Translation is not possible.
মধ্যরাতের হাসপাতালের করিডোরটা বড্ড নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে শুধু দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়া নার্সদের জুতো আর ট্রলি চাকার ঘসঘসে শব্দ। জানালার ওপাশে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। কাঁচের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে—ঠিক যেন মানুষের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অসহায় কান্না।
 
আহিয়ান করিডরের স্টিলের বেঞ্চটাতে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার এলোমেলো চুল, বিধ্বস্ত চেহারা। চোখের চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে বারবার মুছছে, কিন্তু ঝাপসা ভাবটা কাটছে না। তার ঠিক পাশেই বসে আছে সাফওয়ান। তার হাতে একটা তসবিহ থাকার কথা ছিল, কিন্তু তার হাতে এখন আহিয়ানের কাঁধ। শান্ত, ধীরস্থির স্পর্শ। আইসিইউর ভেতরে তাদের ভার্সিটি জীবনের বন্ধু রাফি লড়ছে মৃত্যুর সাথে। বাইক এক্সিডেন্ট। মাথার খুলি ফেটে মগজের কিছুটা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছে।
 
আহিয়ান হঠাৎ মাথা তুলল। তার চোখে সেই চিরচেনা সংশয়বাদী ক্ষোভ, যা ক্যাম্পাসের আড্ডায় বহুবার দেখা গেছে। কিন্তু আজকের ক্ষোভের সাথে মিশে আছে প্রচণ্ড হাহাকার। সে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু গলার স্বর বের হলো ফিসফিসানি হয়ে, যেন কোনো এক পরাজিত সেনাপতির শেষ আর্তনাদ।
 
“সাফওয়ান, তোরা তো বলিস গাছের পাতাও নাকি আল্লাহর হুকুম ছাড়া নড়ে না। রাফির এই এক্সিডেন্ট, এই মৃত্যু—সবই তো লওহে মাহফুজে লেখা ছিল, তাই না? ও তো চাইলেও আজ বাইক না নিয়ে বের হতে পারত না, কারণ চিত্রনাট্য তো আগেই লেখা। তাহলে এই যন্ত্রণার দায় কার? যে স্ক্রিপ্ট লিখেছে তার, নাকি যে পুতুলের মতো পারফর্ম করছে তার? একজন খুনি যখন খুন করে, একজন নাস্তিক যখন অবিশ্বাস করে—সেটাও তো আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। তিনি চাইলে তো রাফিকে আজ বাঁচাতে পারতেন, আমাকে বা তোকে আস্তিক বা নাস্তিক বানাতে পারতেন। তাহলে দিনশেষে জাহান্নামের আগুন কেন আমাদের জন্য? পুতুল নাচের সুতো যার হাতে, দোষ তো তার হওয়া উচিত, পুতুলের কেন?”
 
সাফওয়ান জানত, এই প্রশ্নটা আহিয়ানের একার নয়। এটি এই যান্ত্রিক সভ্যতার লাখো তরুণের বুকের ভেতর জমে থাকা এক দগদগে ঘা। সে আহিয়ানের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। বাইরে তখনো বজ্রপাত হচ্ছে। সেই বিদ্যুতের আলোয় সাফওয়ানের শান্ত মুখটা ক্ষণিকের জন্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
 
“আহিয়ান, তুই জানালার দিকে তাকা,” সাফওয়ান ধীর গলায় বলল। “বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। তুই কি জানিস কখন বৃষ্টি থামবে? জানিস না। কিন্তু আবহাওয়াবিদরা মেঘের গতিবেগ দেখে বলে দিতে পারে কখন ঝড় আসবে। এখন বল তো, আবহাওয়াবিদ ‘জানে’ বলেই কি ঝড়টা আসছে? নাকি ঝড়টা আসবে, তাই সে জেনেছে? তার জ্ঞান কি ঝড়টাকে বাধ্য করেছে ধ্বংসলীলা চালাতে?”
 
আহিয়ান চুপ করে তাকিয়ে রইল। সাফওয়ান বলতে থাকল, “তোর লজিকের গোড়ায় একটা বিশাল গলদ আছে দোস্ত। তুই আল্লাহর ‘ইলম’ আর আল্লাহর বাধ্যবাধকতাকে গুলিয়ে ফেলেছিস। আল্লাহ ‘আলিমুল গায়িব’, তিনি মহাকালের শুরু আর শেষটা একই ফ্রেমে দেখতে পান। তিনি সময়ের ফ্রেমে বন্দী নন, তিনি সময়ের স্রষ্টা। আমাদের কাছে যা ‘আগামীকাল’, আল্লাহর কাছে তা উন্মুক্ত কিতাব। তিনি জানেন তুই এখন এই প্রশ্নটা করবি, তাই তিনি লিখে রেখেছেন। তিনি লিখে রেখেছেন বলে তুই প্রশ্ন করছিস—বিষয়টা এমন নয়। কারণ, তুই তো জানতিস না যে তুই আজ এই প্রশ্নটা করবি। তোর কাছে অপশন ছিল চুপ থাকার, অথবা কাঁদার। তুই বেছে নিয়েছিস প্রশ্ন করাটা। এই ‘বেছে নেওয়া’ বা ‘ইখতিয়ার’-এর জায়গাটুকুতেই তোর পরীক্ষা।”
 
আহিয়ান পাল্টা যুক্তি দিল, “কিন্তু তিনি তো সর্বশক্তিমান। তিনি চাইলে কি আমি নাস্তিক হতে পারতাম? তিনি চাইলে কি রাফি বাইক নিয়ে বের হতে পারত? তাঁর ইচ্ছার বাইরে তো কিছু হয় না। তাহলে তাঁর ইচ্ছাতেই তো আমি অবিশ্বাস করছি।”
 
সাফওয়ান একটু নড়েচড়ে বসল। হাসপাতালের সাদা আলোয় তার চোখ দুটো গভীর দেখাল। সে বলল, “তোর এই পয়েন্টটা বুঝতে হলে তোকে একটু গভীরে নামতে হবে। দর্শন আর ওহির জ্ঞানের মিলন ঘটাতে হবে এখানে। শোন, আল্লাহর ‘ইচ্ছা’ বা ‘ইরাদা’ দুই ধরণের। খুব মনোযোগ দিয়ে বুঝবি। একটা হলো ‘ইরাদা কাউনিয়া’—যা সৃষ্টিগত ইচ্ছা। আর অন্যটা ‘ইরাদা শারঈয়া’—যা বিধানগত বা পছন্দনীয় ইচ্ছা।
 
আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে ইবলিসকে হায়াত দিয়েছেন, ফেরাউনকে ক্ষমতা দিয়েছেন, এমনকি হিটলারকে গ্যাস চেম্বার বানানোর শক্তি দিয়েছেন। এটা তাঁর ‘ইরাদা কাউনিয়া’। কেন দিয়েছেন? কারণ এই দুনিয়াটা ‘দারুল ইমতিহান’ বা পরীক্ষার হল। পরীক্ষার হলে একজন ছাত্র ভুল উত্তর লেখার স্বাধীনতা পায়। শিক্ষক তার হাত চেপে ধরেন না। যদি শিক্ষক জোর করে ছাত্রের হাত দিয়ে সঠিক উত্তর লিখিয়ে নেন, তবে সেই পরীক্ষার কোনো মূল্য থাকে কি? আল্লাহ মানুষকে ফেরেশতা বানাননি, আবার পশুও বানাননি। তিনি মানুষকে দিয়েছেন ‘ফ্রি উইল’ বা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। আল্লাহ চান, মানুষ পাপ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাপ থেকে ফিরে আসুক। এটাই তাঁর ‘ইরাদা শারঈয়া’। তিনি চান না তুই কুফরি কর, তিনি চান না রাফি বেপরোয়া গতিতে বাইক চালাক। তিনি মদ হারাম করেছেন, কিন্তু মদের বোতল ধরার শক্তি তোর হাত থেকে কেড়ে নেননি। তিনি জিনা হারাম করেছেন, কিন্তু সেই পরিস্থিতির কাছে যাওয়ার ক্ষমতা তোকে দিয়েছেন। কেন? যাতে তুই তোর নফসকে দমন করে বলিস—‘আমি আমার রবের ভয়ে এটা করছি না’। এই যে ইচ্ছাশক্তির লড়াই, এটাই তোকে আশরাফুল মাখলুকাত বানায়। এখন তুই যদি তোর স্বাধীনতার অপব্যবহার করে গর্তে পড়িস এবং গর্তে পড়ে বলিস—‘আল্লাহ কেন গর্তটা রাখলেন?’, তবে সেটা হবে নিজের বোকামির দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো।”
 
করিডরের শেষ মাথায় আইসিইউর লাল বাতিটা জ্বলছে আর নিভছে। মৃত্যুর এক অদ্ভুত সংকেত। আহিয়ান মাথা নিচু করে বলল, “কিন্তু পরিবেশ? একজন মানুষ যদি হিন্দু বা খ্রিস্টান পরিবারে জন্মায়, তার তো কোনো দোষ নেই। তার মগজ তো ছোটবেলা থেকেই ওভাবে ওয়াশ করা হয়েছে। সে কেন জাহান্নামে যাবে?”
 
সাফওয়ান আলতো করে আহিয়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। যেন কোনো এক অবুঝ শিশুকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। “দোস্ত, আল্লাহ কি তোর চেয়ে কম ইনসাফকারী? নাউজুবিল্লাহ। তিনি তো ‘আহকামুল হাকিমিন’। যার কাছে সত্যের দাওয়াত পৌঁছায়নি, যার বোঝার মতো মানসিক পরিপক্কতা বা সুযোগ ছিল না, আল্লাহ তাকে হুট করে জাহান্নামে ফেলে দেবেন না। আখেরাতে তাদের জন্য আলাদা পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে—এটাই বিশুদ্ধ মত। কিন্তু সমস্যা তো তাদের নিয়ে নয়, সমস্যা তোকে নিয়ে। সমস্যা আমাদের নিয়ে।
 
আমাদের কাছে সত্য এসেছে। কোরআন ধুলো পড়া অবস্থায় আমাদের বুকশেলফে আছে। আজান হলে আমরা শুনি। ইউটিউবে ডিবেট দেখি। এরপরও যখন আমরা বলি—‘তকদিরে ছিল তাই আমি মানিনি’, তখন আমরা আসলে মুনাফেকি করি। তুই লক্ষ্য করেছিস আহিয়ান? দুনিয়ার কোনো ব্যাপারে আমরা তকদিরের দোহাই দিই না। তুই যখন পরীক্ষার খাতায় লিখিস, তখন কি কলম রেখে বসে থাকিস এই ভেবে যে—‘পাস করার হলে এমনিই করব’? তুই যখন রাস্তা পার হস, তখন কি দুপাশে না দেখে চোখ বন্ধ করে দৌড় দিস—‘মরার হলে মরবই’ ভেবে? না। সেখানে তুই তোর শতভাগ চেষ্টা করিস, সাবধানতা অবলম্বন করিস। ব্যাংকে টাকা জমানোর সময় তুই তকদিরের ভরসায় থাকিস না। অথচ, যখনই রবের হুকুম মানার প্রসঙ্গ আসে, নামাজের সময় আসে, পর্দা করার কথা আসে—তখনই তোরা খুব দার্শনিক হয়ে যাস। তোরা বলিস—‘আল্লাহর ইচ্ছা হলে হেদায়েত পাব’। এই দ্বিমুখী আচরণ কেন? দুনিয়ার জন্য ‘ফ্রি উইল’ আর আখেরাতের জন্য ‘জবরদস্তি’? এটা কি তোর বিবেকের সাথে প্রতারণা নয়?”
 
আহিয়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কথাটা তো সত্য। সে তো ক্যারিয়ারের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে। সেখানে তো সে ভাগ্যের দোহাই দেয় না। তবে ধর্মের বেলায় কেন সে নিজেকে অসহায় পুতুল ভাবে?
 
সাফওয়ান তার স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে আবার বলতে শুরু করল, “তকদির হলো একটা মহাসমুদ্র। এর গভীরে ডুব দিতে নেই, ডুবলে হারিয়ে যাবি। সাহাবারা তকদির নিয়ে বিতর্ক করতেন না, তাঁরা তকদিরকে বিশ্বাস করে আমল করতেন। হযরত আলী (রা.)-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল তকদির আর ইচ্ছাশক্তি নিয়ে। আলী (রা.) তাকে বললেন, ‘তোমার এক পা তোলো।’ লোকটি পা তুলল। এরপর তিনি বললেন, ‘এবার দ্বিতীয় পা-টিও তোলো।’ লোকটি বলল, ‘তা তো অসম্ভব, পড়ে যাব।’ আলী (রা.) হাসলেন। বললেন, ‘প্রথম পা তোলার যতটুকু ক্ষমতা তোমাকে দেওয়া হয়েছে, ওটাই তোমার স্বাধীন ইচ্ছা। আর দ্বিতীয় পা তুলতে না পারাটাই তকদির বা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ।’
 
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা ওই দ্বিতীয় পা তোলার চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হয়ে প্রথম পা-টাও নড়াতে চাই না। আল্লাহ তোকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন, তার হিসাব নেবেন। তুই বাংলাদেশে জন্মেছিস না আমেরিকায়, সেটা তোর হাত নেই। কিন্তু বাংলাদেশে জন্মে তুই সত্য খুঁজেছিস কি না, বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়েছিস কি না—এটার হিসাব তোকে দিতে হবে। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘আমি মানুষকে পথ দেখিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ।’ স্টিয়ারিং তোর হাতে। ম্যাপ তোর সামনে। এখন তুই যদি গাড়ি খাদে ফেলিস, তবে গাড়ির ম্যানুফ্যাকচারারকে দোষ দিতে পারিস না।”
 
বাইরের ঝড়টা কিছুটা কমেছে। কিন্তু আহিয়ানের ভেতরের ঝড়টা তখনো চলছে। সে বলল, “কিন্তু আল্লাহ তো কোরআনে বলেছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দেন, যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। তাহলে?”
 
“আবারও কন্টেক্সট ছাড়া আয়াত বুঝছিস,” সাফওয়ানের কণ্ঠে এবার কিছুটা দৃঢ়তা। “আল্লাহ কি লটারি করে হেদায়েত দেন? না। আল্লাহ তাদেরকেই পথভ্রষ্ট করেন, যারা নিজেদের অন্তরকে বক্র করে ফেলেছে। সুরা বাকারায় আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন, ‘তিনি ফাসিক (অবাধ্য) ছাড়া কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না।’ যখন কেউ সত্য শোনার পরও অহংকার করে, নিজেকে বড় ভাবে, যুক্তির আড়ালে নিজের প্রবৃত্তির পূজা করতে চায়—তখন আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন। এটা আল্লাহর জুলুম নয়, এটা বান্দার কর্মফল। ডাক্তার যখন দেখেন রোগী বারবার ওষুধ ফেলে দিচ্ছে, তখন ডাক্তারও হাল ছেড়ে দেন।
 
আবু জাহেল জানত মুহাম্মদ (সা.) সত্যবাদী। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ করেনি শুধু অহংকারের কারণে। সে ভেবেছিল, বনু হাশেমের কাছে বনু মাখজুম মাথা নত করবে না। এখানে তকদির তাকে আটকায়নি, আটকেছে তার ইগো। আজকের যুগেও নাস্তিকতার মূলে বেশিরভাগ সময় বিজ্ঞান থাকে না, থাকে ইগো এবং ভোগবাদী মানসিকতা। মানুষ চায় না তার জীবনে কোনো ‘হারাম’ বা নিষেধ থাকুক। সে চায় আনলিমিটেড ফ্রিডম—যা খুশি করব, যা খুশি খাব। এই স্বেচ্ছাচারী জীবনের লাইসেন্স পেতেই সে স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। আর সেটাকে জাস্টিফাই করার জন্য তকদিরের এমন খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করায়।”
 
সাফওয়ান থামল। তার চোখ ভিজে উঠেছে। আইসিইউর দরজার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “রাফি হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু রাফির মৃত্যু কি কেবলই একটা দুর্ঘটনা? নাকি এটা আমাদের জন্য একটা সিগন্যাল? আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, শ্বাস নিচ্ছি, আমাদের ‘সময়’ কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। স্ক্রিপ্ট রাইটার আমাদের কলম এখনো কেড়ে নেননি। খাতা এখনো খোলা। আমরা চাইলে এখনি তওবা করে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারি। এই ক্ষমতা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।
 
সালাফদের জীবনী পড়েছিস? তাঁরা কীভাবে জীবনকে দেখতেন? তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ঈমান হলো আশা আর ভয়ের মাঝখানের অবস্থা। তাঁরা তকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকতেন, যাকে বলা হয় ‘রিদা বিল ক্বাদা’। জীবনে যত ঝড়ই আসুক, তাঁরা জানতেন—আমার রব আমার জন্য যা ভালো মনে করেছেন, তাই হয়েছে। কিন্তু নিজের পাপের জন্য তাঁরা কখনো তকদিরকে দোষ দিতেন না। তাঁরা রাতের অন্ধকারে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতেন। বলতেন, ‘রাব্বানা জলামনা আনফুসানা’—হে রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আদম (আ.) ভুল করার পর বলেছিলেন, ‘আমি জুলুম করেছি’। আর ইবলিস ভুল করার পর বলেছিল, ‘আপনি আমাকে বিপথগামী করেছেন’। যে নিজের দোষ স্বীকার করে, সে আদমের সন্তান। আর যে দোষ আল্লাহর ওপর চাপায়, সে ইবলিসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তুই কার দলে থাকবি আহিয়ান? আদমের, নাকি ইবলিসের?”
 
আহিয়ান অনুভব করল তার গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। এতদিনের জমানো পাথরটা যেন সরে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল একটা লেখার কথা—যেখানে বলা হয়েছিল, বিশ্বাস হলো অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া নয়, বরং ভোরের আলোর অপেক্ষায় থাকা। সে এতদিন অন্ধকারের গর্তে বসে আলোর সমালোচনা করেছে, কিন্তু আলোতে আসার চেষ্টা করেনি।
 
সাফওয়ান পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে আহিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল। “দোস্ত, ইসলাম কোনো জটিল ফিলোসফি নয়। এটা হলো আত্মসমর্পণের প্রশান্তি। তুই যখন যুক্তি দিয়ে সব বুঝতে যাবি, তখন মস্তিষ্ক তোকে ধোঁকা দেবে। কারণ আমাদের মস্তিষ্কের প্রসেসর খুবই সীমিত। একটা পিঁপড়া যেমন ইন্টারনেটের মেকানিজম বুঝতে পারে না, তেমনি আমরাও অসীম রবের সব হিকমত বুঝতে পারব না। কিন্তু আমরা তাঁর রহমত অনুভব করতে পারি। তুই যখন মায়ের কোলে মাথা রাখিস, তখন কি মায়ের ডিএনএ টেস্ট করিস? না। তখন শুধু বিশ্বাস আর ভালোবাসা কাজ করে। রবের সাথে সম্পর্কটা ঠিক তেমনই। স্বামীর কাছে স্ত্রীর সব আবদার যেমন যুক্তিহীন মনে হলেও আদতে তা ভালোবাসারই প্রকাশ, তেমনি রবের সব বিধানেই বান্দার জন্য কল্যাণ লুকিয়ে আছে।
 
এই যে তুই হিন্দু, খ্রিস্টান বা নাস্তিকদের কথা বললি—সবার ভেতরেই আল্লাহ একটা ‘ফিতরাত’ বা ডিফল্ট প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছেন। বিপদে পড়লে, বিমান যখন মাঝ আকাশে কাঁপতে থাকে, তখন কট্টর নাস্তিকও অবচেতন মনে ‘ওহ গড’ বলে চিৎকার করে ওঠে। ওই ডাকটা কে দেয়? ওটা তার রুহ বা আত্মা দেয়। আত্মা জানে তার মালিক কে। কিন্তু দুনিয়ার চাকচিক্য আর শয়তানের ওয়াসওয়াসায় সেই ডাকটা চাপা পড়ে যায়। যারা সেই ডাক শুনতে পায় এবং সাড়া দেয়, তারাই সফল। আর যারা কানে আঙুল দিয়ে রাখে, তারাই ব্যর্থ।”
 
হঠাৎ আইসিইউর দরজা খুলে গেল। ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। তার মুখাবয়ব গম্ভীর। তিনি মাথা নাড়লেন। রাফি আর নেই।
 
করিডরে একটা স্তব্ধতা নেমে এল। আহিয়ান উঠে দাঁড়াল। তার পা কাঁপছে। কিছুক্ষণ আগেও সে তকদির নিয়ে তর্ক করছিল, আর এখন তার সামনে তকদিরের সবচেয়ে বড় সত্য—মৃত্যু—উপস্থিত। সে কাঁচের দেওয়াল দিয়ে রাফির নিথর দেহটার দিকে তাকাল। মেশিনের শব্দগুলো থেমে গেছে। মনিটরের আঁকাবাঁকা রেখাটা এখন সোজা হয়ে আছে। এক সরলরেখা। জীবনের সব জটিল সমীকরণ আজ এক সরলরেখায় মিশে গেছে।
 
আহিয়ানের মনে হলো, এই যে রাফি চলে গেল, সে কি এখন আল্লাহর কাছে গিয়ে বলতে পারবে—‘আমার তকদিরে মৃত্যু ছিল তাই আমি কিছু করিনি’? নাকি তার আমলনামা এখন তার গলার হাড় হয়ে ঝুলছে?
সাফওয়ান আহিয়ানের কাঁধে হাত রাখল। “চল আহিয়ান। রাফির জন্য এখন আর তর্কের প্রয়োজন নেই, দোয়ার প্রয়োজন। আর তোর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্তের। জীবনটা কোনো রিহার্সাল নয় বন্ধু, এটাই ফাইনাল শট। তুই কি এখনো দর্শকের গ্যালারিতে বসে সমালোচকের মতো হাততালি দিবি, নাকি মাঠে নেমে খেলবি? জান্নাতের পথটা খুব মসৃণ নয়, কাঁটা বিছানো। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছালে যে প্রশান্তি পাবি, তার কোনো তুলনা হয় না।”
 
আহিয়ান চশমাটা চোখে পরল। ঝাপসা কাঁচের ওপাশে পৃথিবীটা এখন অনেক স্পষ্ট মনে হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, এতক্ষণ সে ভুল দরজায় কড়া নাড়ছিল। সে যুক্তির দরজায় লাথি মারছিল, অথচ হৃদয়ের দরজাটা খোলাই ছিল।
“সাফওয়ান,” আহিয়ানের গলাটা ধরে এল। “আমাকে অজুর জায়গাটা দেখিয়ে দিবি? অনেকদিন রবের সামনে দাঁড়াই না। খুব ইচ্ছে করছে কপালটা মাটিতে ছোঁয়াই। শুনেছি, সেজদাতেই নাকি বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে।”
 
সাফওয়ানের মুখে এক টুকরো জান্নাতি হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “চল। মসজিদ হাসপাতালের নিচতলায়। আজ আমরা দুজন মিলে রাফির মাগফিরাতের দোয়া করব, আর তোর হেদায়েতের শুকরিয়া আদায় করব।”
 
তারা দুজন লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। মেঘের আড়াল থেকে ভোরের আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে। এই আলোটা নতুন দিনের, নতুন উপলব্ধির।
 
আহিয়ান মনে মনে ভাবল, সবকিছু হয়তো আল্লাহর ইচ্ছায় হয়, কিন্তু আমার ইচ্ছাটাকে তাঁর ইচ্ছার কাছে সঁপে দেওয়ার নামই তো ইসলাম। আমি আর প্রশ্ন করব না কেন আমাকে সৃষ্টি করা হলো, আমি বরং উত্তর খুঁজব—কীভাবে আমাকে আমার স্রষ্টার কাছে প্রিয় করা যায়।
 
“তকদিরে যা লেখা ছিল, ভেবেছ কি তাই শেষ কথা?
তোমার কর্মেই লুকিয়ে আছে, জান্নাত কিংবা ব্যথা।
নৌকা ভাসালে সাগরে, ঝড় তো আসবেই ভাই,
বৈঠা ছাড়লে চলবে না, হাল ধরতে হবে তাই।
আলোর পথে হাঁটলে তুমি, ছায়া যাবে পিছে,
রবের দয়া সত্য জেনো, বাকি সব তো মিছে।”
 
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু আহিয়ানের হৃদয়ের দরজা আজ খুলে গেছে। এক অনন্ত প্রশান্তির পথে তার যাত্রা শুরু হলো। এমন এক যাত্রা, যেখানে যুক্তি এসে আবেগের কাছে হার মানে, যেখানে মস্তিষ্কের অহংকার ধুয়ে যায় চোখের নোনা জলে।
 
এটাই জীবন। এটাই পরীক্ষা। আর এর উত্তরপত্রের নাম—ঈমান।
 
[তাকদিরের স্ক্রিপ্ট ও হৃদয়ের স্টিয়ারিং]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
image
Send as a message
Share on my page
Share in the group