, রাত জেগে পাশে বসে থাকা। অথচ সেই সময়ে যে স্বামী তাকে ভোগ করতে চায়, সে মানুষ নামের কলঙ্ক। তার এই আচরণের বিচার চাওয়ার অধিকার স্ত্রীর আছে।
আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় হয়তো নারীরা লজ্জায় মুখ খোলেন না, অথবা তথাকথিত পারিবারিক সম্মানের ভয়ে চুপ থাকেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ইসলাম তাদের চুপ থাকতে বলেছে।
হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে আমরা দেখেছি, পারিবারিক অসঙ্গতি নিয়েও নারীরা সরাসরি খলিফার দরবারে অভিযোগ করেছেন এবং তিনি তার সমাধান দিয়েছেন। আজকের দিনেও যদি কোনো নারী তার স্বামীর এই পৈশাচিক আচরণের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি কোনো অন্যায় করবেন না। বরং এই জুলুম প্রতিরোধ করাটাই ঈমানের দাবি।
যুক্তি এবং আবেগের মিশেলে যদি আরেকটু গভীরে যাই, তবে দেখব—একজন অসুস্থ মানুষের ওপর জবরদস্তি করাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও ‘ট্রমা’ বা মানসিক আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসলাম মানুষের ‘আকল’ বা বুদ্ধিমত্তা এবং ‘নফস’ বা প্রাণের সুরক্ষাকে শরিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়ত) হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এখন কোনো স্বামীর আচরণ যদি স্ত্রীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে বা তার অসুস্থতাকে বাড়িয়ে প্রাণনাশের কারণ হয়, তবে সেই স্বামী কি শরিয়তের দৃষ্টিতে অপরাধী নন? অবশ্যই অপরাধী। এবং এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে সংশোধনাগারে পাঠানো, বেত্রাঘাত করা বা স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া—সবই ইসলামি বিচারব্যবস্থার এখতিয়ারভুক্ত। সুতরাং যারা বলেন, ‘স্বামীর শরীরের ওপর অধিকার আছে, তাই তিনি যা খুশি করতে পারেন’—তারা মূলত ইসলামের অপব্যাখ্যা করছেন এবং নিজেদের প্রবৃত্তির পূজা করছেন।
আমাদের যুবকদের মগজ ধোলাই করে দিয়েছে পশ্চিমা পর্ন ইন্ডাস্ট্রি। তারা শেখাচ্ছে যে, যৌনতা মানেই ভায়োলেন্স, চিৎকার আর আধিপত্য। অথচ আমাদের রাসুল (সা.)-এর সিরাত দেখুন। তিনি আয়েশা (রা.)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করছেন, একই পাত্র থেকে পানি পান করছেন, স্ত্রীর উরুতে মাথা রেখে শুয়ে থাকছেন। এই যে কোমলতা, এই যে মায়া—এটাই হলো ইসলামের রোমান্স। যেই রোমান্সে সম্মান নেই, যেই রোমান্সে অপরের কষ্টের অনুভূতি নেই, তা ইসলাম নয়, তা হলো পৈশাচিকতা। অসুস্থ স্ত্রীর সাথে জবরদস্তি করা সেই পৈশাচিকতারই চূড়ান্ত রূপ।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকার কারণে হয়তো আজ আমরা হাতেনাতে এর শাস্তি দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু এর মানে এই নয় যে ইসলামে এর বিধান নেই। একটি আদর্শ ইসলামি সমাজে এমন স্বামীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং আইনের আওতায় আনা জরুরি। কারণ, ঘরের ভেতর যে পুরুষটি অত্যাচারী, সে সমাজের জন্যও নিরাপদ নয়। যে তার অর্ধাঙ্গিনীর অসুস্থতা বোঝে না, সে মানবতার কোনো কল্যাণ করতে পারে না।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সমাজ কেন চুপ? সমাজ চুপ কারণ আমরা লজ্জা আর দ্বীনদারিতার সংজ্ঞাকে গুলিয়ে ফেলেছি। আমরা মনে করি, ঘরের কথা বাইরে বলাটা বেহায়াপনা। কিন্তু জুলুম সহ্য করা দ্বীনদারি নয়। ইসলামে আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। একজন নারী যখন তার স্বামীর বিকৃত যৌনাচারের শিকার হন, তখন তিনি কেবল শারীরিকভাবেই লাঞ্ছিত হন না, তার আত্মবিশ্বাস, তার ঈমানি শক্তি এবং তার মানসিক প্রশান্তি—সবই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই অবস্থায় তাকে বলা যে ‘তোমাকে হাশর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে’—এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীর জন্য ক্ষতিকর হন (তা শারীরিক বা মানসিক যেভাবেই হোক), তবে স্ত্রী ‘খুলা’ তালাক বা কাজীর মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন। এবং এই ক্ষতির কারণে তিনি ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন। এটিই তো ইহকালীন বিচারের একটি অংশ।
আরও গভীরে ভাবুন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুমিন পুরুষদের চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, কেবল তাদের স্ত্রী ও দাসী ছাড়া। এই ‘হেফাজত’ মানে কেবল জিনা থেকে বিরত থাকা নয়, বরং এর ব্যবহারকে শরিয়তসম্মত রাখা। পর্নোগ্রাফির অনুকরণে স্ত্রীকে ব্যবহার করা লজ্জাস্থানের হেফাজত নয়, বরং এটি তার অপব্যবহার। যারা এই যুক্তি দেন যে, ‘বাইরে জিনা করার চেয়ে স্ত্রীর সাথে যা খুশি করা ভালো’—তারা শয়তানের ধোঁকায় আছেন। হারাম কখনো হারামের বিকল্প হতে পারে না। মলদ্বারে সঙ্গম বা পিরিয়ড চলাকালীন সঙ্গম—এগুলো স্পষ্ট হারাম। স্ত্রীকে এই হারামে বাধ্য করা মানে তাকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেওয়া। আর যে স্বামী তার স্ত্রীকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়, সে ‘কাওয়াম’ বা অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা হারায়। রাষ্ট্র তাকে অভিভাবকত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে, নারীদের সুরক্ষা আইন বা পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনগুলো যদি ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে সেগুলো মেনে চলা এবং প্রয়োগ করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। অসুস্থ অবস্থায় জোরপূর্বক মিলনকে যদি আমরা ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করি, তবে ইসলাম এর পূর্ণ সমর্থন দেবে। কারণ ইসলাম এসেছে সহিংসতা দূর করতে, বাড়াতে নয়।
যেই স্বামী তার স্ত্রীর চোখের পানিকে উপেক্ষা করে নিজের কামনার আগুন নেভাতে ব্যস্ত, সে মূলত আবু লাহাব বা আবু জাহেলের উত্তরসূরি, মোহাম্মদী আদর্শের অনুসারী নয়। তাকে থামানো, তার হাত ধরে প্রতিহত করা সমাজের এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে।’ ঘরের ভেতরের এই অন্যায় প্রতিরোধ করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
পরিশেষে বলব, এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ একটাই—কুরআনের আলোয় ফিরে আসা এবং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। স্বামীদের বুঝতে হবে, স্ত্রী কোনো বাজারের পণ্য নয় যে তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে হবে। তিনি আমানত। আর আমানতের খেয়ানতকারীকে আল্লাহ মুনাফিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অসুস্থতা, অপারগতা এবং মানবিক সীমাবদ্ধতাকে সম্মান জানানোই প্রকৃত পৌরুষ। পর্নোগ্রাফি আসক্ত বিকৃত মস্তিষ্কের পুরুষদের চিকিৎসার প্রয়োজন এবং প্রয়োজন কঠোর শাসন। ইসলামি অনুশাসনে এই বিকৃতির কোনো স্থান নেই, থাকার প্রশ্নই আসে না। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে এই পৈশাচিকতাকে জায়েজ করতে চায়, তারা ইসলামের শত্রু। তাদের মুখোশ উন্মোচন করা এবং ইহকালেই তাদের বিচারের মুখোমুখি করা সময়ের দাবি। হাশরের বিচার তো আছেই, কিন্তু দুনিয়াতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করাও আল্লাহর নির্দেশ। নারীর সম্মান, সুরক্ষা এবং তার ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়া সেই ইনসাফেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিকে সংযত করি, আমাদের বিবেককে জাগ্রত করি। আমাদের ঘরগুলো হোক জান্নাতের টুকরো, জাহান্নামের গহ্বর নয়। অসুস্থ স্ত্রী যখন স্বামীর দিকে তাকাবেন, তার চোখে যেন ভয়ের বদলে ভরসা দেখতে পান—এটাই ইসলামের শিক্ষা, এটাই মানবতার দাবি।
[অসুস্থ স্ত্রীর অধিকার ও জালিম স্বামী]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group
