পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যখনই কোনো জনপদ থেকে ইনসাফ উঠে গেছে, যখনই বিচারকের হাত অপরাধীর পরিচয় খুঁজতে গিয়ে কেঁপে উঠেছে, তখনই সেই জনপদে নেমে এসেছে আল্লাহর গজব। আজকের এই লেখাটি কোনো সাধারণ কলাম নয়, এটি আমাদের মৃতপ্রায় বিবেকের জানাজার নামাজ। ঢাকার ধামরাইয়ে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি দম্পতি বা একজন নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের ঘুণে ধরা নৈতিকতা আর পক্ষপাতদুষ্ট সুশীলতার নগ্ন দলিল।
ভাবতে পারেন? বিশ্বাস আর বন্ধুত্বের খাতিরে একজন মুসলিম দম্পতি বেড়াতে গিয়েছিলেন তাদের হিন্দু সহকর্মী কৃষ্ণচন্দ্র মনিদাসের বাড়িতে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বা সহকর্মীর প্রতি ন্যূনতম মানবিক আমানতদারিতা থাকবে—এটাই তো ছিল আবহমান বাংলার সংস্কৃতি। কিন্তু রাত বারোটার সেই কাললগ্নে মনিদাসের বোনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে যা ঘটল, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। সাতজন নরপশু। সারা রাত ধরে একটি নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন। সেই গৃহবধূর আর্তনাদ কি ধামরাইয়ের আকাশ ভেদ করে আরশে আজিমের মালিকের কাছে পৌঁছায়নি? তাদের লোলুপ দৃষ্টি কেবল সেই নারীর শরীরের ওপরই পড়েনি, তাদের লোভ ছিল স্বর্ণালংকারের প্রতিও। কানের দুল, গলার চেইন, হাতের বালা—সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নিয়ে তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং যখন নির্যাতিত দম্পতি বিচার চাইতে গেল, তখন সজিব চন্দ্রমনি দাসসহ অন্যরা উল্টো তাদেরকে পিটিয়ে গ্রাম ছাড়া করল। কী অদ্ভুত আমাদের সমাজ! কী বিচিত্র আমাদের বিচারিক বোধ!
এখানেই থামুন। একটু গভীর দম নিন। মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে একটু নাড়া দিন। আপনার চোখের সামনে যদি ভেসে উঠত উল্টো কোনো চিত্র? ধরুন, ভিক্টিম যদি কোনো হিন্দু দম্পতি হতো আর অপরাধী হতো কোনো মুসলিম নামধারী ব্যক্তি? তাহলে এতক্ষণে এই দেশের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, আর মানবাধিকারের ঝাণ্ডাবাহী এনজিওগুলোর অবস্থা কী হতো? এতক্ষণে টকশোতে চায়ের কাপে ঝড় উঠত, পত্রিকার পাতা কালো হয়ে যেত "সংখ্যালঘু নির্যাতন" আর "অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিনাশ" শিরোনামে। বুদ্ধিজীবীরা তাদের কলম শানিয়ে ফেলতেন, আর তথাকথিত প্রগতিশীলরা মোমবাতি হাতে শাহবাগে দাঁড়িয়ে যেতেন। কিন্তু আজ? আজ কেন সব চুপ? আজ কেন সেই সুশীলদের চোখে পানি নেই? কারণ ভিক্টিম এখানে মুসলিম। অপরাধী এখানে ভিন্ন ধর্মের। ধামরাইয়ের এই ঘটনায় তাদের মুখে কুলুপ আঁটা। এই যে দ্বিচারিতা, এই যে অন্যায়ের বাছ-বিচার, এটা কি প্রমাণ করে না যে তাদের কাছে মানবতা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো তাদের এজেন্ডা?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড কত উঁচুতে স্থাপন করেছেন, তা কি আমরা ভুলে গেছি?
সূরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্যদানকারী হও, তাতে তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের যদি ক্ষতিও হয় তবুও। কেউ যদি ধনী হয় বা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের উভয়েরই হিতাকাঙ্ক্ষী। অতএব, তোমরা দুনিয়ার কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে ফিরে যেও না।"
লক্ষ করুন, আল্লাহ এখানে অপরাধী বা ভিক্টিমের ধর্ম পরিচয় দেখতে বলেননি। তিনি ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। ইনসাফ হতে হবে অন্ধ। অপরাধী যেই হোক—সে মুসলিম হোক, হিন্দু হোক, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হোক—তার একমাত্র পরিচয় সে 'অপরাধী'। আর মজলুম যেই হোক, তার একমাত্র পরিচয় সে 'মজলুম'। কিন্তু আজকের সেক্যুলার আইনের মারপ্যাঁচে আর মিডিয়ার ভণ্ডামিতে আমরা বিচারকে ধর্মের চশমা দিয়ে দেখতে শিখেছি। আমাদের প্রশাসন আজ ঘুমাচ্ছে। একটি নারীর ইজ্জত চলে গেল, তাকে গ্রাম ছাড়া করা হলো, অথচ প্রশাসন নীরব। এই নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ নয়?
এই যে একের পর এক ধর্ষণ, এই যে নৈতিক অবক্ষয়—এর মূল কারণ কী? এর মূল কারণ হলো আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ইমানি চেতনার বিলুপ্তি। আমরা এমন এক আইন ব্যবস্থা তৈরি করেছি যা অপরাধীকে ভয় দেখাতে ব্যর্থ। যে আইন মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে আইনের বই কেবল আদালতের তাকে সাজানো থাকে কিন্তু মজলুমের চোখের পানি মুছতে পারে না, সেই আইন দিয়ে আমরা কী করব? আজকে যদি ঐ সাতজন ধর্ষককে জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হতো, যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হতো, তবে কাল কোনো নরপশু কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না।
আধুনিকতা আর প্রগতির নামে আমরা জাহেলিয়াতের যুগে ফিরে গেছি। জাহেলিয়াতের যুগেও নারীদের পণ্য মনে করা হতো, আর আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতেও নারীরা নিরাপদ নয়। পার্থক্য শুধু এটুকুই—তখন তারা কবর দিত জীবন্ত কন্যাকে, আর আজ আমরা কবর দিচ্ছি জীবন্ত নারীর স্বপ্ন আর সম্ভ্রমকে। ধর্ষণ কেন থামছে না? কারণ, ধর্ষকের মনে কোনো ভয় নেই। সে জানে, টাকা থাকলে, পলিটিক্যাল পাওয়ার থাকলে, অথবা 'সংখ্যালঘু' বা 'সংখ্যাগুরু' কার্ড খেলতে পারলে সে পার পেয়ে যাবে।
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সমস্যার গোড়ায় হাত দিচ্ছি না। আমরা ডালপালা ছাঁটছি। ইসলাম বলে, অপরাধের বিচার হতে হবে দ্রুত এবং দৃশ্যমান। যখন কোনো সমাজে অপরাধের শাস্তি বিলম্বিত হয়, তখন সেই সমাজে অপরাধ মহামারী আকার ধারণ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা ধ্বংস হয়েছে কারণ, যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তখন তারা তার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।"
এই হলো ইসলামের ইনসাফ। এখানে সজিব চন্দ্রমনি দাস বা কোনো আব্দুল্লাহর মধ্যে পার্থক্য নেই। যে ধর্ষণ করেছে, সে ফাসাদ সৃষ্টিকারী। তার শাস্তি হতে হবে সর্বোচ্চ এবং কঠোরতম। কিন্তু আমাদের প্রশাসন কি সেই সাহস রাখে? নাকি তারা রাজনৈতিক সমীকরণের হিসাব কষতে ব্যস্ত? প্রশ্ন জাগে, আর কত হাজার বোন ধর্ষিত হলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? আর কত সম্ভ্রম লুন্ঠিত হলে আমরা ন্যায়বিচার দেখতে পাব?
যারা আজ সম্প্রীতির সবক দিতে আসেন, তাদের জিজ্ঞেস করতে চাই—সম্প্রীতি মানে কি কেবল একপক্ষের নীরবতা? সম্প্রীতি মানে কি অন্যায়ের সাথে আপস? ধামরাইয়ের ঘটনায় স্পষ্ট বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ। যারা পরিকল্পিতভাবে একজন মুসলিম নারীকে ফাঁদে ফেলে এই পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তারা কেবল কামুক নয়, তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকেও এটি করতে পারে। আর যদি তাই হয়, তবে এর বিচার হওয়া উচিত আরও কঠোরভাবে। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ আজ অন্ধ। তাদের চশমার গ্লাসটি এমনভাবে তৈরি যে, তাতে কেবল নির্দিষ্ট কিছু রং ধরা পড়ে। মুসলিম নারীর কান্না তাদের কানে পৌঁছায় না, কারণ এতে তাদের এনজিওর ফান্ড বাড়ে না, এতে তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুদের কাছে রিপোর্ট পাঠানোর মতো মশলা থাকে না।
লজ্জা! ভীষণ লজ্জা হয় এই সমাজ নিয়ে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন সত্য বলাটা আগুনের গোলক হাতে রাখার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই। “যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না, সে বোবা শয়তান।” এই হাদিসটি কি আমাদের অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করে না? আমরা কি চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এমন এক সমাজে বেড়ে উঠুক যেখানে নারীর সম্ভ্রমের কোনো মূল্য নেই? যেখানে বিচার চেয়ে উল্টো মার খেতে হয়?
আমাদের বুঝতে হবে, এই সমস্যার সমাধান কেবল মোমবাতি জ্বালিয়ে বা মানববন্ধন করে হবে না। এর সমাধান নিহিত আছে আমাদের ফিরে আসার মাঝে—সেই শাশ্বত সত্যের দিকে, সেই ঐশী বিধানের দিকে। কুরআনের আইন যেদিন প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন বিচারকের আসনে বসে বিচারক আল্লাহর ভয়ে কম্পমান থাকবেন, সেদিনই কেবল এই ধর্ষণ আর অনাচার বন্ধ হবে। মানুষের তৈরি আইন ফাঁকফোকরে ভরা। উকিলের যুক্তিতে সেখানে সত্য মিথ্যা হয়, আর মিথ্যা সত্য হয়। কিন্তু আল্লাহর আইনে কোনো ফাঁক নেই।
আজকে যারা বুদ্ধিজীবী সেজে বসে আছেন, যারা সমালোচনা করেন, তারা কি পারেন না নিজেদের কলম দিয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে? নাকি তাদের কলম কেবল ইসলামের বিষদগার করার জন্যই প্রস্তুত থাকে? মনে রাখবেন, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজকের এই নীরবতা আগামীকালের ইতিহাসের পাতায় আপনাদেরকে মীরজাফরের চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করবে।
ধামরাইয়ের সেই বোনটির কথা ভাবুন। তার স্বামীটির কথা ভাবুন। তাদের কি অপরাধ ছিল? বিশ্বাস করা? সহকর্মীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া? এই সরলতার সুযোগ নিয়ে যারা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারা কি মানুষ? না, তারা মানুষ নামের কলঙ্ক। আর যারা এদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, যারা বিচার না করে উল্টো ভিক্টিমকে গ্রাম ছাড়া করছে, তারা এই অপরাধের সমান অংশীদার।
“আঁধার রাতে ওৎ পেতে রয় হিংস্র দানব দল,
বিচার চেয়ে ফিরল তারা, চোখে শুধুই জল।
সবক দেয় সুশীল যারা, মানবতা আজ কই?
বোনটি আমার কাঁদছে একা, আমি কি বধির রই?”
আমাদের তরুণ সমাজকে জাগতে হবে। আপনাদের রক্ত কি গরম হয় না? আপনাদের কি মনে হয় না যে, এই সমাজটাকে বদলানো দরকার? জাকের নায়েক যখন যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, তখন অনেকে অস্বস্তিবোধ করেন। কেন? কারণ সত্য সব সময় তিতা হয়। আরিফ আজাদ যখন কলমের খোঁচায় আপনাদের ভণ্ডামি ধরিয়ে দেন, তখন আপনারা তাকে মৌলবাদী বলেন। কিন্তু ধামরাইয়ের এই ঘটনার পর কে আসল মৌলবাদী আর কে আসল ভণ্ড, তা কি পরিষ্কার নয়?
প্রশাসনের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ নয়, বরং কঠোর দাবি—এই ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেককে, সে যেই হোক, যে ধর্মেরই হোক, অবিলম্বে গ্রেফতার করুন। তাদের এমন শাস্তি দিন যেন তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। সজিব চন্দ্রমনি দাসদের মতো যারা অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তারাও সমান অপরাধী। তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা আর কোনো আশ্বাস চাই না, আমরা দৃশ্যমান বিচার চাই।
মনে রাখবেন, জুলুমের রাজত্ব কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফেরাউনের পতন হয়েছিল, নমরুদের পতন হয়েছিল। আজকের এই আধুনিক নমরুদদেরও পতন হবে। আল্লাহর গজব যখন আসবে, তখন কেউ রেহাই পাবে না—না ধর্ষক, না প্রশ্রয়দাতা, আর না এই নীরব দর্শক। আমরা চাই না আমাদের দেশটা আল্লাহর গজবের শিকার হোক। তাই সময় থাকতে আমাদের তওবা করতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়াতে হবে।
পরিশেষে বলি, হে আমার ভাই ও বোনেরা! আপনারা হতাশ হবেন না। রাত যত গভীর হয়, ভোর তত নিকটে আসে। এই অন্ধকার কেটে যাবেই। ইনশাআল্লাহ, একদিন এই জমিনে ইনসাফ কায়েম হবে। সেদিন কোনো মনিদাস বা কোনো আব্দুল্লাহ অন্যায় করে পার পাবে না। সেদিন বিচার হবে কেবল আমলনামা দেখে, ধর্ম বা বংশ পরিচয় দেখে নয়। আসুন, আমরা সেই দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি এবং আজ থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত করি।
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যখনই কোনো জনপদ থেকে ইনসাফ উঠে গেছে, যখনই বিচারকের হাত অপরাধীর পরিচয় খুঁজতে গিয়ে কেঁপে উঠেছে, তখনই সেই জনপদে নেমে এসেছে আল্লাহর গজব। আজকের এই লেখাটি কোনো সাধারণ কলাম নয়, এটি আমাদের মৃতপ্রায় বিবেকের জানাজার নামাজ। ঢাকার ধামরাইয়ে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি দম্পতি বা একজন নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের ঘুণে ধরা নৈতিকতা আর পক্ষপাতদুষ্ট সুশীলতার নগ্ন দলিল।
ভাবতে পারেন? বিশ্বাস আর বন্ধুত্বের খাতিরে একজন মুসলিম দম্পতি বেড়াতে গিয়েছিলেন তাদের হিন্দু সহকর্মী কৃষ্ণচন্দ্র মনিদাসের বাড়িতে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বা সহকর্মীর প্রতি ন্যূনতম মানবিক আমানতদারিতা থাকবে—এটাই তো ছিল আবহমান বাংলার সংস্কৃতি। কিন্তু রাত বারোটার সেই কাললগ্নে মনিদাসের বোনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে যা ঘটল, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। সাতজন নরপশু। সারা রাত ধরে একটি নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন। সেই গৃহবধূর আর্তনাদ কি ধামরাইয়ের আকাশ ভেদ করে আরশে আজিমের মালিকের কাছে পৌঁছায়নি? তাদের লোলুপ দৃষ্টি কেবল সেই নারীর শরীরের ওপরই পড়েনি, তাদের লোভ ছিল স্বর্ণালংকারের প্রতিও। কানের দুল, গলার চেইন, হাতের বালা—সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নিয়ে তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং যখন নির্যাতিত দম্পতি বিচার চাইতে গেল, তখন সজিব চন্দ্রমনি দাসসহ অন্যরা উল্টো তাদেরকে পিটিয়ে গ্রাম ছাড়া করল। কী অদ্ভুত আমাদের সমাজ! কী বিচিত্র আমাদের বিচারিক বোধ!
এখানেই থামুন। একটু গভীর দম নিন। মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে একটু নাড়া দিন। আপনার চোখের সামনে যদি ভেসে উঠত উল্টো কোনো চিত্র? ধরুন, ভিক্টিম যদি কোনো হিন্দু দম্পতি হতো আর অপরাধী হতো কোনো মুসলিম নামধারী ব্যক্তি? তাহলে এতক্ষণে এই দেশের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, আর মানবাধিকারের ঝাণ্ডাবাহী এনজিওগুলোর অবস্থা কী হতো? এতক্ষণে টকশোতে চায়ের কাপে ঝড় উঠত, পত্রিকার পাতা কালো হয়ে যেত "সংখ্যালঘু নির্যাতন" আর "অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিনাশ" শিরোনামে। বুদ্ধিজীবীরা তাদের কলম শানিয়ে ফেলতেন, আর তথাকথিত প্রগতিশীলরা মোমবাতি হাতে শাহবাগে দাঁড়িয়ে যেতেন। কিন্তু আজ? আজ কেন সব চুপ? আজ কেন সেই সুশীলদের চোখে পানি নেই? কারণ ভিক্টিম এখানে মুসলিম। অপরাধী এখানে ভিন্ন ধর্মের। ধামরাইয়ের এই ঘটনায় তাদের মুখে কুলুপ আঁটা। এই যে দ্বিচারিতা, এই যে অন্যায়ের বাছ-বিচার, এটা কি প্রমাণ করে না যে তাদের কাছে মানবতা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো তাদের এজেন্ডা?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড কত উঁচুতে স্থাপন করেছেন, তা কি আমরা ভুলে গেছি?
সূরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্যদানকারী হও, তাতে তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের যদি ক্ষতিও হয় তবুও। কেউ যদি ধনী হয় বা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের উভয়েরই হিতাকাঙ্ক্ষী। অতএব, তোমরা দুনিয়ার কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে ফিরে যেও না।"
লক্ষ করুন, আল্লাহ এখানে অপরাধী বা ভিক্টিমের ধর্ম পরিচয় দেখতে বলেননি। তিনি ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। ইনসাফ হতে হবে অন্ধ। অপরাধী যেই হোক—সে মুসলিম হোক, হিন্দু হোক, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হোক—তার একমাত্র পরিচয় সে 'অপরাধী'। আর মজলুম যেই হোক, তার একমাত্র পরিচয় সে 'মজলুম'। কিন্তু আজকের সেক্যুলার আইনের মারপ্যাঁচে আর মিডিয়ার ভণ্ডামিতে আমরা বিচারকে ধর্মের চশমা দিয়ে দেখতে শিখেছি। আমাদের প্রশাসন আজ ঘুমাচ্ছে। একটি নারীর ইজ্জত চলে গেল, তাকে গ্রাম ছাড়া করা হলো, অথচ প্রশাসন নীরব। এই নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ নয়?
এই যে একের পর এক ধর্ষণ, এই যে নৈতিক অবক্ষয়—এর মূল কারণ কী? এর মূল কারণ হলো আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ইমানি চেতনার বিলুপ্তি। আমরা এমন এক আইন ব্যবস্থা তৈরি করেছি যা অপরাধীকে ভয় দেখাতে ব্যর্থ। যে আইন মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে আইনের বই কেবল আদালতের তাকে সাজানো থাকে কিন্তু মজলুমের চোখের পানি মুছতে পারে না, সেই আইন দিয়ে আমরা কী করব? আজকে যদি ঐ সাতজন ধর্ষককে জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হতো, যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হতো, তবে কাল কোনো নরপশু কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না।
আধুনিকতা আর প্রগতির নামে আমরা জাহেলিয়াতের যুগে ফিরে গেছি। জাহেলিয়াতের যুগেও নারীদের পণ্য মনে করা হতো, আর আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতেও নারীরা নিরাপদ নয়। পার্থক্য শুধু এটুকুই—তখন তারা কবর দিত জীবন্ত কন্যাকে, আর আজ আমরা কবর দিচ্ছি জীবন্ত নারীর স্বপ্ন আর সম্ভ্রমকে। ধর্ষণ কেন থামছে না? কারণ, ধর্ষকের মনে কোনো ভয় নেই। সে জানে, টাকা থাকলে, পলিটিক্যাল পাওয়ার থাকলে, অথবা 'সংখ্যালঘু' বা 'সংখ্যাগুরু' কার্ড খেলতে পারলে সে পার পেয়ে যাবে।
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সমস্যার গোড়ায় হাত দিচ্ছি না। আমরা ডালপালা ছাঁটছি। ইসলাম বলে, অপরাধের বিচার হতে হবে দ্রুত এবং দৃশ্যমান। যখন কোনো সমাজে অপরাধের শাস্তি বিলম্বিত হয়, তখন সেই সমাজে অপরাধ মহামারী আকার ধারণ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা ধ্বংস হয়েছে কারণ, যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তখন তারা তার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।"
এই হলো ইসলামের ইনসাফ। এখানে সজিব চন্দ্রমনি দাস বা কোনো আব্দুল্লাহর মধ্যে পার্থক্য নেই। যে ধর্ষণ করেছে, সে ফাসাদ সৃষ্টিকারী। তার শাস্তি হতে হবে সর্বোচ্চ এবং কঠোরতম। কিন্তু আমাদের প্রশাসন কি সেই সাহস রাখে? নাকি তারা রাজনৈতিক সমীকরণের হিসাব কষতে ব্যস্ত? প্রশ্ন জাগে, আর কত হাজার বোন ধর্ষিত হলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? আর কত সম্ভ্রম লুন্ঠিত হলে আমরা ন্যায়বিচার দেখতে পাব?
যারা আজ সম্প্রীতির সবক দিতে আসেন, তাদের জিজ্ঞেস করতে চাই—সম্প্রীতি মানে কি কেবল একপক্ষের নীরবতা? সম্প্রীতি মানে কি অন্যায়ের সাথে আপস? ধামরাইয়ের ঘটনায় স্পষ্ট বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ। যারা পরিকল্পিতভাবে একজন মুসলিম নারীকে ফাঁদে ফেলে এই পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তারা কেবল কামুক নয়, তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকেও এটি করতে পারে। আর যদি তাই হয়, তবে এর বিচার হওয়া উচিত আরও কঠোরভাবে। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ আজ অন্ধ। তাদের চশমার গ্লাসটি এমনভাবে তৈরি যে, তাতে কেবল নির্দিষ্ট কিছু রং ধরা পড়ে। মুসলিম নারীর কান্না তাদের কানে পৌঁছায় না, কারণ এতে তাদের এনজিওর ফান্ড বাড়ে না, এতে তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুদের কাছে রিপোর্ট পাঠানোর মতো মশলা থাকে না।
লজ্জা! ভীষণ লজ্জা হয় এই সমাজ নিয়ে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন সত্য বলাটা আগুনের গোলক হাতে রাখার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই। “যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না, সে বোবা শয়তান।” এই হাদিসটি কি আমাদের অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করে না? আমরা কি চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এমন এক সমাজে বেড়ে উঠুক যেখানে নারীর সম্ভ্রমের কোনো মূল্য নেই? যেখানে বিচার চেয়ে উল্টো মার খেতে হয়?
আমাদের বুঝতে হবে, এই সমস্যার সমাধান কেবল মোমবাতি জ্বালিয়ে বা মানববন্ধন করে হবে না। এর সমাধান নিহিত আছে আমাদের ফিরে আসার মাঝে—সেই শাশ্বত সত্যের দিকে, সেই ঐশী বিধানের দিকে। কুরআনের আইন যেদিন প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন বিচারকের আসনে বসে বিচারক আল্লাহর ভয়ে কম্পমান থাকবেন, সেদিনই কেবল এই ধর্ষণ আর অনাচার বন্ধ হবে। মানুষের তৈরি আইন ফাঁকফোকরে ভরা। উকিলের যুক্তিতে সেখানে সত্য মিথ্যা হয়, আর মিথ্যা সত্য হয়। কিন্তু আল্লাহর আইনে কোনো ফাঁক নেই।
আজকে যারা বুদ্ধিজীবী সেজে বসে আছেন, যারা সমালোচনা করেন, তারা কি পারেন না নিজেদের কলম দিয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে? নাকি তাদের কলম কেবল ইসলামের বিষদগার করার জন্যই প্রস্তুত থাকে? মনে রাখবেন, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজকের এই নীরবতা আগামীকালের ইতিহাসের পাতায় আপনাদেরকে মীরজাফরের চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করবে।
ধামরাইয়ের সেই বোনটির কথা ভাবুন। তার স্বামীটির কথা ভাবুন। তাদের কি অপরাধ ছিল? বিশ্বাস করা? সহকর্মীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া? এই সরলতার সুযোগ নিয়ে যারা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারা কি মানুষ? না, তারা মানুষ নামের কলঙ্ক। আর যারা এদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, যারা বিচার না করে উল্টো ভিক্টিমকে গ্রাম ছাড়া করছে, তারা এই অপরাধের সমান অংশীদার।
“আঁধার রাতে ওৎ পেতে রয় হিংস্র দানব দল,
বিচার চেয়ে ফিরল তারা, চোখে শুধুই জল।
সবক দেয় সুশীল যারা, মানবতা আজ কই?
বোনটি আমার কাঁদছে একা, আমি কি বধির রই?”
আমাদের তরুণ সমাজকে জাগতে হবে। আপনাদের রক্ত কি গরম হয় না? আপনাদের কি মনে হয় না যে, এই সমাজটাকে বদলানো দরকার? জাকের নায়েক যখন যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, তখন অনেকে অস্বস্তিবোধ করেন। কেন? কারণ সত্য সব সময় তিতা হয়। আরিফ আজাদ যখন কলমের খোঁচায় আপনাদের ভণ্ডামি ধরিয়ে দেন, তখন আপনারা তাকে মৌলবাদী বলেন। কিন্তু ধামরাইয়ের এই ঘটনার পর কে আসল মৌলবাদী আর কে আসল ভণ্ড, তা কি পরিষ্কার নয়?
প্রশাসনের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ নয়, বরং কঠোর দাবি—এই ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেককে, সে যেই হোক, যে ধর্মেরই হোক, অবিলম্বে গ্রেফতার করুন। তাদের এমন শাস্তি দিন যেন তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। সজিব চন্দ্রমনি দাসদের মতো যারা অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তারাও সমান অপরাধী। তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা আর কোনো আশ্বাস চাই না, আমরা দৃশ্যমান বিচার চাই।
মনে রাখবেন, জুলুমের রাজত্ব কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফেরাউনের পতন হয়েছিল, নমরুদের পতন হয়েছিল। আজকের এই আধুনিক নমরুদদেরও পতন হবে। আল্লাহর গজব যখন আসবে, তখন কেউ রেহাই পাবে না—না ধর্ষক, না প্রশ্রয়দাতা, আর না এই নীরব দর্শক। আমরা চাই না আমাদের দেশটা আল্লাহর গজবের শিকার হোক। তাই সময় থাকতে আমাদের তওবা করতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়াতে হবে।
পরিশেষে বলি, হে আমার ভাই ও বোনেরা! আপনারা হতাশ হবেন না। রাত যত গভীর হয়, ভোর তত নিকটে আসে। এই অন্ধকার কেটে যাবেই। ইনশাআল্লাহ, একদিন এই জমিনে ইনসাফ কায়েম হবে। সেদিন কোনো মনিদাস বা কোনো আব্দুল্লাহ অন্যায় করে পার পাবে না। সেদিন বিচার হবে কেবল আমলনামা দেখে, ধর্ম বা বংশ পরিচয় দেখে নয়। আসুন, আমরা সেই দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি এবং আজ থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত করি।
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group
