জীবনের এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন আপনার মনে হয় পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। চারদিকের দেয়ালগুলো যেন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে, আর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক অতল গহ্বরের কিনারায়। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে, যখন মনে হয় সব রাস্তা বন্ধ, সব আলো নিভে গেছে, তখনই আসলে আপনার গল্পের মূল মোড়টা শুরু হয়।
এই সেই সন্ধিক্ষণ, যেখানে আপনার হাতে কেবল দুটি অপশন অবশিষ্ট থাকে।
প্রথমটি হলো—
হাল ছেড়ে দেওয়া, স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে নিজেকে ধ্বংসের হাতে সঁপে দেওয়া।
আর দ্বিতীয়টি হলো—দাঁতে দাঁত চেপে ঘুরে দাঁড়ানো, ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে জেগে ওঠা।
পৃথিবীর ইতিহাসে যারাই ইতিহাস গড়েছেন, যারাই নিজেদের চিনিয়েছেন ‘মানুষ’ হিসেবে, তাদের প্রত্যেকের জীবনেই এই ‘দুটি অপশন’ ওয়ালা অধ্যায়টি এসেছিল। কেউ সেখানে ভেঙে চুরমার হয়ে হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে, আর কেউ সেই ভাঙা টুকরোগুলো দিয়েই গড়ে তুলেছে এক ইস্পাতকঠিন ইমারত। প্রতিটা শক্ত মানুষের পেছনে এই না-বলা গল্পটা থাকে, যা হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার চকচকে হাসির আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, ইসলাম মানেই বুঝি শান্তশিষ্ট একটা জীবন, যেখানে কোনো ঝড় নেই, কোনো জলোচ্ছ্বাস নেই। কিন্তু কুরআনের পাতা উল্টালে আমরা দেখি ভিন্ন চিত্র। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-আনকাবুতের শুরুতেই এক প্রলয়ংকরী প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন,
“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’—এ কথা বলেই তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ২)
এই আয়াতটি নিছক কোনো বাক্য নয়; এটি মুমিনের জীবনের ব্লু-প্রিন্ট। আপনি যখনই নিজেকে সত্যের পথে পরিচালিত করবেন, যখনই আপনি নিজেকে আল্লাহর প্রিয়ভাজন ভাবতে শুরু করবেন, ঠিক তখনই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আপনার সামনে হাজির হবে। কেন? কারণ, খাদ ছাড়া সোনা চেনা যায় না, আর চাপ ছাড়া কয়লা হীরায় পরিণত হয় না। যে লোহা আগুনে পোড়ে না, সে লোহা দিয়ে কখনো ধারালো তলোয়ার বানানো সম্ভব নয়। আপনার জীবনের ওই কঠিন সময়টা, যখন আপনার অপশন ছিল মাত্র দুটি, সেটি আসলে আল্লাহ কর্তৃক আপনাকে ‘প্রসেসিং’ করার সময়।
আধুনিক যুগে আমরা ‘ডিপ্রেশন’ শব্দটাকে খুব সস্তায় ব্যবহার করি। সামান্য আঘাতেই আমরা মুষড়ে পড়ি। অথচ আমাদের পূর্বসূরিরা, সেই সালাফ আস-সালেহিন, তাদের জীবনে ঝড় আসত পাহাড়সম। কিন্তু তারা ভাঙতেন না। কেন জানেন? কারণ তাদের ‘মাইন্ডসেট’ ছিল ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা জানতেন, দুনিয়াটা কোনো আরামের বিছানা নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষার হল। পরীক্ষার হলে এসি কাজ না করলে, বেঞ্চ শক্ত হলে যেমন ছাত্র পরীক্ষা ছেড়ে বেরিয়ে যায় না, বরং মনোযোগ দিয়ে খাতাটা শেষ করে, ঠিক তেমনি মুমিন ব্যক্তি জীবনের কঠিন মুহূর্তেও তার ‘ফোকাস’ নড়াতে দেয় না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের দিকে তাকান। তায়েফের ময়দানে যখন তাঁকে পাথর মারা হচ্ছিল, শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পায়ের জুতোর সাথে জমাট বেঁধে যাচ্ছিল, তখন তাঁর সামনেও দুটি অপশন ছিল।
এক—
বদদোয়া করে পুরো তায়েফবাসীকে পিষে ফেলা এবং হতাশ হয়ে দাওয়াতি কাজ ছেড়ে দেওয়া।
দুই—
এই চরম অপমানেও ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং আরও শক্তভাবে নিজের মিশন আঁকড়ে ধরা।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দ্বিতীয়টি বেছে নিয়েছিলেন। আর তাই আজ দেড় হাজার বছর পর আপনি আর আমি কালেমা পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। সেই রক্তঝরা দিনটি যদি তিনি ‘হাল ছেড়ে দেওয়ার’ অপশন বেছে নিতেন, তবে ইসলামের ইতিহাস ওখানেই শেষ হয়ে যেত।
শক্ত মানুষ এমনি এমনি তৈরি হয় না। শক্ত মানুষ তৈরি হয় রাতের অন্ধকারে, জায়নামাজে চোখের পানি ফেলার মাধ্যমে। যখন দুনিয়ার সবাই ঘুমিয়ে থাকে, আর আপনি আপনার রবের সাথে একান্তে কথা বলেন, নিজের দুর্বলতাগুলো তাঁর সামনে উজাড় করে দেন, ঠিক তখনই আপনার ভেতরে এক অলৌকিক শক্তির সঞ্চার হয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন,
“আমি আমার বান্দার প্রতি তেমনই আচরণ করি, যেমন সে আমার প্রতি ধারণা পোষণ করে।”
আপনি যদি ভাবেন, “আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করার জন্য এই বিপদ দিয়েছেন”, তবে আপনি ধ্বংসই হবেন। আর যদি ভাবেন, “আমার রব আমাকে শক্তিশালী করার জন্য, আমাকে কোনো বড় মাকামে পৌঁছানোর জন্য এই সিঁড়িটি দিয়েছেন”, তবে আপনি অবশ্যই বিজয়ী হবেন। মুমিনের ডিকশনারিতে ‘ব্যর্থতা’ বলে কোনো শব্দ নেই; আছে কেবল ‘অভিজ্ঞতা’ এবং ‘পরীক্ষা’।
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সমসাময়িক ভোগবাদী সমাজের চশমা দিয়ে জীবনকে দেখি। আমাদের শেখানো হয়েছে, জীবন মানেই সাকসেস, জীবন মানেই সুখ। তাই যখনই একটু দুঃখ আসে, আমরা ভড়কে যাই। অথচ আল্লাহ বলছেন,
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের কিছুটা ক্ষতি দিয়ে; আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ ‘অবশ্যই’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, এই অপশনটি আসবেই। আপনার চাকরি চলে যেতে পারে, প্রিয়জন আপনাকে ছেড়ে যেতে পারে, দুরারোগ্য ব্যাধি আপনার শরীরে বাসা বাঁধতে পারে, অথবা মিথ্যে অপবাদে আপনার সামাজিক মর্যাদা ধুলিস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে শয়তান আপনার কানে ফিসফিস করে বলবে, “শেষ! সব শেষ! তোমার আর বাঁচার কোনো মানে নেই।”
এটিই সেই প্রথম অপশন—শয়তানের টোপ। কিন্তু কুরআনিক লজিক বলে, “যেখানে শেষ, সেখান থেকেই মূলত নতুনের শুরু।” রাত যখন সবচেয়ে গভীর হয়, ভোর তখন সবচেয়ে নিকটে থাকে।
একজন সালাফি অনুসারী প্রকৃত মুসলিমের জীবন দর্শন হলো—তাকদিরে বিশ্বাস। উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের (রহ.)-এর ঘটনাটি আমাদের জন্য এক জীবন্ত পাঠ। তিনি সফরের সময় তার একটি পা পচন ধরার কারণে কেটে ফেলতে বাধ্য হলেন। ঠিক একই সফরে তার প্রিয় পুত্র ঘোড়ার লাথিতে মারা গেল। এক দিনে দুটি বিশাল ট্রাজেডি! পা হারালেন, সন্তান হারালেন। মানুষ ভাবল তিনি ভেঙে পড়বেন।
কিন্তু তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! আমার চারটি হাত-পায়ের মধ্যে আপনি একটি নিয়েছেন, তিনটি তো রেখেছেন। আমার চার ছেলের মধ্যে একটি নিয়েছেন, তিনটি তো রেখেছেন। আপনি যা দিয়েছেন তার জন্যও প্রশংসা, যা নিয়েছেন তার জন্যও প্রশংসা।”
এই যে মানসিক দৃঢ়তা, এটা কোনো মোটিভেশনাল স্পিকারের ভিডিও দেখে আসেনি। এটা এসেছে কুরআনের গভীর বুঝ থেকে। তিনি জানতেন, তার সামনে দুটি অপশন ছিল:
এক— হা-হুতাশ করে আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা এবং নিজের ঈমান হারানো।
দুই— সবর করে জান্নাতের বিনিময় হিসেবে এই কষ্টকে কবুল করে নেওয়া। তিনি শক্ত হওয়াটাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
আজকের দিনে আমাদের যুবসমাজ সামান্য রিলেশনশিপ ব্রেকআপ বা ক্যারিয়ারের ছোটখাটো ধস নামলেই আত্মহত্যার কথা ভাবে। কারণ, তাদের আত্মার খোরাক নেই। তাদের আত্মা দুর্বল। তারা মনে করে, এই দুনিয়ার প্রাপ্তিই সব। অথচ মুমিন জানে, দুনিয়াটা একটা মুসাফিরখানা। এখানে কেউ থাকতে আসেনি। আসল গন্তব্য তো সামনে। যে মানুষটা জানে তার আসল বাড়ি জান্নাতে, রাস্তার ধারের কোনো সরাইখানায় বেডশিট ময়লা হলে সে কি খুব বেশি বিচলিত হবে?
না। সে বলবে, “রাত পোহালেই তো চলে যাব।” এই চিন্তাটাই মানুষকে ‘শক্ত’ করে। যখন আপনি জানবেন যে, আপনার সাথে যা ঘটছে তা মহাবিশ্বের মহাপরিচালক আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ, তখন আপনার দুশ্চিন্তা বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে।
ভাবুন, আল্লাহ কি আপনাকে ভালোবাসেন না? অবশ্যই বাসেন। মায়ের চেয়েও সত্তর গুণ বেশি বাসেন। তাহলে সেই দয়ালু রব কেন আপনাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেললেন যেখানে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসছে? কারণ, তিনি চান আপনি নিজের পায়ের ওপর দাঁড়ান। তিনি চান আপনি দুনিয়ার ওপর নির্ভরতা ছেড়ে একমাত্র তাঁর ওপর নির্ভর করুন।
একটা বাচ্চার কথা ভাবুন। মা যখন বাচ্চাটাকে হাত ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শেখায়, বাচ্চাটা ভয় পায়, টলমল করে, পড়ে যায়, হয়তো কান্নাও করে। কিন্তু মা কি নিষ্ঠুর? না। মা জানেন, আজ যদি তিনি হাতটা না ছাড়েন, তবে সন্তান কোনোদিন নিজের পায়ে হাঁটতে শিখবে না।
আল্লাহও মাঝে মাঝে আমাদের হাত ছেড়ে দেন, যাতে আমরা শিখতে পারি কীভাবে ঝড়ের মাঝেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়। এটাই সেই প্রসেস—শক্ত হওয়ার প্রসেস।
শক্ত মানুষরা কাঁদে না—এ কথা ভুল। শক্ত মানুষরাই সবচেয়ে বেশি কাঁদে, তবে সেটা মানুষের সামনে নয়, জায়নামাজে। তাদের কান্না হয় নীরব, তাদের অভিযোগ হয় কেবল রবের দরবারে। তারা যখন চোখ মুছে মানুষের সামনে আসে, তখন তাদের চেহারায় থাকে প্রশান্তির ছাপ। কারণ তারা তাদের বোঝাটা আল্লাহর জিম্মায় দিয়ে এসেছে। আপনি যখন আপনার দুর্বলতাগুলো আল্লাহর কাছে প্রকাশ করবেন, আল্লাহ তখন আপনাকে এমন শক্তি দেবেন যা দিয়ে আপনি পাহাড়ও টলাতে পারবেন।
সাহাবায়ে কেরাম বদরের মাঠে সংখ্যায় কম ছিলেন, অস্ত্রে কম ছিলেন, কিন্তু তাদের ‘ঈমানি শক্তি’ এত প্রখর ছিল যে, ফেরেশতারাও তাদের সাহায্যে নেমে এসেছিলেন। আপনার জীবনের বদর প্রান্তরেও আপনি একা নন। যদি আপনি ‘শক্ত হওয়ার’ অপশনটি বেছে নেন, তবে আসমানি সাহায্য আপনার জন্যও অপেক্ষা করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।”
এখানে শক্তি বলতে কেবল সিক্স প্যাক বডি বা মাসল বোঝানো হয়নি। এখানে বোঝানো হয়েছে মানসিক ও আত্মিক শক্তি। যে শক্তি দিয়ে মানুষ পাপের হাতছানিকে ‘না’ বলতে পারে। যে শক্তি দিয়ে মানুষ হাজারো কষ্টের মাঝেও বলতে পারে “আলহামদুলিল্লাহ”।
আজকের এই ভোগবাদী সমাজে, যেখানে অশ্লীলতা আর হারাম উপার্জনের স্রোত বইছে, সেখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলাটাই সবচেয়ে বড় শক্তি। সবাই যখন অন্যায়ের সাথে আপস করে নিচ্ছে, তখন আপনি যখন একলা দাঁড়িয়ে সত্যের পতাকা ধরেন—সেটাই আপনার শক্ত হওয়ার গল্প।
আপনার জীবনের ওই কঠিন অধ্যায়টা, যেটা কাউকে বলতে পারেন না, সেটাই আপনার ‘মেকিং জোন’। ওটাই আপনাকে তৈরি করছে ভবিষ্যতের কোনো বড় দায়িত্বের জন্য। হযরত ইউসুফ (আ.)-কে দেখুন। কূয়ায় নিক্ষিপ্ত হলেন, দাস হিসেবে বিক্রি হলেন, মিথ্যা অপবাদে জেলে গেলেন। প্রতিটি ধাপে তার সামনে অপশন ছিল—হতাশ হওয়া অথবা আল্লাহর ওপর ভরসা করে শক্ত থাকা। তিনি শক্ত থাকলেন। আর ফলাফল? জেলখানা থেকে সোজা মিশরের রাজসিংহাসন।
যদি তিনি কূয়ায় পড়ে হতাশ হয়ে যেতেন, তবে কি আমরা আজকের ইউসুফকে পেতাম? পেতাম না। তাই, আপনার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যৎ বিচার করবেন না। বীজের ভেতর বিশাল মহীরুহ সুপ্ত থাকে, কিন্তু তাকে মাটির নিচে অন্ধকার সহ্য করতে হয়, বুক চিরে অংকুর বের করতে হয়। আপনার বর্তমান কষ্টগুলো সেই অংকুরোদগমের বেদনা মাত্র।
আমাদের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, যারা জীবনে অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছে, তারাই পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল ও প্রজ্ঞাবান মানুষে পরিণত হয়। কারণ তারা যন্ত্রণার ভাষা বোঝে। তারা জানে, কীভাবে পড়ে গিয়ে আবার উঠতে হয়। আল্লাহ হয়তো আপনাকে ভেঙেছেন, যাতে আপনি অন্যদের জোড়া লাগাতে পারেন। আপনার ক্ষতগুলো একসময় অন্যদের জন্য আরোগ্যের কারণ হবে। কিন্তু শর্ত হলো—আপনাকে সেই কঠিন সময়ে ‘হাল ছাড়া’ যাবে না। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, “ইন্না মাআল উসরি ইউসরা”—নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।
আল্লাহ একই আয়াতে দুবার বলেছেন এ কথা। কষ্টের পরে নয়, কষ্টের ‘সাথেই’ স্বস্তি আছে। প্যাকেজ ডিল। আপনি কষ্টটা নিচ্ছেন, স্বস্তিটা কেন রিজেক্ট করবেন?
তাই আজ যারা নিজেদের ব্যর্থ ভাবছেন, যারা ভাবছেন জীবনটা বুঝি এখানেই থেমে গেল, তাদের বলছি—আপনার গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। কলম এখনো আল্লাহর হাতে। আপনি শুধু পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছেন, কিন্তু লেখক তো তিনি। তিনি কি তাঁর প্রিয় বান্দার গল্পটা ট্রাজেডি দিয়ে শেষ করবেন? অসম্ভব। মুমিনের গল্পের শেষটা সবসময় সুন্দর হয়, ইহকালে না হলেও পরকালে। আপনার কাজ হলো সেই ‘হ্যাপি এন্ডিং’ পর্যন্ত টিকে থাকা। ধৈর্য মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; ধৈর্য মানে হলো ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা যে, এই ঝড় থামবেই।
নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি সেই কয়লা হবেন যা চাপে গুঁড়ো হয়ে যায়? নাকি সেই হীরা হবেন যা চাপে দ্যুতি ছড়ায়? পছন্দ আপনার। অপশন দুইটা।
এক— হয় আপনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিজেকে শেষ করে দেবেন—মদ, ড্রাগস, হারাম রিলেশন বা আত্মহননের মাধ্যমে।
দুই — আপনি ওজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে বলবেন, “ইয়া রব! আমি দুর্বল, কিন্তু তুমি সবল। আমি পারছি না, কিন্তু তুমি তো পারো। আমাকে শক্তি দাও।”
বিশ্বাস করুন, এই একটি সিদ্ধান্ত আপনার জীবনকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেবে। তখন আপনি আর পরিস্থিতির দাস থাকবেন না, আপনি হবেন পরিস্থিতির নেতা। আপনার গল্পটা যেন এমন হয়, যা শুনে অন্য কেউ সাহস পায়। যেন কেউ আপনার দিকে তাকিয়ে বলতে পারে, “সে যদি পারে, আমিও পারব।”
সালাফরা বলতেন, “যার ঈমান যত মজবুত, তার পরীক্ষাও তত কঠিন।” তাই বিপদ দেখলে ভয় পাবেন না। মনে করবেন, আপনার ঈমানের লেভেল বাড়ছে বলেই পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হচ্ছে। আল্লাহ আপনাকে প্রমোশন দিতে চান। আর প্রমোশন পেতে হলে কঠিন ইন্টারভিউ ফেস করতেই হয়।
পরিশেষে বলি, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকান। এই চোখ অনেক কেঁদেছে, এই মন অনেক ভেঙেছে। কিন্তু আপনি এখনো বেঁচে আছেন। এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। তার মানে আল্লাহ আপনার ওপর আশা ছাড়েননি। তিনি এখনো আপনাকে নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। অতীতে যা হারিয়েছেন, তার জন্য শোক করবেন না। যা আছে, তা নিয়ে নতুন করে শুরু করুন। মনে রাখবেন, ভাঙা হাড় যখন জোড়া লাগে, তখন জোড়া লাগার স্থানটা আগের চেয়েও মজবুত হয়। আপনার ভাঙা হৃদয়টা যখন আল্লাহর ভালোবাসায় জোড়া লাগবে, তখন তা হবে আগের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি পবিত্র।
সুতরাং, শেষ হয়ে যাওয়া নয়, শক্ত হওয়াকেই বেছে নিন। কারণ, ভীরুরা মরে যায় বারবার, কিন্তু সাহসীরা মৃত্যুঞ্জয়ী হয় আল্লাহর রহমতে। আপনার গল্পটা যেন হয় বিজয়ের, পরাজয়ের নয়। সেই গল্প, যেখানে নায়ক রক্তমাখা শরীরেও হাসিমুখে বলে, “আমার রব আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।”
[গন্তব্যের বাঁকে দুই অপশন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
জীবনের এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন আপনার মনে হয় পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। চারদিকের দেয়ালগুলো যেন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে, আর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক অতল গহ্বরের কিনারায়। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে, যখন মনে হয় সব রাস্তা বন্ধ, সব আলো নিভে গেছে, তখনই আসলে আপনার গল্পের মূল মোড়টা শুরু হয়।
এই সেই সন্ধিক্ষণ, যেখানে আপনার হাতে কেবল দুটি অপশন অবশিষ্ট থাকে।
প্রথমটি হলো—
হাল ছেড়ে দেওয়া, স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে নিজেকে ধ্বংসের হাতে সঁপে দেওয়া।
আর দ্বিতীয়টি হলো—দাঁতে দাঁত চেপে ঘুরে দাঁড়ানো, ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে জেগে ওঠা।
পৃথিবীর ইতিহাসে যারাই ইতিহাস গড়েছেন, যারাই নিজেদের চিনিয়েছেন ‘মানুষ’ হিসেবে, তাদের প্রত্যেকের জীবনেই এই ‘দুটি অপশন’ ওয়ালা অধ্যায়টি এসেছিল। কেউ সেখানে ভেঙে চুরমার হয়ে হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে, আর কেউ সেই ভাঙা টুকরোগুলো দিয়েই গড়ে তুলেছে এক ইস্পাতকঠিন ইমারত। প্রতিটা শক্ত মানুষের পেছনে এই না-বলা গল্পটা থাকে, যা হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার চকচকে হাসির আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, ইসলাম মানেই বুঝি শান্তশিষ্ট একটা জীবন, যেখানে কোনো ঝড় নেই, কোনো জলোচ্ছ্বাস নেই। কিন্তু কুরআনের পাতা উল্টালে আমরা দেখি ভিন্ন চিত্র। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-আনকাবুতের শুরুতেই এক প্রলয়ংকরী প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন,
“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’—এ কথা বলেই তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ২)
এই আয়াতটি নিছক কোনো বাক্য নয়; এটি মুমিনের জীবনের ব্লু-প্রিন্ট। আপনি যখনই নিজেকে সত্যের পথে পরিচালিত করবেন, যখনই আপনি নিজেকে আল্লাহর প্রিয়ভাজন ভাবতে শুরু করবেন, ঠিক তখনই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আপনার সামনে হাজির হবে। কেন? কারণ, খাদ ছাড়া সোনা চেনা যায় না, আর চাপ ছাড়া কয়লা হীরায় পরিণত হয় না। যে লোহা আগুনে পোড়ে না, সে লোহা দিয়ে কখনো ধারালো তলোয়ার বানানো সম্ভব নয়। আপনার জীবনের ওই কঠিন সময়টা, যখন আপনার অপশন ছিল মাত্র দুটি, সেটি আসলে আল্লাহ কর্তৃক আপনাকে ‘প্রসেসিং’ করার সময়।
আধুনিক যুগে আমরা ‘ডিপ্রেশন’ শব্দটাকে খুব সস্তায় ব্যবহার করি। সামান্য আঘাতেই আমরা মুষড়ে পড়ি। অথচ আমাদের পূর্বসূরিরা, সেই সালাফ আস-সালেহিন, তাদের জীবনে ঝড় আসত পাহাড়সম। কিন্তু তারা ভাঙতেন না। কেন জানেন? কারণ তাদের ‘মাইন্ডসেট’ ছিল ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা জানতেন, দুনিয়াটা কোনো আরামের বিছানা নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষার হল। পরীক্ষার হলে এসি কাজ না করলে, বেঞ্চ শক্ত হলে যেমন ছাত্র পরীক্ষা ছেড়ে বেরিয়ে যায় না, বরং মনোযোগ দিয়ে খাতাটা শেষ করে, ঠিক তেমনি মুমিন ব্যক্তি জীবনের কঠিন মুহূর্তেও তার ‘ফোকাস’ নড়াতে দেয় না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের দিকে তাকান। তায়েফের ময়দানে যখন তাঁকে পাথর মারা হচ্ছিল, শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পায়ের জুতোর সাথে জমাট বেঁধে যাচ্ছিল, তখন তাঁর সামনেও দুটি অপশন ছিল।
এক—
বদদোয়া করে পুরো তায়েফবাসীকে পিষে ফেলা এবং হতাশ হয়ে দাওয়াতি কাজ ছেড়ে দেওয়া।
দুই—
এই চরম অপমানেও ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং আরও শক্তভাবে নিজের মিশন আঁকড়ে ধরা।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দ্বিতীয়টি বেছে নিয়েছিলেন। আর তাই আজ দেড় হাজার বছর পর আপনি আর আমি কালেমা পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। সেই রক্তঝরা দিনটি যদি তিনি ‘হাল ছেড়ে দেওয়ার’ অপশন বেছে নিতেন, তবে ইসলামের ইতিহাস ওখানেই শেষ হয়ে যেত।
শক্ত মানুষ এমনি এমনি তৈরি হয় না। শক্ত মানুষ তৈরি হয় রাতের অন্ধকারে, জায়নামাজে চোখের পানি ফেলার মাধ্যমে। যখন দুনিয়ার সবাই ঘুমিয়ে থাকে, আর আপনি আপনার রবের সাথে একান্তে কথা বলেন, নিজের দুর্বলতাগুলো তাঁর সামনে উজাড় করে দেন, ঠিক তখনই আপনার ভেতরে এক অলৌকিক শক্তির সঞ্চার হয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন,
“আমি আমার বান্দার প্রতি তেমনই আচরণ করি, যেমন সে আমার প্রতি ধারণা পোষণ করে।”
আপনি যদি ভাবেন, “আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করার জন্য এই বিপদ দিয়েছেন”, তবে আপনি ধ্বংসই হবেন। আর যদি ভাবেন, “আমার রব আমাকে শক্তিশালী করার জন্য, আমাকে কোনো বড় মাকামে পৌঁছানোর জন্য এই সিঁড়িটি দিয়েছেন”, তবে আপনি অবশ্যই বিজয়ী হবেন। মুমিনের ডিকশনারিতে ‘ব্যর্থতা’ বলে কোনো শব্দ নেই; আছে কেবল ‘অভিজ্ঞতা’ এবং ‘পরীক্ষা’।
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সমসাময়িক ভোগবাদী সমাজের চশমা দিয়ে জীবনকে দেখি। আমাদের শেখানো হয়েছে, জীবন মানেই সাকসেস, জীবন মানেই সুখ। তাই যখনই একটু দুঃখ আসে, আমরা ভড়কে যাই। অথচ আল্লাহ বলছেন,
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের কিছুটা ক্ষতি দিয়ে; আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ ‘অবশ্যই’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, এই অপশনটি আসবেই। আপনার চাকরি চলে যেতে পারে, প্রিয়জন আপনাকে ছেড়ে যেতে পারে, দুরারোগ্য ব্যাধি আপনার শরীরে বাসা বাঁধতে পারে, অথবা মিথ্যে অপবাদে আপনার সামাজিক মর্যাদা ধুলিস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে শয়তান আপনার কানে ফিসফিস করে বলবে, “শেষ! সব শেষ! তোমার আর বাঁচার কোনো মানে নেই।”
এটিই সেই প্রথম অপশন—শয়তানের টোপ। কিন্তু কুরআনিক লজিক বলে, “যেখানে শেষ, সেখান থেকেই মূলত নতুনের শুরু।” রাত যখন সবচেয়ে গভীর হয়, ভোর তখন সবচেয়ে নিকটে থাকে।
একজন সালাফি অনুসারী প্রকৃত মুসলিমের জীবন দর্শন হলো—তাকদিরে বিশ্বাস। উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের (রহ.)-এর ঘটনাটি আমাদের জন্য এক জীবন্ত পাঠ। তিনি সফরের সময় তার একটি পা পচন ধরার কারণে কেটে ফেলতে বাধ্য হলেন। ঠিক একই সফরে তার প্রিয় পুত্র ঘোড়ার লাথিতে মারা গেল। এক দিনে দুটি বিশাল ট্রাজেডি! পা হারালেন, সন্তান হারালেন। মানুষ ভাবল তিনি ভেঙে পড়বেন।
কিন্তু তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! আমার চারটি হাত-পায়ের মধ্যে আপনি একটি নিয়েছেন, তিনটি তো রেখেছেন। আমার চার ছেলের মধ্যে একটি নিয়েছেন, তিনটি তো রেখেছেন। আপনি যা দিয়েছেন তার জন্যও প্রশংসা, যা নিয়েছেন তার জন্যও প্রশংসা।”
এই যে মানসিক দৃঢ়তা, এটা কোনো মোটিভেশনাল স্পিকারের ভিডিও দেখে আসেনি। এটা এসেছে কুরআনের গভীর বুঝ থেকে। তিনি জানতেন, তার সামনে দুটি অপশন ছিল:
এক— হা-হুতাশ করে আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা এবং নিজের ঈমান হারানো।
দুই— সবর করে জান্নাতের বিনিময় হিসেবে এই কষ্টকে কবুল করে নেওয়া। তিনি শক্ত হওয়াটাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
আজকের দিনে আমাদের যুবসমাজ সামান্য রিলেশনশিপ ব্রেকআপ বা ক্যারিয়ারের ছোটখাটো ধস নামলেই আত্মহত্যার কথা ভাবে। কারণ, তাদের আত্মার খোরাক নেই। তাদের আত্মা দুর্বল। তারা মনে করে, এই দুনিয়ার প্রাপ্তিই সব। অথচ মুমিন জানে, দুনিয়াটা একটা মুসাফিরখানা। এখানে কেউ থাকতে আসেনি। আসল গন্তব্য তো সামনে। যে মানুষটা জানে তার আসল বাড়ি জান্নাতে, রাস্তার ধারের কোনো সরাইখানায় বেডশিট ময়লা হলে সে কি খুব বেশি বিচলিত হবে?
না। সে বলবে, “রাত পোহালেই তো চলে যাব।” এই চিন্তাটাই মানুষকে ‘শক্ত’ করে। যখন আপনি জানবেন যে, আপনার সাথে যা ঘটছে তা মহাবিশ্বের মহাপরিচালক আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ, তখন আপনার দুশ্চিন্তা বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে।
ভাবুন, আল্লাহ কি আপনাকে ভালোবাসেন না? অবশ্যই বাসেন। মায়ের চেয়েও সত্তর গুণ বেশি বাসেন। তাহলে সেই দয়ালু রব কেন আপনাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেললেন যেখানে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসছে? কারণ, তিনি চান আপনি নিজের পায়ের ওপর দাঁড়ান। তিনি চান আপনি দুনিয়ার ওপর নির্ভরতা ছেড়ে একমাত্র তাঁর ওপর নির্ভর করুন।
একটা বাচ্চার কথা ভাবুন। মা যখন বাচ্চাটাকে হাত ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শেখায়, বাচ্চাটা ভয় পায়, টলমল করে, পড়ে যায়, হয়তো কান্নাও করে। কিন্তু মা কি নিষ্ঠুর? না। মা জানেন, আজ যদি তিনি হাতটা না ছাড়েন, তবে সন্তান কোনোদিন নিজের পায়ে হাঁটতে শিখবে না।
আল্লাহও মাঝে মাঝে আমাদের হাত ছেড়ে দেন, যাতে আমরা শিখতে পারি কীভাবে ঝড়ের মাঝেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়। এটাই সেই প্রসেস—শক্ত হওয়ার প্রসেস।
শক্ত মানুষরা কাঁদে না—এ কথা ভুল। শক্ত মানুষরাই সবচেয়ে বেশি কাঁদে, তবে সেটা মানুষের সামনে নয়, জায়নামাজে। তাদের কান্না হয় নীরব, তাদের অভিযোগ হয় কেবল রবের দরবারে। তারা যখন চোখ মুছে মানুষের সামনে আসে, তখন তাদের চেহারায় থাকে প্রশান্তির ছাপ। কারণ তারা তাদের বোঝাটা আল্লাহর জিম্মায় দিয়ে এসেছে। আপনি যখন আপনার দুর্বলতাগুলো আল্লাহর কাছে প্রকাশ করবেন, আল্লাহ তখন আপনাকে এমন শক্তি দেবেন যা দিয়ে আপনি পাহাড়ও টলাতে পারবেন।
সাহাবায়ে কেরাম বদরের মাঠে সংখ্যায় কম ছিলেন, অস্ত্রে কম ছিলেন, কিন্তু তাদের ‘ঈমানি শক্তি’ এত প্রখর ছিল যে, ফেরেশতারাও তাদের সাহায্যে নেমে এসেছিলেন। আপনার জীবনের বদর প্রান্তরেও আপনি একা নন। যদি আপনি ‘শক্ত হওয়ার’ অপশনটি বেছে নেন, তবে আসমানি সাহায্য আপনার জন্যও অপেক্ষা করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।”
এখানে শক্তি বলতে কেবল সিক্স প্যাক বডি বা মাসল বোঝানো হয়নি। এখানে বোঝানো হয়েছে মানসিক ও আত্মিক শক্তি। যে শক্তি দিয়ে মানুষ পাপের হাতছানিকে ‘না’ বলতে পারে। যে শক্তি দিয়ে মানুষ হাজারো কষ্টের মাঝেও বলতে পারে “আলহামদুলিল্লাহ”।
আজকের এই ভোগবাদী সমাজে, যেখানে অশ্লীলতা আর হারাম উপার্জনের স্রোত বইছে, সেখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলাটাই সবচেয়ে বড় শক্তি। সবাই যখন অন্যায়ের সাথে আপস করে নিচ্ছে, তখন আপনি যখন একলা দাঁড়িয়ে সত্যের পতাকা ধরেন—সেটাই আপনার শক্ত হওয়ার গল্প।
আপনার জীবনের ওই কঠিন অধ্যায়টা, যেটা কাউকে বলতে পারেন না, সেটাই আপনার ‘মেকিং জোন’। ওটাই আপনাকে তৈরি করছে ভবিষ্যতের কোনো বড় দায়িত্বের জন্য। হযরত ইউসুফ (আ.)-কে দেখুন। কূয়ায় নিক্ষিপ্ত হলেন, দাস হিসেবে বিক্রি হলেন, মিথ্যা অপবাদে জেলে গেলেন। প্রতিটি ধাপে তার সামনে অপশন ছিল—হতাশ হওয়া অথবা আল্লাহর ওপর ভরসা করে শক্ত থাকা। তিনি শক্ত থাকলেন। আর ফলাফল? জেলখানা থেকে সোজা মিশরের রাজসিংহাসন।
যদি তিনি কূয়ায় পড়ে হতাশ হয়ে যেতেন, তবে কি আমরা আজকের ইউসুফকে পেতাম? পেতাম না। তাই, আপনার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যৎ বিচার করবেন না। বীজের ভেতর বিশাল মহীরুহ সুপ্ত থাকে, কিন্তু তাকে মাটির নিচে অন্ধকার সহ্য করতে হয়, বুক চিরে অংকুর বের করতে হয়। আপনার বর্তমান কষ্টগুলো সেই অংকুরোদগমের বেদনা মাত্র।
আমাদের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, যারা জীবনে অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছে, তারাই পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল ও প্রজ্ঞাবান মানুষে পরিণত হয়। কারণ তারা যন্ত্রণার ভাষা বোঝে। তারা জানে, কীভাবে পড়ে গিয়ে আবার উঠতে হয়। আল্লাহ হয়তো আপনাকে ভেঙেছেন, যাতে আপনি অন্যদের জোড়া লাগাতে পারেন। আপনার ক্ষতগুলো একসময় অন্যদের জন্য আরোগ্যের কারণ হবে। কিন্তু শর্ত হলো—আপনাকে সেই কঠিন সময়ে ‘হাল ছাড়া’ যাবে না। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, “ইন্না মাআল উসরি ইউসরা”—নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।
আল্লাহ একই আয়াতে দুবার বলেছেন এ কথা। কষ্টের পরে নয়, কষ্টের ‘সাথেই’ স্বস্তি আছে। প্যাকেজ ডিল। আপনি কষ্টটা নিচ্ছেন, স্বস্তিটা কেন রিজেক্ট করবেন?
তাই আজ যারা নিজেদের ব্যর্থ ভাবছেন, যারা ভাবছেন জীবনটা বুঝি এখানেই থেমে গেল, তাদের বলছি—আপনার গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। কলম এখনো আল্লাহর হাতে। আপনি শুধু পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছেন, কিন্তু লেখক তো তিনি। তিনি কি তাঁর প্রিয় বান্দার গল্পটা ট্রাজেডি দিয়ে শেষ করবেন? অসম্ভব। মুমিনের গল্পের শেষটা সবসময় সুন্দর হয়, ইহকালে না হলেও পরকালে। আপনার কাজ হলো সেই ‘হ্যাপি এন্ডিং’ পর্যন্ত টিকে থাকা। ধৈর্য মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; ধৈর্য মানে হলো ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা যে, এই ঝড় থামবেই।
নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি সেই কয়লা হবেন যা চাপে গুঁড়ো হয়ে যায়? নাকি সেই হীরা হবেন যা চাপে দ্যুতি ছড়ায়? পছন্দ আপনার। অপশন দুইটা।
এক— হয় আপনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিজেকে শেষ করে দেবেন—মদ, ড্রাগস, হারাম রিলেশন বা আত্মহননের মাধ্যমে।
দুই — আপনি ওজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে বলবেন, “ইয়া রব! আমি দুর্বল, কিন্তু তুমি সবল। আমি পারছি না, কিন্তু তুমি তো পারো। আমাকে শক্তি দাও।”
বিশ্বাস করুন, এই একটি সিদ্ধান্ত আপনার জীবনকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেবে। তখন আপনি আর পরিস্থিতির দাস থাকবেন না, আপনি হবেন পরিস্থিতির নেতা। আপনার গল্পটা যেন এমন হয়, যা শুনে অন্য কেউ সাহস পায়। যেন কেউ আপনার দিকে তাকিয়ে বলতে পারে, “সে যদি পারে, আমিও পারব।”
সালাফরা বলতেন, “যার ঈমান যত মজবুত, তার পরীক্ষাও তত কঠিন।” তাই বিপদ দেখলে ভয় পাবেন না। মনে করবেন, আপনার ঈমানের লেভেল বাড়ছে বলেই পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হচ্ছে। আল্লাহ আপনাকে প্রমোশন দিতে চান। আর প্রমোশন পেতে হলে কঠিন ইন্টারভিউ ফেস করতেই হয়।
পরিশেষে বলি, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকান। এই চোখ অনেক কেঁদেছে, এই মন অনেক ভেঙেছে। কিন্তু আপনি এখনো বেঁচে আছেন। এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। তার মানে আল্লাহ আপনার ওপর আশা ছাড়েননি। তিনি এখনো আপনাকে নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। অতীতে যা হারিয়েছেন, তার জন্য শোক করবেন না। যা আছে, তা নিয়ে নতুন করে শুরু করুন। মনে রাখবেন, ভাঙা হাড় যখন জোড়া লাগে, তখন জোড়া লাগার স্থানটা আগের চেয়েও মজবুত হয়। আপনার ভাঙা হৃদয়টা যখন আল্লাহর ভালোবাসায় জোড়া লাগবে, তখন তা হবে আগের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি পবিত্র।
সুতরাং, শেষ হয়ে যাওয়া নয়, শক্ত হওয়াকেই বেছে নিন। কারণ, ভীরুরা মরে যায় বারবার, কিন্তু সাহসীরা মৃত্যুঞ্জয়ী হয় আল্লাহর রহমতে। আপনার গল্পটা যেন হয় বিজয়ের, পরাজয়ের নয়। সেই গল্প, যেখানে নায়ক রক্তমাখা শরীরেও হাসিমুখে বলে, “আমার রব আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।”
[গন্তব্যের বাঁকে দুই অপশন]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed
Comment
Share
Send as a message
Share on my page
Share in the group
