মহাকাশের অসীম নিস্তব্ধতা চিরে যখন একটি আওয়াজ ধ্বনিত হয়, তখন কেবল বাতাসের কণাগুলোই কাঁপে না, কেঁপে ওঠে মিথ্যার ওপর নির্মিত সমস্ত প্রাসাদ। সেই আওয়াজটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়, এটি মহাবিশ্বের অস্তিত্বের এক পরম সত্যের ঘোষণা—‘আল্লাহু আকবার’। কিন্তু ইদানীং আমাদের আশেপাশে অদ্ভুত এক দৃশ্যপট রচিত হচ্ছে। যে ধ্বনি শুনে একসময় জালিমের তখত তাউস উল্টে যেত, আজ সেই ধ্বনি শুনলে কিছু মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, হৃদয়ে আতঙ্কের চোরাস্রোত বয়ে যায়। তারা একে উগ্রবাদ, মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে বন্দী করতে চায়।
অথচ তারা জানে না, এই আপত্তি কেবল একটি স্লোগানের বিরুদ্ধে নয়, এই আপত্তি খোদ মহাবিশ্বের রবের শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে এক নগ্ন বিদ্রোহ। কেন এই আপত্তি? কিসের এই ভয়? এটি কি আধুনিকতার কোনো রূপ, নাকি সেই পুরোনো আইয়ামে জাহিলিয়াতেরই এক নতুন সংস্করণ, যা কোট-টাই আর সেক্যুলারিজমের মুখোশ পরে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে?
আসুন, আবেগের ফানুস না উড়িয়ে, কুরআনের আয়াত, হাদিসের সনদ এবং ধারালো যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করি এই আপত্তির ব্যবচ্ছেদ।
শুরুতেই মস্তিষ্কের নিউরনে একটি মৌলিক প্রশ্ন গেঁথে নিন। ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থ কী? আভিধানিক অর্থে আমরা বলি—‘আল্লাহ মহান’। কিন্তু আরবি ব্যাকরণ বা লুগাতের গভীরতা যারা বোঝেন, তারা জানেন এই তরজমাটি অসম্পূর্ণ।
‘আকবার’ শব্দটি ‘ইসমে তাফজিল’ বা সুপারলেটিভ ডিগ্রিরও ঊর্ধ্বে। এর অর্থ—আল্লাহ ‘সবচেয়ে’ বড়, আল্লাহ ‘সবকিছুর’ চেয়ে মহান। কার চেয়ে বড়? আপনার ক্ষমতার চেয়ে, আপনার দম্ভের চেয়ে, আপনার পারমাণবিক বোমার চেয়ে, আপনার পার্লামেন্টের চেয়ে, আপনার নালিশ আর সালিশের চেয়ে।
যখনই কোনো মুমিন চিৎকার করে বলে ওঠে ‘আল্লাহু আকবার’, তখন সে মূলত একটি ঘোষণা দেয়—এই পৃথিবীতে আমি আল্লাহ ছাড়া আর কারোর গোলামি করি না, আর কারোর শ্রেষ্ঠত্ব মানি না। ঠিক এখানেই সমস্যাটা তৈরি হয়। সমস্যাটা আল্লাহর নাম নেওয়াতে নয়, সমস্যাটা ‘সবচেয়ে বড়’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াতে।
মক্কার কুরাইশরা আল্লাহকে বিশ্বাস করত। কুরআনের সূরা যুখরুফের ৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো কে তাদের সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে—আল্লাহ।” তবুও আবু জাহেলের আপত্তি ছিল। কেন?
কারণ, আল্লাহকে স্রষ্টা মানতে তাদের আপত্তি ছিল না, কিন্তু আল্লাহকে একমাত্র ‘বিধানদাতা’ ও ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ মানতে তাদের ইগোতে লাগত। আজকের আধুনিক জাহিলিয়াত সেই আবু জাহেলেরই প্রেতাত্মা। তারা মসজিদে আল্লাহকে ‘বড়’ মানতে রাজি, কিন্তু রাজনীতির মাঠে, সংস্কৃতির মঞ্চে বা স্লোগানে আল্লাহকে ‘সবচেয়ে বড়’ মানতে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা আহত হয়। এই যে বিভাজন, এটাই হলো শিরক, আর এই মানসিকতাই হলো নব্য জাহিলিয়াত।
একটু গভীরভাবে দিয়ে চিন্তা করুন ভাই। একজন মানুষ যখন ‘জয় বাংলা’ বা কিংবা ‘লং লিভ রেভোলিউশন’ বলে, তখন তা যদি বাকস্বাধীনতা হয়, তবে মহাবিশ্বের মালিকের নাম নেওয়া কেন অপরাধ হবে?
যুক্তি বলে, স্রষ্টা যদি সৃষ্টির চেয়ে মহান হন, তবে তাঁর নাম নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় সত্য। বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে, এই পৃথিবী মহাবিশ্বের তুলনায় ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। আর সেই ধূলিকণার বুকে দাঁড়িয়ে কোনো ক্ষুদ্র এক প্রাণী যদি তার স্রষ্টার নাম নিতে কুণ্ঠাবোধ করে বা অন্য কেউ নিলে আপত্তি জানায়, তবে বুঝতে হবে তার মানসিক বৈকল্য চরম পর্যায়ে।
সূরা আল-মুদ্দাসসিরের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (সা.) প্রথমেই নির্দেশ দিয়েছেন— “ওয়া রব্বাকা ফাকাব্বির”—অর্থাৎ, “তোমার রবের বড়ত্ব ঘোষণা করো।”
এটি কোনো অপশনাল বিষয় নয়, এটি ঈমানের শ্বাস-প্রশ্বাস। সালাফ আস-সালেহীন বা আমাদের পূর্বসূরিরা যখন এই আয়াত শুনেছিলেন, তারা তাদের জীবনকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যেখানে আল্লাহর হুকুমের সামনে দুনিয়ার সব পরাশক্তি তুচ্ছ হয়ে যেত।
সাহাবাদের জীবনপদ্ধতি কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়; এটি হলো সেই জীবনব্যবস্থা যেখানে ‘আল্লাহু আকবার’ কেবল মুখের বুলি ছিল না, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নাম ছিল।
একজন মুমিন যখন তাকবীর দেয়, সে মূলত তার নফসের কাছে, শয়তানের কাছে এবং তাগুতের কাছে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
আজ যারা এই স্লোগান নিয়ে চুলকানি অনুভব করছেন, তাদের মনস্তত্ত্বটা একটু গভীরে গিয়ে দেখুন। তাদের ভয়টা মূলত ‘আল্লাহ’ শব্দে নয়, তাদের ভয় ‘ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণে’। তারা চায় ইসলাম থাকুক কেবল জায়নামাজে আর তসবিহ দানায়। কিন্তু ইসলাম তো বৈরাগ্যবাদ শেখায়নি। ইসলাম শিখিয়েছে বীরত্ব।
বদরের প্রান্তরে ৩১৩ জন সাহাবী যখন ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে ১০০০ সুসজ্জিত মুশরিক বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন সেই ধ্বনি ছিল তাদের ঈমানি শক্তির উৎস।
খন্দকের যুদ্ধে পেটে পাথর বেঁধে, অনাহারে থেকেও সাহাবীরা যখন সমস্বরে তাকবীর দিতেন, তখন মদীনার মাটি কেঁপে উঠত, আর মুনাফিকদের হৃদকম্পন বেড়ে যেত।
আজকের দিনের মুনাফিকদের হৃদকম্পনও বেড়ে যায়। কারণ, তাকবীর হলো সেই চাবুক, যা ঘুমন্ত মুসলিম উম্মাহকে জাগিয়ে তোলে।
ওমর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন কাবার চত্বরে দাঁড়িয়ে তিনি ফিসফিস করে কথা বলেননি। হামজা (রা.) এবং ওমর (রা.)-এর নেতৃত্বে দুটি সারি করে মুসলমানরা যখন তাকবীর দিতে দিতে কাবায় প্রবেশ করলেন, তখন কুরাইশরা বুঝে গিয়েছিল—মুহাম্মদ (সা.) আর একা নন।
তাকবীরের এই ঐতিহাসিক ইমপ্যাক্ট আছে বলেই ইসলামের শত্রুরা এই আওয়াজকে স্তব্ধ করতে চায়।
বিষয়টি আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। আমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে আজানের সময়, ইকামতের সময়, সালাতের শুরুতে এবং প্রতি রাকাতে ওঠাবসায় কতবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলি? গুনে দেখেছেন কি? শতবার। সালাতের শুরুতে ‘তাকবীরে তাহরিমা’ বলা হয়। ‘তাহরিমা’ মানে কী? হারাম করে দেওয়া।
অর্থাৎ, যখনই আপনি হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন, তখন দুনিয়ার সব কাজ, সব চিন্তা, সব আনুগত্য আপনার জন্য হারাম হয়ে গেল। এখন আপনি কেবল আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান। যে ব্যক্তি দিনে শতবার মসজিদে এই ঘোষণা দেয়, সে কীভাবে মসজিদের বাইরে এসে এই স্লোগান নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতে পারে?
যদি করে, তবে বুঝতে হবে তার সালাত ছিল কেবল শারীরিক কসরত, রুহ সেখানে অনুপস্থিত। এটি সেই দ্বিমুখী নীতি, যা আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে।
সূরা মুনাফিকুনে আল্লাহ এদের চিত্রই তুলে ধরেছেন। তারা মুখে যা বলে, অন্তরে তা ধারণ করে না। আজকের যুগে যারা ‘আল্লাহু আকবার’ শুনে জঙ্গিবাদের গন্ধ পায়, তারা মূলত নিজেদের অজান্তেই আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা চায় এমন এক ইসলাম, যা তাদের দুর্নীতি, অশ্লীলতা আর অন্যায়ের পথে বাধা হবে না। কিন্তু তাকবীরের স্লোগান যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠ, তা তারা সহ্য করবে কী করে?
আপনি কি কখনো ঝড়ের রাতে সমুদ্রের গর্জন শুনেছেন? কিংবা মেঘের গর্জনে আকাশের বুক চিরে যাওয়া দেখেছেন? প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপের মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষ কতটা অসহায়! তখন মানুষের মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে আসে স্রষ্টার নাম। অথচ রোদের দিনে, এসির বাতাসে বসে সেই মানুষই স্রষ্টার নাম নিতে লজ্জা পায়।
"সিংহের গর্জনে যদি কম্পিত হয় বন,
তবে রবের নামে কেন কাঁপে না তোমার মন?
যে ধ্বনিতে সূর্য ওঠে, তারারা দেয় পাড়ি,
সেই নামেই জ্বলে উঠুক ঈমানের বাতি।"
এই স্লোগান কোনো রাজনৈতিক দলের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটি আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী (সা.) পর্যন্ত সকল নবীর স্লোগান। এটি আসমানের স্লোগান, এটি জমিনের স্লোগান। যখন একজন মুমূর্ষু রোগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তখনও তার কানে এই তাওহীদের বাণীই শোনানো হয়। তাহলে জীবন থাকতে কেন এই আপত্তি?
এখন আসুন, একটু সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এবং বিশুদ্ধ ইসলামি জীবনবোধের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
তথাকথিত মডারেট মুসলিমরা প্রায়ই বলে—‘ধর্ম পালন হবে মনে মনে, স্লোগানে কেন?’ এটি একটি শয়তানি ধোঁকা। ইসলাম কোনো প্রাইভেট রিলিজিয়ন বা ব্যক্তিগত গোপন ধর্ম নয়। ইসলাম একটি কমপ্লিট কোড অব লাইফ। একজন মুসলিমের (অর্থাৎ যারা সাহাবাদের বুঝ অনুযায়ী দ্বীন পালন করেন) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। সে যখন ব্যবসা করে, তখন সুদের অফার ফিরিয়ে দিয়ে কাজের মাধ্যমে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ টাকার চেয়ে আল্লাহর হুকুম বড়। সে যখন চোখের সামনে অশ্লীলতা দেখে এবং দৃষ্টি অবনত করে, তখন সে নীরবে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ আমার কামনার চেয়ে আল্লাহর ভয় বড়। আর যখন সমাজে জুলুম হয়, তখন সে উচ্চস্বরে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ জালিমের চেয়ে আমার রব শক্তিশালী।
সুতরাং, তাকবীর কেবল মুখের আওয়াজ নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল। যারা এই লাইফস্টাইল বা জীবনপদ্ধতিকে ভয় পায়, তারাই এই স্লোগানের বিরোধিতা করে। তারা চায় মুসলিমরা এমন এক জাতিতে পরিণত হোক, যাদের মেরুদণ্ড নেই, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, তাকবীরের সংস্কৃতি যে জাতির মধ্যে জীবিত থাকে, সেই জাতিকে কেউ গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে না।
কুরআন মাজীদের সূরা আল-আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।”
আজ উম্মাহর এই করুণ দশা কেন? কারণ আমরা আল্লাহর বড়ত্ব ভুলে গিয়েছি। আমরা এখন দল, মত, আর নেতার বড়ত্ব নিয়ে ব্যস্ত। আমরা মানুষকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহকে নারাজ করছি।
যখনই কোনো মুসলিম ‘আল্লাহু আকবার’ বলে স্লোগান দেয়, তখন সে মূলত এই উম্মাহকে এক হওয়ার আহ্বান জানায়। সে মনে করিয়ে দেয়—আমাদের রব এক, আমাদের লক্ষ্য এক। এই ঐক্যই কুফরের চোখের বালি। তারা জানে, যদি এই উম্মাহ আবার তাকবীরের পতাকাতলে এক হয়, তবে তাদের শোষণ আর শাসনের দিন শেষ হয়ে যাবে।
তাই তারা মিডিয়া দিয়ে, বুদ্ধিজীবী দিয়ে মগজধোলাই করার চেষ্টা করছে। তারা বোঝাতে চায়—তাকবীর দেওয়া মানেই উগ্রতা। অথচ তাকবীর মানেই হলো শান্তি। কারণ, যে সমাজে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে চুরি হয় না, ধর্ষণ হয় না, দুর্নীতি হয় না। আল্লাহর বড়ত্ব মেনে নেওয়া মানেই সৃষ্টির ওপর থেকে সৃষ্টির প্রভুত্ব খতম করা।
মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, এটা থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র। এই বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। মানুষ একটা ভাইরাস সামলাতে পারে না, সামান্য ভূমিকম্পে অসহায় হয়ে পড়ে। সেই মানুষের মুখে আল্লাহর বড়ত্ব নিয়ে আপত্তি কি মানায়? এটি কি হাস্যকর নয়? এটি সেই জাহিলিয়াত, যেখানে মানুষ নিজের সৃষ্টি করা মাটির পুতুলকে রব বানাত।
আজ মানুষ নিজের তৈরি করা মতবাদকে রব বানিয়েছে। পার্থক্য কেবল উপাদানে—আগে ছিল মাটি, এখন মতবাদ। কিন্তু সারকথা একই—আল্লাহকে অস্বীকার করা বা আল্লাহর সমকক্ষ কাউকে দাঁড় করানো। তাকবীরের স্লোগান এই সমস্ত মিথ্যা ইলাহ বা উপাস্যদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।
যারা বলে, ‘তাকবীর দিলে অন্য ধর্মের মানুষ ভয় পায়’—এটি একটি ডাহা মিথ্যা অজুহাত। ইসলামের ইতিহাসে যখনই মুসলিমরা কোনো জনপদ বিজয় করেছে, তারা তাকবীর ধ্বনি দিয়েই প্রবেশ করেছে। কিন্তু তারা কি সেখানকার গির্জা বা মন্দির ভেঙেছে? তারা কি সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে?
না। বরং তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। ওমর (রা.)-এর জেরুজালেম বিজয়ের কথা স্মরণ করুন। তাকবীরের ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়েছিল, কিন্তু খ্রিস্টানরা পেয়েছিল পূর্ণ নিরাপত্তা। সুতরাং, তাকবীর ভয়ের কারণ নয়, তাকবীর হলো ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি। ভয় পায় কেবল তারা, যারা অপরাধী। পুলিশ দেখলে চোর যেমন ভয় পায়, তাকবীর শুনলে জালেমরা তেমনি ভয় পায়। সাধারণ মানুষের ভয়ের কিছু নেই। বরং এই ধ্বনি শুনে তাদের আশ্বস্ত হওয়া উচিত যে, এখন আর মানুষের মনগড়া আইনে বিচার হবে না, এখন ইনসাফ কায়েম হবে।
আত্মার গভীরে একবার প্রশ্ন করুন—আমরা কি আসলেই মুসলিম? যদি হই, তবে আল্লাহর নাম শুনে আমাদের রক্ত গরম হবে, শরীর শিউরে উঠবে, চোখে পানি আসবে।
সূরা আল-আনফালের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, “মুমিন তো তারাই, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়।”
আপনার হৃদয়ে যদি কম্পন না হয়, উল্টো বিরক্তি আসে, তবে আপনার ঈমানের ইসিজি রিপোর্ট চেক করা দরকার। হয়তো সেখানে ‘নিফাক’ নামক কোনো ব্লক ধরা পড়বে। আমাদের যুবসমাজকে আজ এই হীনম্মন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভার্সিটির ক্যান্টিনে, বন্ধুদের আড্ডায়, সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে—সর্বত্র সত্যকে সত্য বলতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবী আমাদের আসল ঠিকানা নয়। কবরের সেই অন্ধকার ঘরে যখন মুনকার ও নকির ফেরেশতা আসবে, তখন কোনো স্লোগান কাজে আসবে না, যদি না হৃদয়ে আল্লাহর বড়ত্ব থাকে। সেদিন আপনার নেতা, আপনার পার্টি, আপনার সেক্যুলার বন্ধুরা কেউ পাশে থাকবে না। সালাফি জীবনধারায় যারা বিশ্বাসী, তারা এই মৃত্যুচিন্তাকে সবসময় মাথায় রাখে। তারা জানে, দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জিন্দেগীতে মানুষের মন জুগিয়ে চলার কোনো মানে নেই।
আকিদাহর কিতাবগুলো পড়লে দেখবেন, সেখানে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি নিয়ে কত সূক্ষ্ম আলোচনা করা হয়েছে। সব আলোচনার সারমর্ম একটাই—আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, আমরা মুখাপেক্ষী। যে মুখাপেক্ষী, সে কীভাবে অমুখাপেক্ষী সত্তার নামোচ্চারণে বাধা দেয়? এ যেন সূর্যের আলোকে অস্বীকার করে প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করার চেষ্টা।
শেষের দিকে এসে একটা কথা বলি, যা হয়তো আপনার বিবেককে নাড়া দেবে। আপনি যখন মারা যাবেন, আপনার জানাজার খাটিয়া যখন কাঁধে তোলা হবে, তখন মানুষেরা কী বলবে? তারা সমস্বরে বলবে—‘আল্লাহু আকবার’। চার তাকবীরে আপনার জানাজা পড়া হবে।
ভাবুন তো, যেই তাকবীর নিয়ে আপনার এতো এলার্জি ছিল, সেই তাকবীর দিয়েই আপনাকে বিদায় জানানো হচ্ছে। কি অদ্ভুত না? আপনি সারাজীবন যেই ধ্বনিকে ‘মৌলবাদ’ বা ‘বাড়াবাড়ি’ বলেছেন, মৃত্যুর পর সেই ধ্বনিই আপনার মাগফিরাতের একমাত্র মাধ্যম হবে।
তাই সময় থাকতে জাগুন। জাহিলিয়াতের চশমা খুলে ফেলুন। মডার্ন হওয়ার নামে ঈমান বিক্রি করবেন না। আল্লাহু আকবার কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি অস্তিত্বের স্লোগান, এটি মুক্তির স্লোগান, এটি বিজয়ের স্লোগান। যেদিন এই উম্মাহর প্রতিটি যুবকের হৃদয়ে, প্রতিটি নারীর হিজাবে, প্রতিটি পুরুষের দাঁড়িতে এবং কর্মে ‘আল্লাহু আকবার’-এর প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে, সেদিন পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।
আসুন, আমরা আমাদের কণ্ঠে সেই হারানো তেজ ফিরিয়ে আনি। লজ্জিত না হয়ে, কুণ্ঠিত না হয়ে, সগৌরবে ঘোষণা করি মহাকাশের সেই পরম সত্য। আকাশ সাক্ষী থাকুক, বাতাস সাক্ষী থাকুক, আর সাক্ষী থাকুক এই জমিন—আমরা সেই দল, যারা আল্লাহ ছাড়া কাউকে বড় বলে মানি না।
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
[তাকবীর]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
মহাকাশের অসীম নিস্তব্ধতা চিরে যখন একটি আওয়াজ ধ্বনিত হয়, তখন কেবল বাতাসের কণাগুলোই কাঁপে না, কেঁপে ওঠে মিথ্যার ওপর নির্মিত সমস্ত প্রাসাদ। সেই আওয়াজটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়, এটি মহাবিশ্বের অস্তিত্বের এক পরম সত্যের ঘোষণা—‘আল্লাহু আকবার’। কিন্তু ইদানীং আমাদের আশেপাশে অদ্ভুত এক দৃশ্যপট রচিত হচ্ছে। যে ধ্বনি শুনে একসময় জালিমের তখত তাউস উল্টে যেত, আজ সেই ধ্বনি শুনলে কিছু মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, হৃদয়ে আতঙ্কের চোরাস্রোত বয়ে যায়। তারা একে উগ্রবাদ, মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে বন্দী করতে চায়।
অথচ তারা জানে না, এই আপত্তি কেবল একটি স্লোগানের বিরুদ্ধে নয়, এই আপত্তি খোদ মহাবিশ্বের রবের শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে এক নগ্ন বিদ্রোহ। কেন এই আপত্তি? কিসের এই ভয়? এটি কি আধুনিকতার কোনো রূপ, নাকি সেই পুরোনো আইয়ামে জাহিলিয়াতেরই এক নতুন সংস্করণ, যা কোট-টাই আর সেক্যুলারিজমের মুখোশ পরে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে?
আসুন, আবেগের ফানুস না উড়িয়ে, কুরআনের আয়াত, হাদিসের সনদ এবং ধারালো যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করি এই আপত্তির ব্যবচ্ছেদ।
শুরুতেই মস্তিষ্কের নিউরনে একটি মৌলিক প্রশ্ন গেঁথে নিন। ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থ কী? আভিধানিক অর্থে আমরা বলি—‘আল্লাহ মহান’। কিন্তু আরবি ব্যাকরণ বা লুগাতের গভীরতা যারা বোঝেন, তারা জানেন এই তরজমাটি অসম্পূর্ণ।
‘আকবার’ শব্দটি ‘ইসমে তাফজিল’ বা সুপারলেটিভ ডিগ্রিরও ঊর্ধ্বে। এর অর্থ—আল্লাহ ‘সবচেয়ে’ বড়, আল্লাহ ‘সবকিছুর’ চেয়ে মহান। কার চেয়ে বড়? আপনার ক্ষমতার চেয়ে, আপনার দম্ভের চেয়ে, আপনার পারমাণবিক বোমার চেয়ে, আপনার পার্লামেন্টের চেয়ে, আপনার নালিশ আর সালিশের চেয়ে।
যখনই কোনো মুমিন চিৎকার করে বলে ওঠে ‘আল্লাহু আকবার’, তখন সে মূলত একটি ঘোষণা দেয়—এই পৃথিবীতে আমি আল্লাহ ছাড়া আর কারোর গোলামি করি না, আর কারোর শ্রেষ্ঠত্ব মানি না। ঠিক এখানেই সমস্যাটা তৈরি হয়। সমস্যাটা আল্লাহর নাম নেওয়াতে নয়, সমস্যাটা ‘সবচেয়ে বড়’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াতে।
মক্কার কুরাইশরা আল্লাহকে বিশ্বাস করত। কুরআনের সূরা যুখরুফের ৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো কে তাদের সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে—আল্লাহ।” তবুও আবু জাহেলের আপত্তি ছিল। কেন?
কারণ, আল্লাহকে স্রষ্টা মানতে তাদের আপত্তি ছিল না, কিন্তু আল্লাহকে একমাত্র ‘বিধানদাতা’ ও ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ মানতে তাদের ইগোতে লাগত। আজকের আধুনিক জাহিলিয়াত সেই আবু জাহেলেরই প্রেতাত্মা। তারা মসজিদে আল্লাহকে ‘বড়’ মানতে রাজি, কিন্তু রাজনীতির মাঠে, সংস্কৃতির মঞ্চে বা স্লোগানে আল্লাহকে ‘সবচেয়ে বড়’ মানতে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা আহত হয়। এই যে বিভাজন, এটাই হলো শিরক, আর এই মানসিকতাই হলো নব্য জাহিলিয়াত।
একটু গভীরভাবে দিয়ে চিন্তা করুন ভাই। একজন মানুষ যখন ‘জয় বাংলা’ বা কিংবা ‘লং লিভ রেভোলিউশন’ বলে, তখন তা যদি বাকস্বাধীনতা হয়, তবে মহাবিশ্বের মালিকের নাম নেওয়া কেন অপরাধ হবে?
যুক্তি বলে, স্রষ্টা যদি সৃষ্টির চেয়ে মহান হন, তবে তাঁর নাম নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় সত্য। বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে, এই পৃথিবী মহাবিশ্বের তুলনায় ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। আর সেই ধূলিকণার বুকে দাঁড়িয়ে কোনো ক্ষুদ্র এক প্রাণী যদি তার স্রষ্টার নাম নিতে কুণ্ঠাবোধ করে বা অন্য কেউ নিলে আপত্তি জানায়, তবে বুঝতে হবে তার মানসিক বৈকল্য চরম পর্যায়ে।
সূরা আল-মুদ্দাসসিরের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (সা.) প্রথমেই নির্দেশ দিয়েছেন— “ওয়া রব্বাকা ফাকাব্বির”—অর্থাৎ, “তোমার রবের বড়ত্ব ঘোষণা করো।”
এটি কোনো অপশনাল বিষয় নয়, এটি ঈমানের শ্বাস-প্রশ্বাস। সালাফ আস-সালেহীন বা আমাদের পূর্বসূরিরা যখন এই আয়াত শুনেছিলেন, তারা তাদের জীবনকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যেখানে আল্লাহর হুকুমের সামনে দুনিয়ার সব পরাশক্তি তুচ্ছ হয়ে যেত।
সাহাবাদের জীবনপদ্ধতি কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়; এটি হলো সেই জীবনব্যবস্থা যেখানে ‘আল্লাহু আকবার’ কেবল মুখের বুলি ছিল না, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নাম ছিল।
একজন মুমিন যখন তাকবীর দেয়, সে মূলত তার নফসের কাছে, শয়তানের কাছে এবং তাগুতের কাছে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
আজ যারা এই স্লোগান নিয়ে চুলকানি অনুভব করছেন, তাদের মনস্তত্ত্বটা একটু গভীরে গিয়ে দেখুন। তাদের ভয়টা মূলত ‘আল্লাহ’ শব্দে নয়, তাদের ভয় ‘ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণে’। তারা চায় ইসলাম থাকুক কেবল জায়নামাজে আর তসবিহ দানায়। কিন্তু ইসলাম তো বৈরাগ্যবাদ শেখায়নি। ইসলাম শিখিয়েছে বীরত্ব।
বদরের প্রান্তরে ৩১৩ জন সাহাবী যখন ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে ১০০০ সুসজ্জিত মুশরিক বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন সেই ধ্বনি ছিল তাদের ঈমানি শক্তির উৎস।
খন্দকের যুদ্ধে পেটে পাথর বেঁধে, অনাহারে থেকেও সাহাবীরা যখন সমস্বরে তাকবীর দিতেন, তখন মদীনার মাটি কেঁপে উঠত, আর মুনাফিকদের হৃদকম্পন বেড়ে যেত।
আজকের দিনের মুনাফিকদের হৃদকম্পনও বেড়ে যায়। কারণ, তাকবীর হলো সেই চাবুক, যা ঘুমন্ত মুসলিম উম্মাহকে জাগিয়ে তোলে।
ওমর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন কাবার চত্বরে দাঁড়িয়ে তিনি ফিসফিস করে কথা বলেননি। হামজা (রা.) এবং ওমর (রা.)-এর নেতৃত্বে দুটি সারি করে মুসলমানরা যখন তাকবীর দিতে দিতে কাবায় প্রবেশ করলেন, তখন কুরাইশরা বুঝে গিয়েছিল—মুহাম্মদ (সা.) আর একা নন।
তাকবীরের এই ঐতিহাসিক ইমপ্যাক্ট আছে বলেই ইসলামের শত্রুরা এই আওয়াজকে স্তব্ধ করতে চায়।
বিষয়টি আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। আমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে আজানের সময়, ইকামতের সময়, সালাতের শুরুতে এবং প্রতি রাকাতে ওঠাবসায় কতবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলি? গুনে দেখেছেন কি? শতবার। সালাতের শুরুতে ‘তাকবীরে তাহরিমা’ বলা হয়। ‘তাহরিমা’ মানে কী? হারাম করে দেওয়া।
অর্থাৎ, যখনই আপনি হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন, তখন দুনিয়ার সব কাজ, সব চিন্তা, সব আনুগত্য আপনার জন্য হারাম হয়ে গেল। এখন আপনি কেবল আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান। যে ব্যক্তি দিনে শতবার মসজিদে এই ঘোষণা দেয়, সে কীভাবে মসজিদের বাইরে এসে এই স্লোগান নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতে পারে?
যদি করে, তবে বুঝতে হবে তার সালাত ছিল কেবল শারীরিক কসরত, রুহ সেখানে অনুপস্থিত। এটি সেই দ্বিমুখী নীতি, যা আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে।
সূরা মুনাফিকুনে আল্লাহ এদের চিত্রই তুলে ধরেছেন। তারা মুখে যা বলে, অন্তরে তা ধারণ করে না। আজকের যুগে যারা ‘আল্লাহু আকবার’ শুনে জঙ্গিবাদের গন্ধ পায়, তারা মূলত নিজেদের অজান্তেই আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা চায় এমন এক ইসলাম, যা তাদের দুর্নীতি, অশ্লীলতা আর অন্যায়ের পথে বাধা হবে না। কিন্তু তাকবীরের স্লোগান যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠ, তা তারা সহ্য করবে কী করে?
আপনি কি কখনো ঝড়ের রাতে সমুদ্রের গর্জন শুনেছেন? কিংবা মেঘের গর্জনে আকাশের বুক চিরে যাওয়া দেখেছেন? প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপের মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষ কতটা অসহায়! তখন মানুষের মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে আসে স্রষ্টার নাম। অথচ রোদের দিনে, এসির বাতাসে বসে সেই মানুষই স্রষ্টার নাম নিতে লজ্জা পায়।
"সিংহের গর্জনে যদি কম্পিত হয় বন,
তবে রবের নামে কেন কাঁপে না তোমার মন?
যে ধ্বনিতে সূর্য ওঠে, তারারা দেয় পাড়ি,
সেই নামেই জ্বলে উঠুক ঈমানের বাতি।"
এই স্লোগান কোনো রাজনৈতিক দলের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটি আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী (সা.) পর্যন্ত সকল নবীর স্লোগান। এটি আসমানের স্লোগান, এটি জমিনের স্লোগান। যখন একজন মুমূর্ষু রোগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তখনও তার কানে এই তাওহীদের বাণীই শোনানো হয়। তাহলে জীবন থাকতে কেন এই আপত্তি?
এখন আসুন, একটু সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এবং বিশুদ্ধ ইসলামি জীবনবোধের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
তথাকথিত মডারেট মুসলিমরা প্রায়ই বলে—‘ধর্ম পালন হবে মনে মনে, স্লোগানে কেন?’ এটি একটি শয়তানি ধোঁকা। ইসলাম কোনো প্রাইভেট রিলিজিয়ন বা ব্যক্তিগত গোপন ধর্ম নয়। ইসলাম একটি কমপ্লিট কোড অব লাইফ। একজন মুসলিমের (অর্থাৎ যারা সাহাবাদের বুঝ অনুযায়ী দ্বীন পালন করেন) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। সে যখন ব্যবসা করে, তখন সুদের অফার ফিরিয়ে দিয়ে কাজের মাধ্যমে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ টাকার চেয়ে আল্লাহর হুকুম বড়। সে যখন চোখের সামনে অশ্লীলতা দেখে এবং দৃষ্টি অবনত করে, তখন সে নীরবে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ আমার কামনার চেয়ে আল্লাহর ভয় বড়। আর যখন সমাজে জুলুম হয়, তখন সে উচ্চস্বরে বলে ‘আল্লাহু আকবার’—অর্থাৎ জালিমের চেয়ে আমার রব শক্তিশালী।
সুতরাং, তাকবীর কেবল মুখের আওয়াজ নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল। যারা এই লাইফস্টাইল বা জীবনপদ্ধতিকে ভয় পায়, তারাই এই স্লোগানের বিরোধিতা করে। তারা চায় মুসলিমরা এমন এক জাতিতে পরিণত হোক, যাদের মেরুদণ্ড নেই, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, তাকবীরের সংস্কৃতি যে জাতির মধ্যে জীবিত থাকে, সেই জাতিকে কেউ গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে না।
কুরআন মাজীদের সূরা আল-আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।”
আজ উম্মাহর এই করুণ দশা কেন? কারণ আমরা আল্লাহর বড়ত্ব ভুলে গিয়েছি। আমরা এখন দল, মত, আর নেতার বড়ত্ব নিয়ে ব্যস্ত। আমরা মানুষকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহকে নারাজ করছি।
যখনই কোনো মুসলিম ‘আল্লাহু আকবার’ বলে স্লোগান দেয়, তখন সে মূলত এই উম্মাহকে এক হওয়ার আহ্বান জানায়। সে মনে করিয়ে দেয়—আমাদের রব এক, আমাদের লক্ষ্য এক। এই ঐক্যই কুফরের চোখের বালি। তারা জানে, যদি এই উম্মাহ আবার তাকবীরের পতাকাতলে এক হয়, তবে তাদের শোষণ আর শাসনের দিন শেষ হয়ে যাবে।
তাই তারা মিডিয়া দিয়ে, বুদ্ধিজীবী দিয়ে মগজধোলাই করার চেষ্টা করছে। তারা বোঝাতে চায়—তাকবীর দেওয়া মানেই উগ্রতা। অথচ তাকবীর মানেই হলো শান্তি। কারণ, যে সমাজে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে চুরি হয় না, ধর্ষণ হয় না, দুর্নীতি হয় না। আল্লাহর বড়ত্ব মেনে নেওয়া মানেই সৃষ্টির ওপর থেকে সৃষ্টির প্রভুত্ব খতম করা।
মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, এটা থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র। এই বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। মানুষ একটা ভাইরাস সামলাতে পারে না, সামান্য ভূমিকম্পে অসহায় হয়ে পড়ে। সেই মানুষের মুখে আল্লাহর বড়ত্ব নিয়ে আপত্তি কি মানায়? এটি কি হাস্যকর নয়? এটি সেই জাহিলিয়াত, যেখানে মানুষ নিজের সৃষ্টি করা মাটির পুতুলকে রব বানাত।
আজ মানুষ নিজের তৈরি করা মতবাদকে রব বানিয়েছে। পার্থক্য কেবল উপাদানে—আগে ছিল মাটি, এখন মতবাদ। কিন্তু সারকথা একই—আল্লাহকে অস্বীকার করা বা আল্লাহর সমকক্ষ কাউকে দাঁড় করানো। তাকবীরের স্লোগান এই সমস্ত মিথ্যা ইলাহ বা উপাস্যদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।
যারা বলে, ‘তাকবীর দিলে অন্য ধর্মের মানুষ ভয় পায়’—এটি একটি ডাহা মিথ্যা অজুহাত। ইসলামের ইতিহাসে যখনই মুসলিমরা কোনো জনপদ বিজয় করেছে, তারা তাকবীর ধ্বনি দিয়েই প্রবেশ করেছে। কিন্তু তারা কি সেখানকার গির্জা বা মন্দির ভেঙেছে? তারা কি সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে?
না। বরং তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। ওমর (রা.)-এর জেরুজালেম বিজয়ের কথা স্মরণ করুন। তাকবীরের ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়েছিল, কিন্তু খ্রিস্টানরা পেয়েছিল পূর্ণ নিরাপত্তা। সুতরাং, তাকবীর ভয়ের কারণ নয়, তাকবীর হলো ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি। ভয় পায় কেবল তারা, যারা অপরাধী। পুলিশ দেখলে চোর যেমন ভয় পায়, তাকবীর শুনলে জালেমরা তেমনি ভয় পায়। সাধারণ মানুষের ভয়ের কিছু নেই। বরং এই ধ্বনি শুনে তাদের আশ্বস্ত হওয়া উচিত যে, এখন আর মানুষের মনগড়া আইনে বিচার হবে না, এখন ইনসাফ কায়েম হবে।
আত্মার গভীরে একবার প্রশ্ন করুন—আমরা কি আসলেই মুসলিম? যদি হই, তবে আল্লাহর নাম শুনে আমাদের রক্ত গরম হবে, শরীর শিউরে উঠবে, চোখে পানি আসবে।
সূরা আল-আনফালের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, “মুমিন তো তারাই, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়।”
আপনার হৃদয়ে যদি কম্পন না হয়, উল্টো বিরক্তি আসে, তবে আপনার ঈমানের ইসিজি রিপোর্ট চেক করা দরকার। হয়তো সেখানে ‘নিফাক’ নামক কোনো ব্লক ধরা পড়বে। আমাদের যুবসমাজকে আজ এই হীনম্মন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভার্সিটির ক্যান্টিনে, বন্ধুদের আড্ডায়, সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে—সর্বত্র সত্যকে সত্য বলতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবী আমাদের আসল ঠিকানা নয়। কবরের সেই অন্ধকার ঘরে যখন মুনকার ও নকির ফেরেশতা আসবে, তখন কোনো স্লোগান কাজে আসবে না, যদি না হৃদয়ে আল্লাহর বড়ত্ব থাকে। সেদিন আপনার নেতা, আপনার পার্টি, আপনার সেক্যুলার বন্ধুরা কেউ পাশে থাকবে না। সালাফি জীবনধারায় যারা বিশ্বাসী, তারা এই মৃত্যুচিন্তাকে সবসময় মাথায় রাখে। তারা জানে, দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জিন্দেগীতে মানুষের মন জুগিয়ে চলার কোনো মানে নেই।
আকিদাহর কিতাবগুলো পড়লে দেখবেন, সেখানে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি নিয়ে কত সূক্ষ্ম আলোচনা করা হয়েছে। সব আলোচনার সারমর্ম একটাই—আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, আমরা মুখাপেক্ষী। যে মুখাপেক্ষী, সে কীভাবে অমুখাপেক্ষী সত্তার নামোচ্চারণে বাধা দেয়? এ যেন সূর্যের আলোকে অস্বীকার করে প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করার চেষ্টা।
শেষের দিকে এসে একটা কথা বলি, যা হয়তো আপনার বিবেককে নাড়া দেবে। আপনি যখন মারা যাবেন, আপনার জানাজার খাটিয়া যখন কাঁধে তোলা হবে, তখন মানুষেরা কী বলবে? তারা সমস্বরে বলবে—‘আল্লাহু আকবার’। চার তাকবীরে আপনার জানাজা পড়া হবে।
ভাবুন তো, যেই তাকবীর নিয়ে আপনার এতো এলার্জি ছিল, সেই তাকবীর দিয়েই আপনাকে বিদায় জানানো হচ্ছে। কি অদ্ভুত না? আপনি সারাজীবন যেই ধ্বনিকে ‘মৌলবাদ’ বা ‘বাড়াবাড়ি’ বলেছেন, মৃত্যুর পর সেই ধ্বনিই আপনার মাগফিরাতের একমাত্র মাধ্যম হবে।
তাই সময় থাকতে জাগুন। জাহিলিয়াতের চশমা খুলে ফেলুন। মডার্ন হওয়ার নামে ঈমান বিক্রি করবেন না। আল্লাহু আকবার কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি অস্তিত্বের স্লোগান, এটি মুক্তির স্লোগান, এটি বিজয়ের স্লোগান। যেদিন এই উম্মাহর প্রতিটি যুবকের হৃদয়ে, প্রতিটি নারীর হিজাবে, প্রতিটি পুরুষের দাঁড়িতে এবং কর্মে ‘আল্লাহু আকবার’-এর প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে, সেদিন পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।
আসুন, আমরা আমাদের কণ্ঠে সেই হারানো তেজ ফিরিয়ে আনি। লজ্জিত না হয়ে, কুণ্ঠিত না হয়ে, সগৌরবে ঘোষণা করি মহাকাশের সেই পরম সত্য। আকাশ সাক্ষী থাকুক, বাতাস সাক্ষী থাকুক, আর সাক্ষী থাকুক এই জমিন—আমরা সেই দল, যারা আল্লাহ ছাড়া কাউকে বড় বলে মানি না।
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
[তাকবীর]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group
